সোনা বন্ধু নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী: ডি এ তায়েব

সোনা বন্ধু নিয়ে আমি অনেক আশাবাদী: ডি এ তায়েব

1294
SHARE

গানকে ভালোবেসে নয়ন ছোটবেলায় বাবা-মা ও গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমায় মজনু দেওয়ান নামে এক বাউলের কাছে। বাউলের কাছে শুদ্ধ সংগীতের তালিম নিতে শিষ্যত্ব গ্রহণ করে নয়ন। গানের প্রতি নয়নের এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা মজনু দেওয়ানকে মুগ্ধ করে। নয়নের শান্ত সহজ সরল জীবন যাপনে মুগ্ধ বাউলের একমাত্র কণ্যা রশনি। এই মুগ্ধতা এক সময় বিশ্বাস ও আস্তায় রুপ নেয়। তাই বাউল অসুস্থতার সময় মেয়ের ভবিষৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলে রশনির পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় নয়ন।

সময়ের ব্যবধানেই হোক আর ছোটবেলায় গ্রাম থেকে চলে আসার কারণেই হোক কাজল নামে নয়নের খেলার সাথী এখনও তার পথ পানে চেয়ে থাকে। এক সময় কাজলের চোখের নিচে কালি পড়তে শুরু করে প্রিয় মানুষটির জন্য নির্ঘুম রাত কাটানোর কারণে। নিজগৃহে এমন আপন মানুষের কথা এতদিন অজানাই ছিল নয়নের। তবে কাজলের বিশ্বাস নয়ন একদিন তার কাছে ফিরে আসবেই। কাজলের বিশ্বাস কদিন পরেই সত্য হয় কিন্তু ফিরে আসার আগেই নয়ন সব হারিয়ে ফেলে।

এক সময় নয়নের ওস্তাদ মজনু বাউল অসুস্থ হয়ে পড়লে বাবার চিকিৎসার জন্য রশনি তার মায়ের শেষ সম্বল স্বর্ণের কিছু গহনা বিক্রির জন্য তুলে দেয় নয়নের হাতে। সহজ সরল নয়ন গহনা বিক্রি করতে গিয়ে ডাকাতের কবলে পড়ে প্রাণ যায় যায়। এদিকে রশনি বাবার চিকিৎসার টাকার জন্য পাগল প্রায়। রশনি ধরেই নেয় নয়ন গহনা বিক্রির টাকা নিয়ে পালিয়েছে। বাবাকে বাচাঁতে যে কোনো শর্ত মানতে রাজি রশনি। সেই মুহূর্তে এক বয়স্ক মানুষ রশনির বাবার চিকিৎসার সহযোগিতা করেন। শেষ পর্যন্ত বাউল মজনু দেওয়ান মৃত্যুবরণ করেন। শর্ত অনুযায়ী বয়স্ক মানুষটিকে বিয়ে করে রশনি। আহত অবস্থায় নয়ন ছুটে যায় হাসপাতালে জানতে পারে রশনির বাবা মারা গেছে। অবশেষে রশনিকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে নয়ন তার গ্রামের বাড়ি চলে যায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারে তার বাবা বিয়ে করেছে। ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পায় তার নতুন মা আর কেউ নন তার ভালোবাসার রশনি।

 

টান টান গল্পের এই চলচ্চিত্রের নাম সোনাবন্ধু। কাহিনী মাহবুবা শাহরিন, রচনা মমম্বর রুবেল, পরিচালনা জাহাঙ্গীর আলম সুমন, উপদেষ্টা পরিচালক নাদিম মাহমুদ। প্রযোজনা করেছে শুভ টেলিফিল্ম। সোনাবন্ধু একটি গ্রাম বাংলার ছবি এবং গানের ছবি। ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন গত দেড় দশকে নাট্যাঙ্গনের সফল অভিনেতা ডি এ তায়েব। তার বিপরীতে অভিনয় করছেন তিন বারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রী পপি এবং সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত নায়িকা পরীমনি। কয়েকদিন আগে আনন্দ আলোর সঙ্গে এক আড্ডায় বসেছিলেন ডি এ তায়েব। সেই কথপোকথনের চুম্বক অংশ পড়ুন।

আনন্দ আলো: আপনি একজন ব্যস্ত টিভি অভিনেতা হঠাৎ চলচ্চিত্র অভিনয়ে এলেন?

ডি এ তায়েব: ছোট পর্দায় কাজ করতে করতে এক সময় ইচ্ছে হয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করার। অনেক অফার ফেলেও নাটকের ব্যস্ততার কারনে এতদিন চলচ্চিত্রে অভিনয় করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীর আলম সুমনের পরিচালনায় সোনাবন্ধু ছবির গল্প শুনে অভিনয় করতে রাজি হয়ে যাই। চলচ্চিত্রে অভিনয় করার আরো একটি বিষয় কাজ করেছে তাহলো চলচ্চিত্রের প্রতি আমার নিজস্ব একটা ভালোবাসা। আমি ছোট বেলায় প্রচুর ছবি দেখতাম। তখন ভাবতাম চলচ্চিত্রের মতো বিশাল মাধ্যমে আমি একদিন কাজ করব। সেই স্বপ্নটাই আজ সত্যি হতে চলেছে।

আনন্দ আলো: সোনাবন্ধু ছবির প্রচার প্রসার দেখে অনেকেই বলছেন এটা একটা গানের ছবি। সত্যি কি তাই?

ডি এ তায়েব: ঠিক গানের ছবি বলা যাবেনা। এই ছবিকে আমরা আখ্যায়িত করেছি গ্রাম বাংলার প্রাণের ছবি হিসেবে। ছবিতে আছে অসাধারণ একটি আবহমান বাংলার প্রেমের গল্প এবং বাংলার শ্রুতিমধুর কিছু গান। সত্তর ও আশির দশকে যেমন ছবির প্রাণ ছিল গান সোনাবন্ধু ছবিররও প্রাণ হচ্ছে গান। ছবির প্রতিটি গান দশর্ককে আকৃষ্ট করবে বলে আমার বিশ্বাস।

আনন্দ আলো: গান গেয়েছেন কোন কোন শিল্পী?

ডি এ তায়েব: গান গেয়েছেন দেশের সুফিগানের অসাধারণ শিল্পী বারী সিদ্দিক, ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজ, ক্লোজ আপ ওয়ান তারকা সালমাসহ অনেকেই। ইতিমধ্যে বেশির ভাগ গানের দৃশ্য চিত্রায়ন শেষ হয়েছে। চাইলেই দশর্করা ইউটিউবে গান গুলো দেখতে ও শুনতে পারবেন।

আনন্দ আলো: ছবিতে আপনার চরিত্রটি কেমন এবং প্রথম ছবিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতার কথা বলুন?

05_3ডি এ তায়েব: আমার চরিত্রটি একজন গাতকের। যার নাম নয়ন। কিশোর বয়স থেকেই নয়নের প্রবল ইচ্ছা একদিন সে বড় নায়ক হবে। কিন্তু গায়ক হতে হলে তো গুরুর দীক্ষা নিতে হয়। তাই একদিন দূর গ্রামে চলে যায় গান শিখতে। তার পর শুরু হয় ছবির বিভিন্ন ক্লাইমেক্স। আমার কাছে চরিত্রটি অসাধারণ মনে হয়েছে। আমি চেষ্ট করেছি মনপ্রাণ উজাড় করে অভিনয় করতে।

এটা আমার প্রথম কোনো বাণিজ্যিক ছবিতে বড় চরিত্রে অভিনয় করা। এর আগেও দু’একটি ছবিতে শখে অভিনয় করেছি তবে এবারই প্রথম সিরিয়াসভাবে চলচ্চিত্রে বানিজ্যিক অভিনয় করছি। ছবি করতে গিয়ে, চমৎকার সব অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিভিন্ন লোকেশনে বড় ইউনিটের সঙ্গে সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করতে হয়েছে। কখনো গানের কখনো আবার সিকোয়েন্স করতে হয়েছে। শুটিং-এর সময় হাসি আনন্দের মধ্য দিয়ে অভিনয় করে আনন্দ পেয়েছি। সিনিয়রদের কাছ থেকে যেমন বিভিন্ন টিপস নিয়েছি তেমনি জুনিয়রদের সহযোগিতা পেয়েছি। এ ব্যাপারে পরিচালক সুমন ভাই যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন আমাকে।

আনন্দ আলো: দুই নায়িকা পপি ও পরীমনির মধ্যে কার সহযোগিতা বেশি পেয়েছেন?

ডি এ তায়েব: পপি আমাদের চলচ্চিত্রের খুবই গুণী একজন অভিনেত্রী। চলচ্চিত্রে তার অভিজ্ঞতাও বেশি। তিনি সব সময় আমাকে সহযোগিতা করেছেন। অন্যদিকে পরীমনি হচ্ছে একেবারে হালের জনপ্রিয় নায়িকা তিনিও তার সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছেন। তাদের সহযোগিতা, আন্তরিকতায় ভালো করতে পেরেছি। এক্ষেত্রে একজন বিশিষ্ট অভিনেত্রীর কথা উল্লেখ করতে চাই তিনি হচ্ছেন আনোয়ারা। সবার প্রিয় আনোয়ারা আপা। তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

আনন্দ আলো: ছবির কাজ কী শেষ হয়েছে? কবে নাগাদ মুক্তি পাবে সোনাবন্ধু?

ডি এ তায়েব: এরই মধ্যে প্রায় আশি ভাগ কাজ শেষ হয়েছে ছবির। বাকী বিশ ভাগ কাজ শেষ হবে কিছুদিনের মধ্যে। ছবির কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে মুক্তির দিনক্ষণ ঠিক করা হবে। তবে প্রযোজক চান কোনো উৎসব মুখর দিনে ছবিটি মুক্তি দিতে। অর্থাৎ আগামী রোজার ঈদে সোনাবন্ধু মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

আনন্দ আলো: সাম্প্রতিক সময়ে সিনেমায় কর্পোরেট স্পন্সর হচ্ছে। এই ছবিটি কর্পোরেট স্পন্সর পাওয়ার কতটুকু সম্ভাবনা?

ডি এ তায়েব: আজকাল অনেক ছবিতে কর্পোরেট স্পন্সর হচ্ছে। পাশ্ববর্তী দেশে তো প্রতিটি ছবিতে কর্পোরেট স্পন্সর হয়। আমাদের দেশে এই রেওয়াজ চালু হওয়ায় সিনেমা নির্মাণে বড় ধরনের সহযোগিতা পাবে সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গুলো। সোনাবন্ধু ছবিটিও বড় একটি টয়লেট্রিস কোম্পানীর স্পন্সর করার কথা আছে। তারা প্রাথমিকভাবে কথা বলেছেন কিছু দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করছি।

আনন্দ আলো: সোনাবন্ধু নিয়ে তো আপনার একটা টার্গেট আছে? যদি ছবিটি ব্যবসায়িক ভাবে সফল হয় তাহলে কী নাটক ছেড়ে পুরোপুরি চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন?

ডি এ তায়েব: টার্গেট তো অবশ্যই আছে। ছবিটি যদি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয় তাহলে নিয়মিতভাবে ছবি করবো এটা সত্য। তবে টিভি নাটক বাদ দিয়ে নয়। আমাকে তৈরি করেছে মঞ্চ ও টিভি। এই দুই মিডিয়া আমার শেকড়। তাই টিভি নাটক বাদ দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। চলচ্চিত্র হচ্ছে বিশাল মাধ্যম। এ মাধ্যমে সময় সুযোগ বুঝে নিয়মিত কাজ করতে চাই।

আনন্দ আলো: আপনি বলছিলেন ছবিটি মুক্তির আগে সারা দেশব্যাপী বড় ধরনের ক্যাম্পিং করবেন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন?

ডি এ তায়েব: বর্তমান সময়ে প্রচার প্রসার অত্যন্ত জরুরি ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে নাটক সিনেমার ক্ষেত্রে। আমাদের সিনেমার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ এমনিতে কম সেই অবস্থায় যদি প্রচার প্রসার কম হয় তাহলে দর্শকদের হলমুখী করা মুশকিল হবে। তাই আমরা এই ছবি শেষ হওয়া মাত্রই সারা দেশব্যাপী বড় ধরনের ক্যাম্পিং করার পরিকল্পনা করেছি। দেশের প্রতিটি জেলায় শহরের মানুষকে উদ্ভূত করতে চাই ছবিটি দেখার জন্য। একটি হেলিকপটারে করে ছবির পাত্র-পাত্রীরা প্রতিদিন চারটি জেলা শহরে যাবেন। সেখানে খোলা মাঠে ছবির গান দেখানো হবে প্রজেক্টরে। দশর্কদের সঙ্গে সরাসরি মত বিনিময় করা হবে। সব কটি জেলা শহর চষে বেড়ানোর পর ঢাকায় বড় ধরনের ক্যাম্পিং করা হবে। এছাড়া ছবি মুক্তির সময় ঢাকার প্রতিটি সিনেমা হলে ছবির পাত্রপাত্র ও কলা-কুশলীরা যাবেন এবং দর্শকদের ছবি দেখার জন্য আহ্বান জানাবেন।

আনন্দ আলো: আপনি এ পর্যন্ত অসংখ্য নাটক, টেলিফিল্ম ও ধারাবাহিকে অভিনয়ে করেছেন। প্রতিটি ঈদে জনপ্রিয় চ্যানেলগুলোতে আপনার নাটক প্রচার হয়। এসংখ্যা কত হবে আনুমানিক?

Shonabondho-4ডি এ তায়েব: আমার গত দেড় দশকের অভিনয় জীবনে অসংখ্য সিঙ্গেল নাটক, টেলিফিল্ম ও ধারাবাহিকে অভিনয় করেছি। এরমধ্যে কোনোটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে কোনোটা বিশিষ্ট লেখকের গল্প, উপন্যাস অবলম্বনে কোনোটা আবার বিষয়ভিত্তিক এবং সাহিত্য নির্ভর বিশেষ দিবসের নাটকও আছে। এই সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার’শ হবে। এতগুলো নাটকে অভিনয় করার পরও মনে হয় আমি যেন কিছুই করিনি। এখনো অনেক কিছু করার বাকী আছে।

শিল্পী মনের এমনি বৈশিষ্ট যে যত অভিনয়ই করুক না কেন তার ক্ষুধা যেন মিটে না। সব সময় অতৃপ্ত থেকে যায়। বার বার মনে হয় এই চরিত্রটি করা হয়নি, ওই চরিত্রটি করলে ভালো  হতো। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় এখনো আমার প্রিয় চরিত্রটি করা হয়নি।

আনন্দ আলো: আপনার আগামী পরিকল্পনার কথা বলুন?

ডি এ তায়েব: পরিকল্পনা করে কোনো কাজ করতে পারে না শিল্পীরা। শিল্পীরা সাধারণত হয় আবেগী ও খেয়ালী। যখন যেটা ভালো লাগে সেটা করতে আনন্দবোধ করে। আমার স্বভাবটাও তেমনি। যে কাজ করতে ভালো লাগেনা সেটা কখনো করিনা। কখনো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও যাই না। তবে একটি পরিকল্পনা আমার পাকা তাহলো যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন অভিনয় করে যাবো। হোক সেটা নাটকে অথবা সিনেমায়। আমি সব সময় চাই অভিনয়ের মধ্যে যেন বেঁচে থাকি। মানুষের কল্যাণে যেন নিজেকে সব সময় ব্যাপৃত রাখতে পারি। সৎজীবন যাপন করে বাকিটা সময় কাটিয়ে দিতে পারি।