সকালের আলো ছড়ানো গল্প

সকালের আলো ছড়ানো গল্প

955
SHARE
নতুন একটি দিন। নতুন সকাল। নতুন কোনো স্বপ্ন নিয়ে আবার ছুটে চলা। তাই দিনের শুরুটা হওয়া চাই একেবারেই অন্যরকম। ঠিক যেমনিভাবে প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের একেকটি অনুষ্ঠান দর্শকদের সামনে হাজির হয়ে থাকে নতুন কোনো ভালোলাগা, ভালোবাসা কিংবা নতুন স্বপ্ন নিয়ে। সকালের স্নিগ্ধতায় দর্শকদের সামনে অনুষ্ঠানগুলোর আবেদনই থাকে অন্যরকম। গান, আলাপচারিতা কিংবা ভিন্নধর্মী টক শো দিয়ে সাজানো থাকে সকালের এসব অনুষ্ঠান। যারা অনুষ্ঠান গুলো উপস্থাপনা কুরেন তাদের হাসিমাখা মুখ সকালের আলো ছড়ায়। তাদেরই কয়েকজনকে নিয়ে আনন্দ আলোয় এক আড্ডা বসেছিল সেদিন। আড্ডায় এসেছিলেন চ্যানেল আইতে ‘গানে গানে সকাল শুরু’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক দিলরুবা সাথী, এটিএন বাংলার ‘চায়ের চুমুক’ অনুষ্ঠানের ইমতু রাতিশ ও সুমাইয়া সিদ্দিকা ফাইজা খান, মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘রাঙা সকাল’-এর রুবাইয়াৎ অস্মিতা অদিতি এবং বৈশাখী টেলিভিশনের ‘আলাপ’ অনুষ্ঠানের পারিহা লিমা। অন্য রকম এক আড্ডার গল্প লিখেছেন সৈয়দ ইকবাল।

আড্ডায় স্মৃতির ডালপালা মেলে ধরেন চ্যানেল আই-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান গানে গানে সকাল শুরুর উপস্থাপক দিলরুবা সাথী। প্রতিদিন সকালে নতুন করে নিজেকে উপস্থাপন করার বিষয়ে কথা বলেন তিনি। ‘প্রতিদিন সকালের অনুষ্ঠানের প্রসত্মুতিটা শুরু হয় আগের দিনের রাত থেকেই। প্রতিদিনকার অতিথির নাম জানার পর তার সম্পর্কে একটু স্ট্যাডি করতে হয়। বিশেষ দিবস হলে তার জন্য আলাদা প্রসত্মুতি নিতে হয়। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির মতো দিনগুলোতে নিজেকে উপস্থাপনের বিষয়টার দিকে নজর রাখতে হয়। শুধু তাই নয়- অতিথি বুঝেও পোশাক পরতে হয়।’
সাথীর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে রাঙা সকাল (মাছরাঙা টেলিভিশন) অনুষ্ঠানের উপস্থাপক অদিতি বলেন, ‘প্রতিদিন অনুষ্ঠানে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জও থাকে। পাশাপাশি আমাদের অনুষ্ঠানটা সাক্ষাৎকারধর্মী হওয়ায় প্রতিদিনকার অতিথি সম্পর্কে জানতে হয়। আর খুব সকালে ঘুম থেকে উঠা, তাড়াহুড়া করে তৈরি হওয়া, মেকআপ নেয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতেই অন্যরকম তাড়া থাকে।
এটিএন বাংলার ‘চায়ের চুমুকে’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ইমতু রাতিশ ও ফাইজাকে অবশ্য এব্যাপারে বেশ রিল্যাক্স দেখা গেল। কেননা তাদের অনুষ্ঠান সকালে প্রচার হলেও সেটা সরাসরি সম্প্রচারিত না হওয়ায় তাড়াহুড়ার বিষয়টি থাকে না। তবে অনুষ্ঠানটির জন্য প্রতি সপ্তাহে একদিন সময় করে বেশ কয়েকটি পর্বের শুটিং হয়। ফলে মাঝে মাঝে এমনও হয় পর্বের পর পর্ব শুটিং করতে করতে ভোর রাতে তাদের বাড়ি ফিরতে হয়। ইমতু নিজের প্রসত্মুতির কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘সকালের প্রোগ্রাম বলে আমাদের প্রসত্মুতিটা থাকে অন্যরকম। অতিথি অনুযায়ী পোশাক, প্রোগ্রাম ফরম্যাটসহ নানান বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হয়। প্রোগ্রামটা রেকর্ডিং হলেও যেনো প্রতিদিন প্রাণবনত্ম লাগে সেই চেষ্টাটাই থাকে আমাদের পুরো টিমের।’ ফাইজা বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন একটি স্বপ্ন নিয়ে আমরা অনুষ্ঠানটি শুরু করি। প্রতিদিন দর্শকদের সাথে ‘শুভ সকাল’ শেয়ার করে নিজেদের সকালটাও শুভ করে নেই।
