মা ও মেয়ের নাটকীয় গল্প

মা ও মেয়ের নাটকীয় গল্প

1339
0
SHARE
ma-meye

সৈয়দ ইকবাল: চারপাশের পরিবেশ মুহূর্তেই আবেগময় হয়ে উঠল। নাট্যব্যক্তিত্ব রোকেয়া রফিক বেবীর আবেগঘন কথায় পরিবেশটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল। তার প্রয়াত স্বামী নাট্যজগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এস এম সোলায়মানকে নিয়েই দেখা দিয়েছে সেই আবেগঘন মুহূর্ত। স্বামীকে নিয়ে কথা বলার এক ফাঁকে আবেগ সামলাতে পারলেন না গুণী এই নাট্যজন। মেধাবী মেয়ে তরুণ নাট্যকার আনিকা মাহিন একাকে নিয়ে এসেছিলেন আনন্দ আলোর কার্যালয়ে। সম্প্রতি একার লেখা ‘মর্ষকাম’ মঞ্চনাটকটি নির্দেশনা দেন মা রোকেয়া রফিক বেবী। মূলত সেই বিষয়ে কথা বলার জন্যই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল দু’জনকে। সেদিনের সেই আলাপচারিতায় ঊঠে আসে বাংলাদেশের টিভি, মঞ্চনাটক সহ সংস্কৃতির নানান বিষয়। আর বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের কথা উঠলেই এস এম সোলায়মান নিশ্চিত ভাবে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠবেন এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারেই কথা বলতে বলতে আবেগে আপ্লুত হয়ে যান রোকেয়া রফিক বেবী। স্বামীর গড়ে তোলা নাটকের প্রতিষ্ঠান থিয়েটার আর্ট ইউনিটকে যিনি কি না আগলে রেখেছেন পরম যত্নে, পরম মমতায়।

আলোচনার শুরুতে রোকেয়া রফিক বেবীর কাছে মেয়ের লেখা নাটক নির্দেশনা দেয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। একটু যেন ভাবলেন তিনি। তারপরে বললেন- ‘আমার একটা কমিটমেন্ট ছিল এই প্রজন্মের নাট্যকারদের নাটকে কাজ করার। সেই দিক থেকে একার লেখা নাটকের নির্দেশনা দিয়েছি- অবশ্যই অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। আমার মেয়ে নাটকটি লিখেছে- এই বিষয়টা আমার মাথায় একবারও আসেনি। আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে একজন তরুণ যে কি না নতুন কিছু চিন্তা করেছে- তার লেখা নাটক নির্দেশনা দিয়েছি। আর এই নাটকে নবীন এবং অভিজ্ঞ শিল্পীরা একসাথে কাজ করেছেন। সুর-গান-কোরিওগ্রাফিসহ নাটকের পাত্র-পাত্রীদের হাঁটা চলায় একদম নতুন কিছু করার চেষ্টা ছিল। আর পুরো কাজটা একটা সুন্দর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছে। রিহার্সেলও হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। সত্যিই ভালো লাগছে কাজটি করে।

মায়ের দেয়া নির্দেশনা নিয়ে এবার মুখ খুললেন মেয়ে। কথায় কথায় একা বললেন, আমি প্রায় ১৫ বছর ধরে থিয়েটার করি। আমি থিয়েটার আর্ট ইউনিটের একজন সক্রিয় কর্মী। তাই থিয়েটারে অভিনয় এবং নাটকের বিভিন্ন বিষয় আমাকে আন্দোলিত করে ছোটবেলা থেকেই। ‘মর্ষকাম’ আমার লেখা প্রথম নাটক। তবে প্রথম মঞ্চস্থ নাটক হচ্ছে ‘ম্যাকাব্রে’। সে যাই হোক। আমার মা নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন বিষয়টা একবারও মাথায় আসেনি। আমি লিখেছি। নাটকটি তার পছন্দ হয়েছে এবং মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নেন সেটা পর্যন্তই আলোচনা। এরপর একবার কী দু’বার নাটকটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। একটা জায়গায় তো অবশ্যই ভালো লাগছে যে, আমার লেখা নাটক মা নির্দেশনা দিয়েছেন।

মেয়ের লেখালেখি নিয়ে এবার মায়ের সঙ্গে আলোচনা। আপনি কি চেয়েছিলেন মেয়ে নাটক লিখুক? এমন প্রশ্নে রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, ছোটবেলায় একা রিদমিক কবিতা লিখতো। তার লেখার ভেতর একটা ছন্দ আমি আবিষ্কার করেছি। কারণ তার ভাবুক ভাবুক মন আমাকে সেই আত্মবিশ্বাসটা এনে দেয়। একসময় ওকে লেখার বিষয়ে চাপ দিতে থাকি। কিন্তু সে কিছুতেই লিখতে রাজি হয় না। নানান ভাবে বুঝিয়ে নাটক লেখার বিষয়ে তার মনের ভেতরে আগ্রহ সৃষ্টি করেছি। আমার বিশ্বাস ছিল ও নাটক লিখলে খুব ভালো লিখবে।

মায়ের কথাগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল মেয়ে। মায়ের কথা শেষ হতেই একা বলে উঠলেন, প্রথম প্রথম মায়ের কথায় কিছুটা বিরক্ত হতাম। আমি লিখবো না, লিখবো না বলেই যেতাম। কিন্তু মা নাছোড়বান্দা ছিল। শেষমেশ মা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে ছাড়লেন। সত্যিই মায়ের উৎসাহ এবং আগ্রহ ছাড়া নাটক লেখা সম্ভব ছিল না।

মেয়ের কথার সঙ্গে মিলিয়ে রোকয়ো রফিক বেবী বলেন, আমি ওকে লেখার বিষয়ে শুধু উৎসাহই দেইনি। লেখার মধ্যে ওর বাবার বিষয়গুলোও টেনে এনেছি। যেমন- একার টেবিলে আমি সবসময় ওর বাবা যে খাতায় লিখতো সেই খাতাগুলো রেখে দিতাম। কারণ আমি চাইতাম ও ওর বাবার স্পর্শটুকু যেন সব সময় অনুভব করতে পারে।

ma-meye-1আড্ডার এক পর্যায়ে শুরু হয় ‘মর্ষকাম’ নিয়ে আলোচনা। নাটকটির মূল বিষয় নিয়ে কথা বলেন নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী। তিনি বলেন, এই নাটকের মূল্য উপজীব্য হচ্ছে- এর মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। কীভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে তা দেখানো হয়েছে।

কোন ভাবনা থেকে এমন একটি নাটক লিখেছেন? এমন প্রশ্নে একা বলেন, সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি এবং ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো আমাকে খুব আলোড়িত করেছে। সেই চিন্তা থেকেই এটি লেখা।

‘মর্ষকাম’ নাটকটি অনেক বড় পরিসরে নির্দেশনা দেয়ার মতো একটি নাটক। তাই চাইলেই যেকোনো জায়গায় এটি মঞ্চস্থ করা সম্ভব নয়। ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে এটি মঞ্চায়নের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে বলে উল্লেখ করে বেবী বলেন, সব নাটক কিন্তু চাইলেই সব জায়গায় মঞ্চায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমাদের থিয়েটার আর্ট ইউনিটের অনেক নাটক আছে। ‘মর্ষকাম’ না হয় একটি নাটকই থাকলো যা শুধু শিল্পকলা কিংবা অন্য দু একটি জায়গায় মঞ্চস্থ করা যাবে।

মা মেয়ের আড্ডা ক্রমেই জমে ওঠে। নাটক লেখালেখি এবং নির্দেশনা নিয়ে দু’জনের কথোপকথনে প্রাণ ছুঁয়ে যায়। রোকেয়া রফিক বেবী মেয়ের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আমার মেয়েটা বেশ শান্ত। ধীরও বলা যায়। তবে ওর মনের মধ্যে একটা গভীরতা আছে। অনেক কিছু সে প্রকাশ করে না। তবে সময় মতো কাজটা করে খুব সুন্দরভাবে তা বুঝিয়ে দেয়। ও খুব ভালো গান করে।

মা সম্পর্কে একা বলেন, থিয়েটারে ডিসিপ্লিন বলে একটা কথা আছে। সেটা আমি মায়ের কাছ থেকে শিখেছি। একজন মানুষ যে এত নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে চলতে পারে- সেটা মাকে না দেখলে জানাই হতো না। তার মতো ডিসিপ্লিন হয়ে ওঠা সম্ভব না আসলে। এটা সবাই ধারণ করতে পারে না।

আড্ডার একেবারেই শেষ পর্যায়ে চলে আসি আমরা। মা ও মেয়েকে এবার নাট্যজগতের কিংবদনিৱ এস এম সোলায়মান সম্পর্কে বলতে বলা হয়। নাট্যজগতের বিশিষ্ট এই মানুষটি একজনের স্বামী ও অন্যজনের বাবা। রোকেয়া রফিক বেবী বলেন, এস এম সোলায়মান বাংলাদেশের নাট্যজগতে অনেকের আইকন। আজকে যারা বাংলাদেশের নাট্যজগতে বিচরণ করছেন তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে তাকে আইডল মানেন। যারাই থিয়েটার করবেন তাদের প্রত্যেকেরই সোলায়মানের পাগলামিকে ধারন করে থিয়েটারটা করা উচিত। তিনি পাগলামি করেই আজকের বাংলাদেশের থিয়েটারকে একটা জায়গায় এনেছেন। তাই তারমতো পাগলামিটা যারা করতে জানেন কিংবা যারা করছেন তাদের কিন্তু আশপাশটা প্রেরণা দিতে থাকে। কারণ যার মধ্যে এই পাগলামিটা শুরু হয় তিনি তখন এমন একটা স্তরে উঠে যান ভাবনার জগৎটাকে নিয়ে যেখানে বৈষয়িক, সাংসারিক, কিংবা পরিবার তার কাছে খুব তুচ্ছ হয়ে যায়। নিতান্তই এগুলো সাধারণ একটি ঘটনা মাত্র। অকল্পনীয় ভাবে সংসারের ভেতরে থেকে একজন মানুষ সংসারের অনেক ঊর্ধ্বে চলে যান। সোলায়মান ঠিক তেমনি একজন মানুষ ছিলেন। সংসারের ভেতরে থেকেও সংসারের কোনো কিছুই যাকে ছোঁয়নি। অথচ তিনিই একটা বিরাট সংসার গড়েছেন। নাটকের সংসার। আমাদের থিয়েটার আর্ট ইউনিট। যেখানে সোলেমান একমাত্র সোলেমানই আমাদের প্রেরণা যোগাচ্ছেন প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ… বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো…

চোখ বেশ ছলছল করে উঠেছে তার। চোখের কোণে পানি জমে গেছে। টেবিলের উপর রাখা টিসু বক্স থেকে একটা টিসু টেনে নিয়ে চোখের কোণায় আলতো করে ছোঁয়ালেন। মায়ের মুখে বাবা সম্পর্কে এমন কথা শুনে পাশে বসে থাকা মেয়েটিরও চোখ ছলছল করছিল। পাঠক, বোধকরি আপনাদেরও তাই হচ্ছে…