যেভাবে চ্যাম্পিয়ন হলো পর্তুগাল

যেভাবে চ্যাম্পিয়ন হলো পর্তুগাল

518
SHARE

আগেই বলা হয়েছে এবারে পর্তুগাল ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের দৌড়ে ছিল না। তারা ছিল অঘটনের তালিকায়। শেষ পর্যনৱ অঘটন ঘটিয়েই চ্যাম্পিয়ন হলো পর্তুগাল। টান টান উত্তেজনাকর ফাইনালে একটি গোলেই ফয়সালা হয়ে গেলো আগামী চার বছর ইউরোপের সেরা দলের নিশ্চিত ফেভারিট হওয়ার পরও, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তারকা ফুটবলারকে আহত করে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার পরও ফ্রান্স পারলো না পর্তুগালকে হারাতে। বরং তাদেরকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল।

মুহূর্তেটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব। ওই একটি মুহূর্ত দেখার অপেক্ষায় পুরো স্টেডিয়ামে ছিল লক্ষ পর্তুগাল সমর্থক। অবশেষে জয়ের দেখা মিলল একটু বিলম্বে। ১০৯তম মিনিটে। বাম উইং থেকে বলটা পেয়েছিলেন এডের। দু’তিনজন ফরাসি ডিফেন্ডারকে কাটালেন। এরপরই নিলেন মাটি কামড়ানো, অথচ দুর্দানৱ গতির শট। বাম কোন ঘেঁষে সোজা বলটি পৌঁছে গেলো ফ্রান্সের জালে। গোলরক্ষক হুলো লরিস ঝাঁপিয়ে পড়েও হাতের নাগাল পেলেন না।

ম্যাচের ৭ম মিনিটেই রোনালদোকে কঠিন ট্যাকলের মাধ্যমে ফাউল করলেন ফ্রান্স ফুটবলার পায়েত। এরপর ২০ মিনিটে মাঠ ছেড়েই বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন রোনালদো। চোখের পানিতে রোনালদোর চলে যাওয়া দেখেই হয়তো বাকি পর্তুগিজ ফুটবলাররা শপথ নিয়েছিল, ট্রফিটা জিততেই হবে। শেষ পর্যনৱ নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় খেলা এবং ১৯তম মিনিটে গিয়ে এডের দুর্দানৱ এক শটে গোলটি করেন।

২০০৪ ইউরোয় নিজ দেশের মাটিতে পর্তুগাল ফাইনালে উঠেছিলো প্রথমবারের মতো। কিন্তু সেবার গ্রিসের কাছে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় পর্তুগিজদের। ১২ বছর পর আবারও ফাইনালে উঠলেন রোনালদো এবং তার দল। অবশেষে আর স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হলো না। এবার আর রোনালদোকে শিরোপা বঞ্চিত হতে হলো না। নিজে মাঠে পুরো সময় নেতৃত্ব দিতে না পারলেও তার সতীর্থরা তাকে হতাশ করেনি।

প্রথমবারের মতো ইউরো জিতে পর্তুগালের ইতিহাসে রোনালদো নিজেদের সোনালি প্রজন্ম হিসেবেই প্রমাণ করলেন। অথচ গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিচ্ছিল রোনালদোরা। তিন ম্যাচের কোনটিতেই জিততে পারেনি। তিনটিতেই ড্র। কোনমতে সেরা তৃতীয় দল হয়ে গ্রুপ পর্ব পার হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জয়, কোয়ার্টার ফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে এবং সেমিফাইনালে গিয়ে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করেছিল পর্তুগাল ওয়েলসকে হারিয়েছিল ২-০ গোলে।

ইউরো বা বিশ্বকাপের ইতিহাসে পর্তুগালই একমাত্র দল যারা গ্রুপে তৃতীয় হয়ে শেষ পর্যনৱ জিতেছে শিরোপা! বিদ্রুপের হাসি হেসেছিলেন অনেকেই কিন্তু ট্রফিটা যখন রোনালদোসহ তার টিমমেটদের হাতে শোভা পাচ্ছিল তখন সেই বীরদের সালাম করা ছাড়া কারও উপায় ছিল না।

এরমধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের পর প্রথমবার ফ্রান্সকে হারালো পর্তুগাল। ভেঙে দিল নিজ মাঠে টানা ১৮ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। যে মাঠে ফ্রান্স জিতেছিল বিশ্বকাপ শিরোপা সেখানে তাদের বিপক্ষে পর্তুগাল অর্জন করলো ঐতিহাসিক জয়। অসাধারণ, অনন্য তাদের এ সাফল্য।

২০০৪ সালে প্রথম ইউরো আসরে খেলেন রোনালদো। নিজেদের মাটিতে সে আসরে দুই গোল করেন তিনি। এরপর ২০০৮ সালে অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ডের আসরে একটি গোল পান। তবে ২০১২ সালে পোল্যান্ড-ইউক্রেন আসরে পান ৩টি গোল। এরপর চলতি আসরে এখন পর্যনৱ তিনটি গোল দিয়েছেন রোনালদো। উল্লেখ্য, এবারের আসরে গোল করে আরও দুটি রেকর্ড করেছেন রোনালদো। প্রথম ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে গোল করে এ প্রতিযোগিতার ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চারটি আসরে (২০০৪, ২০০৮, ২০১২ ও ২০১৬) গোল করার কীর্তি গড়েন রিয়ালের এই তারকা। একই সঙ্গে ইউরোতে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েন তিনি।

রোনালদোর ইউরো বিজয়

নাম তার সি আর সেভেন। এই নামেই এখন তিনি বিশ্বসেরা। সিআর অর্থ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আর সেভেন তার জার্সি নম্বর। এই ৭ নম্বর জার্সি পরে রোনালদো সারা বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করছেন। পৃথিবীর অন্যতম ধনী ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের সেরা অস্ত্র রোনালদো। এক সময় ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রাণ ভ্রোমরা ছিলেন তিনি। এই ক্লাব থেকে রেকর্ড পরিমান অর্থে চলে যান স্প্যানিস ক্লাব রিয়াল মাদ্রিতে। গত ৪টি বছর তিনি এই ক্লাবেই সম্মানের সাথে খেলে যাচ্ছেন। তার মূল প্রতিদ্বন্ধি স্প্যানিস আরেক ধনী ক্লাব বার্সেলোনার গোল মেশিন লিউনেল মেসি। এই দুই ফুটবল তারকা এখন বিশ্বের ফুটবলকে মোহবিষ্ট করে রেখেছেন। ফুটবলে পৃথিবীর যত সেরা পুরস্কার রয়েছে তার সবগুলোই এখন এই দুই তারকার দখলে। তাদের দু’জনের একাউন্টে বিশ্বফুটবলের অর্ধেক টাকা।

এবারের ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপে ইংল্যান্ড, জার্মানী, ইটালী ও স্বাগতিক ফ্রান্সের নাম ঘুরে ফিরে এসেছে। সেভাবে পর্তুগালের নাম মিডিয়ায় বড় করে উচ্চারিত হয়নি। তবে একথা বেশ জোরে সোরে বলা হয়েছিল রোনালদো যদি জ্বলে উঠে তবে পর্তুগাল বড় কিছু করে ফেলতে পারে। শেষ পর্যনৱ তাই হয়েছে। রোনালদোর অসাধারণ নৈপূন্যে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পর্তুগাল। এর আগে পর্তুগাল এতবড় শিরোপা কখনোই জিততে পারেনি। তাই রোনালদো এখন পর্তুগালের জাতীয় বীর উপাধি পেয়েছেন।

রোনালদো শুধু একজন ফুটবল তারকা নন। তিনি একজন মডেল তারকা, গাড়ি সংগ্রাহক এবং পৃথিবীর সেরা ধনী খেলোয়াড়। রোনালদোর সংগ্রহে আছে অভি বুগত্তি, এ্যাস্টন মার্টিনের মতো শত কোটি টাকার গাড়ি। আছে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার ও অভিজাত বোয়িং বিমান। তিনি নাইকি, এডিডাস ও ক্লিয়ার শ্যাম্পুসহ অসংখ্য পৃথিবী সেরা পন্যের বিজ্ঞপনে মডেল হয়েছেন। রোনালদো বছরে আয় করেন ফুটবল ক্লাব থেকে বেতন বোনাসসহ ৫৬ মিলিয়ন ডলার এবং স্পন্সর, মডেলিং মিলিয়ে আয় করেন আরো ৩২ মিলিয়ন ডলার। মোট ৮৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেন বছরে রোনালদো। এদিক থেকে মেসি পিছিয়ে আছেন ৭ মিলিয়ন ডলার। তার আয় সব মিলিয়ে ৮১ মিলিয়ন ডলার।

বছরে বাংলাদেশি টাকায় ৬৮৮ কোটি টাকা আয় করে রোনালদো। আগামী বছর থেকে আরো বেশি আয় করবেন বলে ধারনা করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। কারণ ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর রোনালদো ক্লাবে ও স্পন্সরদের কাছে আরো বেশি গ্রহণ যোগ্যতা পাবেন।