স্হাপত্য নিয়ে তুলির যত স্বপ্ন

স্হাপত্য নিয়ে তুলির যত স্বপ্ন

1463
SHARE

মোহাম্মদ তারেক: মেয়েটির বয়স কতইবা হবে। নয় অথবা দশ। খুব শখ বান্ধবীর ভাইয়ের মতো কাগজের বাড়ির ডিজাইন করবে। প্রতিদিনই বান্ধবীর বাসায় গিয়ে তাকিয়ে থাকত কাগজের বাড়ির দিকে। আর স্বপ্ন দেখতো আহ! এমন একটি বাড়ির ডিজাইন যদি করতে পারতাম।

মেয়েটির লালিত স্বপ্ন শেষমেশ বাস্তবে রূপ লাভ করে। বান্ধবীর বড় ভাই স্হপতি মামুনুর রশীদের অনুপ্রেরণায় আজ তিনি হয়েছেন একজন সফল স্হপতি। তার নাম ফাল্গুনী সরকার তুলি। ইট, কাঠ, বালু ও কংক্রিটের মাঝেই তিনি খুঁজে ফেরেন প্রকৃতির সান্নিধ্য। আর তাই তার প্রতিটি স্হাপনায় থাকে সবুজের ছোঁয়া। ঘর বাড়ির প্রতিটি ডিজাইনের ক্ষেত্রে আলো, বাতাস, সবুজসহ প্রকৃতিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। দুই বোনের মধ্যে সবার বড় স্হপতি ফাল্গুনী সরকার।

তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীচরণপুর। জন্ম কুষ্টিয়া জেলায়। কিন্তু বেড়ে ওঠা খুলনায়। ফাল্গুনী সরকারের বাবার নাম মনোজ সরকার। সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা ইলা সরকার গৃহিণী। স্কুলজীবন থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।

ছবি অাঁকা, অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি ছিল তার নেশা। তবে ছবি অাঁকার ঝোঁকটা ছিল অনেক বেশি। বাসায় টিচারের কাছে ছবি অাঁকা শিখতেন। যেখানেই ছবি অাঁকার প্রতিযোগিতা হতো সেখানেই তাকে দেখা যেত।

খুলনা রোটারী স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৮ সালে খুলনা মহিলা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্হাপত্য বিভাগে। স্হাপত্য নিয়ে পড়াশোনা চলাকালীন সহপাঠী বন্ধুদের মধ্যে আছেন স্হপতি মাহমুদা খাতুন মুক্তা, জিনিয়া হক পিংকি ও নিপুন। এরা সবাই প্রতিষ্ঠিত আর্কিটেক্ট। নিপুন মারা গেছেন। প্রিয় শিক্ষকের তালিকায় আছেন স্হপতি নাজিম উদ্দিন পায়েল, গৌরি শঙ্কর রায় ও ফাল্গুনী মল্লিক। স্হপতি ফাল্গুনী সরকার তুলি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্হাপত্য বিভাগ থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন ২০০৬ সালে। পাস করে বের হওয়ার পরই যোগ দেন নাজিম উদ্দিন পায়েলের ‘সুবাস্তু’ নামের একটি ফার্মে। সেখানে তিনি দুই বছর চাকরি করেন। তারপর ২০০৯ সালে বাংলাদেশ নেভীতে আর্কিটেক্ট কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন। ২০১০ সালে ফাল্গুনী সরকার তুলি সিনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে যোগ দেন আশিয়ান সিটিতে। সেখানে এক বছর চাকরি করার পর যোগদেন এ্যাসেন্ট গ্রপে। সেখানে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সাথে তিন বছর চাকরি করেন।

