মিউজিক ভিডিওর মাধ্যমে অনেকে ভালো নির্মাতা হয়েছে-সোহেল আরমান

মিউজিক ভিডিওর মাধ্যমে অনেকে ভালো নির্মাতা হয়েছে-সোহেল আরমান

634
SHARE

সোহেল আরমান, জাহাঙ্গীর হায়দার দিপন, নওয়াদ ইকবাল ও আসিফ এই চারবন্ধু মিলে ১৯৯৪ সালে বিটিভির ঈদের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান আনন্দ মেলায় হোম ভিডিও প্রতিযোগিতার জন্য একটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেন। নাম দেন ‘জল ছবি’। এতে গান পরিবেশন করেন দিপক, কথা ও সুর ছিল দিপনের। এতে মডেল ছিলেন লাবণ্য। মিউজিক ভিডিওটির দিকনির্দেশনা দেন সোহেল আরমান। তরুণ এই চার নির্মাতার মিউজিক ভিডিও আনন্দ মেলায় পুরস্কৃত হয়। এই মিউজিক ভিডিওটি এদেশে প্রথম বলে দাবি করেন বিশিষ্ট নির্মাতা সোহেল আরমান। তার সঙ্গে কথা হয় আনন্দ আলোর। লিখেছেন জাকীর হাসান…

আনন্দ আলো: নিজেকে প্রথম মিউজিক ভিডিও নির্মাতা বলে দাবি করেন আপনি। কিন্তু এর আগে তো বিটিভিতে অনেক মিউজিক ভিডিও প্রচার হয়েছে। যেমন- রুনা লায়লার ১০টি গান, সাবিনা ইয়াসমীনের ১০টি গান। এরকম আরো অনেক শিল্পীর একক গান স্টুডিও ও স্টুডিওর বাইরে দৃশ্যধারণ করে প্রচার করা হয়েছে। সেগুলোও তো মিউজিক ভিডিও?

সোহেল আরমান: না সেইগুলো মিউজিক ভিডিওর কনসেপ্টে তৈরি নয়। মিউজিক ভিডিও হচ্ছে গানের ফিকশন। একটি গানের কথা অনুযায়ী দৃশ্যধারণ করে উপস্থাপনা করা। যেমন- সিনেমা, নাটক, গল্প অনুযায়ী দৃশ্যধারণ করে উপস্থাপন করা হয় অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে। এটাও তেমনি, তবে টাইম ডিওরেশন কম। যে গানের কথা বললেন সেগুলো তো গানের কথা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। মডেল হিসেবে কেউ অভিনয়ও করেনি।

আনন্দ আলো: মিউজিক ভিডিও এদেশে কী ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো?

সোহেল আরমান: বিটিভির আনন্দ মেলার জন্য মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে পুরস্কৃত হওয়ার পর পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। চার বছর পর হঠাৎ একদিন দেশের প্রথম ডিজিটাল চ্যানেল, চ্যানেল আই-এ ডাক পড়লো আমার। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ভাই বললেন তোমাকে মিউজিক ভিডিও বানাতে হবে। তাঁর কথায় রাজি হয়ে ভালো মিউজিক ভিডিও নির্মাণের জন্য কম্পিউটারাইজড এডিটিং প্যানেল চাইলাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে প্যানেলের ব্যবস্থা করলেন। এভাবেই চ্যানেল আই প্রথম মিউজিক ভিডিও নির্মাণ ও প্রচার শুরু করে। চ্যানেল আইয়ের জন্য ১৯৯৮ সাল থেকে যে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছি তার মধ্যে খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পীদের গানই বেশি ছিল। যেমন- আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, বেবী নাজনীন, মেহরীন, আসিফ, কানিজ সুবর্না, বাপ্পা মজুমদার, ইবরার টিপুসহ অনেকে আছেন। নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরার গানেরও মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছি। এর আগে জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোরও মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছি। চ্যানেল আই-এর জন্য মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করার পর একুশে টিভিতেও আমার ডাক পড়ে। সেখানেও প্রায় ২৬টি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করি। আমার সঙ্গে তখন আরো ছিলেন জুবায়ের বাবু, রম্য রহিম। পরবর্তীতে নির্মাণে আসেন নব, তন্ময় তানসেন, গাজী শুভসহ অনেকে। যাদের মধ্যে অনেকে এখন মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে তারকা নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আমি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ থেকে দূরে সরে নাটক নির্মাণে ব্যস্থ হয়ে পড়ি। আমার এই মিউজিক ভিডিও নির্মাণের অভিজ্ঞতা নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় কাজে লেগেছে। যেমন- সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে মিউজিক ভিডিও সেগমেন্টের বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি সেই প্রথম থেকে। এবছর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চ্যানেল আই নির্মিত ফেরদৌস আরার চারটি গানের যে মিউজিক ভিডিও প্রচার হয় তার একটির নির্দেশনা দিয়েছি।

আনন্দ আলো: আমাদের দেশের বর্তমান মিউজিক ভিডিও সংস্কৃতি এখন কোন পর্যায়ে আছে?

সোহেল আরমান: একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করতেই হবে তা হলো- মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে অনেক তরুণ ভালো নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আমি নিজেই তো মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে এতদূর এগিয়েছি। মিউজিক ভিডিও এখন আমাদের দেশে শিল্পমাধ্যম হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই শিল্পকে উপজীব্য করে দুটি টিভি চ্যানেল গান বাংলা ও মিউজিক বাংলা সক্রিয় রয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য মিউজিক ভিডিও প্রচার হচ্ছে। যা তরুণ দর্শকদের আকৃষ্ট করছে। প্রশ্ন উঠতে পারে এদেশে মিউজিক ভিডিও কারা দেখে? আসলে এদেশের ইউটিউব চ্যানেলে শতকরা আশি জন মিউজিক ভিডিও দেখে। তাছাড়া মিউজিক ভিডিওর সিডি, ডিভিডি ও মোবাইল ফোনে মিউজিক ভিডিও আপলোড করা যায় যে কোনো জায়গা থেকে।

আনন্দ আলো: মিউজিক ভিডিও নির্মাণে লাভক্ষতির হিসেব কেমন?

সোহেল আরমান: মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে ক্ষতি হয়েছে এ কথা শুনিনি। এক লাখ দেড় লাখ টাকা খরচ করে এর ডবল আয় করছে অনেকে। যারা শখের বসে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করে তাদের কথা আলাদা। অনেক সঙ্গীত শিল্পী আছেন শখের বসে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেন। একটি ভালো মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বাণিজ্যিক ভাবে বিশাল অঙ্কের মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করার মতো স্পন্সর পাওয়া আমাদের দেশে কঠিন।

আনন্দ আলো: আপনার নিয়মিত মিউজিক ভিডিও নির্মাণ না করার কারণ কী?

সোহেল আরমান: আমি এখন নাটক এবং সিনেমা নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত। সময় পাইনা মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করতে। তবুও সময় সুযোগ ও ভালো বাজেট পেলে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করি। এ পর্যন্ত প্রায় ২০০’র বেশি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছি আর কত? প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলতে চাই, আজকে মিউজিক ভিডিও যে শিল্প মাধ্যম হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে এবং যাদের সহযোগিতা ও মেধা মননে এগিয়ে চলেছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, বিটিভির কর্মকর্তা ফিরোজ মাহমুদ, একুশে টিভির সেই সময়ের ম্যানেজমেন্ট, আইয়ুব বাচ্চু, বামবাসহ অনেক শিল্পী কলাকুশলী।