SHARE

জান্নাতুল বাকিয়া কেকা:  এটাকে কি আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি বলব? নাকি তার চেয়েও বড় কিছু? মাতৃ জঠরে গুলীবিদ্ধ শিশু জন্মের পর বেঁচে গেছে। এজন্য বলতেই হয়- রাখে আল­াহ মারে কে? পাশাপাশি আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশংসাও জরুরি। যে সময়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা শোনা যায়- এটা নেই, ওটা নেই, এটা হয় না, ওটা হয় না। আস্থা নেই কারও ওপর। তাই চিকিৎসা নেয়ার জন্য মানুষ ছুটে যাচ্ছে অন্যদেশে… এমন পরিস্থিতিতে মাতৃজঠরে গুলীবিদ্ধ শিশু জন্ম নেবার পর সৃষ্টিকর্তার অপার রহমতে বেঁচে আছে। শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর আর কোন দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এমন সাফল্যের নজীর দ্বিতীয়টি নাই। এজন্য দেশের একদল নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসকের অনন্য ভ‚মিকা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। দেশের প্রচার মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই সাফল্যের খবর প্রচার/প্রকাশ হচ্ছে। আনন্দ আলো মনে করে শুধুমাত্র নাটক সিনেমায় নয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে যারাই যারাই সাফল্য দেখান তারাই তারকা। আর তাই তাদেরকে নিয়ে প্রকাশ করা হলো এই প্রতিবেদন।   মফস্বল শহর মাগুরা। শান্ত নিরিবিলি ছোট্ট শহরে জীবন যেখানে বিকেলের স্নিগ্ধতায় আপ্লুত হয় ! এমনই এক স্নিগ্ধ বিকেলের ঘটনা। যথারীতি হাসপাতালের দায়িত্ব শেষে বাড়িতে ফিরে আয়েসি বিশ্রাম শেষে আসরের নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাগুরা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট শফিউর রহমান। মাগুরা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের একমাত্র সার্জন তিনি। যদিও হাসপাতাল থেকে যে কোন জরুরী অস্ত্রোপচারে তার ডাক আসাটাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু ২৩ জুলাই হাসপাতালের ‘ইমাজেন্সি মেডিকেল অফিসার-ইএমও’র জরুরী আহŸানের পেছনে ছিলো অন্যরকম অস্বাভাবিক এক ঘটনা। কে জানতো ঐ দিন শফিউর রহমান এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। যে ঘটনা বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। যে ঘটনা ঐ দিনের আগে এযাবত কালে কেউ কখনোই শোনেনি। দেখাতো দুরের কথা। এক গর্ভবতী মা যিনি কিনা বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। আর ঐ মায়ের পেটে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে এক শিশু। পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা শিশুটির মায়ের অবস্থা দারুন সংকটাপন্নœ। তাই ইএমও’র খবরে পড়িমড়ি করে হাসপাতালে ছুটে আসেন চিকিৎসক শফিউর রহমান।  হাসপাতালে প্রবেশের পথেই তিনি IMG_6557দেখলেন, হাজারো মানুষের ভীড়। রোগীর স্বজন, প্রিয়জন, সাথে হাজারো নারী-পুরুষের উৎকণ্ঠিত অপেক্ষা। ঘটনার আকর্ষিকতায় ভীত-সন্ত্রস্থ উপস্থিত হাজারো নারী ঠিক সমান সংখ্যক পুরুষও। অনেকে দারুন রাগে-ক্ষোভে-অস্থির! গর্ভবতী মা! মায়ের প্রতি দারুন সহানুভুতিশীল সকলেই! তারপরও ঐ জনতার মধ্যে টান টান উত্তেজনা! চিকিৎসক হিসেবে ঐ উত্তেজিত জনতার শোক-রাগ-উৎকণ্ঠার মাঝে এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি শফিউর রহমান। ইতিমধ্যে শুনলেন বুলেটবিদ্ধ হয়ে সেই মায়ের এক স্বজনের মৃত্যুও হয়েছে। পরিস্থিতি তাই থমথমে। তাই কি করতে হবে ঠান্ডা মাথায় সেই চ্যালেঞ্জটা সেভাবেই নিলেন তিনি। যদিও জানতেন এই মায়ের কিছু হলে তার সব দায় তাঁকেই নিতে হবে। অপেক্ষমান জনতা মুর্হূতেই পাল্টে দিতে পারে সহানুভতির পারদ!  চিকিৎসক শফিউর রহমান এভাবেই ঐ দিনের ঘটনার বিবরন দিলেন। জানালেন, দ্রুতই তিনি সেই মাকে দেখলেন। শুনলেন, গর্ভবর্তী এই মা নাজমা বেগম তারই এক স্বজনের রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন। পেটের ভেতরে রক্ত ক্ষরণ হওয়াতে সেই মা ততক্ষনে ‘শকে’ চলে গেছেন। ইতোমধ্যে আল্টাসাউন্ড করে জানা গেছে, মায়ের গর্ভের সন্তানের বয়স ৩২ সপ্তাহ ৫ দিন। মানে সন্তানের জন্মের জন্য আরো বাকি প্রায় আট সপ্তাহ। তারপরও মাকে বাঁচাতে হলে দ্রুতই অস্ত্রোপচার জরুরী। তাই বাইরে উত্তেজিত জনতা, আক্রান্তের স্বজন, প্রিয়জন, গর্ভের অপরিনত সন্তান এতসব স্পর্শকাতর ইস্যুকে আমলে না নিয়েই অস্ত্রোপচার শুরু করলেন তিনি।  মা নাজমার পেটের ভেতরে রক্তে পুরিপূর্ন। গুলিটা পেটের বাঁ দিকে ভেদ করে আটকে ছিলো কুচকির পেশিতে। মায়ের পেটের অভ্যন্তরে এত সব ক্ষত মেরামত করে সন্ধা ছয়টায় জন্ম নিলো তার গর্ভের শিশুটি। যদিও জন্মের সময় শিশুটির শরীর ছিলো নিলচে এবং কেমন যেন নিস্তেজ-আর ভীষন ক্লান্ত। শফিউরের বর্ণনা এমন- জন্মের পর প্রায় পাঁচ মিনিট পার হচ্ছে, শিশুটি কাঁদাছে না। আমি ছাড়াও ওটিতে থাকা মাগুরা সদর হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ জয়ন্ত কুমার কুন্ড, এ্যানেসথেসিয়ার চিকিৎসক সৌমেন সাহাসহ সবাই উৎকণ্ঠায়। কিন্তু আশ্চর্য সেই শিশু ! যে কিনা প্রবল ভাবে বেঁচে থাকার জন্যেই যেন জন্মালো। চিকিৎসক জয়ন্তও মুখ দিয়ে এমনকি কৃত্রিম অক্সিজেন দিয়ে শিশুটিকে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে সহায়তা করলেন। তাতে সাড়া দিয়ে হঠাৎ কেঁদে উঠলো শিশুটি। ততক্ষনে আমার সাথে থাকা শিশু বিশেষজ্ঞ জয়ন্ত শিশুটিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু তখনও আমরা জানি না যে শিশুটিও বুলেটেবিদ্ধ ! শিশুটি সময়ের অনেক আগেই জরুরী অবস্থায় জন্ম নেয়। অপরিনত জন্মের কারণে শিশুটির ওজন ছিলো মাত্র এক হাজার আট’শ গ্রাম। মানে দুই কেজিরও কম। অথচ শিশুদের জন্মের সময় ওজন আড়াই কেজির কম হলে জীবন হয় ঝুঁিকময়। শরীরের নানান অঙ্গ বিশেষ করে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গঠন পরিপূর্ন হয় না। দেখা দেয় শরীরের নানান গঠনগত ত্র“টি। এই সব বিবেচনায় শিশুটির প্রযোজন ছিলো আরো উন্নত চিকিৎসা। যা মফস্বল শহরে পাওয়া সম্ভব ছিলো না। সেই বিচেনায় পঁিচশ জুলাই শিশুটিকে আমরা ঢাকায় পাঠাই। তারপরতো এক বিস্ময়কর ইতিহাসের জন্ম হয়। হ্যা, চিকিৎসা ক্ষেত্রে সেই বিস্ময়কর ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নেতৃত্বে দেশের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। শিশুটিকে নিয়ে মাগুরায় যখন ‘জীবন-মরণ’ লড়াই চলছিলো তখনই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও তার ব্যাপারে ব্যাপক উদ্যোগ শুরু হয়।  জন্মের প্রায় ৫৬ ঘন্টা পর মাকে ছেড়ে চাচা ও ফুফুর সাথে মাগুরা থেকে ঢাকার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ২৬ জুলাই ভোরে শিশুটি এসে পৌঁছায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শিশু সার্জারি বিভাগে সেদিন রাত্রি কালীন দায়িত্বে ছিলেন ডা. সদরুদ্দিন আল মাসুদ। তিনি শিশুটিকে দেখে একটু যেন ভয় পেয়েছিলেন। ভয়তো পাবারই কথা। ছোট্ট শিশু। গুলীর আঘাতে বিদীর্ন তার শরীর। তাকে নিয়ে ভয়-দুশ্চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। পরের দিন সকালে শিশুটিকে প্রথম দেখেন শিশু সার্জারী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কানিজ হাসিনা। কী ভয়াবহ চিত্র। শিশুটির বুকের ডানপাশ দিয়ে ঢুকে গেছে যে গুলীটা তা মায়ের পেটের ভেতরে শিশুটি গুটিশুটি হয়ে থাকার কারনে ভাজ করা হাত ও গলার পাশ ঘেষে বাম চোখের কিছু ক্ষতি করে বেরিয়ে গেছে অন্যধার দিয়ে।  শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য শুরু হলো চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। ১০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলো। যে বোর্ডে যুক্ত হলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আশরাফুল হক, অধ্যাপক আব্দুল হানিফ, সহযোগি অধ্যাপক কানিজ হাসিনা, শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এখলাসুর রহমান, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আব্দুল ওয়াদুুদ চৌধুরী, কার্ডিও থোরাসিক সার্জন কামরুল, চর্ম বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী, চক্ষু বিভাগের ডা. ফরিদুল হাসান, অর্থোপেডিক বিভাগের ডা. গোলাম মোস্তফা ও প্লাস্টিক সার্জারী বিভাগের ডা. নওয়াজেশ।  সম্মানীত এই চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় শিশু সুরাইয়া বেঁচে গেছে। মায়ের কোলে চড়ে সে ফিরে গেছে মাগুরায়। তাকে দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ আসছে দুর দুরান্ত থেকে। একথা সত্য, জীবন মরণ সবই সৃষ্টিকর্তার হাতে। তবুও কথা থেকে যায়। ভাবা যায় মায়ের পেঠে থাকা অবস্থায় গুলীবিদ্ধ শিশুকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আওতায় জন্মদিয়ে সম্পুর্ণ সুস্থ করে তুলেছেন আমাদের দেশের চিকিৎসকরাই। শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকদের অনেকে অর্থ সহায়তাও দিয়েছেন। রক্ত দিয়েছেন কেউ কেউ।  যে ঘটনার প্রেক্ষিতে শিশু সুরাইয়া ময়ের পেটে থাকা অবস্থায় গুলীবিদ্ধ হয় তা খুবই কদর্য ও নিন্দনীয়। এই ঘটনায় যারা জড়িত তাদের উপযুক্ত শাস্তি হবে এই বিশ্বাস আছে আমাদের। পাশাপাশি আরেকটি বিশ্বাস বুকে লালন করতে চাই। সুরাইয়াকে বাঁচিয়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের চিকিৎসকদের ভ‚মিকা দেশবাসীকে আশ্বস্থ করেছে। হ্যা আমরাও পারিÐ এই বিশ্বাস জন্মেছে সবার মধ্যে। বিশেষ করে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বেড়েছে সাধারন মানুষের। এই আস্থা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি এটাই কামনা। সুরাইয়ার জন্য আমাদের অনেক আদর অনেক ভালোবাসা…