Home প্রতিবেদন শাহ সিমেন্ট সুইট হোম সাব্বির আহমেদের স্থাপত্য ভূবন

সাব্বির আহমেদের স্থাপত্য ভূবন

SHARE
Sabbir-Ahmed

আধুনিক স্থাপত্য শৈলীর সমন্বয়ে স্থাপত্য শিল্পে কাজ করে চলেছেন সাব্বির আহমেদ রাজু। ২০০৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিষয়ে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৮ সালে তিন বন্ধু মিলে গড়ে তোলেন ‘জিইওমেট্রিক্স আর্কিটেক্টস’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইতোমধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার ডিজাইন করেছে। স্থাপত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতা করছেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগে। সম্প্রতি সাব্বির আহমেদ বার্জার অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স ২০১৭ এর আরবান ডিজাইন ল্যান্ডস্কেপ এবং রেনোভেশন, ক্যাটাগরিতে ‘শতাব্দি’ প্রজেক্টের জন্য নোটেবল ম্যানসন অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এর আগে তিনি আইইবি কনভেনশন সেন্টার প্রতিযোগিতায় কমেন্ডেশান অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এবার শাহ্ সিমেন্ট সুইট হোমে তাকে নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন মোহাম্মদ তারেক।

আমি সব সময় খুব সহজ ফর্ম এবং ক্লিন স্পেস ডিজাইন করার চেষ্টা করে থাকি। কমপ্লিকেডেট ডিজাইন এড়িয়ে চলি। এতে করে বিল্ডিং স্ট্রাকচার সহজ হয় এবং একটা সিস্টেমে ডিজাইন করা যায়। কিছুটা গ্রীণ স্পেস রাখার চেষ্টা করি। মেটারিয়ালের সত্যতা এবং ন্যাচারাল লুক আনার চেষ্টা করি। রুফ লাইট এবং ন্যাচারাল লাইট নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে। সেকশন এ স্পেস ইন্টারকানেকটেড করার চেষ্টা করি, যাতে করে স্পেসগুলো আরো আকর্ষনীয় ভাবে কাজ করে। এতে করে ফ্লোর টু ফ্লোর যোগাযোগ থাকে। বাংলাদেশের আলো-বাতাস যাতে করে বিল্ডিংয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে সেদিকে খেয়াল রাখি। কথাগুলো বললেন, স্থপতি সাব্বির আহমেদ রাজু। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা মেলায়। কিন্তু তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। সাব্বিরের বাবার নাম ফরহাদ হোসেন। তিনি একজন ব্যবসায়ী। মা নিলুফা আক্তার গৃহিণী।

ছোটবেলা থেকেই কাটুর্ন আঁকাআঁকির প্রতি ছিল তার ভীষণ নেশা। গান গাওয়া পছন্দের বিষয়ের একটি। ভালো গিটার বাজাতে পারেন। টিভি পর্দায় আর্কিটেক্টদের দেখে পরবর্তীতে আর্কিটেক্ট হওয়ার অনুপ্রেরণা ব্যাচেলর পান। নিজের ইচ্ছা থেকে আর্কিটেক্ট হওয়া তার। মতিঝিল সরকারি বয়েজ হাইস্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালে রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে। স্থপতি সাব্বির আহমেদ ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন ২০০৭ সালে। পাস করে বের হওয়ার পরপরই তিনি যোগ দেন তানিয়া করিম এনআর খান এন্ড এসোসিয়েটস-এ। সেখানে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাত বছর কাজ করেন। স্থাপত্য চর্চার পাশাপাশি সাব্বির আহমেদ টিচিং অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে শিক্ষকতা করতেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগে। এরপর ২০১২ সালে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখনো পর্যন্ত শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন তিনি। ২০০৮ সালে তিন বন্ধু মিলে গড়ে তোলেন ‘জিইওমেট্রিক্স আর্কিটেক্টস’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। দুই বন্ধু বিদেশে চলে যাওয়ার পর বর্তমানে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপ্যাল আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পার্টনার দায়িত্ব পালন করছেন স্ত্রী স্থপতি সানিয়া আক্তার এবং ছোট ভাই স্থপতি নাফিউর রহমান। লালমাটিয়ায় খুব সুন্দর একটি অফিস সাজিয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি কমার্শিয়াল টাওয়ার, ইউনিভার্সিটি, স্কুল, ডুপলেক্স বিল্ডিং, মসজিদসহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন।

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে মালিবাগের ‘শতাব্দি প্রজেক্ট’, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ভবন, আল আরাফাহ স্কুল, মতিঝিলের আনোয়ার ল্যান্ডমার্ক মিক্সড ইউসড বিল্ডিং, ধানমন্ডির সিক্স স্টোরিড কমার্শিয়াল বিল্ডিং-এর রেনোভেশন, পাকশি মসজিদ, কালিয়াকৈর এর সিকদার ডুপলেক্স রেসিডেন্স বিল্ডিং, গাজীপুরের মি: মোশারফের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, বনানীর ডোরস শোরুমের ইন্টেরিয়র, উত্তরায় চায়নার জ্যাক সুইং মেশিন কোম্পানির ব্র্যাঞ্চ অফিসের ইন্টেরিয়র, যমুনা ফিউচার পার্কের সানাই শো রুমের ইন্টেরিয়র, সোসাল ইসলামী ব্যাংক ব্র্যাঞ্চের ইন্টেরিয়র, ইবিএল ব্যাংক বুক অফিস এবং ব্র্যাঞ্চের ইন্টেরিয়র, পূর্বাণী গ্রæপ অফিসের ইন্টেরিয়র এবং রেনোভেশন, গুলশান, বনানীর বেশ কিছু রেসিডেন্স বিল্ডিংয়ের ইন্টেরিয়রসহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। ২০০৬ সালে সাব্বির ভারতের আহমেদাবাদে স্থপতি বি-ভি-দোশীর ‘ঠঅঅঝঞট ঝঐওখচঙ’ কনসালটেন্ট এবং ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি আনিকেত ভাগোওয়াত-এর প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিছুদিন আগে স্থপতি সাব্বির আহমেদ বার্জার অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স ২০১৭ তে আরবান ডিজাইন, ল্যান্ডস্কেপ এন্ড রেনোভেশন ক্যাটাগরিতে শতাব্দি প্রজেক্টের জন্য নোটেবল ম্যানসন অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। যার নকশা প্রণয়নের পেছনে রয়েছে তার সুদূর প্রসারি চিন্তা ভাবনা।

Sabbir-Ahmed-proস্থপতি সাব্বির বলেন, শতাব্দি প্রজেক্টটি মালিবাগের প্রথম লেনের গণবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। যেখানে ছোট ছোট বিজনেস এবং সেলাই কারখানা গড়ে উঠেছে। পাঞ্জাবি বাঙালি কালচারের একটি অন্যতম পোশাক। যাকে ঘিরে অনেক ব্র্যান্ড শপ গড়ে উঠেছে। শতাব্দি তেমনি একটি ব্র্যান্ড নাম যারা মালিবাগে তাদের পাঞ্জাবি প্রডাকশন হাউজটি তৈরি করছে। তাদের আগের প্রডাকশন কারখানাটি এখানেই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। পর্যাপ্ত আলো বাতাস ছিল না। তার সঙ্গে প্রয়োজন ছিল একটু বেশি স্পেস। এসবের কারণে আগের বিল্ডিংটা ভেঙে নতুন একটি বিল্ডিং করার উদ্যোগ নেন কেবিআল আজাদ। আর্কিটেক্ট হিসেবে প্রজেক্টের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়। এখানকার মাইক্রোক্লাইমেট সম্পর্কে আমার খুব ভালো ধারণা ছিল। সে জন্য ক্লায়েন্টের রিকুয়ারমেন্ট থেকে শুরু করে একটি বিল্ডিংয়ের ক্লাইমেটিক প্রয়োজনগুলোও ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো বিল্ডিংটাই একটি রেসিডেন্টসিয়াল এরিয়ার মধ্যে গড়ে উঠেছে। আবাসিক এলাকায় একটি প্রডাকশন হাউজ হলে সেখানে অনেক লোকজনের যাতায়াত চলবে। আবাসিক লোকজন যাতে কোনো বিব্রতকর অবস্থায় না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রেখে ডিজাইন করা হয়েছে। এমন কি বিল্ডিংয়ের ক্যারেক্টারিস্টিকও এমন রাখা হয়েছে যাতে করে বিল্ডিংটিকে দেখে এলিয়েন মনে না হয়।

এমন ভাবে স্পেস ডিজাইন করা হয়েছে যাতে করে পরবর্তীতে প্রডাকশন হাউজ বন্ধ হয়ে গেলে এটি একটি আবাসিক ভবন হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।

বিল্ডিংয়ের থ্রি লেয়ারে সাইটে গার্ডেন রাখার চেষ্টা হয়েছে যাতে করে আশে পাশের বিল্ডিংগুলো থেকে এই বিল্ডিংয়ের গ্রীণ স্পেসগুলো উপভোগ করা যায়। বিল্ডিংয়ের সার্ভিসগুলো এমনভাবে একদিকে সাজানো হয়েছে যাতে করে সার্ভিস লাইন একপাশেই শেষ হয়ে যায়। এবং বাকি অংশটি কাজ করার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। করিডোরের শেষপ্রান্তে অন্ধকার না হওয়ার জন্য সিঁড়ি ঘরের ল্যান্ডিং থেকে একটি অংশ কেটে ন্যাচারাল লাইট নেয়া হয়। দুই ফ্লোরের মধ্যে কানেক্ট করার জন্য দ্বিতীয় তলার ফ্লোরের দুপাশে দুটি অংশ কেটে দেয়া হয়। এতে করে একটি ফ্লোর থেকে আরেকটি ফ্লোরে কথাবার্তা চালানো যায়। বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি এবং রুফের জন্য মেটাল ফ্রেম ওয়ার্ক করা হয়। এতে করে তাড়াতাড়ি কন্সট্রাকশনও সম্ভব হয়েছে। শুধুমাত্র চার মাসে কন্সট্রাকশন শেষ হওয়ার কারণে ওভারডে কষ্ট কমে আসে। বিল্ডিংটির লোড, বিয়ারিং, এক্সপোসডব্রিক স্টাকচারে করা হয়। এতে করে অনেক ন্যাচারাল লুক আসে। এবং খরচও কমে আসে। এই বিল্ডিংয়ের ন্যাচারাল লাইট বেশি রাখা হয় যাতে করে আর্টিফিশয়াল লাইটির ওপর প্রেশার কম পড়ে। এবং বিদ্যুৎ খরচ বাঁচে। এমন কি সাইটে একটি পুরনো গাছকে বাঁচিয়ে রাখা হয়।

এটি শুধু একটি বিল্ডিংই নয়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে এবং এটি বাংলাদেশের কালচার এ অন্যতম অবদান রেখেছে। আবহাওয়া উপযোগী বিল্ডিং হওয়াতে কর্মচারীরা স্বস্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং ভালো প্রডাকশনও হচ্ছে। বিল্ডিংটির কারণে কম্পাউন্ড সিকিউরিটি বেড়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ইন্টারেকশন হয়েছে বলে মানুষের ব্যবধানও কমে যাচ্ছে। এটি এখন শুধু একটি প্রডাকশন হাউজও একটি ভালো আর্কিটেকচারই নয়, এটি বর্তমানে সমাজের দায়িত্বপূর্ণ বিল্ডিং।

জলবায়ু, প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি কাজে নজর দেন স্থপতি সাব্বির আহমেদ। এই স্থপতি তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে ভালোবাসেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্থপতি সাব্বির বলেন, আর্কিটেকচারাল প্র্যাকটিসে আরো সময় দেয়ার ইচ্ছা আছে আমার। এর সঙ্গে বলতে হয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র একটি দেশ, যার ল্যান্ড ভেলু অনেক বেশি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চেষ্টা করে ভালো কিছু ইৎবধঃযরহম স্পেস এবং আবহাওয়া উপযোগী ডিজাইন করাই আমার উদ্দেশ্য।