সিম্ফনী চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড-২০১৬ বসেছিল সুরের মেলা

সিম্ফনী চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড-২০১৬ বসেছিল সুরের মেলা

448
SHARE

প্রশ্ন উঠতে পারে কে ছিলেন না সেদিনের অনুষ্ঠানে? উত্তর একটাই দেশের শতাধিক বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী যখন কোন সঙ্গীতায়োজনে উপস্থিত থাকেন তখন কি আর বলার অপেক্ষা থাকে কে ছিলেন না সেই অনুষ্ঠানে। সঙ্গীতাঙ্গনের প্রায় সবাই ছিলেন এই অনুষ্ঠানে। যদি বলি এটা ছিল সঙ্গীত শিল্পীদের মিলন মেলা। তাহলে কম বলা হবে। এটা ঠিক মিলনমেলা নয় সঙ্গীতাঙ্গনের মানুষদের মহামিলনের এক অনিন্দ্যসুন্দর আয়োজন হয়ে উঠেছিল এবারের সিম্ফনি চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস এর ১১তম আসরটি। ২৭ মে সন্ধ্যায় ঢাকার ওয়েস্টিন-এর বলরুমে এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে দেশের নবীণ প্রবীণ সঙ্গীতশিল্পীদের মাঝে অনেক দিনপর পরস্পরকে দেখা, কুশল বিনিময় করা সেই সাথে প্রাণময় আড্ডা দেয়ার চমৎকার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। সঙ্গীত যে গুরুমুখী বিদ্যা। এটাই আবার প্রমাণ হয়েছে সিম্ফনি চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস এর গালা রাউন্ডে। অনেক প্রবীণ শিল্পীও যখন সবার সামনে তার গুরুকে পা ছুঁয়ে সালাম করছিলেন তখন যেন আমাদের সংস্কৃতির উজ্জলতম শিষ্টাচারের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছিলো। এমনও হয়েছে এই অনুষ্ঠানে এসে অনেক শিল্পী তার বন্ধুর দেখা পেয়েছেন। একই শহরে থেকেও হয়তো দেখা হয়নি বহুদিন। সিম্ফনি চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে এসে তার সাথে দেখা। সাথে সাথে আবেগে জড়িয়ে ধরা। তারপর কত গল্প, কত স্মৃতি আওরানো। অতঃপর অনুষ্ঠানের মাঝে নিজেকে একাত্ম করেন। সব মিলিয়ে এবার ১১তম আসরটি ভেন্যুর দিক দিয়ে ছোট্ট হলেও আয়োজনের দিক দিয়ে ছিল বিশাল।

ওয়েস্টিন-এর বলরুমে দুইদিকে মঞ্চ দেখে অতিথিরা প্রথমে একটু যেন ভরকে যান। দুটি মঞ্চ কেন? তার মানে কী ঘাড় ঘুরিয়ে একবার এইদিকে অন্যবার আরেকদিকে দেখতে হবে। ঘটনা তাই ঘটলো। অনুষ্ঠান শুরু হলো প্রথমে ডান দিকের মঞ্চে। শুরুতেই চমক। দেশের বিশিষ্ট ব্যান্ড সংগঠন জলের গান জলের মতোই থইথই আনন্দ ছড়িয়ে দিলেন উপস্থিত দর্শকের মাঝে। শুরুতেই জমে গেল অনুষ্ঠান।

হঠাৎ বাম দিকের মঞ্চ থেকে উপস্থাপক ফারজানা ব্রাউনিয়ার মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এলো। দর্শক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। ফারজানা ব্রাউনিয়ার অপূর্ব উপস্থাপনা ভঙ্গি দর্শকের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই মঞ্চে বক্তৃতা দিতে এলেন চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। সাথে সাথে অতিথিদের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। অতিথিরা হাত তালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানালেন। ফরিদুর রেজা সাগরের বক্তৃতার পর মঞ্চে এলেন এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া শাহিদ। এবার আজীবন সম্মাননা প্রদানের পালা। কে পাচ্ছেন আজীবন সম্মাননা? এই নিয়ে দর্শক সারিতে মৃদু গুঞ্জন। মঞ্চে ডেকে নেয়া হল নায়করাজ রাজ্জাক, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী এবং চ্যানেল আই এর পরিচালক পর্ষদ সদস্য জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুনকে। দর্শক সারিতে তখনও গুঞ্জন কে পাচ্ছেন আজীবন সম্মাননা। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে উপস্থাপক ফারজানা ব্রাউনিয়া ঘোষণা করলেন সেই জীবিত কিংবদনৱী সঙ্গীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহর নাম। সাথে সাথে দর্শক সারীতে শিল্পীদের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। শাহনাজ রহমতুল্লাহ মঞ্চে উঠে যাচ্ছিলেন তখন দর্শক সারিতে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মাননা জানান। শাহনাজ রহমতুল্লাহকে উত্তরীয়, সম্মাননা ক্রেস্ট ও অর্থ প্রদান করা হয়। এসময় শাহনাজ রহমতুল্লাহকে শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠানে সমবেত সকল শিল্পী উঠে দাঁড়িয়ে তারই গাওয়া একটি গানের সাথে কণ্ঠ মেলান। এই মুহূর্তটি ছিল সত্যি মনে রাখার মতো।

যেন ভুলে না যাই

শাহনাজ রহমতুল্লাহকে সম্মাননা জানানোর পর পর্দায় ভেসে ওঠে গত বছর হারিয়ে যাওয়া অর্থাৎ এই দুনিয়া ছেড়ে যাওয়া সঙ্গীত শিল্পীদের নামের তালিকা ও তাদের ছবি। আনন্দের মাঝে হঠাৎ যেন বিষাদের ছায়া। এসময় কারও কারও চোখ ছল ছল করে ওঠে।

এসো আনন্দে ভাসি

আবার ঘাড় ঘুরানোর পালা। ডান দিকের মঞ্চে এবার আনন্দ অনুষ্ঠান হবে। কে আসছেন আনন্দ দিতে? একথা ভাবতে না ভাবতেই মঞ্চে ঢুকলেন ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজ সাথে বিশিষ্ট অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু। দুই জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গীত পরিবেশনা সকলকে মুগ্ধ করে। তারা গান শেষে মঞ্চ ত্যাগ করা মাত্রই আবার ঘাড় ঘুরান দর্শক। কারন বাম দিকের মঞ্চে এবার শুরু হবে অ্যাওয়ার্ড প্রদানের পালা। এবারের অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিকল্পনা ছিল প্রশংসনীয়। দুই দিকে দুই মঞ্চে কখনো অ্যাওয়ার্ড প্রদান আবার কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বিষয় বৈচিত্র্যের কারনে দর্শক আনন্দ নিয়েই গোটা অনুষ্ঠান উপভোগ করে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক পর্বে বিশিষ্ট শিল্পী সাদী মুহম্মদের সাথে বিশিষ্ট অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের যুগলবন্দী গান, বিশিষ্ট অভিনেত্রী কুসুম শিকদার ও তারিনের কণ্ঠে আরো দুটি চমৎকার গান দর্শকের মাঝে আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি বোনাস হিসেবে ছিল বাংলার গানের শিল্পীদের মনোজ্ঞ সঙ্গীত পরিবেশনা। শেষে ব্যান্ড গুরু আইয়ুব বাচ্চুর গান অনুষ্ঠানটিকে আরো আলোকিত করে তোলে।

 

অনুষ্ঠানে মোট ১৭টি ক্যাটাগরিতে সিম্ফনি চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। বিজয়ীদের মাঝে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন নায়করাজ রাজ্জাক, সৈয়দ আব্দুল হাদী, আলম খান, লাকী আখন্দ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, আজাদ রহমান, নাহার জামিল, রফিকুল আলম, রফিকুজ্জামান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন মাহমুদ, বাপ্পা মজুমদার, মানাম আহমেদ প্রমুখ।          ছবি: রাকিবুল হক

SCMA-1

অ্যাওয়ার্ড পেলেন যারা

ক্রিটিক (১৩টি): উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত (কণ্ঠ)- প্রিয়াংকা গোপ (অ্যালবাম: রাগা ডিলাইটস, গান- ট্রাক-১)। রবীন্দ্রসঙ্গীত- অদিতি মহসিন (অ্যালমাব: মম রূপে বেশে, গান- অ্যালবামের সব গান)। নজরুল সঙ্গীত- ইয়াসমিন মুশতারী (অ্যালবাম: রাঙা অতিথি, গান- গানগুলি মো…)। লোকসঙ্গীত- মমতাজ (অ্যালবাম: মাঝি, গান- হতাশা…)। আধুনিক গান- কনক চাঁপা (অ্যালবাম: আড়ালে, গান- কোনদিন আসে না যেন সেদিন…)। নবাগত শিল্পী- নির্বাচিতা (অ্যালবাম: আসবে না ফিরে, গান- ফুল বনে মন ছিলো…)। সঙ্গীত পরিচালক- আলাউদ্দিন আলী (অ্যালবাম: সোনালী গান, গান- শত জনমের স্বপ্ন…)। শ্রেষ্ঠ গীতিকার- রবিউল ইসলাম জীবন (অ্যালবাম: এশী এক্সপ্রেস, গান- রোদ সরিয়ে…)। ছায়াছবির গান (অ্যালবাম: অচেনা হৃদয়, গান- যতদিন ধরে বাঁচি…, শিল্পী- বেলাল খান ও কোনাল)। কাভার ডিজাইন- প্লান বি (অ্যালবাম: ক্ষমা করো)। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার- আজম বাবু (অ্যালবাম: জলছবি)। সেরা ব্যান্ড- শিরোনামহীন (অ্যালবাম: শিরোনামহীন)। মিউজিক ভিডিও নির্মাতা- তানিম রহমান অংশু (অ্যালবাম: হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা, গান- হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা)।

পপুলার চয়েস (৪)টি: আধুনিক গান- ফাহমিদা নবী (অ্যালবাম ও গান: তুমি অভিমানে)। সেরা ব্যান্ড- অবসকিউর (অ্যালবাম: অবসকিউর ও বাংলাদেশ, গান- আজাদ…)। নবাগত শিল্পী (যৌথভাবে)- জিনিয়া জাফরিন লুইপা ও এশী, লুইপা- (গান ও অ্যালবাম: ছায়াবাজি) এবং ঐশী- (অ্যালবাম: ঐশী এক্সপ্রেস, গান- ব্রেক আপ…)। ছায়াছবির গান- সামিনা চৌধুরী (ছায়াছবি ও অ্যালবাম: সুতপা’র ঠিকানা, গান- গুণে গুণে এই দুই…)।

 

আসুন সকলে মিলে আমাদের সঙ্গীতকে এগিয়ে নেই

-ফরিদুর রেজা সাগর

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই

শুদ্ধ সঙ্গীতের বিকাশে আমাদের এই আয়োজন চলছে অব্যাহত গতিতে। এবার সিম্ফনি আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে। এজন্য ধন্যবাদ। আজীবন সম্মাননা পেলেন দেশের জীবনৱ কিংবদনৱী সঙ্গীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তাঁকে জানাই আনৱরিক শুভেচ্ছা। আজ শতসঙ্গীত শিল্পীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি অনেক ব্যাঞ্জনা পেয়েছে। আসুন সকলে মিলে আমাদের বাংলা সঙ্গীতকে অহংকারের সাথে এগিয়ে নেই। যারা এবার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তাদের সবাইকে শুভেচ্ছা।

আসুন সকলে মিলে বাংলা গান শুনি

-জাকারিয়া শাহিদ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এডিসন গ্রুপ

সকলেই জানেন, সিম্ফনি নামের মধ্যে গানের একটা সুর জড়িত আছে। সেজন্য সুরের কোন বড় প্রতিযোগিতায় আমরা যুক্ত হতে পেরে খুব খুশি। এজন্য চ্যানেল আই-এর প্রতি আমাদের অনেক কৃতজ্ঞতা। যাঁরা আজ অ্যাওয়ার্ড পেলেন তাঁদের সবাইকে শুভেচ্ছা। একটা অনুরোধ, আসুন সকলে মিলে বাংলা গান শুনি। বাংলা গানের বিকাশে আনৱরিকভাবে এগিয়ে যাই।

 

বিশেষ সম্পাদকীয়

কেন বুকের ভেতর সূর বাজে না?

বিনোদন সাংবাদিকতায় অনেক বছর ধরে আছি। একসময় দেশের শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকে শিক্ষা সংস্কৃতি, কখনো কখনো রাজনীতি নিয়েও কাজ করেছি। টানা ১৯ বছর ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা করার পর যুক্ত হই আনন্দ আলোর সাথে। শুরু থেকে সংস্কৃতি কর্মীদের সাথেই আমার ওঠাবসা। তাদের সুখ-দুঃখ নিয়েই পথ চলি, লিখি এবং তা প্রকাশ করি।

চোখের সামনে দেশের সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোর চড়াই উৎড়াই দেখেছি এখনো দেখেই চলেছি। অন্য সেক্টরের কথা বলবো না। শুধুমাত্র সঙ্গীতের ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাই। চ্যানেল আই শুদ্ধ সঙ্গীতের বিকাশে একটি অ্যাওয়ার্ড চালু করেছে। এবার অ্যাওয়ার্ডটির ১১তম আসর শেষ হলো। আমার ধারনা ইতিমধ্যে দেশের নবীণ প্রবীণ সব শিল্পীর ঘরে এই অ্যাওয়ার্ড পৌঁছে গেছে।

কিন্তু কাজের কাজ কি কিছু হয়েছে? অর্থাৎ দেশে শুদ্ধ সঙ্গীতের বিকাশ কি হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর কতটা সনেৱাষজনক হবে জানি না।

একটি ঘটনার কথা বলি। রাতে বাসযোগে উত্তরবঙ্গের একটি শহরে যাচ্ছি। ড্রাইভার গাড়িতে হিন্দী গান বাজাচ্ছেন। তাকে বললাম, ভাই বাংলা গান বাজান না। বিরক্ত হয়ে সে বাংলা গান বাজিয়ে দিল এবং সেটা অখ্যাত কোন এক শিল্পীর। ভাবলাম হোক না অখ্যাত। বাংলা গানতো। চলুক। কিন্তু তার বেসুরো গলা বিরক্তির উদ্রেক করে বাসের যাত্রীদের মাঝে। এক যাত্রী বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারকে বলে ভাই ক্যাসেট বদলান। ড্রাইভার বেশ খুশি। আবার হিন্দী গান বাজাতে শুরু করলো। আমার বেশ অপমান হচ্ছে। ব্যাগে দেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পীর সিডি ছিল। সেটা ড্রাইভারকে দিয়ে বললাম, এই সিডিটা বাজান।

ড্রাইভার রাজি হলো না। বাসের সংখ্যাগরিষ্ঠ যাত্রী হিন্দীর পক্ষে। ভাই যেটা চলছে সেটাই চলুক।

আমি আর প্রতিবাদ করতে পারলাম না। সেই থেকে মর্মপীঢ়ায় ভুগি। আমাদের বাংলা গান কি হারিয়ে যাবে?

২৭ মে ওয়েস্টিনের বলরুমে সিম্ফনী চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান দেখার পর কেন যেন বুকে সাহস পাচ্ছি। শতাধিক শিল্পী সেদিন একত্রিত হয়েছিলেন। বড়দের প্রতি ছোটদের সেকি টান। বড়রাও ছোটদের বুকে টেনে নিচ্ছেন।

এত আনৱরিকতার পরও আমাদের বাংলা সঙ্গীত কেন বুকে বাজছে না? প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন সবাই!