সবার আগে প্রয়োজন পরিবারে নারীর মর্যাদা-শাহীন আনাম

সবার আগে প্রয়োজন পরিবারে নারীর মর্যাদা-শাহীন আনাম

931
SHARE

নারীকে পুরুষের পাশাপাশি মূল চালিকা শক্তি হিসেবে যোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে আরেকজন বিশিষ্ট নারী অক্লানত্ম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ২০০২ সাল থেকে আজ অবধি তিনি নারীর উন্নয়ন, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, শিশু শ্রম প্রতিরোধসহ নানান সামাজিক আন্দোলন করে যাচ্ছেন তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের’ মাধ্যমে। তিনি শুধু আমাদের দেশে নয় বহির্বিশ্বের নারী অধিকার আদায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন বহুবার। তিনি শাহীন আনাম। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। সম্প্রতি ফাগুনের এক সকালে গুলশানে তাঁর অফিসে কথা হয় আনন্দ আলোর। কথার বেশির ভাগ অংশ জুড়েই ছিল নারী অধিকার, ৮ মার্চ নারী দিবস আর নারীর মর্যাদার বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয়। লিখেছেন জাকীর হাসান

আনন্দ আলো: নারীদের নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা কিভাবে পেলেন?

শাহীন আনাম: বাংলাদেশের উন্নয়ন, দেশপ্রেম ও আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এবং এদেশের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে যদি কেউ কাজ করতে চায় তাদের প্রথমেই উচিত নারীদের নিয়ে কাজ করা। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। দেশের বৃহত্তর এই নারীগোষ্ঠী সামাজিক নানান প্রতিকূলতায় পিছিয়ে আছে। কারণ নারীর প্রতি বৈষম্য রয়েছে। নারীর প্রতি নির্যাতন রয়েছে। এসব যদি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকে তাহলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রসত্ম হবেই। তাই আমরা চেষ্টা করছি সমষ্টিগতভাবে নারীর উন্নয়নে কাজ করতে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নারীদের নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি আমার মায়ের কাছ থেকে। আমার বাবার মৃত্যুর পর আমাদের চার ভাই-বোনকে তিনি যেভাবে আগলে রেখে মানুষ করেছেন ঐ সময় সেটা ভাবা যায় না। পড়াশোনা শেষ করার পর সাহসের সঙ্গে কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে, কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সেটাও আমার মার কাছ থেকে শিখেছি। বলতে পারেন নারীদের নিয়ে কাজ করার সকল অনুপ্রেরণা আমার মা।

আনন্দ আলো: আপনার দৃষ্টিতে ঘরে বাইরে বাংলাদেশের নারীদের বর্তমান অবস্থা এখন কেমন?

শাহীন আনাম: এটাতো বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলাদেশের নারীরা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেছে। এমন সব চ্যালেঞ্জিং জায়গায় নারীরা এখন কাজ করছে ১০ বছর আগেও যেটা চিনত্মা করা যায়নি। এদেশের নারীরা এখন প্লেন চালাচ্ছে, এভারেস্ট বিজয় করেছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টস-এ প্রায় ৩০ লাখ নারী কাজ করছে। তাদের দু’হাতের রোজগারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আসে। শুধু তাই নয় নারীরা যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে সেখানেই কাজ করছে। এই অধিকার তাঁরা অনেক কষ্টে অর্জন করেছে কেউ তাঁদের দয়া করে দেয়নি। তবে এখনো ঘরে বা বাইরে নানান প্রতিকূলতায় নারী তার প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

নারীর লেখাপড়া শেখাটা একটা বড় সমস্যা। অনেক পরিবার রয়েছে তারা নারীর লেখাপড়ায় তেমন উৎসাহী নয়। এসএসসি বা এইচএসসি পাস করার পর তাকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। নারী এতে প্রতিবাদ করতে পারে না। সেই বিয়েও নারী নিজের ইচ্ছামতো করতে পারে না। তাকে পরিবারের পছন্দে বিয়ে করতে হয়। বিবাহিত জীবনেও আছে আরো নানান প্রতিকূলতা। স্বামীর সংসারেও নারী নিজের কোনো সিদ্ধানত্ম নিতে পারে না। পরের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় তাকে। সে কী বাসা-বাড়ি ঘর সংসার সামলাবে না চাকরি করবে সেই সিদ্ধানত্ম স্বামী বা শ্বশুর-শাশুড়ি নেয়। চাকরি করার অনুমতি থাকলেও কী ধরনের চাকরি করবে সেখানেও তার সিদ্ধানত্ম নেয়ার ক্ষমতা নেই। তবে সাম্প্রতিককালে নারীরা নিজের চেষ্টায় খোলস ছেড়ে বাইরে বেরুতে চেষ্টা করছে তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি দেশের খুবই নামকরা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে এবার ভাইস চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল পেয়েছে যে ক’জন শিক্ষার্থী তাদের প্রত্যেকেই নারী। এই প্রতিষ্ঠানে তো শুধু মেয়েরা পড়ে না এখানে ছেলেরাও পড়ে। মেয়েরা সত্যিকার অর্থে সুযোগ পেলে ভালো করতে পারে তার চিত্র এটি।

