ভালোবাসার উত্তম পুরুষ!

ভালোবাসার উত্তম পুরুষ!

869
SHARE
Uttam-Suchitra

লোকজন শুধুই তার দিকে তাকাচ্ছে। কারও চোখে সন্দেহ। কারও চোখে আনন্দ। কিছুক্ষণ আগে একটি মেয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। যাবার সময় মোবাইলে সেলফি তুলেছে। এই মাত্র একটি মেয়ে আর একটি ছেলে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওরা বাজি ধরেছে। মেয়েটি বলছে এই লোক মহানায়ক উত্তম কুমার। ছেলেটি  বলছেÑ অসম্ভব! এটা হতেই পারে না। উত্তম কুমার পৃথিবীতে নাই। কাজেই ঐ লোক উত্তম কুমারের মতো দেখতে অন্য কেউ।

মেয়েটি লোকটির সামনে এসে দাঁড়াল।

ভাই আপনার নাম?

লোকটি শীতল কণ্ঠে উত্তর দিলেনÑ আমার নাম জেনে কি করবেন?

মেয়েটি বললÑ আমরা আপনার ব্যাপারে বাজি ধরেছি। আমার ধারণা আপনি মহানায়ক উত্তম কুমার। আর আমার বন্ধুর ধারণা আপনি উত্তম কুমার নন। উত্তম কুমারের মতো কেউ।

লোকটি মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করলো। মেয়েটি নাম বললো, তমা ইসলাম।

তোমাকে তুমি করে বলতে পারি?

তমা মাথা নেড়ে বললÑ অবশ্যই।

লোকটি বললÑ তোমার বন্ধুর নাম বল। তমার বন্ধু এগিয়ে এসে নিজের নাম বললÑ আমার নাম অরুণ।

লোকটি মৃদু হেসে বললেনÑ উত্তম কুমারের আসল নাম কিন্তু অরুণ, এটা জানো তোমরা?

তমার বন্ধু বললÑ হ্যাঁ জানি। উত্তম কুমারের আসল নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর।

অরুণের কথায় লোকটি খুশি হয়ে বললেনÑ তুমি দেখি উত্তম কুমার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানো। তোমার কেন মনে হচ্ছে আমি উত্তম কুমার না। উত্তম কুমারের মতো অন্য কেউ… ?

অরুণ বললÑ এটা তো সহজ হিসাব। জন্মের পর আসে মৃত্যু। মৃত্যুর পর আর কোনো নিশানা থাকে না। উত্তম কুমার মারা গেছেন। কাজেই এই পৃথিবীতে তার ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনা নাই। লোকটি এবার গম্ভীর হয়ে বললেনÑ আমি যদি প্রমাণ করতে পারি আমিই উত্তম কুমার, তাহলে…

লোকটির কথা শুনে তমা হাত তালি দিয়ে বললÑ আমি বলেছিলাম না ইনিই উত্তম কুমার। কি আমার কথা সত্যি হলো তো? তমাকে থামিয়ে দিয়ে অরুণ বললÑ অসম্ভব এই লোক উত্তম কুমার না। মৃত মানুষ কখনও বেঁচে ওঠে দেখেছিস? উত্তম কুমার সেই কবে ১৯৮০ সালে মারা গেছেন।

তমা জোর দিয়ে বললÑ আমি নিশ্চিত এই লোক আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক। ইস্ আমার যে কি খুশি লাগছে। এক কাজ করি মিডিয়ায় খবর দেই। সবাইকে উত্তম কুমারের কথা বলি। দেখিস একটা হৈ চৈ পড়ে যাবে। বলেই মোবাইল ফোনে একটা নাম্বার টিপতে যাচ্ছিল তমা। অরুণ ধমক দিয়ে বললÑ তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কেউ তোর কথা বিশ্বাস করবে না। মৃত মানুষ কখনও এভাবে পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার আসে না। এই লোক উত্তম কুমারের মতো দেখতে অন্য কেউ।

অরুণের কথায় মোটেই গুরুত্ব দিল না তমা। লোকটির সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলোÑ প্লিজ বলেন তো আপনি কে? লোকটি বললেনÑ বললাম তো আমি উত্তম কুমার।

কিন্তু অরুণ তো সেটা বিশ্বাস করছে না।

লোকটি বললÑ এই বিশ্বাসের ব্যাপারটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা দু’জনই নিশ্চয়ই সিনেমা দেখতে পছন্দ করো?

