Home প্রতিবেদন প্রকৃতি কথা শিশির ধোয়া শীতের ছোঁয়া-মুকিত মজুমদার বাবু

শিশির ধোয়া শীতের ছোঁয়া-মুকিত মজুমদার বাবু

SHARE
POJ

হেমন্ত ঋতুকে বলা হয় হেমন্তল²ী। এই ঋতুতেই কৃষকের ঘরে নতুন ফসল ওঠায় আনন্দের বান বয়ে যায়। আনন্দ-উল্লাস-উচ্ছ¡াস নিয়ে পালিত হয় নবান্ন উৎসব। হেমন্তের মাঝামাঝি সময় থেকেই ফসল শূন্য মাঠে কিংবা দূর্বা ঘাসের ডগায় জমতে শুরু করে রাতের শিশির। শিশির বিন্দুর ওপর সকালের মিষ্টি রোদ পড়ে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। বইতে শুরু করে উত্তরের হিমেল হাওয়া। হেমন্তকে বিদায় জানিয়ে গুটি গুটি পায়ে বাংলার প্রকৃতিতে নামে শীতঋতু। ষড়ঋতুর পঞ্চম ঋতু। বারো মাসের পৌষ-মাঘ।

ঋতুবৈচিত্র্যে প্রকৃতিতে এখন শীতকাল। এ ঋতুতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে সকালের সূর্য। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ে রাতের শিশির। হলুদ শস্যক্ষেত উঁকি দেয় উষ্ণতার জন্য। মাঠের পর মাঠ সবুজ সবজির ক্ষেত শিশিরে ¯œান করে অপেক্ষা করে সূর্যের হাসির। অন্যান্য ঋতুর তুলনায় এই ঋতুতে বেশি উৎপাদিত শাক-সবজির মধ্যে ফুলকপি, বাঁধা কপি, শালগম, গাজর, মূলা, পালন শাক, বেগুন, শিম অন্যতম।

কুয়াশামাখা শীতের সকালে জবুথবু হয়ে ঝিমোয় গাছ-গাছালি। তন্দ্রাভাব নিমিষেই কাটিয়ে দেয় রঙ-বেরঙের পাখির ঝাঁক। শীত ঋতুতেই গাছে, মাঠে, জলাশয়ে সবচেয়ে বেশি পাখির দেখা মেলে। ঝুপঝাপ উড়ে এসে পড়ে দল বেঁধে। হুটহাট উড়ে যায় আবার খাবারের সন্ধানে। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে শীতের সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা। দেশ হয়ে ওঠে পাখির রাজ্য। কিন্তু এ সময় অনেক লোভী মানুষ বিভিন্ন উপায়ে পাখি শিকার করে। তারা জানে না, প্রকৃতিতে পাখি আমাদের অনেক উপকারে আসে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।

গ্রামের বয়স্ক আর অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা উঠোনে আগুন জ্বেলে শীত কাটানোর চেষ্টা করে। হেমন্তের কাটা ধানের খড় দিয়ে তারা জ্বালানির জোগান দেয়। কেউ হাত সেঁকে উঠে যায় নিত্যদিনের কাজে। আবার নতুন কেউ যোগ হয় আগুন পোহানোর উৎসবে। উঠোনের পাশেই গাছিবউয়ের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। বড় টিনের ছড়ানো পাত্রে জ্বাল দেয় রাতের কুয়াশায় ভেজা খেজুর গাছের গা বেয়ে বারবার ওঠানামা করে সংগ্রহ করা মিষ্টি মধুর রস। শীত ঋতুতে সবার মন জয় করে খেজুরের রস, রস থেকে তৈরি করা গুড়-পাটালি, পিঠা-পায়েস আর নলেন গুড়ের সন্দেশ। গুড় দিয়ে যে সন্দেশ তৈরি হয় অনেকের কাছে তথ্যটা অবাক মনে হলেও এটাই সত্যি। আর ওই সন্দেশ একবার যদি কেউ চোখে দেখে তাহলে সারা জীবন তার স্বাদ মুখে লেগে থাকবে। তবে গুড়-পাটালিও কম স্বাদের নয়।

শীত ঋতুতে গ্রামের গাছিদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যা। কুয়াশায় মোড়ানো শীতের সকালে বাঁক কাঁধে বিস্তীর্ণ মাঠের সরু পথ দিয়ে গাছিদের বাড়ি ফেরার দৃশ্য যে কেউকে মুগ্ধ করবে। তবে এখন আর গাঁয়ের পথের ধারে কিংবা মাঠে মাঠে আগের মতো খেজুর গাছ দেখা যায় না। বাংলার ঐতিহ্য খেজুর গাছ দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেকের কাছেই এই গাছটি অপ্রয়োজনী বলে তারা ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। শুধু শীত মৌসুমে রস পাওয়া যায় বলে জমির মালিক বেশি মুনাফার জন্য বিদেশি প্রজাতির গাছ রোপণ করে অধিক লাভবান হচ্ছে। অথচ তৎকালীন অবিভক্ত ভারতেও যশোর জেলা খেজুরের গুড়-পাটালির জন্য বিখ্যাত ছিল। ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একসময় যশোর অঞ্চলের প্রধান কৃষিজ পণ্য ছিল খেজুরের গুড়। গুড় তৈরি করার জন্য গড়ে উঠেছিল কারখানা। কারখানায় উৎপাদিত শত শত মণ খেজুরের গুড় জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপে রফতানি হতো।

