চঞ্চলা চপলা সুন্দরী ঝর্ণা-মুকিত মজুমদার বাবু

চঞ্চলা চপলা সুন্দরী ঝর্ণা-মুকিত মজুমদার বাবু

18
0
SHARE
Evergreen-3

ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!
তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা!
অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনু ভরি’ যৌবন, তাপসী অপর্ণা!
ঝর্ণা!

কতই না কাব্যিকভাবে ঝর্ণার ছবি এঁকেছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। বাংলা সাহিত্যজুড়ে ঝর্ণার রূপ বর্ণনা বুঝি অন্য কোনো কবির কবিতায় এতটা জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। বহুবিধ অলংকার, উপমায় ভূষিত করে ছন্দের জাদুকর পাহাড়ি ঝর্ণাকে উপস্থাপন করেছেন। ছন্দ তুলে ছুটে চলা ঝর্ণার রূপে কবি মুগ্ধ হয়েছেন। শুধু কবি নয়, এমন কোনো প্রকৃতিপ্রেমী নেই যার কণ্ঠ গুনগুন করে ওঠে না ঝর্ণার ছুটে চলা ছন্দ-সুরে। নেচে নেচে প্রবাহিত হওয়া পাহাড়ি ঝর্ণায় প্রকৃতিপ্রেমীরা যেন খুঁজে পান উচ্ছ¡াস, উল্লাস, মুগ্ধতা, যৌবন, অনুপ্রেরণা, বাধা-বিপত্তি জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র।
আষাঢ়-শ্রাবণ শেষ হলেও বর্ষার টিপ টিপ এখনো ঝরছে। বর্ষাকালেই সবুজ প্রকৃতি যেন আরো সবুজ, ¯িœগ্ধ হয়ে ওঠে বৃষ্টিতে ¯œান করে। বর্ষাতেই পাহাড়ি ঝর্ণা হয়ে ওঠে যৌবনা। পাহাড়ের গায়ে গাঢ় সবুজের ঢেউ আর চপলা পায়ে ছুটে চলা রিনিক ঝিনিক সুর পাহাড়কে যেন নতুন করে জাগিয়ে তোলে। বর্ষায় পাহাড়ের মন ভোলানো সবুজ আর ঝর্ণার গান শুনতে হলে যেতে হবে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে। গ্রীষ্ম Ðলীয় অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পাহাড়ি বনে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টির পানি মিলিত ধারায়ছন্দ-সুরের ঝর্ণা সৃষ্টি করে। পাহাড়ে ছোট-বড়-মাঝারি বিভিন্ন আকারের ঝর্ণার দেখা মেলে। বড় আকারের ঝর্ণাগুলো জলপ্রপাত হিসেবেও পরিচিত। যেমন, শুভলং, তিনাপ সাইতার, মাধবকুÐ, হিমছড়ি, রিঝুক ইত্যাদি।
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় অবস্থিত মাধবকুÐ জলপ্রপাত। সারাবছর একটি মূল ধারায় ঝর্ণার জল প্রবাহিত হয়। বর্ষাকালের অবিরাম বর্ষণে মাধবকুÐ ঝর্ণা হয়ে ওঠে মোহনীয়। মুগ্ধতার অপার বিস্ময়ের কারণে ঝর্ণা ও ঝর্ণা সংলগ্ন এলাকাকে ইকোপার্ক ঘোষণা করা হয়েছে। আবার রাঙামাটির পাহাড়ঘেরা কাপ্তাই হ্রদ প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। হ্রদের পাশের উঁচু পাহাড়ের কোল থেকে কলকল ছলছল করে ঝরে পড়ছে শুভলং ঝর্ণা, যার উচ্চতা প্রায় ৩০০ ফুট। দেখতে অনিন্দ্য সুন্দর। বর্ষায় ঝর্ণার জলধারা নেমে আসে হ্রদের বুকে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মনোমুগ্ধকর ঝর্ণা দেখা যায় বান্দরবান অঞ্চলে। গহীন জঙ্গল রোয়াংছড়িতে অবস্থিত তিনাপ সাইতার নামক ঝর্ণাটি এগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঝর্ণার দুদিকে দাঁড়িয়ে আছে সবুজে মোড়ানো খাঁড়া পাহাড়। মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে তিনাপ সাইতারের জলধারা। বহমান জলধারার ছন্দময় নাচুনীমোহনীয় ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে।
সাঙ্গু বান্দরবানের অন্যতম নদী। পাহাড়ের বুক চিরে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে। নদীর তীরে অবস্থিত উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে পড়ছে রিঝুক ঝর্ণা। উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট। সারাবছর রিঝুকে জলপ্রবাহ থাকে, যা সাঙ্গুর নাব্যতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বান্দরবান-রুমার পথে অবস্থিত প্রাকৃতিক ঝর্ণা শৈলপ্রপাত। ঝর্ণাটি প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। ঝর্ণার জলধারা স্বচ্ছ এবং ঠাÐা।
একদিকে সাগর, অন্যদিকে পাহাড় বেষ্টিত হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান। উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ হিমছড়ি ঝর্ণা। মূল ঝর্ণাসহ বেশ কিছু ঝর্ণা রয়েছে হিমছড়িতে। ঝর্ণা শীতল অনুভূতি, সবুজ পাহাড়, আর সাগরের অনাবিল পরশে হিমছড়ি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট-বড়-মাঝারি অসংখ্য ঝর্ণা ছোট ছোট ছড়ায় ভাগ হয়ে পাহাড়ি বনে ছন্দ তুলে প্রবাহিত হয়। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ছড়াগুলো পাহাড়ি বনকে সিক্ত করে, প্রাণের সঞ্চার করে। তাইতো পাহাড়ি বন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা। ছড়াগুলো সমতলে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বড় ছড়া সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে নদীতে রূপ নেয়। সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কাসালং, কর্ণফুলি প্রভৃতি নদী এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। এসব নদী পাহাড়ি জীবন ও জীবিকায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ঢেউ খেলানো গাঢ় সবুজে মোড়ানো পাহাড় বরাবরই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে টানে, মুগ্ধ করে, বিস্মিত করে। মনের ক্ষুধা মেটানো পাহাড়ের আরেক মুগ্ধতা হলো ঝর্ণা। নদী যেমন দেশকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি ঝর্ণাও বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু বর্তমানে অধিক জনসংখ্যার চাপ, পাহাড় কাটা, বন উজাড়সহ বহুবিধ কারণে পাহাড় ধ্বংস হচ্ছে। পাহাড়ের অলংকার ঝর্ণার গায়েও লাগছে ধ্বংসের উত্তাপ। আমাদের গর্বের পাহাড় সংরক্ষণ করে রক্ষা করতে হবে ছন্দ-সুরের ঝর্ণা।
লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন