Home প্রতিবেদন প্রকৃতি কথা স্নিগ্ধতায় ফুটুক সবুজ ফুল-মুকিত মজুমদার বাবু

স্নিগ্ধতায় ফুটুক সবুজ ফুল-মুকিত মজুমদার বাবু

SHARE
POJ

বাংলার প্রকৃতিতে কোনো অপূর্ণতা নেই, নেই কোনো অপ্রাপ্তি। বাংলা সত্যিই সোনার বাংলা, রূপসী বাংলা। এদেশে আছে ছন্দ তুলে চপলা পায়ে ছুটে চলা পাহাড়ি ঝরনা, সাগর পানে ধেয়ে চলা বহতা নদী, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, পৃথিবীর বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, জলের বন রাতারগুল, সাগরের কোলঘেঁষে জেগে ওঠা শতাধিক দ্বীপ ও চরাঞ্চল। আরো আছে পাহাড় আর পাহাড়ের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। বনাঞ্চল আছে, বন্যপ্রাণী আছে, আরো আছে পৃথিবীখ্যাত বেঙ্গল টাইগার। আছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো সবুজ শ্যামলীমা সুন্দর সুন্দর গ্রাম।

প্রকৃতি সবার পালক। প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানুষ শান্তি পায়। অশান্ত মন শান্ত হয়। মানুষ যেমন স্থান করে নিয়েছে প্রকৃতির কোলে, তেমনি পশুপাখি, গাছগাছালি, ফুল, ঝরনা, পাহাড়, লতাপাতা, নদী, সাগর ইত্যাদি প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতি থেকে আনন্দরস পান করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা প্রকৃতিকে ক্ষত-বিক্ষত করছি। মনের গøানি দূর করার মতো স্থানগুলোর সতর্কীকরণ বাণী উপেক্ষা করছি। অথচ আমাদের চলন-বলন যদি পরিবেশবান্ধব না হয় তাহলে উপভোগ্য স্থানগুলোর সৌন্দর্য দিন দিন হারিয়ে যাবে। এমন একদিন আসবে যেদিন ওই স্থানের প্রতি মানুষের আর কোনো কৌতূহল থাকবে না। সবুজে নিকানো সুন্দরবন, দৃষ্টিনন্দন সেন্টমার্টিন কিংবা আকাশ-সাগরের মিশে যাওয়া কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত আজ আমাদের অসচেতনতা, অজ্ঞতা, হেঁয়ালীপনাসহ বহুবিধ কারণে ক্ষত-বিক্ষত।

মুগ্ধতা ছড়ানো স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পর্যটকের আসা-যাওয়া আনন্দের সংবাদ না হয়ে দুঃসংবাদ হয়ে উঠছে। যেমনÑ দেশের একমাত্র প্রবালসম্বৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি পর্যটক প্রতিদিন জাহাজে করে যাতায়াত করছে। অবাধে গড়ে উঠছে হোটেল-মোটেলসহ দোকান-পাট। সেন্টমার্টিন প্রবালসম্বৃদ্ধ দ্বীপ হওয়ায় ইট-পাথরের বহুতল ভবন নির্মাণ দ্বীপের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবাল তোলা ও বিক্রি নিষেধ থাকলেও অবাধে অবৈধভাবে তাই-ই বিক্রি হচ্ছে। মাছ ধরার নৌকার নোঙর প্রবালের ওপরে ফেলার কারণে ভেঙে যাচ্ছে প্রবাল কলোনী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দ্বীপের পরিবেশ। ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে গিয়ে আমরা দ্বীপের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা ধ্বংস করছি। আবার অসচেতন পর্যটক চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, কোমলপানীর ক্যান ইত্যাদি যথেচ্ছ ফেলে বর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত করছে সৈকত ও সাগরের পানি। রাতে উচ্চস্বরে গান-বাজনা আর হৈ-হুল্লোড়ের কারণে ভয়ে অনেক প্রাণী দ্বীপের কাছ ঘেঁষছে না। বিশেষ করে বিশ্বের দুর্লভ প্রজাতির অলিভ রিডলে টার্টল ভয়ে ডিম না পেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে এদের বংশবিস্তার।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। উত্তাল ঢেউ আর ভালোবাসার পরশে ছুঁয়ে যায় দেহ-মন। সাগর-আকাশের অপূর্ব এই সমুদ্রসৈকতও পিছিয়ে নেই দূষণের কবল থেকে। প্রতিদিন সমুদ্রসুধা পান করতে আসা পর্যটক নানাভাবে সৈকত ও সমুদ্রের পানি দূষিত করছে। সাগরে মাছ ধরা জেলেদের অসচেতনতা ও কুসংস্কারের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক মা কচ্ছপ। তারা কচ্ছপকে ‘অপয়া’ মনে করে জালে আটকে গেলে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। আবার মা কচ্ছপ ডাঙায় ডিম পাড়তে এলে অনেক সময় বেওয়ারিশ শিয়াল-কুকুরের আক্রমণে মারা যাচ্ছে। এছাড়া সমুদ্রসৈকতে চলাচলকারী মোটরসাইকেল, প্রাইভেট গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে কাঁকড়া, কচ্ছপসহ নানা প্রজাতির প্রাণী মারা যাচ্ছে। পর্যটকরা খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে সমুদ্রসৈকতে। তবে মাছ ধরার যান্ত্রিক নৌকা এবং মালবাহী জাহাজ থেকে ফেলা বর্জ্যরে কারণে সাগর দূষিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি দূষণে পিছিয়ে নেই সুন্দরবনও। বনের ভেতরে বার বার মাল বোঝাই জাহাজ ডুবি, সার্চলাইট জ্বালিয়ে রাতে জাহাজ চলাচল করা, হুইসেল বাজানো, বন থেকে অতিরিক্ত মধু আহরোণ করা, চোরা শিকারির দৌরাত্ম্য, কাঠের জন্য অধিক গাছ কাটাসহ বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা আজ আর সুন্দর নেই। এছাড়া দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অসচেতনতা, অবহেলা, তত্ত¡ধায়নের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে। মনের জানালা দিয়ে লুটোপুটি খাওয়া ফুরফুরে নির্মল বাতাস যদি আজ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে মনটাইতো অন্ধ হয়ে যাবে, এরপর বন্ধ হয়ে যাবে সব কটা জানালা। বন্ধ দুয়ারে অন্ধকার ঘরে মানুষ কি বাঁচতে পারে! মানুষকে বাঁচতে হলে চাইÑ ¯িœগ্ধতায় ফোটা সবুজ ফুলের রূপ, রস আর গন্ধ।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন