Home আরোও বিভাগ সিনেমা সিনেমার সব্যসাচী

সিনেমার সব্যসাচী

SHARE
Ahmed-Zaman-Chowdhury

সৈকত সালাহউদ্দিন:
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্তে¡ স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেনিতে প্রথম, পরবর্তীতে শিক্ষক যিনি অধ্যাপনা ছেড়ে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে সুউচ্চে তুলে ধরেছিলেন তিনি আহমদ জামান চৌধুরী (জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯৪৭-মৃত্যু ৬ মার্চ ২০১৩)। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায়ও চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ষাটের দশকে কিংবদন্তি সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ সম্পাদিত সাপ্তাহিক চিত্রালীতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে ভারপ্রাপ্ত ও পরে পূর্ণাঙ্গ সম্পাদক হন। নিজের জনপ্রিয় কলাম বিষয় বিবেচনার জন্য তিনি আজাচৌ ডাকেও প্রসিদ্ধ হন। তাঁর যোগদানের পর চিত্রালী ও চলচ্চিত্র বিষয়ক সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ বলা হয়। লাহোরে চিত্রালীর উর্দু সংস্করণও বের হতো। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি(বাচসাস)-এর তিনবারের সভাপতি ছিলেন। একইসাথে তিনি ছিলেন আমাদের সিনেমার সফল কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গীত রচয়িতা। প্রযোজনাও করেছেন সিনেমার নানা অঙ্গনে সফল সব্যসাচী এই মানুষটি। এফডিসি আয়োজিত নতুন মুখের সন্ধানে-এর বিচারক ছিলেন।
সিনেমার অনেক বিখ্যাত মানুষ আরো বিখ্যাত হয়েছেন আহমদ জামান চৌধুরীর মাধ্যমে। নায়করাজ রাজ্জাক, মিষ্টি মেয়ে কবরী, বিউটি কুইন শাবানা, ট্যালেন্টেড ববিতা, ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা, গøামারগার্ল রোজিনা, মুভিমোগল একেএম জাহাঙ্গীর খানসহ অনেক উপাধি তাঁরই দেয়া। সোহেল রানা নামটিও দিয়েছেন তিনি।
নতুন প্রজন্ম জেনে চমকিত হবেন যে, তারা যে গানগুলো বা রিমিক্স শোনেন, রিয়েলিটি শোগুলো যে গানগুলো নিয়ে অনুষ্ঠান সাজায় পুরনো দিনের সেই অনেক জনপ্রিয় গানই লিখেছেন আহমদ জামান চৌধুরী। পাঁচ শতাধিক গানের মাঝে রয়েছে পীচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি, এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি, বিদায় দাওগো বন্ধু তোমরা, মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না, যেওনা সাথী, এই বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেওনা, ও দরিয়ার পানি, ওরে ও বাঁশীওয়ালা, বন্ধু ওগো কি করে ভাবলে, চুরি করেছো আমার মনটা হায়রে হায় মিস লংকা প্রভৃতি গান। তাঁর লেখা যাদু বিনে বাঁশী গানটির জন্য সেরা গায়িকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রুনা লায়লা।
আহমদ জামান চৌধুরীর নানা রকম স্পর্শে আমাদের সিনেমার কাহিনী, কাহিনী বিন্যাস, চিত্রনাট্য, সংলাপে পালাবদল ঘটে। নতুন নামে ডাকো, পীচঢালা পথ, নাচের পুতুল, এপার ওপার, নওজোয়ান, তুফান, মাস্তান, আগুন, পদ্মাবতী, অবুঝ মন, রাঙাভাবী, মেহেরনেগার, রাক্ষুসীসহ অনেক সুপারহিট ও নন্দিত সিনেমায় আছে তার ছোঁয়া। তাঁর কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীত রচনা এবং প্রযোজনায় বাঁদি থেকে বেগম ও যাদুর বাঁশী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের একাধিক শাখায় পুরস্কার লাভ করে। ববিতা বাঁদি থেকে বেগম-এর জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। আহমদ জামান চৌধুরী যাদুর বাঁশী সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এই ছবিতে পরিচালনার সুযোগ দেন আবদুল লতিফ বাচ্চুকে।
চিত্রালীতে আজাচৌ নামে কলাম বিষয় বিবেচনা দারুণ জনপ্রিয় ছিল নানা বিষয় সূ², ব্যঙ্গ, রসে পরিবেশনের জন্য। হাওয়া থেকে পাওয়া, কথায় কথায় ছিল অন্যান্য জনপ্রিয় বিভাগ। তাঁর হাত ধরে নাম করেছেন হীরেন দে, আবদুর রহমান, নরেশ ভুঁইয়া, ইয়াসিন বাবুলসহ একঝাক চলচ্চিত্র সাংবাদিক। সম্পাদক হয়ে চিত্রালীতে রঙিন পাঁচমিশালী, ঘরোয়া বিনোদন যুক্ত করেন এবং ২০ পৃষ্ঠায় উন্নীত করেন। তিনি এমন ব্র্যান্ড ছিলেন তাঁর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শুভেচ্ছা জানান শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকসহ চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। আশির দশকেই চিত্রালীতে টেলিভিশন-এর জন্য দুই পৃষ্ঠা বরাদ্দ করেন। খেলাকেও নিয়ে আসেন গøামার পাতায়। খেলোয়াড়দের নিয়ে চালু করেন ময়দানী হাওয়া। আপনাদের চিঠি পেলাম-এর কলেবর বৃদ্ধি করেন। নারীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়, হে নারী আপনার সমস্যা। চিত্রালী বন্ধ হয়ে যাবার পর দৈনিক মানবজমিন, যুগান্তরসহ কয়েকটি পত্রিকায় যোগ দেন। জীবনের শেষভাগে আবারো অধ্যাপনায় যোগ দেন, এবার সিনেমা ও মিডিয়া নিয়ে বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড ও পরে গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে। এক পীচঢালা পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বনানী কবরস্থানে শুয়ে আছেন সিনেমার সব্যসাচী মানুষটি।
আহমদ জামান চৌধুরী চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা ও চিত্রালীকে এমন উচ্চতায় নিয়েছেন যে, বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণালী ইতিহাস জানতে চিত্রালী উল্টালেই হয়। কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীত রচয়িতা, প্রযোজক হিসেবেও মেধার সোনা ফলিয়েছেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস, ফজলুল হক স্মৃতি পদকসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। তবে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার নিউ ওয়েভ এবং সিনেমায় সামগ্রিক অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকের দাবিদার তিনি। মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান করে হলেও রাষ্ট্র তাঁর অবদানকে সম্মান ও নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক, উপস্থাপক, গণমাধ্যম পরামর্শক ও সাংগঠনিক সম্পাদক,বাচসাস।