হারিয়ে যাচ্ছে দেশী বাদ্যযন্ত্র!

হারিয়ে যাচ্ছে দেশী বাদ্যযন্ত্র!

782
SHARE
Baddo-Jontra

মোহাম্মদ তারেক: সঙ্গীত হচ্ছে আত্মার যোগ। হৃদয়ের টান। সঙ্গীত হচ্ছে গুরুবিদ্যা। সাধনা ছাড়া সঙ্গীতে সিদ্ধি কখনোই সম্ভব না। সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে মনের পরিশুদ্ধি মেলে। সঙ্গীত সাধনার পূর্বশর্ত হচ্ছে অনুশীলন। সেই অনুশীলনের জন্য প্রয়োজন বাদ্যযন্ত্র। কণ্ঠের কথা বলি আর একক বাদ্যযন্ত্র চর্চার কথাই বলি বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সঙ্গীতচর্চা অসম্ভব।

দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কথা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একতারার ছবি। মাত্র একটি তারের সাহায্যে চারদিকে ছড়িয়ে যায় এর মোহনীয় সুর। তাই তো শিল্পীর গলায় শোনা যায় একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল। তবে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রভাব আর যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার আজকাল আর চোখেই পড়ে না। একটা সময় ছিল যখন ভাল্লুক, বানর ও সাপ খেলায় তুবড়ি, বাজিকরের ডুগডুগি, যাত্রাপালায় হারমোনিয়াম, সার্কাসের জোকারের ঘুঙুর, রাজকীয় কাজে, খাজনা আদায় ও লাঠি খেলায় ‘নাকারা’, পালাগানে দোতারার মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো শোভা পেত। এর বাইরে খমক, মৃদঙ্গ, কঙ্গ, বঙ্গ, সানাই, তুরি, বেনু, করতাল, মন্দিরা, ঘণ্টা, সেতার, বিভিন্ন নামের যে বাঁশি, হারমোনিয়াম, বেহালার মতো বাদ্যযন্ত্রগুলোও ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হতো। উচ্চাঙ্গ ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ব্যবহৃত সেতার ও সরোদের ব্যবহার এখনো রয়েছে। কিন্তু সেই পুরনো দিনের সেতার ও সরোদ আর নেই। তার জায়গা দখল করেছে আধুনিক কাঠামো।

সঙ্গীতচর্চা ও আয়োজনের বড় অংশ জুড়ে থাকত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। কালের বিবর্তনে এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হারিয়ে গেছে অতীতের অনেক বাদ্যযন্ত্র। সঙ্গীতেও লেগেছে পাশ্চাত্যের ছোঁয়া। তাই একসময় যাদের সঙ্গীতে হাতে খড়ি হয়েছিল হারমোনিয়াম কিংবা তবলার মাধ্যমে তাদের উত্তরসূরিরা বেছে নিচ্ছেন গিটার কিংবা কিবোর্ডকে। তাহলে কী দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বিলুপ্তির পথে হাঁটছে? এর খোঁজ নিতেই সেদিন আমরা গিয়েছিলাম দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বিক্রয়ের সবচেয়ে বড় স্থান রাজধানীর শাঁখারি বাজারে। শাঁখারি বাজার এবং তার আশেপাশের এলাকায় বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত এবং বিক্রয়ের ঐতিহ্যের বয়স প্রায় দুশ বছরের পুরনো। যতীন এন্ড কোং এখানকার পুরনো দোকানগুলোর মধ্যে একটি। কয়েক পুরুষ ধরে এ ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন অনেক মানুষ। পুরনো নতুন মিলিয়ে এখন প্রায় ২০টি বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে, যারা নিজেরাই দেশীয় নানা বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত করে থাকেন। সতীশ, সুরসাগর, সুধা, নিউশিল্পী নিকেতন, অংকুর, লোকনাথ, কনা মিউজিক, সুরশিল্পী, শ্রীকৃষ্ণ মিউজিক্যাল হাউস, নন্দি এন্ড কোং, নিল এন্ড ব্রাদার্স, ঝর্না মিউজিক্যাল হাউস তেমনি কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম। এরা বেশির ভাগই দেশীয় বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত করে থাকে।

রেডিমেন্ট বা অর্ডার দিয়েও বাদ্যযন্ত্র কেনা যায়। চাইলে দেশের বাইরে থেকে বাদ্যযন্ত্র এনে দেন। নিজেদের প্রস্তুত করা হারমোনিয়াম, তবলা, গিটার, দোতারা, একতারা, সারিন্দা, এসরাজ, তানপুরা, সেতার, বাঁশি, মৃদঙ্গগ, ঢুমকো, ঢোল, জিপসী, খোল, মন্দিরা, কঙ্গো, বেহালা সবই এখানে পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিক্রি হয় হারমোনিয়াম ও তবলা।

এক সময় তানপুরা ও সেতারের কদর ছিল বেশি। দিনে দিনে তানপুরা ও সেতারের ক্রেতা কমে যাওয়ায় এখন এ দুটি যন্ত্রের কারিগরদেরও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে অন্য পেশায় চলে গেছে।

কাঠ, খাসির চামড়া, গরুর চামড়া, লাউ, পাইন কাঠ, প্লাইউড, পিতল এগুলো হচ্ছে বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্র তৈরির কাঁচামাল। তবলা প্রস্তুত করার জন্য একসময় মাটির বায়া পাওয়া যেত এখন আর সে বায়া পাওয়া যায় না। মন্দিরা নামের ছোট বাদ্যযন্ত্রটি এখন অনেকেই ভারতে কিনতে যান। অথচ ধামরাইয়ে কাসার শিল্পীরা এখনও ভালো মন্দিরা প্রস্তুত করেন। বেহালা নামক যন্ত্রটি আমাদের এখানে তৈরি হলেও সেটি তেমন একটা মানসম্মত হয় না বলে জানালেন নির্মাতারা নিজেই। দামে একটু কম হলেও ভারতীয় বা চাইনিজ বেহালা কেনেন ক্রেতারা। তবে ভালো হচ্ছে জার্মানি বা ইতালির বেহালা।

শাঁখারি বাজার ও রাজধানীর আশেপাশে যে সকল বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে তাদের প্রায় সবারই নিজস্ব কারিগর রয়েছে বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের জন্য। এখানে মফস্বল থেকেই ক্রেতারা আসেন বেশি। আবার অনেক সময় বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান থেকে টেন্ডার দিয়েও কাজ করা হয়। ব্যবসার অবস্থা কেমন জানতে চাইলে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই উত্তর দেন ভালো। অনেকে বলেন, পাকিস্তান আমলে মুসলমান সমাজে মনে করা হতো গানবাজনা করা যাবে না। গানবাজনা করলে লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। কিন্তু এখন অনেকেই বুঝতে পেরেছেন সঙ্গীতচর্চাও শিক্ষার একটি অংশ। সঙ্গীতচর্চা করেও ভালো পড়াশোনা করা যায়।

