Home সাক্ষাৎকার সিনেমা হলে আর সিনেমার ভবিষ্যৎ নাই!-অপর্ণা সেন

সিনেমা হলে আর সিনেমার ভবিষ্যৎ নাই!-অপর্ণা সেন

SHARE
Aporna-sen

হালকা সাজগোজ। পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে চোখে কালো চশমা। চুলটা পরিপাটি। হাতটা এ কাঁধ থেকে ও-কাঁধ নিলেই যেন ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে উঠছে পর্দার সেই ‘তিন কন্যা’, ‘জীবন সৈকত’, ‘অপরিচিত’র নায়িকার মুখাবয়ব। সেই অপর্ণা সেন! এখনও অনবদ্য। একেবারে সামনে বসে আছেন যিনি। ঢাকায় এসেছিলেন তবে শুধু অভিনেত্রী হিসেবে নয়, নিজের নির্মাণ ‘সোনাটা’ চলচ্চিত্র নিয়ে ছিলেন। যা ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে। ছবি প্রদর্শনের আগে রাজধানীর শওকত ওসমান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে এক আলাপচারিতায় কথা বললেন অধুনা ভারতের অন্যতম এই নির্মাতা-অভিনেত্রী। কথা প্রসঙ্গে উঠে এলো তার নির্মিত ছবি ‘পারমিতার একদিন’, ‘গয়নার বাক্স’সহ অনেক কিছুই। আর যেটা খুব যতœসহকারে বলেন, সেই বিষয়- নারীদের অধিকার নিয়ে বললেন। নানা প্রসঙ্গে নিয়েই এই সাক্ষাৎকার। অপর্ণা নিজেই শুরুটা করলেন এভাবে- আমি যে খুব বেশি ছবি নির্মাণ করি তা নয়। তবে শেষ দুটির (আরশিনগর ছাড়া) একটি বাদল সরকারের প্রতি উৎসর্গ করতে তার ‘সারা রাত্রি’ নাটক থেকে তৈরি করি ‘সারি রাত’ সিনেমা। অপরটি মারাঠি সাহিত্যিক মহেশ এলকুঞ্চওয়ারের ‘বিকাল ছবি’ নাটক থেকে তৈরি করলাম ‘সোনাটা’। ৩জন মধ্য বয়স পেরুনো নারীকে নিয়ে এর গল্প। এটি ইংরেজি নাটক। তাই ছবিও ইংরেজিতে।

প্রশ্ন: উৎসব কেমন লাগছে?

অপর্ণা সেন: প্রজেকশনের ব্যবস্থায় আমি কিছুটা চিন্তিত। কারণ আমি যখন একটি ছবি দেখলাম, দেখার সময় সেখানে অনেক আওয়াজ পেয়েছি। আমি জানি না ‘সোনাটা’ দেখার সময় দর্শকরা সেটা কীভাবে নেবেন!

তবে সব মিলিয়ে ভালো লাগছে। কতটা কঠিন একটা চলচ্চিত্র উৎসব পরিচালনা করা- তা আমি জানি। আমি অনেক বড় উৎসবে গিয়েছি। কিন্তু সেখানে কোনও উষ্ণতা থাকে না। এখানে আছে। মানুষের উষ্ণতা আছে। সত্যিই সব মিলিয়ে ভালো লাগছে।

প্রশ্ন: ছবি নির্মাণের যাত্রাকে কীভাবে দেখছেন? নারী নির্মাতা হিসেবে কখনও কোনও প্রতিবন্ধকতা এসেছে?

অপর্ণা সেন: আমি বলবো ‘না’। নারী বলে আমার প্রতিবন্ধকতা এসেছে- তা নয়। আমি যেহেতু মূল ধারার বিষয়ে নির্মাণ করি না।  তাই কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তো এসেছেই। আমার ভাগ্য ভালো বলব। কারণ আমি তা উতরে গেছি। আফসোসও আছে, ‘পরমা’ বা ‘পারমিতার একদিন’ নারীবাদী ছবি হিসেবে সবার কাছে পৌঁছায়নি। যে দুটো ছবির জন্য আমি আন্তর্জাতিক অঙ্গন বা নিজের অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছি, সে দুটো ছবিই দর্শকের কাছে পৌঁছায়নি। এ দুটো ছবিই ইংরেজিতে নির্মিত। ইংরেজি ছবির ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। আমরা প্রডিউসার পাই না। তারা হিন্দিতে ছবি করতে চান।

প্রশ্ন: অনেক নতুন নির্মাতা কাজ করছেন। সে তুলনায় আপনি অভিজ্ঞ ও সফল। আপনার এখনও এমনটি মনে হয়!

অপর্ণা সেন: পশ্চিমবঙ্গে তো কোনও ভাষার উপর বিধি আরোপ নেই। তাই আমরা যেকোনও ভাষায় ছবি করতে পারি। যদি হিন্দিতে করি, তাহলে আমাদের ডেইলি বেজ ওয়ার্কারদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ দিতে হয়। ইংরেজিতে যদি করি, সেটা আন্তর্জাতিক ছবি হিসেবে গণ্য হবে। তখন চার গুণ টাকা দিতে হয়। আমরা এত টাকা কোথায় পাব! এগুলোও সমস্যা। হয়তো ছবির ১০ মিনিট কমিয়ে দিলে বাজেট কমে। একটি রুমের ভেতরের দৃশ্য বেশি রাখলে খরচ কমে।

একসময় ইরানে অনেক বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি করতে বাধা আসত। তখন তারা বাচ্চাদের ছবি তৈরি করা শুরু করল। আমাদের এখানে বাজেট সমস্যা। তাই আমাদের অনেক কিছু ভাবতে হয়। যদি এত বছর পরও প্রডিউসারদের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে, আমি সিনেমা বানাতে পারি- তাহলে আর কীইবা বলার আছে!

প্রশ্ন: আপনি নারীদের নিয়ে অনেক ভাবেন। ‘সোনাটা’ ছবিও তিনজন নারীর গল্প। আপনি নারীবাদ বলতে কী বোঝেন?

অপর্ণা সেন: ‘সোনাটা’র যে তিনজন নারী, তারা সবাই আয়-রোজগার করেন। তারা কারও উপর নির্ভরশীল নয়। এখানে একটা সংলাপ আছে,  আমরা সবাই হলাম ফেমিনিস্ট। এটাই নিয়েই অনেক মজা করে। এ ছবিতে এটাই ‘আইটেম’ সংলাপ (হাসি)।

আর ফেমিনিস্ট বলতে, আমি যা ভাবি সেটা এক ধরনের,  ফেমিনিজম এখন যেভাবে দাঁড়িয়েছে- সেটা অন্য ধরনের। একটা সময় এটা অন্যরকম ছিল। আমাদের সময়ে মেয়েরা আসলেই খারাপ অবস্থায় ছিলেন। আমার নারীবাদ মানবতাবাদের অংশ ছিল। অর্ধেক মানব সমাজ যদি অবদমিত করে রাখা হয়, তবে সমাজকেই দাবিয়ে রাখা হয়।

প্রশ্ন: শাবানা আজমি ও আপনার বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। ‘সোনাটা’ ছবিতেও আপনারা একসঙ্গে অভিনয় করলেন। দুজন একসঙ্গে বসলে আসলে কী নিয়ে আলোচনা হয়?

অপর্ণা সেন: সব কিছু নিয়ে আলোচনা হয়, ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে কাজের মানুষ পর্যন্ত। নারীবাদ, সিনেমা, ফ্যাশন-সবই থাকে। আমরা তো অনেক পুরনো বন্ধু, তাই বাদ যায় না কিছুই। আসলে জীবন নিয়েই আলোচনা হয়।

প্রশ্ন: কয়েক যুগ ধরে আপনি সিনেমা যুক্ত। পরিবর্তন দেখে আসছেন। চলচ্চিত্র এখন প্রেক্ষাগৃহে চালাতে নানা সমস্যা উঠে আসছে। অথচ টেলিভিশনে চলছে। ভবিষ্যতের সিনেমার বিপণনটা কীভাবে দেখেন?

অপর্ণা সেন: সিনেমা হলে গিয়েই যে ছবি দেখতে হবে, এমন তো কথা নেই। এখন টরেন্ট থেকে ছবি ডাউনলোড করে রাখেন। নেটে দেখেন। প্রেক্ষাগৃহে আর সিনেমার ভবিষ্যৎ নেই।

প্রশ্ন: সিনেমা হল ছাড়া কি সিনেমা ভাবা যায়!

Aporna-sen-1অপর্ণা সেন: এখন তা ভাবায় যায়। এখান তো মোবাইল স্ক্রিনে সিনেমা ভাবা যায়। শুধু দেখাই নয়, এটা দিয়ে সিনেমাও তৈরি হয়। তা দিয়ে ভালো ছবি হচ্ছে। শর্টফিল্ম হচ্ছে। এগুলো দেখানো হচ্ছে উৎসবেও। অনলাইনে এখন সিনেমা দেখার সুযোগ হচ্ছে। এত ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ তার পছন্দমতো থিয়েটার খুঁজে নিচ্ছে। মোবাইল, টিভি, অনলাইন- এগুলো। আবার পাশাপাশি সিনেপ্লেক্সও থাকতে হবে। মানুষ তার সুবিধা মতো যাবে।

প্রশ্ন: আপনার পরিচালনার কথা শুনতে চাই। আপনি যখন প্রথম ছবি ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ তৈরি করলেন। তার প্রযোজক হলেন শশী কাপুর। এতে অভিনয় করেন তার স্ত্রী জেনিফার কাপুরও। এটা কী পরিচালকের পছন্দ ছিল নাকি প্রযোজকের?

অপর্ণা সেন: এটা অবশ্যই আমার পছন্দের ছিল। খুব সুন্দরভাবে কাজটি শেষ হয়েছে।

প্রশ্ন: বর্তমানে একটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে খুব বিতর্ক হয়। আপনার ছবি ‘গয়নার বাক্স’-এ ছোট হলেও সুন্দরভাবে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরা হলো। অথচ গত কয়েক বছরের বেশকিছু ছবিতে (মালয়লাম, তেলেগু, বলিউড) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন ভারতীয় নাগরিক বা নির্মাতা হিসেবে আপনার কি মনে হয় না, ইতিহাস সঠিক রাখা উচিত?

অপর্ণা সেন: মুক্তিযুদ্ধে অবশ্যই ভারতের একটা ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর বড় ভূমিকা ছিল। তখন তো বাংলাদেশ ছিল না, সেই অর্থে তারা হয়তো দেখাতে পারে। আসলে আমি ছবিগুলো দেখিনি। তাই আমার জন্য মন্তব্য করাটা কঠিন।

পশ্চিমবঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ একটু অন্যভাবে পৌঁছেছিল। যেহেতু বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন ছিল। আমাদের হৃদয়ের গভীর যোগ ছিল এতে। আমরা মনে তখন ছিল, একটা বড় ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করছি, একটি দেশের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে সমর্থন করছি- এগুলো। তবে বৃহত্তর ভারতবর্ষে মেসেজটা এভাবে যায়নি। তাই তারা হয়তো সেভাবে দেখতে পারে। কারণ সে সময়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের আঁচও ছিল। সে জন্য হবে হয়তো।

প্রশ্ন: সিনেমা, নাটক ও নির্মাণ নিয়ে অনেক কথা হলো। কবিতার সঙ্গেও আপনার যোগসূত্র আছে। আপনার মামা হলেন জীবনানন্দ দাশ। দুই দেশেই তিনি বিখ্যাত। বিশেষ করে বাংলাদেশে। আত্মীয় হিসেবে সেটা ভাবতে কেমন লাগে?

অপর্ণা সেন: আমরা তাকে ‘বিলু মামা’ বলে ডাকতাম। বাবা-মা ‘বড় দা’ বলে ডাকতেন। কারণ তিনি বংশের বড় ছিলেন। আমি কখনও তাকে আত্মীয় হিসেবে ভাবিনি। সবসময়ই কবি হিসেবে ভেবেছি। তিনি তো বাংলা কবিতাকে আধুনিক রূপ দিয়েছেন। আমরা সবসময় ‘মেঘলা দুপুর’ বলি তো? তিনি বলেছেন, মেঘের দুপুর। সম্পূর্ণ নতুন ভাষার ব্যবহার। কবির পাঠক হিসেবে ভাবতেই গর্ববোধ করি।