শুধু প্রয়োজন ভালো গল্পের ভালো সিনেমা-ফজলুর রহমান বাবু

শুধু প্রয়োজন ভালো গল্পের ভালো সিনেমা-ফজলুর রহমান বাবু

SHARE
fazlur-rahman-babu

অভিনয়ে বারবার নিজেকে ভাঙা এবং নতুন করে গড়া- এমন কথাটিই বোধহয় অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করে শুধু দর্শকপ্রিয়তাই অর্জন করেননি, সাধারণ মানুষের কাছে পেয়েছেন দারুণ ভালোবাসা। এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সব চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে আলাদাভাবে ঠাঁই করে নিয়েছেন এই গুণী অভিনেতা। ক’দিন আগে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এরু ছবি তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ‘অজ্ঞাতনামা’য় দুর্দান্ত অভিনয় করে ফজলুর রহমান বাবু প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের চোখের পানি ঝরিয়েছেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে এই অভিনেতার কী এমন জাদু রয়েছে, কীভাবে তিনি নিজেকে ভেঙে নতুন করে পুনরায় আরেকটি চরিত্রে গড়ে তোলেন কিংবা অভিনয়ের আগে নিজের প্রস্তুতিটা কেমন থাকে এমন নানান বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দ আলোর সঙ্গে। নগরীর শহীদবাগে নিজ বাসায় বসে দীর্ঘ আলাপচারিতার চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো- লিখেছেন সৈয়দ ইকবাল।

আনন্দ আলো: প্রথমেই ‘অজ্ঞাতনামা’ ছবিটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই ছবিতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল?

ফজলুর রহমান বাবু: দেখুন, একজন অভিনেতার কাজই হচ্ছে চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলা। যে কাজটা আমি এই ছবিতে করেছি। একজন পিতার জায়গা থেকে বিদেশে গিয়ে সন্তান হারানোর ব্যাথাটা ফিল করেছি। এখন এই ব্যাথার জায়গাটা যে যত ছুঁতে পারবে সে তত ভালো অভিনয় করতে পারবে। আমি ‘অজ্ঞাতনামা’র ক্ষেত্রে সেটাই করেছি। অভিনয়ের গভীর জায়গাটা ছোঁয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। কতটুকু করতে পেরেছি সেটা দর্শকই ভালো বলতে পারবেন। তবে প্রথম যখন তৌকীর আহমেদ আমাকে ছবির গল্প এবং আমার চরিত্রটি সম্পর্কে বলেন তখন আমি স্ক্রিপ্টটা পড়তে চাই। স্ক্রিপ্ট পড়ে আমি তৌকীরকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন দেই। এই ধরনের চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পাওয়া সত্যিই একজন অভিনেতার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। এই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছবিটির শুটিং হয়েছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী একটুও খারাপ লাগেনি অভিনয় করে। কারন একজন অভিনেতার যে ক্ষুধা সেটা আমি মিটিয়েছি ‘অজ্ঞাতনামা’য়।

স্ক্রিপ্ট পড়ার পর আমি প্রতিনিয়ত নিজেকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে ভাঙার চিন্তা করেছি। কোন জায়গায় কেমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে হবে সেসব নিয়ে স্ট্যাডি করেছি। সর্বোপরি আমি চরিত্রটির ব্যাপারে স্ট্যাডি করেছি। আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা করেছি। জানি না কতটুকু কী করেছি। তবে ছবিটি মুক্তির পর অনেকেই প্রশংসা করেছেন। ফোন করে এসএমএস করে এবং কারো সঙ্গে দেখা হলেই বলেছেন ছবিটির ব্যাপারে।

আনন্দ আলো: চলচ্চিত্রে এখন ভিন্নধারার গল্পের ছবি বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। একই ফরম্যাটের মধ্যে ছবির গল্প এখন আর দর্শক নিতে চায় না। চলচ্চিত্রের এই যে পরিবর্তন এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ফজলুর রহমান বাবু: দেখুন, এক সময় বলা হতো টেলিভিশন কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা কিংবা কলাকুশলীরা মেইন স্ট্রিম বা মূলধারার না। অথচ সারা পৃথিবীতে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এত ধারা নেই। সবই কিন্তু ফিল্ম। একটা বিজ্ঞাপনও কিন্তু ফিল্ম। আসল কথা হলো- গল্পটা কে কীভাবে এবং কত সময় ধরে দর্শকদের বলবেন কিংবা দেখাবেন। আমাদের এখানে চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা অভিনয় শিল্পীদের খুব সুন্দরভাবে ভাগ করে ফেলা হয়েছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক। তবে আশার কথা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে বেশকিছু ভিন্নধারার গল্প ও ভিন্নধারার নির্মাণশৈলীর ছবি নির্মিত হয়েছে এবং সেগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। আমি যদি সর্বশেষ ‘আয়নাবাজির’ কথাই বলি তাহলে বলতে হবে বেশ কয়েকবছর একটি সিনেমা মুক্তি পায় যেটা অনেক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা সফলও হয়েছে। মজার একটি কথা বলি- ‘আয়নাবাজি’র আগে ‘মনপুরা’ সিনেমাটি চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই দুটি ছবির পরিচালকই আমাদের টিভি মিডিয়ার এবং দুটি ছবির শিল্পী-কলাকুশলীরা টিভি মিডিয়ারই। এখানে একটি কথা না বললেই নয় সেটি হলো-আয়নাবাজির মতো আমাদের অজ্ঞাতনামাও অনেকদিন ধরে প্রেক্ষাগৃহে চলতো যদি ছবিটির প্রচার-প্রচারণা আরো জোরালোভাবে করা হতো। আমাকে এখনো অনেকে ফোন করে বলেন, ছবিটি তারা দেখতে চায়, কোন হলে গেলে দেখা যাবে এমন প্রশ্ন প্রতিনিয়ত শুনছি। ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা ভালো গল্প ও ভালো নির্মাণের পাশাপাশি এর প্রচার-প্রচারণা অন্যরকম ছিল। তাই তো দর্শক আকৃষ্ট হয়েছে সিনেমাটির প্রতি। আমার বিশ্বাস ‘অজ্ঞাতনামা’র প্রচার-প্রচারণা আরো করলে দর্শক অনেকদিন ধরে সিনেমা হলে ছবিটি দেখতে পেতো। তাই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমার অনুরোধ একটি ভালো সিনেমা হলে সেটার প্রচারের জন্য ভিন্নধর্মী কিছু আইডিয়া করুন। দেখবেন দর্শক হলে গিয়ে সিনেমা দেখবেই। এদেশের দর্শক হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে চায়। শুধু প্রয়োজন ভালো গল্পের ভালো সিনেমা। আর আমাদের গল্প, আমাদের সমাজ, আমাদের ক্রাইসিস এবং আমাদের স্বপ্নের কথা বলবে যেসব সিনেমা সেটাই আমার কাছে মূলধারার সিনেমা।

আনন্দ আলো: এখন টিভি নাটকের কেমন অবস্থা মনে হয় আপনার কাছে?

ফজলুর রহমান বাবু: ভালো। তবে আগের চেয়ে দর্শক কিছুটা কমেছে। এটার মূল কারণ আমাদের নাটকের বাজেট এবং প্রপারলি দর্শকদের নাটকটা দেখতে না দেয়ার পরিবেশ এর মধ্যে তো রয়েছেই ভিনদেশি চ্যানেলের আগ্রাসন। তবে একথা সত্যি যে, আমাদের দেশে অনেক ভালো ভালো প্রোডাকশন নির্মিত হচ্ছে। এই অঙ্গনকে ভালোবেসে এখনো অনেক তরুণ কাজ করছেন বলেই সম্ভব হচ্ছে। তবে টিভি নাটকের দর্শকদের ফিরিয়ে আনার জন্য টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, বিজ্ঞাপন দাতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের শিল্পীদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। শুধু একজন আরেকজনকে দোষ দিলেই হবে না। ইন্ডাস্ট্রিটা আমাদের এবং এটাকে বাঁচাতে সম্মিলিত ভাবে আমাদেরই কাজ করতে হবে।

আনন্দ আলো: বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন টিভি চ্যানেলগুলোতে বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়ালগুলো প্রচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত বলবেন-

ফজলুর রহমান বাবু: মনে পড়ে আশির দশকে বিটিভিতে আমরা অনেক জনপ্রিয় সিরিয়াল দেখেছি। যখন সেসব সিরিয়াল শুরু হতো তখন আমরা সব কাজ বাদ দিয়ে সাদাকালো টিভি সেটের সামনে বসে যেতাম। এমনকি তখন অনেক কম টেলিভিশন থাকার ফলে পাড়া প্রতিবেশীর বাসায় গিয়ে দলেবলে সেসব সিরিয়াল দেখেছি। বর্তমানে অনেক চ্যানেলই বিদেশি সিরিয়াল বাংলায় ডাবিং করে প্রচার করছে। আমার কথা হচ্ছে দর্শকদের রুচির জায়গা নষ্ট হোক এমন কিছু না করাই ভালো। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আমি এর বিপক্ষে। তবে শুধু দর্শকপ্রিয়তার জন্য এমনটি না করাই ভালো। আর দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আঘাত আসে এমন কিছু না করাই আমি ভালো বলবো।

আনন্দ আলো: সম্প্রতি মিডিয়ায় সিনিয়র-জুনিয়র শিল্পীদের মধ্যে সম্মান-অসম্মানের মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এই নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি কোনো কোনো শিল্পী বেশ কিছুদিনের জন্য নিষিদ্ধও হচ্ছেন-

