ভালোবাসার মূলমন্ত্র প্রকৃতি : মুকিত মজুমদার বাবু

ভালোবাসার মূলমন্ত্র প্রকৃতি : মুকিত মজুমদার বাবু

1641
SHARE

“ভালোবাসা তুমি অনাবৃষ্টিতে কেমন রুক্ষ, কী দগ্ধ আজকাল তারা-পাতা নেই, পাখিরা উধাও; ভীষণ রিক্ত তোমার সলাজ ডাল…” প্রকৃতির ভালো-মন্দের সাথে আমাদের রয়েছে গভীর যোগসূত্র। প্রকৃতি অসুস্থ, রুগ্ন, রুক্ষ কিংবা বৈরী হলে তার প্রভাবে প্রভাবিত হই আমরা। প্রকৃতি স্বচ্ছ, শান্ত, স্নিগ্ধ, রঙিন থাকলে মানুষের মনেও ছড়িয়ে যায় সেই শান্ত, স্বচ্ছ রঙিনের মায়াবী স্নিগ্ধতা। মায়ের সাথে যেমন ভ্র“ণের সম্পর্ক, প্রকৃতির সাথে তেমনি জীবনের। অবলীলায় তাই স্বীকার করতেই হবে আমরা প্রকৃতিরই সন্তান। এ অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অব্দি চলছে। চলবে প্রকৃতি ও জীবন যত দিন পৃথিবীতে থাকবে। প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটা প্রমাণিত যে, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কর্ম ক্ষমতা, আকার-আকৃতি, চলন-বলন, স্বভাব-চরিত্র ওই অঞ্চলের প্রকৃতির প্রভাবেই প্রভাবিত। এটা সহজেই অনুমেয় যে, শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষের কর্মকান্ড আর নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের মানুষের কর্মকান্ড এক নয়। আমরা যদি প্রমাণিত এই সত্যটি মেনে নেই তাহলে অবশ্যই আমাদের প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে। আর এটা করতে হবে আমাদের নিজেদের স্বার্থে। আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। এক এক ঋতুতে প্রকৃতি এক এক রূপে পরিবর্তিত হয়। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহে যেমন অস্থির করে তোলে প্রাণপ্রকৃতি তেমনি শীতের হিমেল হাওয়াও প্রাণীকুলকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়। বর্ষার রিমঝিম বারিধারা যেমন স্মৃতিকাতর করে তোলে মানুষের মন তেমনি শরতের স্বচ্ছতা, নির্মলতা, পবিত্রতা আর রাতের রুপালি চাঁদের আলোর জোয়ার ভাসিয়ে নিয়ে যায় অন্য কোনোখানে, অন্য কোনো ভুবনে। গর্ভবতী ফসলের মাঠ, হালকা কুয়াশা আর নবান্ন উৎসবই হেমন্তের কথা বলে। ফুল-পাখি-লতা-পাতার সাথে উচ্ছ¡সিত মানুষের হৃদয়ে আসে বসন্ত। ঋতুরাজ বসন্ত। ফুলেল বসন্ত। ভালোবাসার বসন্ত। প্রকৃতির উৎফুল­তায় মানবপ্রকৃতিও হয়ে ওঠে চঞ্চল। এই উচ্ছলতা, উদ্যোমতা হারিয়ে যায় যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে প্রকৃতি। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই আমরা অবিবেচকের মতো জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে চলেছি। ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকার কারণে শুরুতে এর মাত্রা ছিল কম। ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা এখন আগের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। একবার ভেবে দেখুনতোÐ আপনজনের হাত ধরে কোনো বহতা নদীর কূলে কিংবা কোনো নিরিবিলি ছায়া সুনিবিড় উদ্যানে গিয়ে বসলে নদী ও উদ্যানের পরিবেশ যদি ভালো না থাকে তাহলে ভালোবাসাও ভালো লাগবে না। চারপাশে পাখি যদি মিষ্টি মধুর সুরেলা ছন্দে গান না গায় তাহলে মন প্রফুল­ হয় না। গাছে গাছে যদি ফুল না ফোটে, সৌরভ না ছড়ায় তাহলে ভালোবাসাও পূর্ণতা পায় না। ফাগুনের বাতাস যদি না বয়ে যায় তাহলে মনে আসে না যৌবনের বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ¡াস। আজ যথেচ্ছ পরিযায়ী পাখি শিকার হচ্ছে, বনের ভেতর করাতকল বসিয়ে সংরক্ষিত বন উজাড় করা হচ্ছে, পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোনো গর্ত ভরাট করে আবাসিক এলাকা নির্মাণ করতে কিংবা ইটের ভাটায় মাটির জোগান দিতে, নদী দখল, ভরাট আর দূষণ দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় বলি হচ্ছে হাজার হাজার গাছ, কৃষি জমির টপসয়েল যাচ্ছে ইটভাটা ও সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালের কারখানায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে একদিকে যেমন আবাদি জমি কমছে তেমনি ঝোপ-জঙ্গল-উঁচুবৃক্ষ উজাড় হচ্ছে, অবিবেচকের মতো নদীর বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মাটি হয়ে যাচ্ছে বন্ধ্যা, অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, আবাসিক প্রকল্পগুলো দখল করে নিচ্ছে শহরের চারপাশ, বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গেছে যে বর্তমানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যার কারণে প্রায়ই আঘাত হানছে ভূমিকম্প, জলোচ্ছ¡াস, ঘুর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের ওপর ন্যস্ত থাকলে তাকে পাশ কাটিয়ে আমরা দিব্যি প্রকৃতিপ্রেমী ভাবখানা চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলছি। স্বউদ্যোগে খুবই কম সংখ্যক মানুষই এগিয়ে আসছে প্রকৃতি সংরক্ষণে। যারা প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন তারাও অনেক সময় অসৎ ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক প্রলোভনে প্রকৃতির ক্ষতি করে যাচ্ছে। যেখানে প্রকৃতির অস্তিত্ব থাকবে না সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন। ভালোবাসাতো পরের কথা। সুস্থ প্রকৃতিই ভালোবাসায় পূর্ণতা দিতে পারে। তাই প্রকৃতিকেই আখ্যায়িত করা যায় ভালোবাসার মূলমন্ত্র হিসেবে। লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন