Home টি-২০ আড্ডা ভাই, আমি একটু পাগলাটে ধরনের-আগুন

ভাই, আমি একটু পাগলাটে ধরনের-আগুন

SHARE
Agun

মোহাম্মদ তারেক
আনন্দ আলো: গানে এলেন কীভাবে?
আগুন: ছোটবেলায় দেখতাম মা নীলুফার ইয়াসমিন গান করতেন, রেওয়াজ করতেন। এ বিষয়টি আমাকে অনুপ্রেরণা জোগায়। আমি যা শিখেছি সবই বাবা-মায়ের কাছ থেকে। আমি আজকের আগুন হয়েছি বাবা-মায়ের কারণে। আমার ভেতরে বাবা-মায়ের যতটুকু প্রভাব আছে তা মনে হয় কেবল জন্মসূত্রেই পাওয়া।
আনন্দ আলো: জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় যে গানটি।
আগুন: ১৯৯২ সালে আমার জীবনের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। ঐ বছর সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে প্লেব্যাক করি। ছবি মুক্তি পাওয়ার পর আমার গাওয়া ‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে’ গানটি মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে। ছবিটি বøক বাস্টার ব্যবসা করার সঙ্গে সঙ্গে আমার জ[ীবনের সব দরজা জানালা খুলে যায়। তখন আমার বয়স আর কত হবে ২০ কী ২১। সাডেনের সুপারহিট অ্যালবামের পর কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির প্লেব্যাকে বিশাল এক ব্রেক থ্রো পাই আমি। সবকিছু মিলিয়ে ঐ বয়সে চাওয়ার চেয়ে পাওয়ার অর্জনটা অনেক বেশি মনে হয়েছে। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা পাওয়া।
আনন্দ আলো: দেশের টিভি দেখেন?
আগুন: অবশ্যই দেশের টিভি চ্যানেল দেখি। আমাদের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সংগীত বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো দেখি। সংবাদ দেখি, নাটক দেখি, সিনেমা দেখি।
আনন্দ আলো: স্টুডিওতে প্রথম দিন…
আগুন: ১৯৮৮ সালের কথা। আমাদের ব্যান্ড সাডেনের জন্য প্রথম গান রেকর্ড করি। স্টুডিও ছিল শ্রæতি। আমাদের দলের পাঁচজন বসে একদিনে চারটি গান রেকর্ড করে ফেলি। ব্যাপারটি প্রথম হলেও ভয় ডর ছিল না মোটেও। অনেকটা পিকনিক আমেজে গানগুলো তৈরি করে ফেলি। প্রথম রেকর্ড নিয়ে এর চেয়ে ভালো কোনো স্মৃতি নেই। তবে সাডেনটার জন্য বড় আফসোস হয়।
আনন্দ আলো: গান গেয়ে প্রথম পারিশ্রমিক…
আগুন: ১৯৮৮ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর তিন মাস অবসর সময় পাই। ঐ সময় বন্ধুরা মিলে ‘সাডেন’ নামের একটি ব্যান্ড দল গঠন করলাম। অল্পদিনেই সাডেনের নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ব্যান্ডের সদস্য আমরা সবাই ছিলাম ১৭ কি ১৮ বছরের তুর্কি তরুণ। সপ্তাহে তিন চারটি শো করতাম। শো শেষে ৩ থেকে ৪শ টাকা পেতাম।
আনন্দ আলো: আপনার গাওয়া কোন গানটি এখনো হৃদয়ে গেঁথে আছে?
আগুন: আমার গাওয়া অনেক গানই হৃদয়ে গেঁথে আছে। তবে আমার স্বপ্নগুলো কেন এমন স্বপ্ন হয়, পৃথিবীতে সুখ বলে, জীবনের সব সুখ, বাবা বলে ছেলে নাম করবে, ঝড়ো বেদনার মতো গানগুলো মাঝে মাঝে হৃদয়ে নাড়া দেয়।
আনন্দ আলো: প্রথম অ্যালবাম…
আগুন: ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় আমার ব্যান্ড সাডেনের প্রথম অ্যালবাম। অ্যালবামটি রিলিজ হওয়ার পর আমাদের আর পায় কে? আমরা প্রথম বামবা আয়োজিত কনসার্টে গান করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ৩৫ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিল। এভাবে কল শো, কনসার্ট এমনকি বিয়ে বাড়িতেও গান করেছি। এভাবে আমার রক্তে কখন যে গান ঢুকে গেছে তা টেরই পাইনি।
আনন্দ আলো: জীবনের যে সময়টা ফ্রেমে বন্দী করে রাখার মতো…
আগুন: বাবা মারা যাওয়ার মাস তিনেক আগের ঘটনা। মানসিক ভাবে খুব বাজে একটা সময় পার করছিলাম। বাসায় বসে বসে যখন কম্পোজিশন করতাম তখন বাবা মাঝে মাঝে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন আমার কী হয়েছে? আমি বাবার সঙ্গে সব কথাই শেয়ার করতাম। বন্ধুদের একটা দল নিয়ে তখন আমরা ইস্কাটনে আড্ডা দিতাম। আমার স্ত্রীকে যেদিন প্রথম দেখি সেদিনের গল্প। বন্ধুদের আড্ডাস্থলে ঢুকেই দিলাম চিৎকার। আমাদের বাসাটাও ছিল আড্ডাস্থলের কাছেই। সেদিন বাবা আমার ভয়াবহ চিৎকার শুনেছিলেন। রাতে আমাকে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী এখন সুখী? আমার পছন্দের কথাটা বাবাকে বললাম। বাবা তখনই আমাকে বললেন, মেয়েটাকে বিয়ে করো। সেই সময়টা ফ্রেমে বন্দী রাখার মতো।
আনন্দ আলো: ছেলের জন্য আগুনের গান…
আগুন: বছর দুয়েক আগের ঘটনা। মিছিল তখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। এই বয়সের ছেলেরা একটু বেপরোয়া থাকে। কথা শুনতে চায় না, নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। কিছু বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আমার বুকটা তখন ফেটে যাচ্ছিল। কষ্ট থেকেই ছেলেকে নিয়ে একটি গান লিখি। গানের কথা ছিল এরকমÑ ও আমার সাদা ঘুড়ি উইড়া গেলো পবনে। ভাইবা মরি মরি নাটাই ছাড়া যদি হারায় আসমানে। কাচের দেয়াল অ্যালবামে গানটি স্থান পেয়েছে।
আনন্দ আলো: প্রথম নাটক…
আগুন: ২০০৯ সালে ‘সীমান্তে নদী’ নাটকের মাধ্যমে টিভি পর্দায় যাত্রা শুরু করি। নাটকে আমার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তমালিকা কর্মকার। আমার সঙ্গে যৌথভাবে নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন কাজী লুবনুর।
আনন্দ আলো: শিল্পী আগুন এবং অভিনেতা আগুন। কাকে আপনি সফল মনে করেন?
আগুন: শিল্পী আগুন অবশ্যই সফল। আর অভিনেতা আগুন একজন ভালো অভিনেতা। যে কোনো চরিত্রই ফুটিয়ে তুলতে পারে।
আনন্দ আলো: আবার যদি তরুণ বয়স ফিরে পান তখন কী করবেন?
আগুন: আবার গায়ক হওয়ার চেষ্টা করব।
আনন্দ আলো: আগুনের যে কাজটা করলে মন ভালো হয়ে যায়?
আগুন: মশাল, মিছিলের সঙ্গে সময় কাটালে মন ভালো হয়ে যায়।
আনন্দ আলো: আপনাকে একদিনের জন্য মঙ্গলগ্রহে পাঠানো হলে কাকে সঙ্গে নিতে চাইবেন?
আগুন: মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার সময় গিটার সঙ্গে নিয়ে যাব। কারণ গান গাওয়া মিস করা যাবে না।
আনন্দ আলো: আপনি নাকি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখেন। ঘটনা কী?
আগুন: স্বপ্ন তো জেগে জেগেই দেখি। কারণ ঘুমালে তো আর স্বপ্ন দেখা যাবে না। স্বপ্ন আমাকে ঘুমাতে দেয় না।
আনন্দ আলো: আপনার পাঁচটি ভালো গুণের কথা বলুন?
Agunআগুন: আমার পাঁচটি ভালো গুণ হচ্ছেÑ আমি একজন সত্যবাদী মানুষ। মিথ্যা কথা সচরাচর বলি না। মানুষের প্রতি সহানুভ‚তিশীল। একদমই মানুষকে ঠকাই না। স্ত্রী-সন্তানদের প্রচÐ ভালোবাসি।
আনন্দ আলো: আপনার পাঁচটি খারাপ গুণের কথা বলুন?
আগুন: আমার পাঁচটি খারাপ গুণ হচ্ছেÑ আমি সহজেই সবার সঙ্গে মিশতে পারি। মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারি না। আমি একটু পাগলাটে ধরনের। কখনো কখনো প্রচÐ রেগে যাই। অপ্রিয় সত্য কথা মুখের ওপর বলে ফেলি।
আনন্দ আলো: প্রথম প্রেম…
আগুন: আমার খালা সাবিনা ইয়াসমিন আমার স্ত্রীর মামী। সেই হিসেবে আমরা দুজন কাজিন ছিলাম। আমরা দুজনই উদয়ন স্কুলে পড়তাম। ও আমার নিচের ক্লাসে পড়ত। সেই থেকে আমাদের চেনাজানা এবং বলা যায় এক ধরনের বন্ধুত্ব হয়। দেখা যেত যে কোনো ধরনের খেলাধুলা কিংবা অন্য যে কোনো ব্যাপারেই আমি আর বৃষ্টি একদলে, অন্য কাজিনরা আরেক দলে। মানে দুজন সব সময় একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করতাম। হয়তো বাকি জীবনটা দুজন একসঙ্গে কাটাবো বলেই এমনটাই হতো। সাধারণ অর্থে প্রেম বা ঐ রকম কিছু ছিল না। কিন্তু ওকে দেখলে কেমন জানি লাগত আমার। যেটা অন্য কাজিনদের দেখলে লাগত না। এই করতে করতে একসময়ে আমাদের প্রেম হয়ে গেল। তখন নিয়মিত ফোনে কথা বলা, ঘুরতে যাওয়া এসব চলতে লাগল। দীর্ঘদিন লুকোচুরি গল্পের পর ১৯৯৮ সালে আমরা বিয়ে করি।
আনন্দ আলো: প্রেম-ভালোবাসা তারপর বিয়ে। আর এই বিয়ের জন্য নাকি আপনি মামলাও খেয়েছেন?
আগুন: ১৯৯৮ সালে আমরা প্রেম করে বিয়ে করি। বিয়ের পর শ্বশুর আমার নামে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করে দেয়। মানে একবার ধরা পড়লে ৬ মাসের আগে জামিন নেই। সবাই তখন দিশেহারা। কিন্তু আমি তো গান গেয়ে মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। আমারও কিছু ক্ষমতা আছে। ওই থানার ওসি আমার চাচা, ঐ থানার ওসি আমার মামা। আমি পুলিশ অফিসারদের কাছে ফোন করে বললাম, চাচা এখন আমি কী করবো? উনারা বললেন, তুমি তোমার মতো চলাফেরা করো, পুলিশের সামনে পড়লে ওরা তোমাকে চিনবে না। তুমিও তাদের চিনবে না। মুখ ঘুরিয়ে থাকবে। এদিকে আমার বাসার অবস্থা আরও খারাপ। আমার মা বৃষ্টির মাকে ফোনে বলছেন, আপনার বেয়াদব মেয়ের পাল্লায় পড়ে আমার ছেলে এই কাজ করেছে। ওদিকে বৃষ্টির মা বলছেন, আপনার বেয়াদব ছেলের কারণেই আমার মেয়ের এই অবস্থা…
আনন্দ আলো: গোপন কোন কথাটি স্ত্রীর কাছে বলেন না?
আগুন: ভাইরে আমার কোনো গোপন কথা নাই। সব কথাইতো বলা হয়ে গেছে।