রঙের বৈশাখ বৈশাখের রঙ

রঙের বৈশাখ বৈশাখের রঙ

371
0
SHARE
Boishak

-শামসুজ্জামান খান

বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় এ উৎসব এখন রঙে রেখায় উজ্জ্বল, বর্ণাঢ্য। বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলয় হিসেবে পরিকল্পিত রমনা, শাহবাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সেদিন নানা রঙে, বিচিত্র পোশাকের লাখ লাখ মানুষের উচ্ছল হাস্যকলধ্বনিময় পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। বছরের আর কোনো দিনে নারী, পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, শিশুর এই মতো আনন্দোচ্ছলতা আর বাঙালি পোশাকের বহু বিচিত্র রঙ রূপ কারুকাজ সমৃদ্ধ ডিজাইনের অপরূপ বাহার আর দেখা যায় না। ফ্যাশন ডিজাইনাররা পাঞ্জাবি, কুর্তা, ফতুয়া, শাড়ি, ধুতি, চাদরকে যে কত রঙে, বর্ণে, উদ্ভাবনাময় বিন্যাসে দৃষ্টিনন্দন করে তোলেন সে এক বিস্ময় বটে! ডিজাইনারের শিল্পকুশলতায় ঐতিহ্যের ছোপের মধ্যে আধুনিতার নতুন নতুন ছাপ পড়ে। ফলে নববর্ষের পোশাকে পাশ্চাত্যের প্যান্টশার্ট এমনকি উত্তর ভারতের সালোয়ার কামিজও জায়গা পায় না। বাঙালিয়ানাকে কেন্দ্রে রেখে তৈরি করা শাড়ি, বøাউজ, পাজামা পাঞ্জাবির মন ভোলানো, চোখ জুড়ানো রঙ, নকশা ও সৌন্দর্যকলা এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়। বর্ণপ্রকর্ষের এ যেন এক অনন্য প্রদর্শনী। অথবা এমনও বলা যায় বাঙালি পোশাকের এ এক উন্মুক্ত বিশাল প্যারেড শো।
রঙের এই বিচিত্র বিস্ফোরণের মধ্যে প্রাধান্য বাসন্তী রঙের। বসন্তের রঙ বাসন্তী। এইসব বিষয়ের গভীরতর ব্যাখ্যা আছে। নানা রকম ব্যাখ্যা। নৃতত্ত¡বিদের, মনোবিজ্ঞানীর, সমাজতাত্তি¡কের। আবার আদিবাসীদের উজ্জ¦ল রঙপ্রিয়তার প্রভাবের কথাও কেউ কেউ বলেন। মনোবিজ্ঞানীরা বাসন্তী রঙকে যৌনতার প্রতীকেও ব্যাখ্যা করেন। আমরা অত সব জটিলতায় যাব না। নববর্ষ আমাদের কাছে জাতীয় আনন্দের প্রতীক। আনন্দের এই দিনে আমরা সুন্দর করে রুচিশীলভাবে সাজতে চাই। গানে-নাচে-অভিনয়ে-হাস্যকৌতুকে এবং উন্নত খাদ্যে জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে চাই। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা পাহাড়ি আদিবাসী বাস করে তাদের নববর্ষের উৎসব বৈশাখী বা আসামীরা করে রঙ্গিল বিন্দু উৎসব।
নববর্ষের উৎসব উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনের দেয়াল অনুপম সুন্দর রঙিন ফোকমোটিফে অপরূপ করে তোলে শিক্ষার্থীরা। এই রীতি গ্রাম আর শহরের সমবেত আনন্দময় ও শৈল্পিক উপস্থাপনা। গ্রামে এইসব মোটিফ লোকশিল্পীরা করেন আচার-অনুষ্ঠানে, সরাচিত্রে কাঠের পুতুলে, নকশি কাঁথায়, আলপনায়, স্ক্রোলচিত্রে, পটচিত্রে, শখের হাঁড়ি চিত্রে ইত্যাদিতে। পটুয়ারা এ ধরনের নকশা আঁকেন। বাঙালির এই লৌকিক সংস্কৃতিকে নববর্ষে নবআধারে ভিন্নমাত্রিকতায় উপস্থাপন করেন চারুকলার তরুণশিল্পীরা। ফলে বাঙালির নানা মাধ্যমের লৌকিক শিল্পকলা বাংলা নববর্ষের উৎসবকে শেকড় সংলগ্ন করে ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে সমন্বিত করে নবমাত্রিকতা দান করে। তাই আমরা বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে যেয়ে বাঙালির লৌকিক সংস্কৃতির নানা উপাদানকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে নতুন এবং পুরাতনের মিশ্রণে নবরূপ দান করি। রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহরের নববর্ষ উৎসব তাই জাতীয় সংস্কৃতির নবনির্মাণের অন্যতম প্রধান উপায় ও উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
অতীত মৃত নয়, অতীতের শ্রেষ্ঠ অংশ তাই বর্তমানে প্রবহমান হতে পারে। বাংলা নববর্ষ অতীতের অনেক সংস্কৃতি উপাদানকে নতুন তাৎপর্যে, নতুন আঙ্গিকে আমাদের সামনে আনছে। সংস্কৃতি এভাবেই এগোয়। শুধু সংস্কৃতির নববিন্যাস নয় সংস্কৃতি সমাজ সমালোচনারও হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ থেকে চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে নববর্ষের দিনে যে আনন্দ মিছিল ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে তা শুধুই কারনিভ্যাল না। এই মিছিলের মুখোশ, হাতি, ঘোড়া, সাপ নানা সংগুপ্ত বার্তা দিচ্ছে। একজন ফোকলোরবিদ হিসেবে আমরা এর ব্যাখ্যা করব ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। চারুকলার ছাত্রদের নববর্ষের মিছিল শুধু বর্ণাঢ্যই হলো না তাতে যুক্ত হলো তীর্যক ভঙ্গি ও স্বৈরশাসকের রাষ্ট্রশাসনের আবিলতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ ও সমাজ সমালোচনায় দীপ্র হলো মিছিল। বর্ণিলতা, রঙের উজ্জ¦লতার ভেতরে চোরাস্রোতের মতো বয়ে চলল ক্রোধের বহ্নিশিখা। ধর্মীয় আবিলতার বিরুদ্ধে আনা হলো পুরনো সং বা লোকরীতির কোনো নিন্দাবাচক অভিব্যক্তি। সুন্দর লোক ব্যঞ্জক ভঙ্গির মধ্যে পুরে দেয়া হলো সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় বিকৃতির বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ।