ফজলুর রহমান বাবু: এগুলোর জন্য অনেকাংশে বিভিন্ন রিয়েলিটি শোই দায়ী। একজন অভিনয়শিল্পী তৈরি হতে থিয়েটার করা থেকে শুরু করে টিভি নাটকে অভিনয় পর্যন্ত প্রায় দশ-বারো কিংবা পনের বছর সময় লেগে যায়। অথচ আজকাল বিভিন্ন ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতা থেকে হুট করেই বেশ কয়েকজন শিল্পী চলে আসছে। আমি এটাকেও কোনো সমস্যা মনে করি না। কারণ ইন্ডাস্ট্রি বড় হচ্ছে। অনেক চ্যানেল, অনেক কাজ এবং অনেক অভিনয়শিল্পী লাগবেই। আমার কথা হচ্ছে একজন নবীন শিল্পী আসার আগেই তাকে যে, সুপারস্টার, টপস্টার কিংবা সেরা উপাধি আগেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে এতে করেই সে আর তা ধারণ করতে পারছে না। এর উপর তো রয়েছেই গাড়ি, টাকা- পয়সা এবং পত্রিকাজুড়ে বিশাল কাভারেজ। এখন এই শিল্পী যখন এত তকমা এবং এত প্রশংসা নিয়ে কোনো শুটিং স্পটে যাবে তখন সেতো অন্য কাউকে কিছুই মনে করবে না। আমি অবশ্যই এসব ট্যালেন্ট হান্টের বিপক্ষে নই। তবে যাদেরকেই আনা হচ্ছে তাদের যেন আরেকটু গ্রুমিং এবং আরেকটু রয়েসয়ে কথা বলাটা শেখানো হয়। কে সিনিয়র কে কেমন কাজ করেন কিংবা ইন্ডাস্ট্রির বিষয়ে আরো ধারণা দেয়া উচিত। তাহলেই আমরা পাবো আগামীর সুন্দর একটি শোবিজ অঙ্গন।

আনন্দ আলো: এই যে অভিনয় করেই যাচ্ছেন, কখনো হাফিয়ে উঠেন না।

oggatonamaফজলুর রহমান বাবু: সত্যি কথা বলতে কী-একই ধরনের চরিত্রে কাজ করলে বেশ হাফিয়ে উঠি, আবার ‘অজ্ঞাতনামা’র মতো চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পেলে কষ্ট হলেও সেটা এনজয় করি। আর আমি কখনোই টানা অভিনয় করি না। একটা নাটক কিংবা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ফাঁকে কিছুদিন সময় নেই। একটির কাজ করে অন্তত তিনদিন পর নতুন আরেকটির কাজ শুরু করি। যে দুদিন তিনদিন আমি সময় পাই সেই তিনদিন পরবর্তী শুটিংয়ের কস্টিউম থেকে শুরু করে স্ক্রিপ্ট, ডায়লগ, অভিনয়ের সাবটেক্সটগুলো নিয়ে চিন্তা করি। মোটকথা আমি একটা গ্যাপ নিয়েই একটার পর আরেকটা ফিকশনে অভিনয় করি। তারপরও অনেক সময় যে একই ধরনের চরিত্র কিংবা একঘেয়েমি কাজ করা হয় না তা আমি বলবো না। করা হয়। কারণ অভিনয়টা যেহেতু রুটিরুজি তাই অনেক সময় অনিচ্ছাতেও কাজগুলো করি।

আনন্দ আলো: আজকে ফজলুর রহমান বাবু যে জায়গায় অবস্থান করছেন তাতে কী আপনি সন্তুষ্ট?

ফজলুর রহমান বাবু: অবশ্যই। আমি সন্তুষ্ট। আমি অভিনেতাই হতে চেয়েছিলাম এবং সেটা হওয়ার জন্যই ছুঁটে চলেছি। আমি একসময় ব্যাংকে চাকরি করেছি। তখনোও থিয়েটার এবং টিভি নাটকে কাজ করি। তবে পুরোপুরি যখন এটাকে পেশা হিসেবে নিয়ে নিলাম তখন তো অভিনেতা হওয়ার জন্যই সব ছেড়ে দেই। সেই ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আসা। থিয়েটারে সম্পৃক্ত হওয়া কিংবা কলেজে পড়ার সময়তো অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি। আজকে যখন আমি রাস্তায় বের হলে মানুষ, আমাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে ঐ যে বাবু যায়- উনি অভিনয় করে তখন সত্যিই ভালো লাগে। কারণ আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। সবাই আমাকে চিনুক, কথা বলুক, ভালোবাসুক এটাই তো আমার প্রত্যাশা ছিল। অভিনয় দিয়ে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া সত্যি অন্যরকম এক আনন্দের বিষয় কাজ করে। তবে টেলিভিশনে আপনাকে দেখেছি এবং আপনার অভিনয় ভালো লাগে এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।