ভাঙনই সত্যি হলো!

ভাঙনই সত্যি হলো!

SHARE
Shakib-Apu

জীবন চৌধুরী: শাহরুখ খানের জীবনের সঙ্গে মিল রেখে আমাদের শাকিব খান তার জীবনকে সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন কি না সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এটা বলা যায় যে, শাহরুখ খানের জীবনের সঙ্গে তার অনেক মিল আছে।

মিল নম্বর এক. শাহরুখ খানের মুম্বাইয়ের বাড়ির নাম জান্নাত। আর আমাদের শাকিব খানের গাজীপুরের বাড়ির নাম জান্নাত।

মিল নম্বর দুই. শাহরুখ খান মুসলমান হয়েও হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়ে গৌরিকে বিয়ে করেছেন। আমাদের শাকিব খানও মুসলমান হয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়ে অপু বিশ্বাসকে বিয়ে করেছেন।

মিল নম্বর তিন. শাহরুখ খানের ছেলের নাম আব্রাম। আর আমাদের শাকিব খানের ছেলের নাম আব্রাহাম। তবে দু’জনের মধ্যে একটা অমিল আছে। সেটা হলো শাহরুখ খান তার স্ত্রী সন্তানকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আর আমাদের শাকিব খান তার স্ত্রী অপু বিশ্বাসকে প্রচÐ ঘৃণা করেন। ছেলেকে ভালোবাসেন কিন্তু ছেলের মায়ের ব্যাপারে দারুণ বিতৃষ্ণা তার। সেজন্য নাটকীয় বিয়ের খবর ফাঁস হবার মাত্র কয়েকমাস পরই শাকিব খান তার স্ত্রী অপু বিশ্বাসকে তালাক দিয়েছেন। স্ত্রী অপু বিশ্বাস বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বলেছেন, শাকিব খানের এই ‘তালাক’ সিদ্ধান্ত তিনি মানেন না। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তিনি মন্তব্য করেছেন, শাকিব খান তাকে জোর করে বিয়ে করেছেন। ধর্মান্তরিতও করেছেন জোর করে। কাজেই শাকিব খান তাকে ত্যাগ করতে পারেন না। এ ব্যাপারে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের বিয়ের তারিখ নিয়েও দু’জন দুরকমের কথা বলছেন। অপু বিশ্বাস এতদিন ২০০৮ সালের ১৮ এপ্রিলকে তাদের বিয়ের তারিখ হিসেবে বলে আসছিলেন। ডিভোর্স লেটারে শাকিব খান তাদের বিয়ের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ২০০৮ সালের ১৬ মার্চকে। অর্থাৎ অপু বলছেন ২০০৮ সালের ১৮ এপ্রিল তাদের বিয়ে হয়েছে। অন্যদিকে শাকিব বলছেন এপ্রিলে নয় মার্চে তাদের বিয়ে হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো বিয়ের কাবিন নামায় উল্লেখ করা দেন মোহরের অর্থ নিয়েও দু’জনের কথায় কোনোই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শাকিব খান বলছেন তাদের বিয়েতে দেন মোহর ধার্য করা হয়েছিল ৭ লাখ ১ টাকা। অন্য দিকে অপু বলছেন দেন মোহরের অঙ্ক ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। ফলে এই তারকা দম্পত্তির বিয়ে এবং ডিভোর্স পরবর্তী সংবাদ মুখ রোচক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ প্রচার মাধ্যমে দু’জনকে ঘিরে নানা মন্তব্য করা হচ্ছে।  অনেকের মন্তব্য ছাপার অক্ষরে মোটেই প্রকাশ যোগ্য নয়। অথচ শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে স্তরের তারকা সে ক্ষেত্রে দেশ ব্যাপি তাদের অসংখ্য ভক্ত থাকার কথা। তারা অনেকের আইডল হয়ে ওঠার কথা। অথচ আইডল তো দূরের কথা তারা দু’জন বিশেষ করে শাকিব খান সামাজিক মাধ্যম সমূহে দারুণ বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন।

আনন্দ আলোর গত সংখ্যায় শাকিব ও অপু বিশ্বাসের সংসার জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাভার স্টোরি প্রকাশ হয়েছে। সেখানে অপু ও শাকিব খানের বিচ্ছেদ কী আসন্ন এ ব্যাপারে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আনন্দ আলোর পাঠক, পাঠিকারা এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অধিকাংশরাই শাকিব খানকে দোষারোপ করেছেন। প্রিয়ন্তি সাহা নামে এক কলেজ ছাত্রী লিখেছেন, ‘নকল করে সিনেমা চলে। কিন্তু জীবন নয়। একটা মেয়ে তার জীবন, তার ক্যারিয়ার তার ধর্ম বিসর্জন দিল। স্বামীর ক্যারিয়ারের কথা ভেবে জীবনের সব চেয়ে সুন্দরতম ঘটনা বিয়ের কথা গোপন রাখতে বাধ্য হলো। মা হবার পরও প্রকাশ্যে সে খবর কাউকে জানাতে পারল না। অথচ তাকে তালাক দেয়া হলো। এটা কেমন বিচার?

রেহানা আকতার নামে একজন চাকরিজীবী লিখেছেন, ‘এত কিছু সহ্য করে অপু বিশ্বাস কি পেল? এক পাতার ডিভোর্স পেপার আর তিন পাতার একটা উকিল নোটিস? এই কি তার প্রাপ্য?

শাকিব খান আর অপু বিশ্বাসের মধ্যে ‘সংসার সংসার’ খেলার নাটকের পরিসমাপ্তি শেষ পর্যন্ত কীভাবে হবে আমরা জানি না। তবে বিষয়টির দ্রæত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। এখনও শোবিজের মানুষেরা সাধারণ মানুষের কাছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেবতা তুল্য। অথচ তাদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে চলচ্চিত্রের তারকাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা কমে যাবে।  এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়বে আমাদের চলচ্চিত্রের ওপর। যা কখনই কাম্য হতে পারে না। শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। এক. তাদের বিয়ের তারিখ আসলে কত? ১৬ মার্চ নাকি ১৮ এপ্রিল? দেন মোহরের টাকা আসলে কত ৭ লাখ এক টাকা? নাকি ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। জানা গেছে অপু বিশ্বাসের কাছে নাকি কাবিন নামার কপি নাই। তাহলে সেটা কি শাকিব খানের কাছে আছে? একজন বলছে ৭ লাখ ১টাকা। অন্যজন বলছে ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। দু’জনের কথার মধ্যে তো আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সত্যটা আসলে কী? তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। আরও জরুরি দরকার শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের তালাক নামার সুরাহা। অন্যথায় বিষয়টি নিয়ে দুষ্টু মানুষেরা নানা কথা ছড়াতেই থাকবে। এতে হয়তো শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু ক্ষতি হবে আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারের। উদাহরণ স্বরূপ বিশিষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিনের একটি ফেসবুক স্টাটাসের প্রসঙ্গ তুলতে চাই। বিচ্ছেদের মতো কোনো ঘটনায় অভিভাবক পর্যায়ের ব্যক্তিদের উচিত অহেতুক কোনো পক্ষকে ছোট না করে বক্তব্য দেয়া। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কথা বলবো না সেটাও ভাবা উচিত নয়। কিন্তু অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলতে গিয়ে অহেতুক বিতর্ক ছড়ানোও তো কাক্সিক্ষত নয়।

তসলিমা নাসরিক লিখেছেন, বাংলাদেশের ছবির হিরো শাকিব তালাক দিচ্ছে বাংলাদেশের ছবির হিরোইন অপু বিশ্বাসকে। অপুর দোষ, অপু তার স্বামীর নির্দেশ পালন করেনি, তার কথা শোনেনি।

শাকিবকে ভালোবেসে অপু নিজের ধর্ম ছেড়ে শাকিবের ধর্ম গ্রহণ করেছে, শাকিবের বাড়িতে ঝি চাকরের মতো কাজকর্ম করেছে। শাকিব বিয়ের ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখতে বলেছে বলে লুকিয়ে রেখেছে, বাচ্চা হওয়ার খবরটাও লুকিয়ে রাখতে বলেছে বলে দীর্ঘকাল লুকিয়ে রেখেছে, বাচ্চা হওয়ার সময় শাকিব হাসপাতালে যায়নি তারপরও শাকিবের জন্য অপুর ভালোবাসা কিছু কমেনি। এখন বাচ্চা কোলে মেয়েটি পাচ্ছে তালাকনামা। শাকিবের মতো আত্মম্ভরী পুরুষতান্ত্রিকের সঙ্গে তালাক হয়ে যাওয়া অবশ্য ভালো। স্বনির্ভর মেয়ে নিজের দেখভাল নিজেই করতে পারে।

শাকিবের জন্য কান্নাকাটি হাহুতাশ বন্ধ করতে হবে অপুকে। আপাতত অপু বিশ্বাসের কোনও পুরুষকে বিশ্বাস করা উচিত নয়। হজ করাও উচিত নয়। মানুষের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মরে যাওয়ার আশক্সক্ষা ছাড়া ওতে সত্যিকার কোনও ফায়দা নেই। অপুকে এখন নিজের পায়ের তলার মাটি যেমন আরো শক্ত করতে হবে। মনের ভেতরের মাটিও আরও শক্ত করতে হবে। পায়ের তলার মাটি, মনের ভেতরের মাটি দুটোই এমন নরম যে, যে কেউ তাদের ডুবিয়ে দিতে পারে কাদায়, যে কেউ আবার তাদের মনেও অনায়াসে ডুবে যেতে পারে”।

তসলিমা নাসরিন উপযাচক হয়ে যে কথাগুলো বলেছেন তার অনেক কিছুর সঙ্গেই আমাদের দ্বিমত আছে। এজন্যই বলছি অপু বিশ্বাস ও শাকিব খানের ‘সংসার সংসার’ খেলার ব্যাপারে দ্রæত একটা সমাধানে আসা প্রয়োজন। তানাহলে অনেকেই সুযোগ বুঝে দু’পক্ষকেই উত্তেজিত করবে। ফলে মুখরোচক খবরের ডালপালা ছড়াতেই থাকবে।

দ্য ফ্লাওয়ার অব ওয়ার!

সারারা মুশাররাত তূর্ণা

Joyপ্রথম যখন জনসম্মুখে আসে শাকিব-অপুর সন্তান আব্রাম খান জয়, তখন তার চোখে মুখে বিস্ময়। টেলিভিশন চ্যানেলে তাকে নিয়ে লাইভে হাজির হওয়া মা অপু বিশ্বাসকে অপলক নয়নে অবাক হয়ে দেখছিল জয়। মা কেন কাঁদছে? সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিন যেমন সে জানত না, একইভাবে নিজের বয়স একবছর দুই মাসে পা দেয়ার মাঝেই বাবা-মায়ের চূড়ান্ত বিচ্ছেদ কেন হল তা বোঝার ক্ষমতাও এখনও হয়ে ওঠেনি জয়ের।

এখনও ঠিক করে হাঁটা বা কথা বলা শিখতে না পারা জয় জানে না তার মায়ের জীবনে কতগুলো ঝড় বয়ে গেছে বা যাচ্ছে, জানে না নিজের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। এতদিন ধরে আগলে রাখা মা কে কী আইনের বেড়াজালে সাত বছর হলে তাকে ছেড়ে দিতে হবে? যে বাবার স্নেহ সে পেয়েছে গত এক বছরে হাতে গোনা মাত্র কয়দিন, সে কি সত্যিই তার সারাজীবনের ভরণপোষণ নেবেন?

এসব প্রশ্নের কোনটির উত্তর জানা বা বোঝার বয়সই যে শিশুর হয়নি, সে শিশুটির বাবা-মা নিজেদের দ্ব›েদ্বর সমাধান করতে না পেরে বেছে নিয়েছেন বিচ্ছেদের পথ। ২০০৮ সালের ১৮ এপ্রিল (মতান্তরে ১৬ মার্চ) গোপনে বিয়ে, সবার অলক্ষে কলকাতায় জয়ের জন্মলাভ- এসব কিছুর পর সম্প্রতি হুট করেই অপুর বাসায় শাকিবের তালাকনামা পাঠানোর আলোচনায় ব্যস্ত সবাই। চূড়ান্তভাবে ডিভোর্স হয়ে গেলে যে কোন সময় হয়ত আবারও ঘর বাঁধতে পারেন শাকিব কিংবা অপু। নতুন সংসারে তারা হয়ত সুখীও হবেন। কিন্তু জয়ের সুখ বা আনন্দের কী হবে?

দ্য ফ্লাউয়ার অব ওয়ার অভিভাবকত্ব আইন ১৮৯০ অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর সাত বছর পর্যন্ত ছেলেসন্তান হলে মায়ের কাছে থাকবে। এ সময় মা হবেন সন্তানের শরীরী অভিভাবক। কিন্তু কোনো সম্পত্তির অধিকারী হবেন না।

আইন অনুযায়ী সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক হচ্ছেন বাবা। তবে এ সময় সন্তানের ভরণ-পোষণ বাবাকে বহন করতে হবে। সাত বছর পর তার শরীর ও সম্পত্তির অভিভাবক হবেন বাবা। সাত বছর পর বাবা যদি অন্যত্র বিয়ে করেন তখন নাবালক সন্তানের নিরাপত্তা ও বাবার কাছে থাকাটা অকল্যাণকর হলে এবং বাবা সন্তানের অভিভাবক নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হলে দাদি বা নানি বা মায়ের কাছে থাকতে পারে। আবার মা যদি অন্যত্র বিয়ে করেন তাহলে সে ক্ষেত্রে দাদি ও নানি অগ্রাধিকার পাবেন। তখন সন্তানের মতামত ও বিবেচনা করে আদালত নির্ধারণ করবেন।

এই আইনি ভাষা শিশু জয় মেনে নিতে পারবে কিনা, সেই জবাব একমাত্র সময়ই দিতে পারবে। ধরে নেয়া যাক, দ্বিতীয় বিয়ে করলেন না শাকিব কিংবা অপু, তারপরেও নিজের বাবা-মার সঙ্গে একসাথে পরিবারের মাঝে একটি শিশুর যে স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, সেই সুযোগ কিন্তু পাবে না ছোট্ট জয়। নিয়তির নিষ্ঠুরতায় তাকে বেছে নিতে হবে বাবা কিংবা মায়ের মধ্যে যে কোন একজনকে।

একটু বড় হলে যখন সে স্কুলে যাবে, চোখের সামনে সহপাঠীদের বাবা-মা কে একসঙ্গে দেখবে, তখন শিশু জয়ের মনে যে কষ্ট তৈরি হবে, তা নিয়ে কি স্বাভাবিক জীবন পাওয়া আসলেই সম্ভব? গত আট মাসে শাকিব-অপু নিয়ে প্রচারিত বা প্রকাশিত অসংখ্য সংবাদ, তাদের পারস্পরিক দ্ব›দ্ব কিংবা নিজের জন্ম নিয়ে ঘোলা হওয়া জলের খবর যখন জানতে পারবে জয়, কী রকম প্রভাব পড়বে সেই কোমল মনে? এসব কথা কি একবারও ভেবে দেখেছেন শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস?     সূত্র: চ্যানেল আই অনলাইন