Home প্রতিবেদন হিমু ও মিসির আলীর নতুন সংগ্রাম!

হিমু ও মিসির আলীর নতুন সংগ্রাম!

SHARE
Humayun-AHmed-1

পার্কের বেঞ্চিতে বসে একটি মেয়ে বই পড়ছে। আর কাঁদছে। কলাপাতা রংয়ের কামিজের সঙ্গে সাদা রংয়ের সালোয়ার পরেছে মেয়েটি। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। পার্কের বেঞ্চিতে বসে ক্লাসের বই পড়ার ভঙ্গিতে শব্দ করে উপন্যাস পড়ছে।

‘শ্রাবণীর ঘরের দরজা বন্ধ।’

জামিল সাহেব দরজায় টোকা দিয়ে বললেন, আসব মা?

শ্রাবণী বলল, এসো বাবা।

জামিল সাহেব ঘরে ঢুকলেন। মেয়ের বিছানায় পা তুলে বসলেন। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। তিনি বললেনÑ তোর ঘরে সিগারেট খাবার অনুমতি আছে তো?

‘অনুমতি নেই। তবে তুমি খেতে পারো।’

শ্রাবণী জানালা খুলে দিল। জামিল সাহেব বললেন, তোর সুন্দরবনের বাঘের খবর চলে এসেছে। লাস্ট সেনসাস রিপোর্ট। বাঘ-বাঘিনীর সংখ্যা সবই আছে। এই সঙ্গে স্পটেড ডিয়ারের সংখ্যাও আছে। এই যে কাগজটায় লেখা।

‘থ্যাংকস বাবা। মেনি থ্যাংকস।’

জামিল সাহেব সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেনÑ নবনীকে দেখছি না? নবনী কোথায়?

‘শাহেদ ভাইয়ের সঙ্গে নদীর দিকে হাঁটতে গেছে।’

‘ও দেখি সারদিন হাঁটাহাঁটির মধ্যেই আছে। তোর হাটতে ভালো লাগে না?’

‘না।’

‘তোর পায়ের অবস্থা কি? ব্যথা সেরেছে?’

‘হু’।

জামিল সাহেব চুপচাপ সিগারেট টানতে লাগলেন। শ্রাবণী বলল, বাবা, আমার মনে হয় তুমি আমাকে কিছু বলতে এসেছ’ এখন বুঝতে পারছ না বলা ঠিক হবে কি না। দ্বিধার মধ্যে পড়েছ। বলে ফেলো।

জামিল সাহেব বললেন, ‘একটু আগে তুই যে কাÐটা করেছিস তা আমার পছন্দ হয়নি। সেই কথাই বলতে এসেছি।’

‘কোন কাÐের কথা বলছ? হরবোলাকে যে এক হাজার টাকা দিয়েছি সেটা?’

‘হ্যাঁ। এক হাজার কেন, ইচ্ছে হলে তুই পাঁচ হাজার টাকা দিবি। সেটা কোনো কথা না। কিন্তু যেখানে আমি দুশ টাকা দিয়েছি সেখানে তুই আমাকে ডিঙিয়ে একহাজার টাকা দিলি। তুই আমাকে ছোট করলি।’

‘বাবা আমি ওর কাÐ কারখানা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, আমরা মুগ্ধ হয়েছি, তুমিও সে রকম লোকটাকে মুগ্ধ করবে। কিন্তু তুমি তাকে মাত্র দুশ টাকা দিলে। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।’

‘এই দরিদ্র দেশে দুশ টাকা মাত্র না। তোর কাছে মাত্র মনে হয়েছে। ওর কাছে এটা ছিল অপ্রত্যাশিত। ও প্রচÐ রকম খুশি হয়েছিল।’

‘হ্যাঁ খুশি অবশ্য হয়েছিল। কিন্তু তুমি তার খুশি হবার ক্ষমতা অতিক্রম করতে পারনি। আমি করেছি। এক হাজার টাকা পেয়ে কী রকম ভেউ ভেউ করে কাঁদছিল। ওর কান্না দেখে আমার নিজের চোখে পানি এসে গেল। যে কাজটা আমি করলাম তুমি কেন সেটা করতে পারলে না? তোমার তো টাকার অভাব নাই।

‘টাকা থাকলেই সব সময় এমন দেওয়া যায় না। পাবলিক ফিগারদের দিকে সবার চোখ থাকে। সবাই বলবে জামিল সাহেব দুই হাতে টাকা ছড়ায়। কোথায় পায় এত টাকা?’

‘কে কী ভাববে না ভাববে তাই নিয়ে আমাদের চলতে হবে?’

‘তোমাকে না বললেও চলবে। কিন্তু আমাকে চলতে হবে।’

শ্রাবণী নিচু গলায় বললÑ বাবা, আমি তোমাকে হার্ট করে থাকলে ক্ষমা চাচ্ছি। আমি কাউকেই হার্ট করতে চাই না। কিন্তু আমার ভাগ্য এতই খারাপ যে সবাইকে হার্ট করি।’

জামিল সাহেব উঠতে উঠতে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে এটা এমন কিছু না। লেট আস ফরগেট ইট।’

শ্রাবণী কাঁদছে। বাবা কঠিন কিছু বললেই তার চোখে পানি আসে।

এই পর্যন্ত পড়ে মেয়েটি বই বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

হুমায়ূন আহমেদ কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। পৃথিবীতে নেমেই তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে শুরু করেছেন। কোথায় যাবেন আগে? গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে নাকি ধানমন্ডিতে নিজের বাসায়। পৃথিবীতে আসার সময় শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে পরিবার পরিজনের সঙ্গে দেখা করা যাবে না। কিন্তু পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হচ্ছে। একটু দূরে উপন্যাস পড়তে পড়তে মেয়েটি কাঁদছে তার জন্য খুব মায়া হচ্ছে। উপন্যাস পড়ে কেউ এভাবে কাঁদে? তাও আবার পার্কে?

একটু এগিয়ে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেনÑ মা তুমি কাঁদছ কেন?

মেয়েটি হুমায়ূন আহমেদের দিকে বিরক্ত চোখে তাকালো। আমি কাঁদতেছি তাতে আপনার কি? আপনার কি কোনো ক্ষতি হচ্ছে’?

‘হ্যাঁ ক্ষতি হচ্ছে। তোমাকে কাঁদতে দেখে আমার কান্না পাচ্ছে।  হুদাই কেন কান্না পাচ্ছে এটা এক ধরনের মানসিক ক্ষতি না, কি বলো?

মেয়েটি এবার শব্দ করে কেঁদে ফেললÑ আমাকে বিরক্ত করবেন নাতো। যান এইখান থেকে। মেয়েটির বকা খেয়ে হুমায়ূন আহমেদ একটুও নড়লেন না। বরং আগের চেয়ে আরও বেশি মাত্রায় মেয়েটির প্রতি আগ্রহী হলেনÑ ‘মা তুমি কি কারও উপন্যাস পড়ে কাঁদছো?

মেয়েটি মাথা নেড়ে বললÑ হ্যাঁ

কার উপন্যাস!

হুমায়ূন আহমেদের।

উপন্যাসের নাম কী?

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’।

মেয়েটির মুখে নিজের উপন্যাসের নাম শুনে হুমায়ূন আহমেদ খুশি হলেন। মনে মনে ভাবলেন পাঠক এখনও তাকে ভোলে নাই। সত্যি কি ভোলে নাই? একটু যাচাই করে দেখলে কেমন হয়?

মেয়েটি এখনও কাঁদছে। হুমায়ূন আহমেদ খোঁচা দেয়ার ভঙ্গিতে বললেনÑ উপন্যাস পড়ে কেউ এভাবে পার্কে বসে কাঁদে। তাও আবার হুমায়ূন আহমেদের মতো সস্তা লেখকের উপন্যাস…

Himu-Misir-Aliমেয়েটি হুমায়ূন আহমেদের কথা শেষ করতে দিল না। বাজখাই গলায় প্রতিবাদের সুরে বললÑ এই যে কি বললেন আপনি? হুমায়ূন আহমেদ সস্তা লেখক? তার কয়টা লেখা আপনি পড়েছেন? নাম বলেন, নাম বলেন… তার জোসনা ও জননীর গল্প পড়েছেন? দারুচিনি দ্বীপ, কৃষ্ণপক্ষ, জলজোছনা, পেন্সিলে আঁকা পরী, নির্বাসন, তোমাকে, আমার আছে জল, নক্ষত্রের রাত, নীল অপরাজিতা, আয়নাঘর, নবনী, তিথির নীল তোয়ালে, এইসব দিন রাত্রি, ময়ুরা²ী, দেবী, হিমু, চলে যায় বসন্তের দিন, কহেন কবি কালিদাস, বৃহ¤œলা… বলেন এর মধ্যে কোনটা আপনি পড়েছেন? বলেন, বলেন…

মেয়েটি প্রায় এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো বইয়ের নাম বলল। হুমায়ূন আহমেদ অবাক হয়ে ভাবলেন তিনি নিজে তার এতগুলো বইয়ের নাম একবারে বলতে পারবেন না। মেয়েটি ফনা তোলা সাপের মতো তাকিয়ে আছে। হুমায়ূন আহমেদ সারেÐার করার ভঙ্গিতে বললেনÑ মা আমার ভুল হয়েছে… আমি আসলে… মেয়েটি হুমায়ূন আহমেদের কথা কেড়ে নিয়ে বললÑ আমি আসলে কি…? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? শোনেন হুমায়ূন আহমেদ ছিল একটা রিয়েল জিনিয়াস। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতির অনেক ক্ষেত্রেই তিনি পরিবর্তন এনেছেন। আগে আমরা ইন্ডিয়ান রাইটারদের উপন্যাস পড়তাম। হুমায়ূন আহমেদই এই দেশে প্রথম লেখক যিনি আমাদের বই পড়ার অভ্যাস বদলে দেন। টিভি নাটকেও নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। আর চলচ্চিত্রের বেলায়ও তাই। মানুষটা যদি বেঁচে থাকতো তাহলে দেখতেন, আমাদের আরও অনেক কিছু হতো… বলতে বলতে মেয়েটি হঠাৎ উঠে দাঁড়াল এবং হন হন করে সামনের দিকে চলে গেল। মেয়েটিকে ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না হুমায়ূন।

ফাইভ, ফোর, থ্রি, টু, ওয়ান, জিরো অ্যাকশন। দূর থেকে কে যেন চিৎকার দিল। হুমায়ূন আহমেদ চমকে উঠলেন। এই শব্দগুলো তার অনেক পরিচিত। প্রিয় শব্দও বটে। তার মানে পার্কের কোথাও নিশ্চয় টিভি নাটক অথবা সিনেমার শুটিং হচ্ছে। শব্দগুলো যে দিক থেকে এসেছে সেই দিকে চোখ ফেলে দূরে মানুষের জটলা দেখলেন। যারা শুটিং করছে তাদেরকে নিশ্চয়ই চিনবেন হুমায়ূন। পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখাও হয়ে যেতে পারে। এক পা দু’পা করে জটলার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। শুটিং দৃশ্যের অভিনেতা ও  অভিনেত্রীকে দেখে খুশিতে মন ভরে উঠলো। আসাদুজ্জামান নূর ও মুনিরা মিঠু বাসার কর্তা ও কাজের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন। আসাদুজ্জামান নূর রাগ করে বাসা থেকে বেড়িয়ে এসে পার্কে বসে আছেন। মুনিরা মিঠু তার রাগ ভাঙাতে এসেছে। এই হলো দৃশ্য। দূরে একদল পুলিশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হুমায়ূন আহমেদের মনে হলোÑ আসাদুজ্জামান নূর তো এখন দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী। কাজেই তার প্রটেকশনের জন্য পুলিশ থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। নূরের সঙ্গে একবার কি কথা বলা যায়? ভাই কেমন আছেন? আপনার দিনকাল কেমন চলছে? মনে মনে  প্রশ্নগুলো পর পর সাজালেন। পরক্ষণেই কেন যেন মনে হলো এই ধরনের প্রশ্ন করার কোনো মানে দাঁড়াবে না। তাছাড়া আসাদুজ্জামান নূর কি তাকে এখন চিনতে পারবে? হুমায়ূন… আমাকে আপনারা চিনতে পারতেছেন না? কেউই পাত্তা দিবে না। ভাববে লোকটা পাগল। কাজেই দূর থেকে সবকিছু দেখা ভালো।

এই এলাকার শুটিং শেষ। ইউনিট অন্যদিকে ছুটছে। হুমায়ূন আহমেদের সামনে দিয়েই আসাদুজ্জামান নূর হেঁটে গেলেন। সঙ্গে নাটকের পরিচালকসহ অন্যরা। মোবাইলে কথা বলতে বলতে মনিরা মিঠু সবার পিছনে হাঁটছিল। হুমায়ূন আহমেদের দিকে চোখ পড়তেই হঠাৎ যেন থমকে দাঁড়ালো। হুমায়ূনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখলো। তারপর আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলÑ আপনার নাম কি গো?

হুমায়ূন নিজের নাম বলতে গিয়েও বললেন না। নাম পাল্টে বললেনÑ জহির হোসেন।

বাড়ি কোথায়?

ময়মনসিংহ।

ঢাকায় থাকেন?

না। বেড়াইতে আসছি।

আপনার চেহারাতো দেখি আমাগো হুমায়ূন স্যারের মতোই। হুমায়ূন স্যারকে চিনেন?

হ্যাঁ, এই দেশে তারে কে না চিনে?

হুমায়ূনের কথা শুনে মিঠু হঠাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে উঠলো। হুমায়ূন আহমেদের কাছে জানতে চাইলÑ বাবাজি আপনি এইখানে কতক্ষণ আছেন?

কেন মা জননী?

৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারবেন। একজনের সঙ্গে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিব। বলেই হুমায়ূনের উত্তরের অপেক্ষা না করে মোবাইলে কাউকে ফোন করলো মিঠু। ওপাশে ফোন রিসিভ করার শব্দ পেয়ে ব্যস্ত হয়ে বললÑ আপনি এখন কোথায়? আমি যা বলতেছি মনোযোগ দিয়ে শোনেন। ৩০ মিনিটের মধ্যে রমনা পার্কে আসতে পারবেন? আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। আহ্ হা আসেন তো আগে… এখন সবকিছু বললে তো সারপ্রাইজ আর সারপ্রাইজ থাকবে না। ঠিক আছে বলতেছি। হুবহু হুমায়ূন স্যারের মতো একটা লোকের দেখা পাইছি। কথা বার্তা, হাঁটাচলা সবকিছুতে হুমায়ূন স্যার… আপনি  আসতেছেন…?

ফোন রেখে মনিরা মিঠু হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিতে চাইল। কিন্তু শুটিং-এর জন্য তার ডাক পড়েছে। তাই যেতে যেতে বললÑ আপনি ৩০ মিনিট একটু অপেক্ষা করবেন প্লিজ… আপনার সঙ্গে একজনকে পরিচয় করিয়ে দিব। প্লিজ আপনি যাবেন না কিন্তু…

মনিরা মিঠু কাকে ফোন করেছে সেটা বুঝতে পেরেছেন হুমায়ূন আহমেদ। এই মুহূর্তে প্রিয়তমা স্ত্রী শাওনের মুখোমুখি হতে চান না। তাকে দেখার পর শাওন হয়তো কেঁদে ফেলবে। শাওনের কান্না তিনি সহ্য করতে পারবেন না। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। চেহারা পাল্টে ফেললে কেমন হয়? শাওন এসে তাকে খুঁজবে। তাকে না পেয়ে নিশ্চয়ই মিঠুকে নানান প্রশ্ন করবে। এই সুযোগে হুমায়ূন প্রিয়তমা স্ত্রীকে একনজর দেখতে পারবেন। চেহারা পাল্টে ফেললেন হুমায়ূন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন শাওন হন্তদন্ত হয়ে পার্কে ছুটে এসেছে। হুমায়ূন আহমেদকে খুঁজছে সবাই। ততক্ষণে সারা পার্কে হুমায়ূন আহমেদের উপস্থিতির কথা রাষ্ট্র হয়ে গেছে। নানা জনে নানা মন্তব্য করছে। কেউ বলছে মৃত মানুষ কখনও জিন্দা হইছে দেখছেন। যত্তসব আজগুবি খবর। শুটিং বন্ধ রেখে সবাই খুঁজছে হুমায়ূন আহমেদকে। আসাদুজ্জামান নূরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে শাওন। কাঁদছে। মিঠুকে ডাক দিলেন আসাদুজ্জামান নূর। তুমি কি সত্যি সত্যি হুমায়ূনের চেহারার মতো কাউকে দেখেছো?

মিঠু দৃঢ়তার সঙ্গে বললÑ বিশ্বাস করেন নূর ভাই, হুবহু হুমায়ূন স্যার। সেই চোখ, সেই মুখ, হাসি, একটু বাঁকা হয়ে হাঁটা… বিশ্বাস করেন… আমি সত্যি বলতেছি।

আসাদুজ্জামান নূরসহ সবাই অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। শাওন হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ফেলল।

Humayun-AHmedহাঁফাতে হাঁফাতে শাহবাগের পাশেই আজিজ মার্কেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন হুমায়ূন আহমেদ। পার্কে শাওনকে দেখে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। শাওনের কান্না সহ্য করতে পারছিলেন না। একবার স্বরূপে আবিভর্‚ত হবেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েও ফেলেছিলেন। পরক্ষণেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। হুমায়ূন স্বরূপে ফিরলে পরিস্থিতি হয়তো আরও নাজুক হতে পারে। কাজেই আর মায়া বাড়িয়ে লাভ নাই। পৃথিবীতে আর নয়। পরপারের উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে। তার আগে নিজের বইয়ের কেনা বেচা কেমন সেটা একবার দেখে গেলে মন্দ হতো না। পার্ক থেকে অনেক কষ্টে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আজিজ মার্কেটে এসেছেন হুমায়ূন। গেট দিয়ে ঢোকার মুখে দুজন তরুণের কথা কানে এলো।

প্রথম জন: আসলে আমাদের নাটক, সিনেমা তখনও হুমায়ূন আহমেদের ঘরানাতেই আটকে আছে কি বলিস? গতকাল ইউটিউবে একটা নাটক দেখলাম। তরুণ পরিচালকের নাটক। সংলাপ, পাত্র-পাত্রীর অঙ্গভঙ্গি, গøাস ভাঙা সবকিছুই হুমায়ূন আহমেদের নাটকের মতো। চিন্তা কইর‌্যা দেখ আমরা কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের স্টাইল থাইক্যা এখনও বাইর হইতে পারি নাই। উপন্যাসের বিক্রির কথা যদি ধরিস তাহলে হুমায়ূন আহমেদই এখনও শীর্ষে। লোকটার আরও কিছুদিন বাইচ্যা থাকা দরকার ছিল।

কথা বলতে বলতে তরুণদ্বয় হুমায়ূন আহমেদের পাশ দিয়েই চলে গেল।

আজিজ মার্কেটের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগের চেয়ে লোকের ভিড় বেশি। একটা বইয়ের দোকানে ঢুকলেন হুমায়ূন। বইয়ের র‌্যাকে হুমায়ূন আহমেদের বইই বেশি। দোকানে বসা তরুণ সেলস ম্যানের সঙ্গে একটু রসিকতা করতে চাইলেনÑ ভাই মানুষ এখনও হুমায়ূনের বই পড়ে?

তরুণ সেলসম্যান অবাক হয়ে বললÑ আপনি এইটা কি বললেন মুরুব্বি। হুমায়ূন আহমেদের বই আছে বইল্যাই তো আমরা এখনও টিকে আছি। আহারে! মানুষটা যদি আরও কিছুদিন বাইচ্যা থাকতো।

দোকানের ভিতর দুজন তরুণ হুমায়ূনের বই নেড়েচেড়ে দেখছে। একজন হুমায়ূনের ‘আমার আছে জল’ নামে একটা বই কিনলো। অন্যজন কিনলো জোছনা ও জননীর গল্প। দৃশ্যটা দেখে খুশিতে হুমায়ূনের চোখে পানি এসে গেল। কিন্তু তিনি বুঝতে দিলেন না। নিঃশব্দে বইয়ের দোকান থেকে বেড়িয়ে ভাবলেন এবার পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া যাক।

 

বিদায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন। হঠাৎ হুমায়ূন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেনÑ এই যে পৃথিবীতে এলাম যোগফল কি দাঁড়াল। কি দেখলাম? কি নিয়ে যাচ্ছি? একটি খাতায় প্রশ্ন লিখলেন তিনিÑ বাংলাদেশের টিভি নাটক কি এগিয়েছে? কে যেন খস খস করে উত্তর লিখলোÑ না। টিভি নাটক এগোয়নি।

কারণ কি?

কারণ ঐ একটাই… পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাব। বাংলাদেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেলে নাটকের জন্য বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের জন্য নাটক প্রচার করা হবে বিষয়টি পরিষ্কার নয়।

আর চলচ্চিত্র?

এই ক্ষেত্রটি আরো নাজুক।

সেটা কেমন?

চলচ্চিত্রের মানুষেরা নানা ভাগে বিভক্ত। যৌথ প্রযোজনার নামে এদেশে ঠগবাজি চলছে।

আর সংগীত?

এক্ষেত্রেও কোনো ভবিষ্যৎ নাই। গান রিলিজ হলেই কে বা কারা পাইরেসি করে।

তাহলে উপায়?

উপায় একটাই সবার সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি।

হুমায়ূন নোটখাতায় পয়েন্টগুলো লিখলেন। এখন যেতে হবে। কিন্তু যেতে মন চাইছে না। পৃথিবীতে এসেও পুত্র কন্যাদের সঙ্গে দেখা হলো না। নিদেনপক্ষে মিসির আলী অথবা হিমুর সঙ্গে দেখা হলেও ভালো হতো। এখন কি কেউ হিমু হয় না। মিসির আলীর সংখ্যা কি কমে গেছে?

হুমায়ূন আহমেদ শাহবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এখান থেকেই পরপারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। হঠাৎ দূরে একজন তরুণকে দেখে চমকে উঠলেন। আরে ঐটা হিমু নাকি? হ্যাঁ হিমুর মতোই দেখতে। হিমু হওয়ার কতগুলো শর্ত আছে। ছেলেটি শর্তগুলো পালন করেছে কি না তা বোঝার চেষ্টা করলেন। হিমু হতে গেলে বয়স আঠারোর উপরে হতে হবে। হ্যাঁ এই ছেলের বয়স আঠারোর উপরে। হলুদ পাঞ্জাবি বাধ্যতামূলক। হ্যাঁ এই ছেলে হলুদ পাঞ্জাবি পরেছে।

খালি পা থাকলে ভালো। তবে খালি পা বাধ্যতামূলক না। হিমুরা কম দামি চামড়ার স্যান্ডেল পরতে পারবে। হ্যাঁ এই ছেলে কম দামি চামড়ার স্যান্ডেল পরেছে। কিন্তু এই ছেলে কি প্রতি পূর্ণিমায় পূর্ণচন্দ্রের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে? বৃষ্টির দিনে কি ছাতা পরিহার করে? হিমুদের জন্য সপ্তাহে দুইদিন নিরামিষ আহার বাধ্যতামূলক। এই ছেলে কি সেটা মানে? হিমুরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু এই ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়তো। হিমুরা কখনোই কোনো তরুণীর সঙ্গে হৃদয় ঘটিত ঝামেলায় জড়াবে না। এক হিমু অন্য হিমুকে ভাইয়ের মতো দেখবেÑ এই ছেলে কি শর্তগুলো মানে? বোধহয় মানে। ছেলেটি রাস্তা পার হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ তাকে ডাকলেনÑ অ্যাই হিমু…

ছেলেটি থমকে দাঁড়াল। কে তাকে ডাকলো বোঝার চেষ্টা করলো। হুমায়ূন এক দৌড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেনÑ তুমি হিমু না?

জি হিমু। আপনি?

আমি হুমায়ূন।

হিমু খুশি হয়ে বললÑ বাহ! আপনার নাম হুমায়ূন! চেহারা তো হুমায়ূন স্যারের মতোই। আমাকে কেন ডাকলেন?

ডাকলাম… এমনি… তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা হলো.. তাই…। আচ্ছা মিসির আলীর সঙ্গে কি তোমার দেখা হয়?

হ্যাঁ হয়তো। আমরা দুজনে মিলে একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি।

প্রজেক্ট। সেটা কেমন?

প্রতিদিন একটা করে ভালো কাজ।

বুঝলাম না।

হিমু এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললÑ এইখানে না বোঝার কি আছে। বিষয়টা পরিষ্কার। ধরেন আপনি প্রতিদিন একটা হলেও ভালো কাজ করবেন। সেটা হতে পারে কোনো মানুষকে আর্থিক সাহায্য করা, এই যে একটা মানুষ রাস্তা পার হইতে পারতেছে না। তাকে হাত ধইর‌্যা রাস্তা পার করানো। দেশের টেলিভিশনে দেশের নাটক সিনেমা দেখা এইটাও একটা ভালো কাজ। মিথ্যা বলবেন না এইটাও ভালো কাজ। কাউকে ঠকাইবেন না এইটাও ভালো কাজের মধ্যে পড়ে। চিন্ত কইর‌্যা দেখেন দেশের ১৬ কোটি মানুষ প্রতিদিন ১৬ কোটি ভালো কাজ করলে আর কি কিছু লাগে? বলেই হিমু নামের তরুণটি হঠাৎ রাস্তায় নেমে একজন অন্ধের হাত ধরে বললÑ চাচা ভয় পাবেন না। আমার হাত শক্ত করে ধরেন। আমি আপনাকে রাস্তা পার করে দিচ্ছি। আসেন…

দৃশ্যটা দেখে হুমায়ূন আহমেদের চোখে পানি এসে গেল। তিনি ভাবলেন পরপারে গিয়ে প্রথমে এই ঘটনাই সবাইকে জানাবেন।