আনন্দ আলো: ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। এই দিবস সম্পর্কে আপনার অনুভূতি জানতে চাই?

Shahin-Anam-1শাহীন আনাম: ৮ মার্চ শুধু আমাদের দেশে নয় আনত্মর্জাতিকভাবে নারীদের জন্য একটি উৎসব পালন করা হয়। এই দিনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন কারণ তিনি এই দিবসটিকে অত্যনত্ম গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আমরাও যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি উদযাপন করি। অনেকেই বলে থাকেন এই দিবস উদযাপন করে কী লাভ। আমি মনে করি অবশ্যই লাভ আছে। এদিনে নারী মনে করে এই দিবসটি একানত্মই তার নিজের। শহর থেকে তৃণমূল পর্যনত্ম সবাই এখন নারী দিবস সম্পর্কে সচেতন। প্রত্যনত্ম গ্রামের নারীরা যারা সবচেয়ে অবহেলিত তারা এই দিন সম্পর্কে জানার পর অবাক হয়ে বলে একটি দিন শুধু আমার জন্য? সেদিন নারীরা নিজেকে ক্ষমতায়ন মনে করে। মনে করে আজকে শুধু আমাকে নিয়ে চিনত্মা ভাবনা করার দিন।

আনন্দ আলো: বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। সে ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় অসুবিধা কী কী?

শাহীন আনাম: বাংলাদেশের নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ঘরে বাইরে নারীর উপর সহিংসতা। এই সহিংসতা এখন নানা রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই মাধ্যমে নারীর পর্ণ ছবি ভিডিও এবং নানান উক্তির মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এই ব্যাপারে এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে তা ভয়াবহ রূপ নিবে। এ বিষয়ে কার্যকরী আইনও দরকার। শুধু তাই নয় যেহেতু সমবয়সী ছেলেদের মাধ্যমে এই সহিংসতা হয় তাই ছেলেদের এ ব্যাপারে সচেতন করা আগে জরুরি। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে ধরনের অসুবিধাগুলো রয়েছে সেগুলো হলো রীতি রেওয়াজ, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা, অপসংস্কৃতিসহ নানান কারণেই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রসত্ম হচ্ছে। যেমন আগে হিন্দু ধর্মের নারীদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হতো না। কিছুদিন আগে এ ব্যাপারে আন্দোলন করে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার ব্যবস্থা করেছি আমরা। এখনও তাদের পরিবারে অনেক বাধা-বিপত্তি ও অধিকার আদায়ে নানান বিপত্তি রয়েছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হিন্দু নারীদের বাবার বাড়ির সম্পত্তির উপর অধিকার নেই, ডিভোর্স দেয়ার অধিকার নেই। এসবের কারণে ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না। ফলে তারা নির্যাতিত হচ্ছে।

গ্রামে গঞ্জেতো নারীদের এখনো প্রতি মুহূর্তে নানান নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এবং শহরের শিক্ষিত নারীদের অনেকেই আমাদের দেশে অনেক অবদান রেখে চলেছেন। তাদের সেই অবদান মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এ নিয়ে তেমন প্রচারও নেই। এ ব্যাপারে যথেষ্ট কাজ এখনো বাকী আছে। আমার মতে নারীর অবদানটা সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া দরকার যে একজন শিক্ষিত নারী এদেশের উন্নয়নে কী কী অবদান রাখছে। নারীর অবদান মূল্যায়ন করার জন্য মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ১২০টি সহযোগী সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা শুধু কয়েকটি সংগঠন মিলে এ কাজ করলে হবে না। যারা নারীর উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন, যারা সচেতন মানুষ দেশকে ভালোবাসেন তাদেরও এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তাই নয় নারীর কাজকে স্বীকৃতি দিতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন পরিবারে নারীর কাজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং পরিবারে বা সংসারে যদি নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় তবেই আমাদের নারীদের উপর সহিংসতা কমবে। নারী নায্য অধিকার আদায়ে এগিয়ে যাবে।

আনন্দ আলো: নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করে ঘরে ও বাইরে। যা দেশের জিডিপিতে যোগ হয় না আপনাদের সমীক্ষা বলেছেন। এটা কেন হচ্ছে?

শাহীন আনাম: নারীরা যে কাজ করে সেটা সব সময় অদৃশ্য থেকে যায়। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেছেন সংসারের ২২টি কাজের মধ্যে নারী ১৭টি কাজ করে বাকী ৫টি করে পুরুষ। যেমন গ্রামের কৃষকের স্ত্রীরা সারা মাস খেটে কৃষিপণ্য উৎপন্ন করে। কিন্তু সেই নারী পণ্য বাজারে নিয়ে যাচ্ছে না। বাজারে নিয়ে যাচ্ছে তার কৃষক স্বামী। বাজারে পণ্য বিক্রি করে টাকাটাও নারীকে অর্ধেক দেয়া হচ্ছে না। বলাও হচ্ছে না তোমার চাষ করা পণ্য বাজারে বিক্রি করে এই টাকা পাওয়া গেছে। পরিবারেই নারী তার স্বীকৃতি পাচ্ছে না জিডিপিতে যোগ হওয়া পরের বিষয়। তবে জিডিপিতে অনত্মর্ভুক্ত হওয়ার একটি পন্থা হলো সিস্টেম অব ন্যাশনাল একাউন্ট। এটা নির্ধারণ করা হয় আনত্মর্জাতিক লেভেলে। যদি জিডিপিতে নারীদের কাজ অনত্মর্ভুক্ত করতে হয় তাহলে ঐ লেভেলে কিছুটা সংশোধন প্রয়োজন। সেটা করা বেশ কঠিন।

আনন্দ আলো: বর্তমানে তো নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন এসেছে?

শাহীন আনাম: হ্যাঁ আজকাল নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এখন বাবা মা শুধু তার ছেলেকেই নয় স্কুলে লেখাপড়া করাতে চায় তার মেয়েকেও। অনেকে স্বপ্নও দেখেন মেয়ে লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে বড় কিছু একটা হবে। কিন্তু বাসত্মব তো অনেক কঠিন শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না। অনেক বাবা-মা মেয়েকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠাতে পারছে না। দেশে ভালো চাকরি যোগাড় করা দুরূহ। অগত্য চিনত্মা করতে হয় বিয়ের। গ্রামের অনেক নারী আমাকে বলেন, আপা মেয়েকে এসএসসি পাস করিয়েছি বলুন এখন কী করবো। আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না। ওই নারী তাঁর মেয়ের নিরাপত্তা চায়, পড়াশোনার সুযোগ চায়। পড়াশোনার পর ভালো চাকরি চায়। আমরা তো এসব চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় এগুলোই হলো মূল বাঁধা।

আনন্দ আলো: নারীরা নিগৃহীত হয় বেশি কোন কোন পরিবারে?

শাহীন আনাম: ছোটবেলা যদি পরিবার থেকে নারীর প্রতি পুরুষের, পুরুষের প্রতি নারীর সম্মানের বিষয় বুঝানো হয় এবং কার প্রতি কী ধরনের আচরণ করতে হবে সেটা যদি আগে থেকে বুঝিয়ে দেয়া হয় তাহলে দেশের সমাজ ব্যবস্থাটা অন্যরকম হতো। নারীরা কম-বেশি সব ধরনের পরিবারে অসম্মানজনক আচরনের শিকার হয়। বেশি হয় দরিদ্র পরিবারে। তবে শিক্ষিত সচেতন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে এই সংখ্যা কম।

আনন্দ আলো: আপনার পরিবারের কথা বলুন?

শাহীন আনাম: আমার দুই সনত্মান। দু’জনই মেয়ে। বড় মেয়ে তাহমিমা একজন লেখক। বৃটেনে বসবাস করে। ছোট মেয়ে প্রীতি বিদেশ থেকে লেখাপড়া করেছে। সে দেশেই থাকবে এবং এখানে তার ক্যারিয়ার গড়বে। তরুণদের নিয়ে কাজ করতে সে পছন্দ করে। আমার স্বামী মাহফুজ আনাম ডেইলী স্টারের সম্পাদক। আমার সকল কাজে সব সময় তিনি সহযোগিতা করেন। তিনি নারীর অধিকার সম্পর্কে অত্যনত্ম সচেতন। নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীর অধিকার, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এ সবের বড় একজন এডভোকেট।