বৈশাখী টেলিভিশনের ‘আলাপ’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক পারিহা বলেন, ‘প্রতিদিনকার অনুষ্ঠানের প্রসত্মুতিটা শুরু হয়ে যায় আগের দিনের রাত থেকেই। অতিথির নাম জানার পর তার সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বিশেষ দিবস কিংবা অনুষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী পোশাক পরতে হয়। এর উপর তো থাকেই সময়মতো অনুষ্ঠানে পৌছার টেনশন। ট্রাফিক জ্যাম, ঘড়ির কাঁটা ধরে দৌঁড়ানো- সব মিলিয়ে প্রতিদিন একটা অন্যরকম ধকল দিয়েই সকালটা শুরু হয়। এই বুঝি দেরি হয়ে গেলো, এই বুঝি গেস্ট রাগ করে চলে গেলো- এমন টেনশনটা কিন্তু থাকেই। তারপরও অনুষ্ঠানের সেট-এ বসে অনুষ্ঠানে আসা অতিথিকে নিয়ে যখন চলতে থাকে অনুষ্ঠান এবং সেখানে যখন দর্শকদের ফোন আসতে শুরু করে তখন আর এসব কষ্টগুলোকে কষ্টই মনে হয় না।’
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ভুলও হয়। একথা অকপটে বললেন সবাই। কিছুটা মজা করে সাথী বললেন- ‘অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারের আগে ‘দোয়া কলমা’ পড়ি। তারপরও কিছু না কিছু ভুল যে হয় না তা বলবো না। তারপরও চেষ্টা থাকে কোনো রকম ভুল যেনো না হয়। আমার সামান্য ভুল দিয়ে দিন শুরু হোক এটা আমি চাই না। ভুল তো ভুলই। সেটা হোক ছোট কিংবা বড়।’
অনুষ্ঠানে ভুল হওয়ার টেনশন থাকাটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন অদিতি। তিনি বলেন, ‘আমি চাই প্রতিদিন অনুষ্ঠান শুরুর আগে এই টেনশনটা থাকুক। কারণ টেনশনটা থাকলেই আমার সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টাটা থাকবে। আবার অনেক সময় অনুষ্ঠানে এমন বড় মাপের অতিথি থাকে যে, তাদের সামনে কথা বলতেও বেশ নার্ভাসও লাগে।’ পারিহা বলেন, ‘সরাসরি অনুষ্ঠানে চোখ-কান সবসময় খোলা রাখতে হয়। কারণ কখন কোন ভুল হয়ে যায় এই বিষয়ে সজাগ থাকতে হয় সবসময়।’
আড্ডার এক পর্যায়ে উঠে আসে অনুষ্ঠানে মজার কোনো স্মৃতি নিয়ে কথাবার্তা। শুরুতেই সাথী অনন্য এক স্মৃতির কথা বলেন। আমাদের সবার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সাথে যখন অনুষ্ঠান শুরু করি সেটা সত্যিই অন্যরকম আনন্দের থাকে। আর অনুষ্ঠানে কখনো বিশিষ্টজনদের কেউ ফোন করে যখন কথা বলেন তখন সত্যিই বেশ ভালো লাগে। যেমন একবার গানে গানে সকাল শুরুর অনুষ্ঠানে বন্যা দি (রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা) ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে ফোন করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই অনুষ্ঠানটি আমি উপস্থাপনা করেছিলাম। এটা নিঃসন্দেহে আমার উপস্থাপনা ক্যারিয়ারে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা’- কথাগুলো বলার পর সাথীর চোখে মুখে তখন আনন্দের ঝিলিক।
নিজের মজার স্মৃতির কথা একটু অন্যরকমভাবে ব্যাখ্যা করলেন পারিহা। বললেন, ‘প্রতিদিন খুব সকালে ঘুম ঘুম চোখে উঠতে হয়। অনেক সময় এমনও হয় চোখে ঘুম থাকার কারণে পেস্ট এর জায়গায় ফেসওয়াশ দিয়ে ব্রাশ করা শুরু করি। এটা অনেক সময়ই হয়েছে।’ অদিতির কথা শুনে আড্ডায় সকলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অদিতি নিজের মজার স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘একদিন এক অনুষ্ঠানে অতিথির হাঁটুর উপর গুলি খাওয়া প্রসঙ্গ আসতেই তিনি গুলি লাগার সেই জায়গাটি দেখানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেন। তাকে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছিল না যে, এটা সরাসরি অনুষ্ঠান এবং এভাবে দেখানো ঠিক হবে না। শেষমেশ অবশ্য বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছিল। এটা নিয়ে আমরা অনুষ্ঠানের পর বেশ হেসেছিলাম।’ ইমতু আর ফাইজা নিজের মজার অভিজ্ঞতার কথা বললেন একটু অন্যভাবে। তারা বলেন, ‘শুটিং করতে করতে অনেক সময় ভোর হয়ে যায়। এমনও হয় বাসায় গিয়ে যখন ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে যাবো ঠিক তখন আমাদের অনুষ্ঠান প্রচারের সময় হয়ে আসে। এটা বেশ মজার।’
অনুষ্ঠান উপস্থাপনার নানান আলোচনার পর কথা হয় তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। একে একে বলতে থাকেন নিজেদের পড়াশুনাসহ অন্যান্য কাজের বিষয়ে কথাবার্তা।

রুবাইয়াৎ অস্মিতা অদিতির মিডিয়ায় পথচলা শুরু ২০০৭ সালে উপস্থাপনার মাধ্যমেই। ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করা অদিতি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বেশ কয়েক বছর। মাছরাঙা টেলিভিশনের রাঙা সকাল অনুষ্ঠানের বাইরে চ্যানেলটিতে তিনি প্রোমো ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছেন।
পারিহার মিডিয়ায় পথচলা ২০০৪ সালে লাক্স-আনন্দধারা মিস ফটোজেনিক-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তখন ঢাকা থেকে দ্বিতীয় রানারআপ হলেও মিডিয়া কাজ করা হয়নি। ২০১০ সালে আরটিভিতে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে তার মিডিয়ায় কাজ করা শুরু হয়।
ইমতু রাতিশের মিডিয়ায় পথচলা শুরু হয় ২০০৬ সালে চ্যানেল ওয়ানের ঈদ বাজার অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে। এরপরই তিনি বিজ্ঞাপনসহ বেশকিছু নাটকে অভিনয় করেন। সম্প্রতি নারগিস আক্তারের ‘যৈবতী কন্যার মন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। ইমতু বিবিএ শেষ করে এমবিএ করছেন।
দিলরুবা সাথী ইডেন কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স শেষ চ্যানেল আইতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে উপস্থাপনার পাশাপাশি নৃবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে একটা গবেষণায় ভাবানুবাদের কাজ করছেন।
ছোটবেলা থেকেই উপস্থাপনার প্রতি দুর্বলতা ছিলো ফাইজার। তাই তো এটিএন বাংলার ‘চায়ের চুমুকে’ অনুষ্ঠানে উপস্থানা করছেন এ লেভেল কমপ্লিট করা ফাইজা ভবিষ্যতে মিডিয়ায় ভালো ভালো কাজ উপহার দেয়ার পাশাপাশি একজন ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চান।
সকালের আরো যত অনুষ্ঠান
বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সকালে বেশকিছু অনুষ্ঠান প্রচার হয়ে থাকে। যমুনা টিভিতে ‘সকালের বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রানেত্মর দিনের শুরুর নানা ঘটনা ও ভিডিও তথ্যচিত্র নিয়েই অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়। জুবায়ের, আইরিন ও কনক টিনার উপস্থাপনায় এ অনুষ্ঠানটিতে দর্শকের জন্য থাকে চলতি ঘটনাভিত্তিক দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুসঙ্গ, জীবনধারণ সংশ্লিষ্ট দরকারি তথ্য।
বাংলাভিশনে প্রতিদিন সকালে প্রচার হয় ‘দিন প্রতিদিন’ শিরোনামের অনুষ্ঠান। কায়নাত খানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি প্রতিদিন সকাল ৮.৩০ মিনিটে প্রচার হচ্ছে।
এসএ টিভিতে প্রচার হচ্ছে গানের সাথে আলাপচারিতামূলক অনুষ্ঠান ‘সকালের ডায়েরি ও হাওয়া লাগে গানের পালে’। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করছেন শাফায়াত মাহমুদ।