Home প্রতিবেদন যাদের হারিয়েছি

যাদের হারিয়েছি

SHARE

গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ জন প্রিয় মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের মধ্যে আছেন অভিনেতা, অভিনেত্রী, সঙ্গীত পরিচালক সাংবাদিক। তাদের প্রতি আনন্দ আলোর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এক সাগরের গোবিন্দ হালদার

মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি অথবা এক সাগরের রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা ’৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এই গান স্বাধীনতাকামী মানুষের চেতনাকে শানিত করেছে। এই গানের রচয়িতা বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ গোবিন্দ হালদার। একাধারে তিনি কবি, সুরকার। সৃজনশীল এই গীতিকার ১৯৩০ সালে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁতে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য মৈত্রী সম্মাননা দেন। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন গোবিন্দ হালদার।

বড়পর্দার জাদুকর চাষী নজরুল

সদা হাস্যময় অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী পাঁচ দশকের অধিকসময় এদেশের চলচ্চিত্রে যিনি ছিলেন মধ্যমনি, সেই চাষী নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে রাত ১১ জানুয়ারি ২০১৫তে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তার দুই সন্তান- বড় মেয়ে সান্নি লেখাপড়া শেষ করে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ে আন্নি এক সময় অভিনয় করতেন। তারও বিয়ে হয়েছে। তার স্ত্রী জোসনা কাজী একজন গৃহিণী। চাষী নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তার ইচ্ছা ছিল চলচ্চিত্রে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করবেন। শুরুও করেছিলেন ১৯৫৫ সালে একটি প্রামাণ্য চরিত্রে অভিনয় কিন্তু এক সময় পর্দার পেছনে কাজ করতে করতে অভিনয় করার কথা ভুলে যান। ১৯৬০ সালে ফতেহ লোহানী নির্মিত আছিয়া ছবির সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে বীরের বেশে ফিরে এসে ১৯৭২ সালে নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য ছবি ওরা ১১ জন। তিনি জীবদ্দশায় ২২টি ছবি নির্মাণ করেছেন এর মধ্যে ৫টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। একুশে পদক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মাণ করেন শাস্তি ও সুভা। শরৎচন্দ্রের অমর কথা সাহিত্য দেবদাস নির্মাণ করেন দুই বার। তার উল্লেখযোগ্য ছবি- হাঙ্গরী নদী গ্রেনেড, বিরহ ব্যথা, বেহুলা লক্ষ্মিন্দার, পদ্মা মেঘনা যমুনা, দুই পুরুষ, মিয়া ভাই, হাসন রাজা, ভুল যদি হয়, অন্তরঙ্গ, বাসনা। এ ছাড়া কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার আত্মজীবনীমূলক সিনেমা শিল্পী নির্মাণ করেন।

গানের পাখি ফরিদা ইয়াছমিন

farida-yesminএদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রের একজন ফরিদা ইয়াছমিন। ষাট, সত্তর ও আশির দশকের চলচ্চিত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের ফরিদা ইয়াছমিন দাপটের সঙ্গে গান করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আছে পথ যেন ফুরাতে চায়না, প্রদীপ জ্বললে যদি ঘর আলো হয়, ফুলের হাওয়া লাগে বনে ওই, প্রেমে নয়ন অন্ধ, সারাদিন বইছে বাতাস, সে আসবে আজ আসবে, অনেক কিছু বলব আশায়, ওগো বন্ধু তুমি জীবনের খেলাঘর, কথা দাও ওগো বন্ধু তুমি সহ আরো অনেক জনপ্রিয় গানের কণ্ঠ শিল্পী তিনি। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ২০১৫ সালের ৮ আগস্ট ইন্তেকাল করেন ফরিদা ইয়াছমিন। ১৯৪১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা লুৎফর রহমান ছিলেন সিভিল সার্ভিস অফিসার। মা মৌলুদা খাতুনও ছিলেন কণ্ঠশিল্পী। ১৯৬২ সালে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে সেবা প্রকাশনীর প্রকাশক বিশিষ্ট লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই ছেলে কাজী শাহানুর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন। ফরিদা ইয়াছমিনের জন্ম এক বিশাল সঙ্গীত পরিবারে। তারা পাঁচ বোন। সবাই বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী। সবার বড় ফরিদা ইয়াছমিন, মেজ ফওজিয়া খান, সেজ ড. নাজমা ইয়াছমিন হক, এরপর নিলুফার ইয়াছমিন এবং সবার ছোট সাবিনা ইয়াছমিন।

নয়ীম গহর জন্ম আমার ধন্য হলো

noem-gohorজন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, নোঙ্গর তুলো তুলো সময় যে হলো হলোসহ মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ ও কালজয়ী অনেক গানের গীতিকার নয়ীম গহর মৃত্যুবরণ করেন ৬ অক্টোবর ২০১৫ তে। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এই সঙ্গীতজ্ঞের মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। নয়ীম গহর বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন যদি কিছু মনে না করেন-এর সূচনা সঙ্গীত রচনা করেন। ২০১২ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন।

এক সময়ের তারকা আদিল

চলচ্চিত্র অভিনয়ে এসেছিলেন নায়ক হতে কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অভিনয় করেন ভিলেন চরিত্রে। আদিল ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে কৌতুক অভিনেতা, পরিচালক হাসমত পরিচালিত এখানে আকাশ নীল ছবির মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু করেন। আদিল ২০১৫ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। আদিলের পৈতৃক নিবাস নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায়। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আদিল দুই’শর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ ছবিতে ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে আছে বন্দুক, মোকাবেলা, বারুদ, তাজ তলোয়ার, সওদাগর, নেপালী মেয়ে, বুলবুল-এ বাগদাদ, চন্দ্রলেখা, ঈমান উল্লেখযোগ্য। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী মালিয়া আক্তার মুন, মেয়ে মুনিয়া ও ছেলে বাবু বাইয়ানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

কৌতুক অভিনেতা চাঁদ প্রবাসী

টিভি ও চলচ্চিত্রের প্রবীন অভিনেতা চাঁদ প্রবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। চাঁদ প্রবাসী টিভি ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৬৫ সালে। ঢাকা বেতারের গ্রামীণ শ্রোতাদের আমার দেশ অনুষ্ঠানে রুস্তম আলী চরিত্রে পারফর্ম করে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এরপর চলচ্চিত্র ও টিভি মিডিয়ায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। শুধু কৌতুক অভিনতা হিসেবে নন সিরিয়াস অভিনেতা হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছেন চাঁদ প্রবাসী। তিনি শুধু ঢাকার ছবিতে নন কলকাতার ছবিতেও অভিনয় করেছেন। মৃত্যুর আগে চাঁদ প্রবাসী অসংখ্য ছবি ও নাটকে অভিনয় করে গেছেন।

বিনোদন সাংবাদিক মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন

চলচ্চিত্র অঙ্গনে দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা তিনি শুরু করেছিলেন খবর গ্রুপের সাপ্তাহিক ছায়াছন্দ পত্রিকার মাধ্যমে। তিনি এ পত্রিকার মাধ্যমে তার সুনাম যশ খ্যাতি অর্জন করেন। খ্যাতিমান এই চলচ্চিত্র সাংবাদিক মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের জন্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সঙ্গে ছিলেন আনন্দ আলোর একান্ত সুহৃদ।  মোহাম্মদ আওলাদ হোসেনের মৃত্যুকালে মেয়ে অপরাজিতা ও ছেলে মুন ও স্ত্রী মৌসুমী হোসেন কে রেখে গেছেন। ছেলে ও মেয়ে দু’জনই বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নরত।

কণ্ঠশিল্পী খেয়ালীর অকাল প্রয়াণ

না ফেরার দেশে চলে গেছেন চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ ২০১০-এর শিল্পী খেয়ালী কর্মকার। সেরাকণ্ঠ ২০১০ প্রতিযোগিতায় খেয়ালী যৌথভাবে দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর রাতে মালিবাগের বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে খেয়ালীকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। খেয়ালীর দেশের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। তার বাবা গৌরাঙ্গ কর্মকার একজন গানের ওস্তাদ। বাবার কাছেই খেয়ালী গানের তালিম নেন। খেয়ালীর একটি মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।

আরো যারা

গত বছর আমরা হারিয়েছি মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেত্রী অমিতা বসু, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শব্দসৈনিক রাশিদুল হোসেন, চলচ্চিত্রের ভিলেন অভিনেত্রী নাগমা, টিভি নাট্যকার ও নাট্য নির্দেশক ফারুক হোসেন এবং তরুণ রেডিও জকি প্রত্যয়।