শীতের রাজ্যে রঙিন পাখি:মুকিত মজুমদার বাবু

শীতের রাজ্যে রঙিন পাখি:মুকিত মজুমদার বাবু

1237
0
SHARE

হাকালুকি হাওর। পরিযায়ী পাখির রাজ্য। শীতের সকাল। মিষ্টি রোদের মিষ্টি আমেজ। কুয়াশার সাথে রোদের আলো গায়ে মেখে লুটোপুটি খাচ্ছে ল্যাঞ্জাহাঁস, সিঁথিহাঁস, পাতিহাঁস, টিকিহাঁস, রাজহাঁসসহ নানা প্রজাতির পাখি। বিচিত্র রঙের। বিচিত্র ঢঙয়ের। কূজনে মুখরিত চারপাশ। এক ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। আরেক ঝাঁক দখল করে নিচ্ছে তাদের জায়গা। কোনোটা কালো, কোনোটা মেটে, কোনোটা ধূসর রঙের আবার কোনোটা কালচে খয়েরি। এ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বপ্নদ্বীপের পাখির ছবি। মনোহর এ চিত্রের গান, ছন্দ, কবিতা। মাধুর্যময় পুলকিত মনের আনন্দ, উল্লাস, উচ্ছ্বাস। সেই উল্লাস উচ্ছ্বাসের ঢেউয়ে কানায় কানায় ভরে ওঠে যেকোনো মানুষের মনের অসীম সাগর। উদ্বেলিত হয় হৃদয়ের অলিগলি। পূর্ণতা পায় চোখের তারা। রবি ঠাকুরের কবিতার মতো বলতে ইচ্ছে করে-

“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।

সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে …”

শুধু যে শীতের হাকালুকির এ মনোরম চিত্র তা কিন্তু নয়। প্রকৃতির অপার মুগ্ধতার স্বর্গভূমি বাংলাদেশের অধিকাংশ নদ-নদী, উপকূলীয় অঞ্চল, বিভিন্ন জলাশয়ে মেতেছে স্থানীয় পাখির সাথে পরিযায়ী পাখির দল। তাদের চলার ছন্দ, কথা বলার ঢঙ, গান গাওয়ার সুরেলা কণ্ঠ ঘর ছাড়া করেছে পাখিপ্রেমীদের। যারা সারা বছর অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে দিন পার করেছে তাদের কাছে এ সময়টা মাহেন্দ্রক্ষণ। কর্মব্যস্ততা দূরে ঠেলে পাখিদের সাথে তারাও মিলেমিশে একাকার। সকাল গিয়ে দুপুর আসে, বিকেলের পর আসে মুখরিত সন্ধ্যা। নিকষ কালো রাতের মৌনতা পেরিয়ে কুয়াশাকে সাথে নিয়ে ফিরে আসে আবার সকালের রাঙা রোদ। রঙবাহারি পাখিদের রূপ-মাধুর্যে রাঙিয়ে দেয় মনের উঠোন। ভরিয়ে দেয় অপূর্ণ থেকে যাওয়া চাওয়া পাওয়ার হৃদয়পাত্র।

“পাখি সব করে রব, রাতি পোহাইল

কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল”

এ দেশের ঘুমিয়ে থাকা মানুষ আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে পাখির ডাকে। কান পেতে শুনতে পায় সুরেলা পাখির মিষ্টি গান। আবার দিনের শেষে সন্ধ্যাও নামে পাখির কলকাকলিতে। বিদায়ী সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে আবির ছড়িয়ে মিলিয়ে যায়… সেই আলো-আঁধারির মায়াবী সন্ধ্যায় ঝাঁক বেঁধে আপন গন্তব্যে ফেরার অভূতপূর্ব ছবি মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয় দেহমনে। পাখি যেন হয়ে উঠেছে প্রকৃতির অলংকার, এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। অন্যান্য ঋতুতে কম বেশি পাখি দেখা গেলেও পরিযায়ী পাখি বেশি দেখা যায় শীতকালে। এ সময় আমাদের দেশে উপযুক্ত বাসস্থান ও খাবার পাওয়ার কারণে দেশের স্থানীয় পাখিদের সাথে যোগ হয় পরিযায়ী পাখির দল। জীবনধারণের প্রয়োজনেই এদেরকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে আসা-যাওয়া করতে হয়। এ পথচলায় তারা পাড়ি দেয় হাজার হাজার কিলোমিটার পথ। পরিযায়নের সময় অধিকাংশ পাখি রাতেই চলাচল করে। এসব পাখিদের কেউ দিবাচর, কেউবা নিশাচর। পরিযায়ন করা পাখিদের সহজাত স্বভাব এবং বংশপরম্পরায় এটা চলতে থাকে। পরিযায়ন শেষে আবার তারা চলে যায় অন্য দেশে। এ পাখিগুলোকে বিজ্ঞানীরা পরিযায়ী পাখি বললেও সাধারণ মানুষের কাছে এরা অতিথি পাখি বা শীতের পাখি বলে পরিচিত। তবে এ পাখিগুলো আমাদের দেশে অতিথি পাখি নয়, এদেশের পাখি। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তারা অন্য দেশে পাড়ি জমায় এবং অনুকূল পরিবেশ পেয়ে ফিরে আসে স্বদেশভূমিতে।

পরিযায়ী পাখির মধ্যে জলচর পাখির সংখ্যাই বেশি। মোট জলাভূমির পাখির মধ্যে প্রায় ১০ ভাগ স্থানীয়, বাকি ৯০ ভাগই পরিযায়ী। হাওর, বাঁওড়, মোহনা, চর ও উপকূলীয় অঞ্চল নানা প্রজাতির জলচর পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। তবে কোনো কোনো প্রজাতির পাখিরা গ্রীষ্মকালেও আসে। এছাড়া অল্প সংখ্যক পাখি বসন্তে বা হেমন্তে স্বল্প সময়ের জন্য এদেশে থাকে যাদেরকে পান্থ পরিযায়ী বলা হয়। বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ছয়শ’ পাখির বড় একটা অংশ দখল করে আছে পরিযায়ী পাখি।

সৌন্দর্যের আধার পাখি কি শুধু আমাদের মনের ক্ষুধা মেটায় না। পতঙ্গভূক পাখি নানা প্রজাতির  তিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফসলকে রক্ষা করে। মৎস্যভূক পাখি অসুস্থ ও দুর্বল মাছ খেয়ে অন্যান্য মাছ ও জলজ পরিবেশ ভালো রাখে। ইঁদুরভূক পাখি ইঁদুর খেয়ে কৃষকদের উপকার করে। এসব পাখি হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিলে অবস্থান করে বলে এদের বিষ্ঠা মাটিতে জমা হয়ে মাটিকে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ করে তোলে। এগুলো জৈব সার হিসেবে কাজ করে মাটিকে উর্বর করায় ভালো ফসল উৎপাদন হয়।

বর্তমানে বৈরী জলবায়ু আর মানবসৃষ্ট কারণে হৃদয় প্রফুল্ল করা মনের ক্ষুধা মেটানো লাখো লাখো পরিযায়ী পাখির ঐক্যতানের দৃশ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের অনেক জলাভূমি ভরাট হয়ে গড়ে উঠছে জনবসতি, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, হাসপাতাল-রাস্তা। বন উজাড় হচ্ছে। নদী দখল ও দূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। অধিক পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়িয়ে তুলছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। কৃষি জমিতে যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে প্রকৃতি ও জীবন। বায়ু দূষণের মাত্রা সেই বিপন্নতাকে আরো ত্বরান্বিত করছে। তারপর আছে নিষ্ঠুর শিকারির নির্মমতা। আইন থাকতেও পাখি শিকারের এই অপতৎপরতা কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না।

মাটি দিয়ে আর জলাভূমি ভরাট নয়, গাছ কেটে বন উজাড় করে আর পাখির আবাসস্থল ধ্বংস নয়, কৃষি জমিতে বিষ প্রয়োগ করে আর নয় পাখির অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন করা। প্রকৃতির অলংকার হিসেবে পরিবেশ ও পর্যটনের জন্য স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল ও জলাভূমি সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন