সালমান শাহ আয়নায় বন্ধুর মুখ

সালমান শাহ আয়নায় বন্ধুর মুখ

26
0
SHARE
salman2

শহীদুজ্জামান
কোনটাকে সত্য বলে ধরে নিব? ভদ্রমহিলা কি মানসিক ভাবে অসুস্থ? নাকি সম্পূর্ণ সুস্থ? বিবেকের তাড়নায় ২১ বছর পর কিছু সত্য কথা প্রকাশ করলেন। আগের দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তার ভিডিও বার্তা শুনে একবারও মনে হয়নি তিনি মানসিক ভাবে অসুস্থ। বরং মনে হয়েছে তিনি সুস্থ মস্তিষ্কে বিবেকের তাড়নায় চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ২১ বছর আড়াল করে রাখা কিছু সত্য প্রকাশ করছেন। ভদ্রমহিলার নাম রুবী। আমেরিকায় থাকেন। দেশ বরেণ্য চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র মৃত্যু ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অন্যতম আসামী। আজ থেকে ২১ বছর আগে সালমান শাহ’র রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দুটি পক্ষ শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। এক পক্ষের বক্তব্য ছিল সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। অন্যপক্ষ অর্থাৎ সালমানের বাবা-মার বক্তব্য ছিল সালমানকে হত্যা করা হয়েছে। এব্যাপারে তারা আদালতে মামলাও করেছিলেন সেই সময়। উল্লেখিত ভদ্রমহিলা রুবী সেই মামলার অন্যতম আসামি। অথচ তিনিই ২১ বছর পর রীতিমত একটা বোমা ফাটালেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজির হয়ে অনেকটা আত্মগøানি মোচনের ভঙ্গিতে দৃঢ়তার সঙ্গে বললেনÑ সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এবং এই হত্যাকাÐে জড়িত রয়েছে তারই স্বামী ও প্রয়াত সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা ও তার পরিবারের লোকজন।
সঙ্গত কারণেই রুবীর এই বক্তব্য সারাদেশে সিনেমা প্রেমী মানুষসহ সাধারণের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে নানান সংকটের কথা প্রায়শই আমরা কমবেশী বলে থাকি। নায়ক সংকটের কথাও মাঝে মাঝে উঠে আসে। এই সংকট অনেকটাই দূর করে দিয়েছিলেন প্রয়াত সালমান শাহ। অভিনয় গুণে তিনি দেশের চলচ্চিত্র প্রেমী মানুষের কাছে অনেক আদরনীয় হয়ে উঠেছিলেন। সালমান শাহ’র অভিনয় সৌকর্যে অনেকে নায়করাজ রাজ্জাকের ছায়াও খুঁজে পেয়েছিলেন। অনেক আশা, অনেক ভরসার সালমান শাহ যখন আমাদের চলচ্চিত্রে সম্ভাবনার আলো ফেলতে শুরু করলেন তখনই ঘটলো বিপর্যয়। প্রিয় নায়ক সালমান শাহ হঠাৎ মারা গেলেন। কেউ বলল আত্মহত্যা। আবার কেউ বললÑ এটি আত্মহত্যা নয়। সালমানকে হত্যা করা হয়েছে। বাদানুবাদ চলতেই থাকলো। প্রিয় নায়কের মৃত্যুর ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন ভক্ত আত্মহত্যাও করলেন। এর থেকেই বোঝা যায় সালমান তার অভিনয় গুণে ভক্তদের কতটা কাছের মানুষ হতে পেরেছিলেন।
হত্যা নাকি আত্মহত্যা? এই টানাপোড়েনের মাঝে কেটে গেছে ২১ বছর। সালমান শাহকে নিয়ে তার ভক্তদের ভালোবাসার ¯্রােত এতটুকু কমেনি। বরং ভালোবাসার ¯্রােত দিনে দিনে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। গঠিত হয়েছে সালমান শাহ ফ্যানক্লাব। প্রিয় নায়কের জন্য আকুলতা বেড়ে চলছিল। ঠিক এমনই সময়ে হঠাৎ করে সালমান শাহ মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আদালতে দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি রুবী প্রবাস থেsalman3কে ভিডিও বার্তায় জানিয়ে দিলেনÑ সালমান শাহ মরে নাই। তাকে হত্যা করা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই সারাদেশ ফুসে উঠলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশের প্রচার মাধ্যম, সালমান শাহ’র পরিবার, ভক্তরা ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সরব হলেন। একটাই দাবি সালমান শাহ হত্যায় জড়িতদের ফাঁসি চাই!
কিন্তু প্রিয় নায়ক সালমান শাহকে কি সত্যি সত্যি খুন করা হয়েছে? নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন? বিষয়টি নিয়ে আবারও ধূ¤্রজাল ছড়ালেন প্রবাসী সেই মহিলা রুবি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবার তিনি একটি ভিডিও বার্তা দিলেন। আগের দিনের ভিডিও বার্তার সঙ্গে এই ভিডিও বার্তায় কোনো মিল নাই। আগের দিন ভদ্রমহিলা ভয়ার্ত চোখে-মুখে, অনুশোচনা প্রকাশের ভঙ্গিতে সালমান শাহ’র প্রতি মায়া জড়ানো কিছু শব্দ উচ্চারণ করে সালমানের মায়ের উদ্দেশে বলছিলেনÑ ভাবী সালমান, আমাদের ইমন মরে নাই। ভাবী ইমনকে হত্যা করা হয়েছে। আমার স্বামী আমার ভাইকে দিয়ে এটা করিয়েছে। আমার ভাইকেও ওরা মেরে ফেলেছে। এই হত্যাকাÐে সামিরা ও তার পরিবারও জড়িত। ভাবী প্লিজ আপনি কিছু একটা করেন… প্লিজ ভাবী…
পরের দিনের ভিডিও বার্তায় রুবী নামের এই ভদ্রমহিলাকে দেখা গেল অন্য সুরে কথা বলছেন। নিজেকে মানসিক রোগী বলে দাবি করে বললেনÑ আমি আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলে দেখলাম গতকাল যা বলেছি তার কিছুই ঠিক নয়। সালমান আত্মহত্যাও করতে পারে আবার তাকে হত্যাও করা হতে পারে। আমি এব্যাপারে সিওর না। ভিডিও বার্তায় হয়তো কাউকে উদ্দেশ্য করে রসিকতা করার ভঙ্গিতে বললেন আমার শরীর ভালো না। আমার ছেলে বলেছে মা তুমি হাসপাতালে ভর্তি হও। আমি সুস্থ নই। কি তোমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না? বিশ্বাস না করলে নাই। আমার কাছে হাসপাতালের কাগজপত্র আছে। তোমরা আমার কিছুই করতে পারবে না। তোমরা আমাকে পাবে কি ভাবে? আমি কিন্তু আমেরিকান সিটিজেন…
মজার ব্যাপার হলো ‘রেন্ট সিলেট’ নামের একটি ভিডিও টিভি চ্যানেলে রুবী নামের এই ভদ্র মহিলার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রচার হয়েছে। এই অডিও সাক্ষাৎকারে দীর্ঘক্ষণ তিনি সহজ স্বাভাবিক ও সাবলীল ভঙ্গিতে সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে এই কথাটিই জোর দিয়েছেন। প্রায় ৩০ মিনিটের এই অডিও সাক্ষাৎকারে তার কণ্ঠ শুনে একবারও মনে হয়নি তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ!
রুবীর আগের দিনের ভিডিও বার্তা ও পরের দিনের ভিডিও বার্তার মধ্যে গরমিল থাকায় অনেকে ধারণা করছেন রুবী আগের দিন হয়তো সত্য কথাই বলতে চেয়েছেন। কিন্তু তার ভিডিও বার্তা ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে নিশ্চয়ই কারও চাপে পড়ে সুর পাল্টেছেন!
কিন্তু আমরা মনে করি সুরটি আসলে কি তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনা তো প্রায় চাপা পড়েই গিয়েছিল। বলা যায় সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরী এককভাবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে আসছিলেন। হঠাৎ প্রবাসী রুবীর বক্তব্য ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে নতুন মোড় নিয়েছে। একটি বিষয় বোধকরি পরিষ্কার হওয়া দরকার। রুবী হঠাৎ ভিডিও বার্তা দিলেন কেন? তার আগের দিনের কথার সঙ্গে পরের দিনের কথার এত গরমিল কেন? রুবী কি কারও চাপের কারণে সুর পাল্টেছেন? তারা কারা?
মজার ব্যাপার হলো সালমান শাহকে ঘিরে তার পরিবার অর্থাৎ বাবা-মায়ের পক্ষ আর সাবেক স্ত্রী সামিরার পক্ষের লোকজন পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েই চলেছেন। সালমানের শ্বশুর বলেছেন মৃত্যুর আগে সালমান শাহ নানা কারণে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার ছবির বাজার পড়ে যাচ্ছিল। সালমানের সংসার খরচের টাকা নাকি তিনিই যোগান দিতেন।
সালমানের ছোটভাই সালমানের শ্বশুরের এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন তার এই বক্তব্য সঠিক নয়। সালমান তার স্বল্প সময়ের চলচ্চিত্র জীবনে ৩৭টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তখনকার দিনে তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া চিত্র নায়ক। কাজেই তার অর্থনৈতিক কোনো সংকট থাকার কথা নয়। বরং সালমান শাহর অর্থ লোপাট করেছে তার সাবেক স্ত্রীর পক্ষের লোকজন।
২১ বছর আগের ঘটনা। অনেকে বলছেন নির্ভরযোগ্য অনেক আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। তবুও আমরা মনে করি সত্যের মৃত্যু নাই। আজ না হোক কাল সত্য প্রকাশ হবেই। আমরা মনে করি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে Salman-Shah-Sabnurসালমান শাহ’র সাবেক স্ত্রী সামিরা ও প্রবাসী রুবীকে প্রকাশ্যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো দরকার। সামিরা ও একজন অভিনেতাকে ঘিরে সেই সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু আপত্তিকর রিপোর্ট ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় সামিরাকে ঘিরেও নানান প্রশ্নের ডালপালা উঁকি দিচ্ছে। সেই সময় নগরীর একটি হোটেলের এক অনুষ্ঠানে সালমানের উপস্থিতিতে একজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী সামিরার গালে চুমু খেয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক ভাবে সালমান শাহ বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি বলে ঐ ব্যবসায়ীর গালে চড় মেরেছিলেন। সালমান শাহ মৃত্যুর ঘটনায় এর কোনো প্রভাব আছে কি না তাও তলিয়ে দেখা যেতে পারে।
মোটকথা, প্রিয় নায়ক সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। প্রবাসী রুবী নামের সেই মহিলা বোধকরি ঘটনা তদন্তের একটা নতুন পথ খুলে দিয়েছেন। হঠাৎ তিনি কেন বললেন সালমান আত্মহত্যা করে নাই। তাকে খুন করা হয়েছে। আবার হঠাৎই তিনি কেন বললেন সালমান আত্মহত্যাও করতে পারে আবার তাকে হত্যাও করা হতে পারে। আমি এব্যাপারে সিওর না। একই ব্যক্তির বিপরীত মুখি বক্তব্যের কারণ কি? এটাও কি কোনো রহস্য? কে এই রহস্যের রূপকার? তাকে খুঁজে বের করতে পারলেই বোধকরি প্রিয় নায়ক সালমানের মৃত্যুর রহস্যও প্রকাশ পাবে। সালমান শাহর জন্য আজও কাঁদে তার ভক্তরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কান্নার সুর সত্যি অনেক কষ্টের। ভক্তদের মধ্যে অনেকে সালমান শাহকে নিয়ে নতুন করে গান লিখেছেন। গেয়েছেন। অনেকে নাটক বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছেন। সবার দাবি সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
একটা ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। ওর নাম রোদেলা। সালমান শাহকে সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি তার। দেখবে কি করে তখন তো তার জন্মই হয়নি। রোদেলার বয়স তখন ১৭ বছর। টিভিতে সালমান শাহ অভিনীত বেশ কয়েকটি ছবি দেখেছে। গুণী অভিনেত্রী মৌসুমীর সঙ্গে কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবিতে সালমান শাহ’র অভিনয় দেখে সে মুগ্ধ। ছবির নানান দৃশ্যের কথা বলতে বলতে হঠাৎ সে কেঁদে ফেললÑ আমাদের এত সুন্দর একজন নায়ক ছিলেন। তার মৃত্যু হলো। কেউ বলছেন তিনি আত্মহত্যা করেছেন। যদি আত্মহত্যা করেই থাকেন নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ ছিল। কেউ তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে। তার তো বিচার হওয়া প্রয়োজন। আর যদি সালমান শাহকে হত্যা করা হয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও তো ব্যবস্থা নেয়া দরকার। হত্যাকারীদের কঠিন শাস্তি চাই। বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠলো মেয়েটি।
প্রিয় পাঠক, এই কান্নার কি কোনো অর্থ আছে? যদি থেকে থাকে তাহলে আসুন সালমান শাহ’র মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তৎপর হই।