তমা বললÑ হ্যাঁ।

লোকটি বললেন, সিনেমায় কি হয়? একজন মানুষ, অন্য একজন মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে। আমরা দর্শক তাকে বিশ্বাস করি বলেই সে অভিনেতা হয়ে ওঠে। তোমাদের যদি বিশ্বাস করতে মন চায় যে আমিই উত্তম কুমার তাহলে তো আর ঝামেলা থাকে না। উত্তম কুমার, উত্তম কুমারই থেকে যায়। কি বলো অরুণ? তুমি কি করো? লোকটির প্রশ্ন শুনে অরুণ বললÑ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্মের ওপর পড়াশোনা করছি।

গুড। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? ডিরেকশন দিবে নাকি অ্যাকটিং…?

আমি ডিরেকশনেই থাকতে চাই। আপনাকে একটা প্রশ্ন করবো?

করো।

আপনি সত্যি সত্যি কে বলুন তো।

লোকটি এবার বিরক্ত বোধ করলেন। গম্ভীর হয়ে বললেনÑ তোমরা কি সত্যি সত্যি জানতে চাও যে আমি কে?

হ্যাঁ।

তাহলে চোখ বন্ধ করো।

চোখ বন্ধ করবো, কেন?

যা বললাম করো।

অরুণ এবং তমা দু’জনই চোখ বন্ধ করলো। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখলো লোকটি নাই। ঘটনাটি নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে একটা গল্প তৈরি হলো। গল্পটা এরকমÑ ঢাকার শাহাবাগস্থ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি ক্যাম্পাসে মহানায়ক উত্তম কুমারের মতো একটি লোকের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল। হঠাৎ দেখা গেল লোকটি উধাও। এ ব্যাপারে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছে। এক পক্ষ বলিতেছে এ ধরনের ঘটনা ঘটে নাই। অন্য পক্ষ বলিতেছেন ঘটনা ঘটিয়াছে। তবে ঘটনায় দেখার ভুল ছিল ইহা নিশ্চিত।

 

তমা ও অরুণকে ঘিরে ধরেছে তার বন্ধুরা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছে। তোরা কি সত্যি সত্যি উত্তম কুমারকে দেখেছিস? নাকি এমনি এমনি ক্রেডিট নিচ্ছিস? তমা আর অরুণ যতই বলে ঘটনা সত্য, বন্ধুরা ততই তাদেরকে ভৎর্সনা করতে থাকে। মিনহাজ নামে ওদের এক বন্ধু সবাইকে শুনিয়ে বলতে থাকেÑ তমা আর অরুণ আজ জেগে স্বপ্ন দেখেছে। দু’জনকে আসুন করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানাই।

মিনহাজের কথা শুনে করতালির বদলে সবাই ভুয়া ভুয়া ধ্বনিত দিতে থাকলো। তমার খুব খারাপ লাগছে। অরুণেরও। দু’জনের মধ্যে একজন দেখলে না হয় দেখার ভুল বলে চালিয়ে দেয়া যেত। দু’জনের তো দেখার ভুল হতে পারে না। তবে তমার মনে একটা খটকা দেখা দিয়েছে। উত্তম কুমারের সঙ্গে সেলফি তুলেছিল সে। অথচ মোবাইলে সেটা নাই। তাহলে কি ব্যাপারটা দেখার ভুল ছিল? ভুল না হলে তো সেলফি উঠার কথা।

বন্ধুরা ভুয়া ভুয়া ধ্বনি দিচ্ছে। তমা আর অরুণ কি করবে বুঝতে পারছে না। জলজ্যান্ত একটা লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তার সঙ্গে কথাও হয়েছে। অথচ এখন তা প্রমাণ করা যাচ্ছে না। তমা মনে মনে বললÑ একবার আর একবার দেখা দিন উত্তম কুমার। প্লিজ…

 

প্রশ্নটা তো জ্বালিয়ে মারছে। যেই দেখে সেই প্রশ্ন করছে দাদা, আপনি কি উত্তম কুমারের কেউ হন? উত্তর দিতে দিতে বিরক্তি ধরে গেছে। লোকটি ভাবলো আর পৃথিবীতে নয়, এবার পরপারে যেতে হবে। হঠাৎ তার মনে হলো এই যে পৃথিবীতে এলাম, কি দেখলাম? কি নিয়ে পরপারে যাচ্ছি? একটা পরিষ্কার ধারণা তো থাকা দরকার। কিন্তু ভক্তদের যন্ত্রণায় তো টেকা দায়। হঠাৎ কেন যেন তমা আর অরুণের কথা মনে পড়লো। ওদেরকে কিছু না বলে এভাবে উধাও হওয়াটা ঠিক হয়নি। চেহারা বদলে ওদের সঙ্গে আবার দেখা করার কথা ভাবলেন তিনি।

অরুণ আর তমা কলেজে ক্যাম্পাসের আমতলায় বেঞ্চির ওপর বসে আছে। দু’জনের এখনও ঘোর কাটেনি। একটা মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে। চোখ ফেরাতেই দেখা গেল সে নাই। এইটা কি জাদু নাকি?

একটা লোক তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বিদঘুটে চেহারা। তমা আর অরুণের সামনে দাঁড়িয়ে বললÑ আমি কি আপনাদের কোনো কাজে আসতে পারি!

তমা বিরক্ত হয়ে বললÑ আপনি কে? আপনি আমাদের কাজে আসবেন মানে?

লোকটি বললÑ আমি উত্তম কুমার।

অরুণ যার পর নাই বিরক্ত হয়ে লোকটিকে ধমক দিলÑ অয় মিয়া ফাইজলামির আর জায়গা পেলেন না, না? আপনি উত্তম কুমার? আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছেন?

লোকটি মৃদু হেসে বললÑ চেহারাতো আসল ব্যাপার নয়, আসল ব্যাপার হলোÑ বিশ্বাস। বাতাস কি দেখা যায়? যায় না। গাছের পাতা নড়লে আমরা তাকে বাতাস বলি। ওটাতো গাছের পাতা। বাতাস কোথায়? এটাই হলো বিশ্বাস। আমিই উত্তম কুমার এটা বিশ্বাস করছেন না আপনারা?

না। আপনি যে উত্তম কুমার তার প্রমাণ কি?

প্রমাণ দিতে হবে?

হ্যাঁ দিতে হবে। কি প্রমাণ আছে বলেন।

লোকটি মৃদু হেসে একটা গল্প বলতে শুরু করলেন। সিনেমায় আসার আগে আমার নাম ছিল অরুণ কুমার। জীবনে প্রথম অভিনয় করবো। ডাক্তার সেজে ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়াব। হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। তাই দেখে টেকনিশিয়ানরা হাসাহাসি করলো। তাদের ভাবটা এমনÑ কোত্থেকে যে এই আপদ এসে ঢুকেছে! পরের দিন স্টুডিওতে ঢুকলাম। টেকনিশিয়ানরা টিপ্পনী কাটছে। ভেবেছিলাম এই জগতে কাজ করবো না। ফিরে যাব। কিন্তু মনের মাঝে হঠাৎ বিদ্রোহ দেখা দিল। পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটু আগে যারা বিদ্রƒপ করছিলো তাদেরকেই অফার করলাম। তারপরের দিন তাদেরকে টোস্ট আর ওমলেট খাওয়ালাম। ব্যস বদলে গেল পরিবেশ। টেকনিশিয়ানরা আমার ওপর বেজায় খুশি।

আরেকটা ঘটনা বলি। তখন আমি অনেক নাম করেছি। গ্রামে শুটিং করতে গেলেই মানুষের ভিড় ঠেকানো যায় না। একদিন দেখি কি এক মহিলা দেয়াল টপকে আমাকে দেখার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছিল পা ফসকে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙতে পারে। তাই তাকে বললামÑ এই যে আপনি দেয়াল থেকে নামেন প্লিজ… মহিলা চিৎকার দিয়ে বললেনÑ দাদা চিন্তার কারণ নাই। আমি আমার স্বামীর পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছি!

এই পর্যন্ত বলে থামলেন লোকটি। তমা ও অরুণের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেনÑ এবার কি বিশ্বাস হচ্ছে আমিই উত্তম কুমার। অরুণ বিশ্বাস করলেও তমা বললÑ আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। যে গল্পগুলো বললেনÑ সেটা তো যে কেউ বলতে পারে। হয়তো কারও কাছে শুনেছেন। আর কি প্রমাণ আছে আপনিই উত্তম কুমার?

লোকটি এবার মুচকি হেসে বললেনÑ আমিই উত্তম কুমার কি উত্তম কুমার না এই প্রমাণ দেয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। আমি কে সেটা আমি জানি! আপনি নিজে কে সেটাও বোঝার চেষ্টা করবেন। নিজেকে আগে জানবেন তাহলে অন্যকে জানাটা সহজ হবে। বলেই আবার উধাও হয়ে গেলেন লোকটি।

 

এবার গল্পের ডালপালা নতুন ভাবে গজাল। সত্যি সত্যি বাংলাদেশে এসেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। চলচ্চিত্র প্রেমীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই থেকে বদলে গেছে আমাদের চলচ্চিত্রের পরিবেশ। এটাই বিশ্বাসের গল্প।