IDRA-dhaka-office,-mothijil২০১৪ সালে স্হপতি ফাল্গুনী সরকার সিনিয়র আর্কিটেক্ট হিসেবে যোগ দেন নাভানা রিয়েল এস্টেটে। ইতিমধ্যে ফাল্গুনী সরকার দেশের নামকরা হাসপাতাল, স্কুল, অডিটোরিয়াম, শো রুম, অফিস বিল্ডিং, কমার্শিয়াল টাওয়ার সহ অসংখ্য ভবনের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডির সোবহানবাগের আদিল প্যাভেলিয়ন, উত্তরার কফি ওয়ার্ল্ডের শো রুম, যমুনা ফিউচার পার্কে গ্রামীণফোনের এক্সপিরিয়েন্স ষ্টোর, খুলনার সিক্সস্টোরীড রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং, খুলনার নেভী স্কুল, ধানমন্ডির কফি ওয়ার্ল্ডের শো রুম, খুলনার খালিশপুরের নেভী অফিসের ইন্টেরিয়র, গেস্ট হাইজের ইন্টোরিয়র, নেভীর অডিটোরিয়াম, বনানীর কফি ওয়ার্ল্ডের শো রুম, বনানীর অক্সফাম হেড অফিসের ইন্টেরিয়র, আশিয়ান সিটির ৫০০ বেডের জেনারেল হাসপাতাল, সাতক্ষীরার আই হসপিটাল, পুবাইলের চার হাজার বিঘার উপর আশিয়ান ভিলেজের মাষ্টার প্লানিং, ঢাকা পূর্বাচলের আশিয়ান হোমের মাষ্টার প্লানিং, উত্তরার কফি ওয়ার্ন্ডের শো রুম, ধানমন্ডির জ্যামকনের কর্পোরেট অফিসের ইন্টেরিয়র মতিঝিলের হলসিম বাংলাদেশ এর কর্পোরেট অফিস এর ইন্টেরিয়র, উত্তরার আইডিএলসি ব্রাঞ্চ অফিসের ইন্টেরিয়র, চিটাগং এর পিজ্জা হাটের শো রুমের অ্যাপার্টমেন্ট, কুমিল্লার ডা: আমিনুর রহমান অ্যাপার্টমেন্ট, হবিগঞ্জ, সিলেট, নারায়নগঞ্জ, রামপুরা ও গুলশানের ব্র্যাক ব্যাংক অফিসের ইন্টেরিয়র, বিভিন্ন জেলায় গ্রামীণ ফোন সেন্টারের ইন্টেরিয়র, ঢাকার বিভিন্ন স্হানের নোকিয়ার আউটলেটের ইন্টোরিয়র সহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। এছাড়া বর্তমানে বেশ কিছু নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন ফাল্গুনী সরকার।

ফাল্গুনী আক্তার তুলি তার সব ধরনের কাজ স্হাপত্যনীতি ও রাজউকের নিয়ম মেনেই করেন। ২০০৪ সালে তিনি বিয়ে করেন। স্বামীর নাম সুজন রায়। তিনি একজন আর্কিটেক্ট।  এই দম্পতি এক সন্তানের জনক-জননী। ছেলের নাম সব্যসাচী রায়।

ফাল্গুনী সরকার বলেন, একজন স্হপতি হিসেবে আমি বলব এটা একটা ক্রিয়েটিভ আর্ট। যেখানে প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তা শৈলীর প্রকাশ থাকে। যখন একটা বিল্ডিংয়ের ডিজাইন করা হয় তখন শুধু ফর্ম, লাইনের কম্পোজিশনের চিন্তা থেকে বের হয়ে আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্হার প্রেক্ষাপট নিয়েও কাজ করে থাকি।

নগরায়নের যুগে সবুজ প্রকৃতিগুলো দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্পেস আর সুযোগ ও সীমিত। তাই প্রতিটি বিল্ডিং ডিজাইন করার সময় ল্যান্ডস্কেপ এর উপর একটু বেশি নজর দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো হারিয়ে যাওয়া সবুজকে একটু হলেও ফিরে পাবো। বিশ্ব উষ্ণতার যুগে বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে স্হপতিদের চিন্তার প্রসারতা আরো বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি কাজে নজর দেন স্হপতি ফাল্গুনী সরকার। স্হাপত্য নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সর্ম্পকে ফাল্গুনী বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিবেশ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে আমার।