শীত ঋতুতে প্রকৃতির গায়ে হিমেল হাওয়া লাগলেও ঠিকই হেসে ওঠে শীতের ফুল। এ ঋতুতে বিভিন্ন রঙের গাঁদা ফুল ফুটলেও এর সঙ্গে হেসে ওঠে ডালিয়া, জিনিয়া, স্বর্ণ অশোক, সিলভিয়া, বাগান বিলাস, জার্বেরা, ক্যামেলিয়া, কসমসসহ নানান ফুল। ফুল ফোটে তুলসি গাছেও। বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি গোলাপও ফোটে শীত ঋতুতে।

শীতঋতু প্রকৃতির সুধা পান করার এক মোক্ষম সময়। এ সময় ঝড়-বৃষ্টি থাকে না। শীতের পরশ নিয়েই মানুষ ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। প্রকৃতির উদার সান্নিধ্য পেতে ছুটে যায়। বছরজুড়ে যে ক্লান্তি জমা হয় দেহ-মনে তা ধুয়ে-মুছে নেয় প্রকৃতি। নতুন করে আবার প্রাণশক্তি ফিরে আসে মানুষের ভেতর। এ ঋতুতে দেশের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন, নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটা, কক্সবাজার, বান্দরবান, সুন্দরবন, রাতারগুলসহ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার মতো অনেক সৌন্দর্যপূর্ণ স্থানে মানুষের সমাগম ঘটে। তবে মনে রাখতে হবে সুন্দর প্রকৃতি সুন্দর রাখতে পর্যটনের স্থানগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আমরা অনেকেই পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, সঙ্গে করে খাবার নেয়া পলিথিন যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ নোংরা করি। পাশাপাশি নির্দেশনাবলি সম্বলিত লেখা উপেক্ষা করি যেটা প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য সুখকর নয়।

মানুষের রসনা তৃপ্তিতে শীতঋতু এক দারুণ সময়। এ সময় শহর কিংবা গ্রামে পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম পড়ে যায়। মায়েরা অপেক্ষায় থাকেন সন্তানদের পিঠা-পায়েস খাওয়ানোর জন্য, জামাই-মেয়ে, নাতি-নাতনী, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও বাদ যান না এ আয়োজন থেকে। গ্রামে সকালের রোদ্দুরে বসে রাতের তৈরি পিঠা যেন অমৃতের মতো স্বাদ লাগে।

শীতঋতুতে বিভিন্ন জলাশয়ের পানি কমে যায়। গ্রামের মানুষ শীত উপেক্ষা করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে। এ সময় হাওর-বাঁওড় থেকে ধরা পড়ে অনেক মাছ। পোলো দিয়ে শত শত মানুষের আনন্দ-উল্লাস নিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য সত্যিই উপভোগ্য। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে, অনেক জলাশয় থেকে পানি সেচ দিয়ে কাদা খুঁড়ে মাছসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী ধরার কারণে দেশি প্রজাতির মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিনষ্ট হচ্ছে জলজজীববৈচিত্র্য।

শীতঋতুতে শহরের অবয়বে ধুলোর আস্তরণ জমে। বিভিন্ন সংস্কারের কাজ চলার কারণে বায়ুদূষণ বেড়ে যায়। শীত মৌসুমে বৃষ্টি না হওয়ার কারণে অলি-গলি-রাজপথে ধুলার দখলে চলে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় ঢাকা শহরের আশপাশে বৈধ-অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়া। তখন রাজধানী শহর হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম দূষণের নগরী।

বৈরী জলবায়ু আর মানবসৃষ্ট কর্মকাÐে ঋতুর কলেবরে পরিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়ত। বর্ষা ঋতুতে বৃষ্টি নেই। শরতে বৃষ্টি ডুবিয়ে দিচ্ছে মাঠ-ঘাট। আবার গ্রীষ্মের প্রচÐ দাবদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে প্রকৃতি ও প্রাণিকুল। এরপরও ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রকৃতিকে জানান দিয়ে, মানুষকে জানান দিয়ে শীত আসে, পাখিরা আসে, কুয়াশার জালে বন্দী হয় সকালের সূর্য। তবে প্রকৃতি বিরোধী কর্মকাÐ যেহারে বেড়ে চলেছে তাতে শীতঋতু কতকাল আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল থাকবে সেটা শুধু ভবিতব্যই বলতে পারে।

লেখক:  চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন