পদ্মা মেঘনার জয়যাত্রা

পদ্মা মেঘনার জয়যাত্রা

168
SHARE
Robindranath-Thakur

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। কী করবেন, কোথায় যাবেন? ভেবে পাচ্ছেন না। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন একটু দূরে নদীর ওপর ঝুপ করে কি যেন একটা পড়লো। ভালো করে খেয়াল করতেই দেখলেন একটি ১০/১২ বছরের ছেলে নদীতে হাবুডুবু খাচ্ছে। দূরে তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বয়স্ক লোক ছেলেটিকে বলছেÑ একদম ভয় পাবি না। মাথা ভাসিয়ে রাখ। শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবি না। এবার দুই হাতে সাঁতার কাটতে শুরু কর। এইতো হচ্ছে… গুড… ভেরিগুড… হাঃ হাঃ হাঃ কিরে তুইতো দেখি সাঁতার শিখে ফেললি।

ছেলেটি সাঁতার কাটতে কাটতেই তীরে এসে উঠল। এবার বোঝা গেল যে লোকটি তাকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছে সে তার বাবা। ছেলের হাত ধরে টেনে তীরে ওঠাতে ওঠাতে বললেন, এই যে হঠাৎ তোকে নদীতে ছুড়ে ফেলে দিলাম এই টেকনিকটা কার কাছ থেকে শিখেছি শুনবি? আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে। একবার হয়েছিল কি জানিস, কবিগুরুর পুত্র রবীন্দ্রনাথ সাঁতার শিখবেন। কিন্তু কীভাবে শিখবেন? পানি দেখলেই ভয় পান। যে মানুষ পানি দেখলেই ভয় পায় তাকে সাঁতার শেখানো কঠিন কাজ। একদিন বোটের ওপর পুত্রের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কবিগুরু। হঠাৎ কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে ছেলেকে বোট থেকে ধাক্কা দেন। ছেলে নদীতে পড়ে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে এবং সাঁতার শেখার সাহস ও কৌশল শিখে যায়।

কবিগুরুর ছেলের সাঁতার শেখার গল্প শোনাতে শোনাতে নিজের ছেলের প্রতি আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন ভদ্রলোক। ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন, সারা জীবন কবিগুরুর আদর্শ অনুসরণ করবি। দেখবি জীবনটা অনেক সহজ হবে। তাঁর গান, কবিতা, উপন্যাস ও ছোটগল্পে মানবতার মর্মবাণীই গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের জাতীয় সংগীত তারই লেখা। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। দেশ নিয়ে এত আবেগময় বাণী কে লিখতে পারে? রবীন্দ্রনাথ। কাজেই রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে চললেই দেখবি জীবন অনেক সুন্দর ও সহজ হবে।

১০/১২ বছরের ছেলেটি তার বাবার কথা কতটুকু বুঝলো কি বুঝলো না তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে সে তার বাবার হাত ধরে হেঁটে গেল সামনের দিকে। যতদূর দৃষ্টি যায় তাদের হেঁটে যাওয়া দেখলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। একটু আগে মন খারাপ ছিল। এখন মনে আনন্দ হচ্ছে। দূরে বাঁশের ডগায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে। বোধকরি স্কুলের সামনে পতাকা উড়ছে। কবিগুরু পতাকার দিকেই হাঁটতে থাকলেন।

 

স্কুলের সামনে প্রচন্ড ভিড়। ঘটনা কী? খোঁজ নিয়ে জানা গেল কবিগুরুর জন্মদিন পালন উপলক্ষে ৩ দিনব্যাপী আনন্দ উৎসব পালনের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘রবীন্দ্র উৎসব’। শিরোনামটা পছন্দ হলো কবিগুরুর। স্কুলের ভিতরে ঢুকলেন তিনি। বিরাট মাঠের মাঝখানে প্যান্ডেলের ভেতর সাজানো মঞ্চে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। মঞ্চে দুইদিকে দুইটি দল বসেছে। মাঝখানে বসেছেন একজন বয়স্ক ব্যক্তি। জানা গেল তিনি স্কুলের বাংলার শিক্ষক শামসুল আলম। দুই দলকেই কবিগুরুর সম্পর্কে প্রশ্ন করা হচ্ছে। ভুল বললে ৫ নম্বর কাটা যাবে। ঠিক বললে ১০ নম্বর যোগ হবে। দুই দলের একটির নাম পদ্মা অন্য দলের নাম মেঘনা। পদ্মা জিতেছে ৬৫ নম্বর আর মেঘনা জিতেছে ৫৫।

শামসুল আলম দুই দলের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, এবারের প্রশ্ন কবিগুরুর বড় বোন ভারতের প্রথম মহিলা উপন্যাসিক। তাঁর নাম কি?

প্রথমে পিনপতন নীরবতা। পরক্ষণেই বীরদর্পে উত্তর দিল মেঘনা দলÑ কবিগুরুর বড় বোনের নাম স্বর্ণকুমারী দেবী।

শামসুল আলম আনন্দে হাততালি দিলেন। মেঘনা দলকে বাহবা দিয়ে পরের প্রশ্ন বললেন, এবারের প্রশ্ন কবিগুরুর প্রথম উপন্যাসের নাম কি?

এবার উত্তর দিল পদ্মা গ্রæপ। কবিগুরুর প্রথম উপন্যাসের নাম বউ ঠাকুরাণীর হাট।

কবিগুরু বেশ মজা পাচ্ছেন। তাঁকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। অথচ তিনি সবাইকে দেখতে পাচ্ছেন। মঞ্চের মাঝখানে পা নামিয়ে বসলেন তিনি। এবার দর্শক সারির লোকজনকে বেশ দেখা যাচ্ছে। দর্শক সারিতে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি। অভিভাবক টাইপের কয়েকজন বয়স্ক লোক বসে আছেন। তাদের মাঝখানে বসা একটি লোককে দেখে কবিগুরু ধারণা করলেন এই লোক বোধকরি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। কারণ তিনি হাতাওয়ালা চেয়ারে বসেছেন। দর্শক সারিতে হাতাওয়ালা চেয়ার ঐ একটিই। তাঁর অনুমানই সত্যি হলো। হঠাৎ মঞ্চে মাইক হাতে এসে দাঁড়াল এক তরুণী। সে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির নাম ঘোষণা করতেই হাতাওয়ালা চেয়ারে বসা ভদ্রলোক শরীর নাড়িয়ে মৃদু হাসলেন। ঘোষিকা বললেন, কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আজ প্রথম দিনে চলছে কবিগুরুকে নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব। পদ্মা ও মেঘনা নামে দুটি দল এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। আমরা প্রতিযোগিতার শেষ ধাপে এসে উপস্থিত হয়েছি। এর পরই বিজয়ী দলের নাম ঘোষণা করা হবে। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মেয়েটি মঞ্চ থেকে নেমে গেল। আবার শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। শামসুল আলম দুই দলের দিকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, প্রতিযোগিতা বেশ জমে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তোমাদেরকে দুটি কথা বলি। তিনি ভালো ছবি আঁকতেন তোমরা নিশ্চয়ই জানো। তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন প্রায় ৭০ বছর বয়সে। ছবি আঁকার প্রথাগত কোনো শিক্ষা তার ছিল না। প্রথম দিকে লেখার হিজিবিজি কাটাকুটিগুলোকে একটা চেহারা দেয়ার চেষ্টা করতেন। তোমাদের কাছে প্রশ্ন ভারতের বাইরে পৃথিবীর কোন দেশে কত সালে তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়?

কবিগুরু মনে মনে ভাবলেন এই প্রশ্নের উত্তর এত কম বয়সী ছেলেদের জানার কথা নয়। তিনি দুই দলের ছেলেদের মুখের দিকে তাকালেন। কে কত নম্বর পেয়েছে এখন ঠিক মনে করতে পারছেন না। তিনি চাচ্ছেন দুই দলই জিতুক। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মেঘনা দলের একজন সদস্য হাত তুললো। আমি বলব।

শামসুল আলম তাকে স্বাগত জানালেন, বলো… ছেলেটির দৃঢ়তার সঙ্গে বলল ১৯২৬ সালে ফ্রান্সের শিল্পীদের আগ্রহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মের ওপর ফ্রান্সে একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

শামসুল আলম চিৎকার দিয়ে বললেন, উত্তর সঠিক হয়েছে। দর্শক সারিতে তুমুল করতালি হচ্ছে। কবিগুরু মনে মনে ছেলেটিকে আশীর্বাদ করলেন। খুশিতে তাঁর মন ভরে গেছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি স্কুলে তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা? একটু শহরের দিকে যাওয়া যাক। স্কুল ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালেন তিনি।

 

এবার একেবারেই ভিন্ন চিত্র। সন্ধ্যায় একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে উঠেছেন তিনি। সামনের সিট খালি পেয়ে তাতেই বসলেন। বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন বাসের শব্দযন্ত্রে তারই গান বাজানো হচ্ছে। নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে… আহ। কী মায়াময় সুর। কবিগুরুর মানসপটে অতীত স্মৃতি ভেসে উঠলো। ১৮৮৭ সালে এই গানটি শুনে কবিগুরুর পিতা তাকে ৫০০ টাকা উপহার দিয়েছিল। তখনকার দিনে ৫০০ টাকা অনেক টাকা। গানটি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লেন কবিগুরু। হঠাৎ কর্কশ শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। বাসের শব্দযন্ত্রে বিদঘুটে সুরের একটা গান বাজছে। গানের ভাষা বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি বিরক্তিকর। কবিগুরু ভাবলেন এই বাসে কেউ কি নেই গানটির ব্যাপারে প্রতিবাদ করে। গানটি কি সবার ভালো লাগছে? বাসের পেছন সারি থেকে একজন যাত্রী মৃদু প্রতিবাদ করলেন, অ্যাই কন্টাকটর আগের গানটা বাজাও। রবীন্দ্র সংগীত… সঙ্গে তিনচারজন প্রতিবাদ করলো। এই যে ভাই ঢিলা তালের গান বাজাইবেন নাতো? ফার্স্ট গান চাই… ফার্স্ট…

কবিগুরু নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বাসটি দ্রæত গতিতে ছুটে চলছে।

 

মঞ্চে কবিগুরুর গান গাইছেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। গান শুনে কবিগুরু দাঁড়িয়ে গেলেন। রাতে বাসের সেই ঘটনা এখনো ভুলতে পারেননি। তখনই ভেবেছিলেন পৃথিবীতে আর নয়। চলে যাবেন পরপারে। কিন্তু রেজওয়ানার কণ্ঠে নিজের গান শুনে আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠলেন কবিগুরু। সুরের মায়ায় সবাইকে ভাসিয়ে নিচ্ছেন শিল্পী। হঠাৎ যেন পিনপতন নিস্তব্দতা। বন্যা একি বলছেন? সমবেত বন্ধুরা যারা আমার এই গান শুনছেন তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলি। রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার অপরাধে আমার মোবাইল ফোনে কে বা কারা মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দিয়েছে। আমি এতে ভীত নই। বরং আমি আরো সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। আশাকরি আপনারা আমার সঙ্গে থাকবেন।

আবার কণ্ঠে সুর তুলেছেন বন্যা। কিন্তু কবিগুরু অবাক। এই দেশে এখনো রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। অতীতে একবার এমনটাই হয়েছিল। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আবারও কি সেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে?

কবিগুরু যেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন মানুষের জন্য। মানবতার জন্য কথা বলা কি অন্যায়? তাহলে এত বাধা কেন? তাহলে ঘটনা কি দাঁড়াল? কবিগুরু কি পরাজিত? হঠাৎ তিনি দেখলেন মঞ্চে উঠে এসেছেন অসংখ্য শিল্পী। তারা গাইছেনÑ বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান… কবিগুরু শিল্পীদের সঙ্গে মিশে গেলেন।