শাঁখারি বাজারে অবস্থিত বাদ্যযন্ত্রের দোকান যতীন এন্ড কোং-এর ব্যবস্থাপক নবকুমার সাহা বলেন, শুদ্ধ সঙ্গীতচর্চায় লোকের আগ্রহ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তাই হারমোনিয়াম কিংবা তবলা দিয়ে সঙ্গীতচর্চার প্রবণতাও কমে যাচ্ছে। তিনি আরো যোগ করেন প্রতিবছরই যাত্রা, পুতুল নাচ কিংবা সার্কাসের মতো আয়োজনগুলো তেমন একটা হচ্ছে না। ফলে এসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোও হুমকির মুখে পড়ছে। শাঁখারি বাজারে অবস্থিত আরেকটি বাদ্যযন্ত্রের দোকান আদি বুদ্ধ অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী উত্তম কুমারের মতে, দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো মূলত গুরুমুখী বিদ্যা। যা একজন ওস্তাদের তত্ত্বাবধানে থেকে আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু এখনকার নতুন প্রজন্ম এত কষ্ট করে কোনো কিছু শিখতে আগ্রহী নয়। তারা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় ইলেকট্রিক বাদ্যযন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের অধিকাংশই যখন মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখন গিটার, কিবোর্ড, পিয়ানো, ড্রামসেট, ভায়োলিনের মতো ভিনদেশি বাদ্যযন্ত্রের কদর বেড়েই চলেছে। যার ফলে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারাতে বসেছে। এ প্রসঙ্গে জলের গানের প্রধান রাহুল আনন্দ বলেন, বিদেশি কোনো কিছুর প্রতি আমাদের ভালোলাগাটা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। একটা কথা আছে না, বাড়ির গরু বাড়িতে খাস খায় না। আমাদের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতাটাও ঠিক তেমন। দোতারার মধ্যে যে পাওয়ারটা রয়েছে তা আমাদের চোখে পড়ে না। তিনি আরো বলেন, নিজের সনৱানকে আদর করার মধ্যে যে সুখ, পরের সনৱানের মধ্যে তা পাওয়া সম্ভব নয়। তারপরও আমরা সেটাই করে যাচ্ছি। ফলে আমাদের সঙ্গীত নিজস্বতা হারাচ্ছে। শুধু দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেই সঙ্গীতচর্চা করতে হবে এমনটাই ভাবেন না রাহুল। তার মতে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের গোড়া সমর্থক নই আমি। কারণ সঙ্গীতের কোনো বাউন্ডারি নাই। তবে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে যে আনন্দটা লাভ করা সম্ভব তা অন্য কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হবে না।

দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের যখন এমন করুণ অবস্থা দেখে অনেকে বলছেন এটা বিলুপ্তির পথে। তবে তা মানতে নারাজ রাহুল আনন্দ। তার মতে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কমে যাওয়ার মূল কারণ বাদকের অভাব। বাদকের বিলুুপ্ত ঘটলেও থেকে যায় বাদ্যযন্ত্র। প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী ও গীতিকার উকিল মুন্সী যে বাঁশিটি বাজাতেন তা তার শিষ্যদের হাত ঘুরে এখন রাহুল আনন্দের হাতে। দেশ ও বিদেশের এমন চার শতাধিক বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রহ রয়েছে তার কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাহুল আনন্দ বলেন, ছোটবেলা থেকেই খেলনা বাদ্যযন্ত্রের সংগ্রহের প্রতি আমার একটা আকর্ষণ ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পণ করার পর তা আমার নেশায় পরিণত হয়। সেই থেকে দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ শুরু করি। বাদ্যযন্ত্রের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি থেকে ‘মুকবাঁশি’ নামে বিশেষ ধরনের একটি বাঁশি সংগ্রহ করেন রাহুল। এই বাঁশিটি যিনি বাজাতেন তিনি নিজেই এটি তৈরি করতেন। তার মৃত্যুর পরও থেকে গিয়েছে তার সৃষ্টি।

একটা সময় ছিল যখন আমাদের পূর্ব পুরুষরা নিজেদের বাদ্যযন্ত্র নিজেরাই তৈরি করে নিতেন। দা কিংবা অন্যকিছু দিয়ে কেটে কেটে তারা একতারা, দোতরা, বাঁশির মতো যন্ত্র তৈরি করে সেগুলো আবার বাজাতেনও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রেও ঘটেছে। তাই বলে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রকে এভাবে দূরে ঠেলে না দিয়ে একে সংরক্ষণের পক্ষেই মত দিয়েছেন রাহুল আনন্দ। তার মতে গ্রামেগঞ্জে এমন অনেকেই রয়েছেন যাদের সংগ্রহে অপ্রচলিত বেশকিছু বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। এগুলোকে এক জায়গায় এনে প্রদর্শনী কিংবা জাদুঘরের স্থানে দিতে পারলেই রক্ষা পাবে আমাদের দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলো। সঙ্গীত আমাদের প্রাণে প্রাণে। সঙ্গীত ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না। তাই বাদ্যযন্ত্রের এ ঐতিহ্যবাহী পেশা এবং স্থানটির আরো অনেক বেশি এক্সপোজার দরকার।