আর ছিমছাম মনোরম সাংস্কৃতিক চেতনার স্ফুরণ ঘটানোর লক্ষ্যে ছায়ানটের রমনা পাকুড়তলার নববর্ষ উৎসবের আকর্ষণ আবার ভিন্নধর্মী। পরিচিত নাগরিক উদ্যোগ ও নান্দনিক পরিবেশনার জন্যই এই উৎসবের আকর্ষণ সর্বাধিক। সবচেয়ে বেশি দর্শক সমাবেশ ঘটে এই অনুষ্ঠানে। সূ²বোধ ও উন্নত রুচির শ্রোতা-দর্শকের সঙ্গে বিপুল মানুষ যোগ দেয় এতে। ছায়ানটের এই অনুষ্ঠান দু রকম তাৎপর্য বহন করে। এক. পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করায় যে প্রতিবাদী চেতনা গড়ে ওঠে তাকে ধারণ করায় ছায়ানটের অনুষ্ঠান প্রতিবাদী চেতনায় ঋদ্ধ হয়ে ওঠে। সেই চেতনা এখন ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিপুল মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমান পরিবারসমূহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছায়ানট এবং এর অনুষ্ঠানকে উচ্চমূল্য দিয়ে থাকে। ফলে বিপুল মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী উচ্চমানের অনুষ্ঠানে সমবেত হয়ে থাকে। এ অনুষ্ঠানও বেশ জাঁকজমকপূর্ণ।
ঢাকার বাংলা নববর্ষ পালনের অপরূপ এক নান্দনিক আয়োজনে যুক্ত হয়েছে চ্যানেল আই ও সুরেরধারা। প্রতিবছর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের বিশাল আঙিনায় হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণের আয়োজন করে চ্যানেল আই নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বর্ষবরণের এই আয়োজন এখন আমাদের ঐতিহ্যের আলোকিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নববর্ষের অনুষ্ঠান কৃষিভিত্তিক বাংলায় বেশ প্রাচীনই বলা যায়। বর্তমান ঢাকা শহরের বর্ণিল নববর্ষ উৎসব আর সেকালের উৎসবে বিস্তর ফারাক। কৃষি জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নববর্ষ উৎসব পরবর্তীকালের মতো বর্ণাঢ্য ছিল না। ‘আমানি’কে নববর্ষের প্রাচীন উৎসব বলা হয়। এ উৎসব ছিল পারিবারিক এবং আচার ও জাদু বিশ্বাসজাত। পরিবার ও শস্যের প্রবৃদ্ধি কামনার শুভ ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান হিসেবেই ছিল এর পরিচিতি। বাইরের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ছিল শিবের গাজন গান। গম্ভীরা। এতে হাস্যরসের উপাদান ছিল। ধীরে ধীরে এ গান সমাজ সমালোচনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অতএব, এ বৈশাখী বিনোদন অনুষ্ঠানেও কোনো জাঁকজমক নেই। তবে সমাজ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। ইংরেজ আমলে জমিদাররা নিজস্ব প্রাসাদ বা সংলগ্ন অঙ্গনে নববর্ষ উপলক্ষে সে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান করতেন তাতে জমিদারি ঠাটবাট এবং জেল্লা যথেষ্টই লক্ষ করা যায়। প্রজারাও জমিদারের খাজনা ও নজরানা দিতে আসত যথাসাধ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় চোপড় পরে।
তবে সেকালের হালখাতা ছিল বেশ জৌলুসপূর্ণ। দোকানদার কলাগাছ আর দেবদারু পাতায় গেট করতেন। দোকান সাজাতেন রঙিন কাগজ জাপরি করে কেটে। মিঠাই মÐার দ্বারা গ্রাহক পৃষ্ঠপোষকদের আপ্যায়নও ছিল সাংবাৎসরিক রীতি। কোনো দোকানে কলের গানও বাজানো হতো। দোকানি ও গ্রাহক অনুগ্রাহকের বিশুদ্ধ হাসিঠাট্টায় পরিবেশ হয়ে উঠত হৃদ্যতাপূর্ণ। এই দুই অনুষ্ঠানে রঙÐতামাশার কিছু ছোপ লাগে।
আমজনতার জন্য ছিল বৈশাখী মেলা আর নানা রকম খেলাধুলা। গ্রামীণ বৈশাখী মেলায় যাত্রা, ভাব গান, কৃষ্ণলীলা, পুতুল নাচ, সার্কাসের আয়োজন ছিল। সারা বছর গ্রামীণ মানুষ অপেক্ষা করে থাকত এই মেলার। সারা বছরের প্রয়োজনের উপকরণ আর বিনোদন তৃষ্ণা মেটানোর জন্য মেলা ছিল সর্বোত্তম স্থান।
খেলাধুলার মধ্যে ছিল চট্টগ্রামে বলি খেলা, গরুর দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই ইত্যাদি। নিম্নবিত্তের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষের জন্য এইবা কম কি!
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাএকাডেমি