বড় ভালো গান গেয়েছিস মা 

বড় ভালো গান গেয়েছিস মা 

1901
SHARE

রেজানুর রহমান: স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। অথচ তাঁর মন খারাপ। ঘটনা কী? কেন তাঁর মন খারাপ? জিজ্ঞেস করতেই তাঁর দুচোখ ছলছল করে উঠল। বললেন, রাষ্ট্র আমাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছে। এর চেয়ে তো বড় স্বীকৃতি আর হয় না। আমি দারুণ খুশি। কিন্তু সেটাতো প্রকাশ করতে পারছি না। আজকের এই আনন্দের দিনে আমার একজন প্রিয় স্বজন মারা গেছেন। বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক খালিদ মাহমুদ মিঠু গাছের চাপায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর এই মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বলতে বলতে চোখ মুছলেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। আমাদের বাংলা গানের জীবনত্ম কিংবদনত্মী এই শিল্পী এমনই মানবিক ও সংবেদনশীল একজন মানুষ। একথা বললে বোধকরি মোটেই অত্যুক্তি হবে না, বন্যা একমাত্র রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাই এই উপমহাদেশে বলা যায় এককভাবে রবীন্দ্র সঙ্গীতকে সাধারণের মাঝে পৌঁছে দেবার কঠিন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

তাঁকে অনেকে সম্মান-শ্রদ্ধা করে বলেন, ঐ যে আমাদের রবীন্দ্র কন্যা…। বাসত্মবেও তাই। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা শুধু গানের মাধ্যমেই নয় তাঁর দৈনন্দিন জীবনাচারণেও রবীন্দ্রনাথকেই ধারণ করেন। তাঁর চলাফেরা, বেশভূষা, আচার-আচরণ সব কিছুতেই অপরূপ এক বাঙালিয়ানা লক্ষ্য করা যায়। আর তাই উপমহাদেশ জুড়ে তাঁর হাজার হাজার ভক্তের একটাই চাওয়া- আমিও বন্যার মতো হতে চাই। বাসত্মবেও তাই ঘটছে। বাংলাদেশের অনেক তরুণী প্রতিদিন বন্যাকেই ফলো করে। তাঁর মতো সাজে, তার মতো করেই শাড়ি পড়ে, কথাবার্তায়ও বন্যার মতোই হাসিখুশি, অমায়িক, প্রাণবনত্ম। গানেও হতে চায় বন্যার মতোই। সবার প্রিয় সেই বন্যাদিই যখন দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি স্বাধীনতা পুরস্কার পান, তখন সারাদেশে আনন্দ উৎসবের ঢেউ কতটা উঠতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আনন্দ আলো পরিবারেও লেগেছে আনন্দ আর উৎসবের ঢেউ। তাই সিদ্ধানত্ম গৃহীত হয়, আনন্দ আলোর একযুগ শুরু বিশেষ সংখ্যায় প্রিয় শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাই হবেন প্রচ্ছদ মুখ।

কিন্তু এজন্য তো বন্যাকে চাই। তাঁর মুখোমুখি বসতে চাই আমরা। প্রিয় শিল্পীর সাথে আড্ডা দিতে চাই। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। দারুণ ব্যসত্মতায় দিন কাটছে তাঁর। স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তিতে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্ত-শুভাকাঙ্খীদের শুভেচ্ছার বন্যায় প্রতিদিনই ভাসছেন তিনি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে হচ্ছে। তার ওপর আছে বঙ্গবন্ধু আনত্মর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। চ্যানেল আইয়ের সহায়তায় বন্যার সুরের ধারার বর্ষবরণ এই অনুষ্ঠান এখন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। সে কারণে অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে তাঁর ব্যসত্মতা এবার যেন অন্যবারের চেয়ে একটু বেশি। তবুও যখনই তাঁর সাথে দেখা হয় তখনই কথাটা তুলি- আপা আমাদের আনন্দ আলোকে একটু সময় দেবেন। আপনার সাথে বসে আড্ডা দেব, কথা বলব।

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা সর্বদাই মুখে হাসি ছড়িয়ে বলেন, আজ হবে না। দেখি দুই একদিন পর… হঠাৎ একদিন নিজেই গুলশানের একটি হোটেলের ঠিকানা দিয়ে বললেন, ওখানে একটা অনুষ্ঠান আছে। আসো। ওখানেই কথা হবে।

গুলশানের সেই হোটেলে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার জন্য বসে আছেন চ্যানেল আই-এর বহুল আলোচিত অনুষ্ঠান ‘গানে গানে সকাল শুরুর’ প্রযোজক, উপস্থাপক, বাদ্যযন্ত্রীসহ নেপথ্যের একদল কর্মী। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম, আহমাদ মাযহার, মোসত্মাফিজুর রহমান নান্টু, অনন্যা রুমা, অভিনেত্রী শিরিন বকুল, ইফতেখার মুনীম, জামাল রেজা, দিলরুবা সাথী, আফরিন, রিফাত, বংশীবাদক গাজী আব্দুল হাকিম, মনোয়ার হোসেন টুটুল, রূপতনু শর্মা, আনোয়ার হোসাইনসহ গানে গানে সকাল শুরুর সকল কর্মকর্তা, কর্মীই অপেক্ষা করছেন প্রিয় শিল্পীর জন্য। টেবিলে রাখা আছে ফুলের উপহার। আর সবার মনের ভেতর থই থই করছে শুধুই আনন্দ আর আনন্দ। একসময় অপেক্ষার প্রহর ভাঙ্গলো। প্রিয় শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এলেন। আনন্দ আর আলোর বন্যায় উদ্বেল হয়ে উঠলো পরিবেশ।

আনন্দ আলোর প্রিয় স্বজন আমীরুল ইসলাম আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন সাক্ষাৎকার গ্রহণের কর্মসূচি। আজ গানে গানে সকাল শুরুর সকলেই প্রিয় শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে প্রশ্ন করতে পারবেন। ঘোষণা দিলেন তিনি। শুরুটা করলেন আনন্দ আলোর সম্পাদক নিজে…

রেজানুর রহমান: স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন আপনার অনুভূতি কি?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: (মৃদু হেসে) আমি প্রথমেই বলতে চেয়েছিলাম এই প্রশ্নটা যেন না করা হয়। কারণ এই প্রশ্নের জবাব বহুবার দিয়েছি।

রেজানুর রহমান: তবুও আমরা যেহেতু প্রশ্নটা করেছি… আপনার অনুভূতি জানতে চাই…

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: অনুভূতিটা মিশ্র। সত্যি কথা বলতে কী… এই যে আমরা আজ সবাই একসাথে হয়েছি, আনন্দ করে খাওয়া দাওয়া করছি… এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের। পুরস্কার পাবার আনন্দতো আছেই। তবে পুরস্কার না পেলে যে দুনিয়াদারী চলবে না এমনতো নয়। আমরা যে যে ক্ষেত্রেই কাজ করি না কেন পুরস্কার পাব বলে অথবা পুরস্কার পাবার আশায় করি না। কাজ করতে হয় তাই করি। দায়িত্ববোধ থেকে কাজটা করি। সেজন্য পুরস্কার পেলে পেলাম। না পেলেও তেমন কোনো ক্ষতি নাই…। কিন্তু পুরস্কার পেলে বেশ ভালো লাগে। যেমন স্বাধীনতা পুরস্কার পাবার পর এই যে আজ সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করছি এটাই আমার ভালো লাগছে। খুব আনন্দ পাচ্ছি। দেশ-বিদেশ থেকে কত চেনা অচেনা মানুষ আমাকে ফোন করেছে। স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার জন্য আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। যারা আমার পরিচিত তারা মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে। একসময় যাদের সাথে পরিচয় ছিলো, নানান ব্যসত্মতায় মেসেজ পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। কাজেই আমি খুব খুশি। তবে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে আমি কি এই পুরস্কারের যোগ্য? দেশ আমাকে সম্মান জানিয়েছে। আমি যেন এই সম্মান রক্ষা করতে পারি এটাই আমার প্রার্থনা।

রেজানুর রহমান: আপনি বললেন, স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তিতে দেশ-বিদেশ থেকে অনেকে আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কার অভিনন্দন আপনাকে বিশেষভাবে অভিভূত করেছে?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: (একটু ভেবে) আমার গানের গুরু ছিলেন কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বেঁচে নেই। কিন্তু আমার এই পুরস্কার প্রাপ্তির খবর পেয়ে কলকাতা থেকে তার ছোটবোন রুনুদি আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রুনুদি নিজে অসুস্থ। তবুও তিনি আমার পুরস্কার প্রাপ্তিতে খুশী হয়েছেন এবং সেকথা কলকাতা থেকে ফোনে জানিয়েছেন। আমি অভিভূত হয়েছি। কারন রুনুদির ফোন পেয়ে মনে হয়েছিল আমার গুরু মোহরদিই যেনো কথা বলছেন। রুনুদি যখন ফোনে বলছিলেন, বন্যা তুমি আমাদের শানিত্ম নিকেতনের গৌরব… তোমার পুরস্কার প্রাপ্তির খবর শুনে আমি অনেক খুশি হয়েছি। আজ আরো একজন খুশি হতেন। কিন্তু তিনি তো পৃথিবীতে নাই…

রুনুদির কথা শুনে আমি বলেছি, হ্যাঁ আমি সেটা জানি। মর্মে মর্মে অনুভব করছি মোহরদিকে। আমার এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে দুইজন মানুষ বেশি খুশি হতেন। একজন হলেন আমার গুরু কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থাৎ আমাদের মোহরদী। আর একজন আমার বাবা। দু’জনই পৃথিবীতে নেই। না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

মনোয়ার হোসেন টুটুল: আমার কোন প্রশ্ন নেই। আপনার পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমরা বাদ্যযন্ত্রীরা অনেক খুশি। মনে হচ্ছে আমরা নিজেরা এই পুরস্কার পেয়েছি। আপনাকে অনেক অভিনন্দন…

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: আমি তোমার কথার সাথে একটা কথা যোগ করি। তোমার কথার সাথে আমি পুরোপুরি একমত। মানুষের জীবন হলো বহতা নদীর মতো। নদী তার চলার পথে দুইধারে অনেক গ্রাম, শহর, জনপদ, গাছপালা, ঘরবাড়িকে ফেলে একপর্যায়ে সমুদ্রে গিয়ে মেশে। এই নদীর মতোই মানুষের জীবন। তার দুই পাড়ের চর, মানুষের বসতি, গ্রামগঞ্জ, নদী ভাঙ্গন সবকিছুই কিন্তু নদীকে ঘিরে। নদীর জন্য সবকিছুই জরুরি। একটু একটু করে নদী এগোয়। তেমনি আমিও একটু একটু করে এগিয়েছি। ভাঙ্গাগড়া ছিল। সাথে ছিল আমার অনেক প্রিয় মানুষ, স্বজন, বন্ধু-বান্ধব। কাজেই আমার এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে সবারই কিছু না কিছু কন্ট্রিবিউশন আছে। এই মুহূর্তে খালিদ মাহমুদ মিঠুর কথা মনে পড়ছে। আমার সাফল্যের ক্ষেত্রে তারও কিছু না কিছু অবদান আছে। অথচ তাকে হারিয়ে ফেলেছি। এরকম অনেকেই হয়তো ভবিষ্যতে থাকবেন না। কিন্তু তাদের অবদানের কথা আমরা যেনো স্বীকার করি। আমরা যেন প্রিয় মানুষকে ভুলে না যাই।

ইফতেখার মুনীম: রেজানুর রহমানের প্রশ্নটাই আবার আমি একটু অন্যভাবে করতে চাই। স্বাধীনতা পুরস্কার পাবার অনুভূতি রবীন্দ্রনাথের কোন গানের লাইনের মাধ্যমে প্রকাশ করবেন?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: একটি গানের লাইন?

ইফতেখার মুনীম: হ্যা। একটি গানের লাইনে…

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: (ভেবে) খুব পরিচিত গান নয়। তবে আমার খুব প্রিয়। তাহলো- তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি…।

জামাল রেজা: শানিত্ম নিকেতনে গেলে মনে হয় এটা বন্যাদির বাড়ি। কাউকে সুন্দরভাবে শাড়ি পড়তে দেখলে মনে হয় এই তো বন্যাদি। কাউকে সুন্দর করে কথা বলতে দেখলে মনে হয় ঐতো বন্যাদি। এটাই বাসত্মবতা। আমার প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে চর্চা করলে এই বিষয়গুলো আয়ত্ব করা সম্ভব?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: এটা বেশ চিনত্মা করে বলার মতো একটি বিষয়। তবে একথা বলতে পারি, শানিত্ম নিকেতনে যারা পড়াশোনা করে তাদের সবারই একটা বেসিক রুচিবোধ তৈরি হয়ে যায়। বেসিক রুচিবোধ বলতে আমি বোঝাতে যাচ্ছি ওখনকার চলাফেরা, নিয়ম-কানুন, আচার-ব্যবহার… যদিও এখন কিছুটা পাল্টে গেছে। তবে আমার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে আমার গুরু কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আচার-ব্যবহার, চিনত্মা-ভাবনা। পরবর্তীতে আমার নিজের চিনত্মা-ভাবনাও যুক্ত হয়েছে। তবে আমি মনে করি প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে একজন মেনটর থাকা জরুরি। আইডল থাকা জরুরি। যেমন পরিবারের ছোটছোট ছেলেমেয়েরা বাবা-মাকে ফলো করে। তাদের মতো হতে চায়। পরিবার থেকে বেরিয়ে স্কুলের প্রিয় শিক্ষককে ফলো করতে চায়। তাকে আইডল ভেবে এগুতে চায়। কাজেই সনত্মানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অবদানের পাশাপাশি তার শিক্ষাগুরুর অবদানও কিন্তু কম নয়। বরং বেশি। কারণ একজন ভালো শিক্ষক অনেক ছাত্র-ছাত্রীর মেনটর অথবা আইডল যাই বলি না কেন তাই হয়ে উঠতে পারেন।

আহমাদ মাযহার: আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই। এটি আপনার স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া সম্পর্কিত নয়। প্রশ্নটি হলো-সম্ভবত বাংলাদেশে আপনার মতো এতো অনুষ্ঠানে কোনো শিল্পী অংশ নিতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথের গান এক সময় সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছানো সহজ ছিল না। আপনি সেই কাজটি সহজভাবে করছেন। তাই অনেক অনুষ্ঠানে আপনাকে যেতে হয়। গান গাইতে হয়। এব্যাপারে অনেকে সমালোচনাও করেন। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: (একটু ভেবে নিয়ে) এখানেও মেনটরের কথা উল্লেখ করতে হবে। আমি মোহরদীর কাছে যখন গান শিখতাম তিনি আমাকে অনেক ঘটনার কথা বলতেন। গল্প করতেন। তার কথা শুনে শুনে কখনও মনে হতো রূপকথার জগতে প্রবেশ করেছি। জেলখানায় গান করতে যেতেন। গ্রামের প্রত্যনত্ম অঞ্চলে গান করতে গিয়ে ফিরতে পারছেন না। এরকম কত সংগ্রামী গল্প…। আমার ক্ষেত্রে বলি… যখন আমার একটু একটু পরিচিতি বাড়তে শুরু করলো, তখন নিজেকে নতুন ভাবে আবিস্কার করতে থাকলাম। প্রসঙ্গক্রমে একটু পেছনের কথা বলি। আমার বাবা সারাজীবন সরকারী চাকরি করেছেন। আমাদের পরিবারে কেউ কখনও গানকে প্রফেশন হিসেবে নেয়নি। আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম বিভাগে পাস করলাম, স্কলারশীপ পেলাম। ইউনির্ভাসিটিতে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে দুইমাস ক্লাসও করলাম। এরই মধ্যে শানিত্ম নিকেতনে গানের ওপর পড়াশুনা করার জন্য আবেদন করেছি। আমার আব্বাই কাজগপত্র তুলে সব কাজ করে দিয়েছেন। তিনি বোধকরি ভাবেননি শানিত্ম নিকেতনে আমি ভর্তির সুযোগ পাব। কারণ আমি তো সেভাবে গান করিনা। দৈনিক পত্রিকায় শানিত্ম নিকেতনে পড়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়েছিল। তাই দেখে আমি আব্বাকে বলেছিলাম- আমি অ্যাপ্লিকেশন করি? আব্বা শায় দিয়েছিলেন- হ্যা কর। আব্বা নিজে আবেদন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। আমি যেদিন পরীক্ষা দিতে যাই সেদিনও আব্বা আমার সঙ্গে ছিলেন। তার ধারনা ছিল আমি শানিত্ম নিকেতনে ভর্তির সুযোগ পাবনা। মেয়ের যেহেতু শখ হয়েছে তাই একটু সহযোগিতা করা। কিন্তু যখন আমার নামে চিঠি এলো, অর্থাৎ আমি শানিত্মনিকেতনে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি তখন পরিবারের সবাই যেন একটু বিপাকে পড়ে গেল। আব্বার মাথা ঘুরে গেল। সর্বনাশ! আমি তো সিদ্ধানত্ম নিয়েই ফেলেছি শানিত্ম নিকেতনে পড়তে যাব, তাই ইউনির্ভাসিটিতে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। তখন আমার নানী, বড় মামা, চাচা সবাই মিলে হুলস্থূল শুরু করে দিলেন। একা একটি মেয়ে দেশের বাইরে শানিত্ম নিকেতনে পড়তে যাবে। এটা কি করে সম্ভব? আমাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর কেউ গান শেখেনি। সেখানে গান শেখার জন্য বাইরের দেশে যাওয়া। অসম্ভব! এটা হতেই পারে না। আব্বার জন্য বিষয়টি সাংঘাতিক টেনশনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু আমার আগ্রহের কাছে সবাই হার মানলেন। শানিত্ম নিকেতনে পড়তে যাবার আগে আব্বা আমাকে বারবার বুঝিয়ে ছিলেন-এখনও ভেবে দেখো। ইকোনমিকস অনেক ভালো সাবজেক্ট। সেটা ছেড়ে তুমি গানের ওপর পড়াশুনা করতে যাচ্ছ। তুমি ঠিক করছো না। আমি আব্বাকে বুঝিয়েছিলাম-আমাকে তোমরা যেতে দাও। গান আমার কাছে উপাসনার মতো। গানের সাথে থাকলে আমি অনেক ভালো থাকি। গান আমাকে যেন একটা ফেরিটেল ল্যান্ডে নিয়ে যায়। গানের মাধ্যমে আমি একটা কল্পনার জগতে ঢুকে যাই। আমাকে গানের ওপর পড়াশোনা করার সুযোগ দাও। আমি কথা দিচ্ছি, শানিত্ম নিকেতন থেকে ফিরে এসে ইকোনমিকসে পড়াশোনা শেষ করব।

ভর্তির সব কাজ শেষ করে আব্বার সাথে ইন্ডিয়ান হাই কমিশন থেকে ফিরছি। আব্বা আমাকে দুটো কথা বললেন। এক. শোন, জীবন বড়ই জটিল। কোথায় থামতে হয় তা যেন তোমার বুদ্ধি বিবেচনায় স্থান পায়। দুই. তুমি বাংলাদেশের মেয়ে। শানিত্মনিকেতনে গিয়ে একথাটা যেন ভুলে যেও না। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেই তবে ফিরবে। আমরা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবার। আমাদের একটা ভ্যালুজ আছে। (আব্বার আশংকা ছিল আমি শানিত্ম নিকেতনে গিয়ে যদি কারও সাথে প্রেম করে বিয়ে করে ফেলি) এটা যেন ভুলে না যাই।

আব্বাকে কথা দিলাম- আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।

তারপর যখন শানিত্ম নিকেতনে পড়তে গেলাম তখনও কিন্তু জানিনা আমি গান গাইব। গান গাইবার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার আমার সেটা নেই। শানিত্মনিকেতনে যারা পড়ে তারা বাইরে ছোট ছোট অনুষ্ঠানে গান গাইতে যায়। আমি তাদেরকে শুধুই দেখি। একদিন মোহরদীই আমাকে বাইরে গান গাইবার জন্য নিয়ে গেলেন। কলকাতায় গান গাইতে যেতে হবে। আমিসহ ৫ জনের একটি গ্রুপ। মোহরদীর সাথে কলকাতায় গেলাম। অনুষ্ঠানে গান গেয়ে পরের দিন আবার শানিত্মনিকেতনে মোহরদীই আমাদেরকে ফিরিয়ে এনে হোস্টেলে দিয়ে গেলেন। ঐ আমার প্রথম গান করা। এক পর্যায়ে শানিত্ম নিকেতনে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে আসার পরই আমার বিয়ে হয়ে গেল।

এবার কি করব ভাবছি। আবার কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো? তখনও গানের ওপর কোন চাকরি বাকরির সুযোগ তৈরি হয়নি। ইন্দিরারোডে সরকারী উদ্যোগে পারফমিং আর্টস অ্যাকাডেমি নামে একটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছে। আমার সাথে নিঝু ছিল। নিঝু আমাকে সেখানে নিয়ে গেল এই ভেবে যে, ওখানে একটা চাকরি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেখানে কাজের কাজ কিছুই হলো না।

এর মধ্যে নিঝুর বন্ধু আল মনসুর অর্থাৎ বেলাল ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। বেলাল ভাই তখন বিটিভিতে কাজ করেন। তিনিই আমাদেরকে ‘শিউলিমালা’ নামে একটি গানের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিলেন। বিটিভিতে গানের রেকর্ডিং করে বাসায় ফিরতে অনেক রাত হয়েছে। আমার স্বামী কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কিন্তু আব্বা তো রেগে অস্থির। পারে তো নিঝুকে মারতে যায়। ভদ্র পরিবারের কোন মেয়ে রাত ১২টা পর্যনত্ম ঘরের বাইরে থাকে? গান গায়? নিঝুরতো করুণ অবস্থা। প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে গেল। অপমানে আমিও কাঁদছি।

সৌভাগ্যবশত: বিটিভিতে আমাদের সেই গানের অনুষ্ঠান হিট হয়ে গেল। পরের প্রোগ্রামের জন্য বিটিভিতে গেছি। মেকআপ রুমের লোকজন দেখেই বলা শুরু করলো, আপা আপনার গানের প্রোগ্রাম দেখেছি। দারুণ হিট হয়েছে। সবাই খুব পছন্দ করেছে। বেশ ভালো লাগল তাদের কথা শুনে। পরে হঠাৎ একদিন বাসায় এক অপরিচিত ভদ্রলোক হাজির। তিনি বললেন, পাওয়ার ডেভলপমেন্ট বোর্ডে কাজ করেন। তারা শেরাটনে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। আমি যেন তাদের সেই অনুষ্ঠানে গান গাই সেই অনুরোধ করতে এসেছেন। সাবিনা ইয়াসমীন, ফরিদা পারভিন সহ অনেকে থাকবেন অনুষ্ঠানে। এর আগে আমি স্টেজে গান করিনি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে আমার এক ফুফা কাজ করেন। বাবাকে বললাম ফুফাকে জিজ্ঞেস করতো সত্যি সত্যি তাদের কোন অনুষ্ঠান হবে কিনা। বাবা খোঁজ নিলেন সত্যি সত্যি অনুষ্ঠান হবে। সাহস করে শেরাটনের সেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে গেলাম। সম্মানী হিসেবে পেলাম ৭০০ টাকা। গান গেয়ে জীবনের প্রথম সম্মানী।

এই একটি ঘটনা আমার গানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। মনে হলো গানের পথেই আমি চলতে পারব। এটাই আমার আসল পথ। শুরু হলো গানের পথেই নবযাত্রা।

আমীরুল ইসলাম: আসলে আমার কোনো প্রশ্ন নেই বন্যাদির কাছে। তবে বন্যাদি সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য শেয়ার করতে চাই। বন্যাদি যখন কথা বলেন তখন সার্বিক তথ্যটা দেয়ার চেষ্টা করেন। যেমন পারফরামিং আর্টস অ্যাকাডেমির কথা বলার সময় ধানমন্ডির কথা উঠেছিল। কিন্তু সংশোধন করে দিয়ে বললেন ওটা ইন্দিরা রোড। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনুষ্ঠানে যে দু’জন শিল্পীর কথা মনে আছে তাদের কথাই বললেন। কনিকা বন্দোপাধ্যায় একবার ঢাকায় এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে তার দেখা হয়েছিল। বন্যাদি সেই গল্পটা একটু বলেন…

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: কনিকা বন্দোপাধ্যায় তার একটা লং প্লে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাতে সেটা তুলে দেয়ার সময় বঙ্গবন্ধু কনিকা বন্দোপাধ্যায়কে বলেছিলেন- আমি আপনার গানের খুব ভক্ত। আপনার গানের সমসত্ম কালেকশন আমার বাসায় ছিল। কিন্তু ৭১ সালে আর্মিরা যখন আমার বাসা লুট করে তখন সব কিছু নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর এই কথা শুনে কনিকা বন্দোপাধ্যয় আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠেছিলেন।

আমীরুল ইসলাম: আমি একটি তথ্য দিতে চাই। বন্যাদি রাঁধতে ভালোবাসেন। শানিত্ম নিকেতনে তিনি নিজে রান্না করে খেতেন। তার কাছে সহজ রান্নার একটি রেসেপি জানতে চাই।

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: আমার রান্নার বড় সমঝদার ছিলেন আমার বড় ভাই। যাই রান্না করি তাই তার কাছে ভালো। একদিন বিশেষ পদের এক রান্না করেছি। ভাই যথারীতি খেয়েছেন। তারপর বার-বার জিজ্ঞেস করছেন- এটাতে খরচ কত হয়েছে। আমি তো খরচের কথা বলি না। শেষমেশ তিনি আমার হাতে তিনশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন- এই খাবারটা আরেকদিন চাই…

আমীরুল ইসলাম: এবার রান্নার সহজ একটি রেসিপি দিন। যা শুধুই আনন্দ আলোর পাঠকদের জন্য।

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: আমি আসলে রান্না শিখেছি শানিত্ম নিকেতনে হোস্টেলে থাকার সময়। হোস্টেলে কিচেনের খাবারে যখন রুচি পেতাম না, তখন বন্ধুরা মিলে ঠিক করতাম রুমে রান্না করে খাব। ছোট ছোট স্টোভ ছিল। হাড়ি কড়াই ছিল। শানিত্ম নিকেতন তো অনেকটা আশ্রমের মতো। এখানে হোস্টেল, একটু দূরে টিচারদের কোয়াটার। টিচাররা তো ফ্যামিলি নিয়ে থাকতেন। টিচারদের বাসার সামনে টাটকা মাছ বিক্রি করতে আসত লোকজন। এমনও হতো স্টোভের ওপর ভাত বসিয়ে ক্লাসে যেতাম। যাবার সময় আমাদের রুমে কাজের জন্য যে মাসী থাকতেন, তাকে বলে যেতাম ভাত হয়ে গেলে স্টোভ বন্ধ করে দিতে। ক্লাস থেকে ফেরার সময় মাছ কিনে এনে তাই রান্না করতাম। মসলা বলতে তেলের সাথে পেয়াজ, একটু টমেটো, কাঁচা মরিচ, একটু গরম মশলা… এই দিয়ে মাছ রান্না করতাম। রান্না খুব একটা খারাপ হতো না। খেতে ভালই লাগত।

শিরিন বকুল: এই এত বড় একটি পুরস্কার পেলেন। এর মাধ্যমে কি মনে হয় আপনার দায়-দায়িত্ব বেড়ে গেল?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: পুরস্কার পেলেই যে দায়-দায়িত্ব বেড়ে যাবে আমি এটা মনেকরি না। এ যাবৎ অনেক গুণী ব্যক্তি স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। আমরা ক’জনকে চিনি। আসলে সব কিছু নির্ভর করে মানুষের কর্মের ওপর। মানুষ মানুষকে মনে রাখে তার কর্মের জন্য। কর্মই আসলে সব।

আজকের এই আড্ডায় আমি আমার জীবনের কয়েকটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। একটা হলো- শুরুর দিকে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে এখানে ওখানে গান গাইতে যাই। তখন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন মালেক সাহেব। তিনি আমার গানের দারুণ ভক্ত হয়ে উঠেছেন। সদরঘাটে এক অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। বলা হযেছিল মেয়র নিজেই আমার নাম বলেছেন। আমি যেন অনুষ্ঠানে গান গাই। অনুষ্ঠানের দিন বিটিভিতে সন্ধ্যার পর আমার একটা গানের রেকর্ডিং ছিল। তাই সদরঘাটের অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের কাছে জানতে চাইলাম আমাকে কয়টার মধ্যে ছেড়ে দিবেন? ওরা বলল- ৫টায় যাবেন। তারপর সব মিলিয়ে বড় জোর দুই ঘন্টা। ৭টার মধ্যে আপনি চলে আসতে পারবেন। আমার হাজবেন্ডকে নিয়ে স্কুটারে করে বিকেল ৫টার মধ্যেই সদরঘাটের সেই অনুষ্ঠানে গেলাম। বসে আছি। অনুষ্ঠান শুরুর কোনই লক্ষণ দেখছি না। কারণ মেয়র না এলে তো অনুষ্ঠান শুরু হবে না। ৭টা বেজে গেল তখনও মেয়র আসেননি। এক পর্যায়ে ৮টা বাজলো। বিটিভির অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং এ যেতে হবে। আমার হাজবেন্ড হেলাল বলল- চল যাই। এমনিতে দেরী হয়ে গেছে। এখন গেলে হয়তো বিটিভির অনুষ্ঠানটা ধরতে পারবে। উদ্যোক্তাদের একজনকে বললাম- ভাই আমরা বরং চলে যাই। সাথে সাথে ৫/৬ জন আমাদেরকে ঘিরে ধরলো। সবার চেহারা মাসত্মান টাইপের। একজন শাসন করার ভঙ্গিতে বলল- মেয়র না আসা পর্যনত্ম আপনারা যাইতে পারবেন না। চুপচাপ বইস্যা থাকেন।

আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। হেলালকে বললাম- তুমি এক কাজ করো… বাইরে গিয়ে একটা স্কুটার ঠিক করো। আমি আসতেছি। কাউকে না বলেই চলে যাব। হেলাল বাইরে গিয়ে স্কুটার ঠিক করেছে। আমি গিয়ে সবেমাত্র হেলালের সাথে স্কুটারে বসেছি। সাথে সাথে হৈ হৈ করে ১০/১২জন তরুণ ছেলে আমাদের স্কুটার আটকে চারপাশে ঘিরে দাঁড়াল। একজন মাসত্মানী স্টাইলে চিৎকার দিয়ে বলল- আপনাদেরকে না বলা হইছে মেয়র না আসা পর্যনত্ম এইখান থাইক্যা যাইতে পারবেন না? এখন দেখি কেমনে যান? নামেন… নামেন বলতেছি। ওদের ব্যবহার দেখে আমার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। হেলাল একটু ভয় পেয়েছে। কারণ মাসত্মান ছেলে গুলো যদি কিছু করে বসে। আমি ছেলে গুলোকে বললাম- আপনারা এভাবে কথা বলছেন কেন? আপনারা আমার সাথে এমন ব্যবহার করলে আমি তো স্টেজে গান গাইতে পারব  না। আমার কথা শুনে একজন মাসত্মান বলে উঠলো- আপনাকে গান গাইতে হবে না। মেয়র না আসা পর্যনত্ম আপনি এইখানে চুপচাপ বইস্যা থাকবেন। কি বললাম বুঝতে পারছেন?

রেজানুর রহমান: শেষ পর্যনত্ম কী সেই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন?

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা: ঘটনাটা এতটাই অপ্রীতিকর ছিল যে এরপর আর কি কি ঘটেছিল তেমন ভাবে স্মরণ করতে পারছি না। তবে শেষ পর্যনত্ম মঞ্চে গান গেয়েছিলাম।

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। এটা আগেরটার চেয়ে একেবারেই বিপরীতমুখী… আমাকে একবার কলকাতা থেকে ডাকা হলো নবদ্বীপে একটা প্রোগ্রাম করতে হবে। নবদ্বীপের একসময়ের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রদে’র সময়কার একটা মন্দির ছিল। স্বর্ণমন্দির। উপরের ছাদের অংশে স্বর্ণ দিয়ে মোড়ানো ছিল। সেটা নাকি চুরি হয়ে গেছে। একজন সাধুর নেতৃত্বে এই মন্দিরের সংস্কার করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। আমাকে সেখানে গান গাইতে হবে। আমি পড়ে গেলাম বিপাকে। একে তো এলাকাটা নবদ্বীপ। তারপর ওপর এলাকাটা বৈষ্ণবদের। ওরা সাংঘাতিক গোঁড়া প্রকৃতির। ওরা কীর্তন পছন্দ করে। অথচ আমি তো কীর্তন গাই না। আমাকে আশ্বসত্ম করা হলো আপনাকে কীর্তন গাইতে হবে না। আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীতই গাইবেন। যেদিন অনুষ্ঠান সেদিন সকালেই নবদ্বীপে পৌঁছালাম। আমাদের জন্য হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছে। বলাবাহুল্য পুরো নবদ্বীপ শহরে মাছ মাংস খাবার কোনো সুযোগ নাই। পুরো শহরটাই নিরামিষাশী… উদ্যোক্তারা আমাকে জানালেন সকাল ১১টার সময় সাধুবাবা সবাইকে ‘দর্শন’ দিবেন। আমি যেন এ সময় উপস্থিত থাকি। সাধুবাবা নিজেই এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।

১১টার দিকে অনুষ্ঠান স্থলে গিয়ে তো আমি অভিভূত। যেদিকে তাকাই শুধুই মানুষ আর মানুষ। শুধুই মানুষের মাথা। বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। সাধুবাবা মঞ্চে বসে আছেন। আমি এসেছি শুনে তিনি খবর পাঠালেন, ‘মাকে আমার পাশে এনে বসাও। স্বেচ্ছাসেবকরা আমাকে মঞ্চে নিয়ে গেল। বাবার পাশে বসাল। আমি যাই দেখছি তাই বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। বাবার সামনে নানান উপঢৌকন রাখা হচ্ছে। টাকা দিয়ে বানানো বড় বড় মালা সাধুবাবাকে পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। দুধ দিয়ে তার পা ধুয়ে দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ পায়ের ওপর শুয়ে পড়ছে। একজন বাবাকে একটা অর্কিডের মালা দিল। সাধুবাবা সেটা হাতে নিয়েই আমার গলায় পরিয়ে দিলেন। আমি কি করব ভেবে পারছিলাম না। স্ট্যাচুর মতো বসে আছি। সাধুবাবা আমার হাতে কিছু চকলেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, মা নেন… খান…। আমি বিস্ময়ে হতবাক। যা ঘটছে তার সব কিছুই তো নতুন। বিস্ময়কর। প্রায় বেলা একটা পর্যনত্ম সাধুবাবা নানা ধরনের উপঢৌকন উপহার গ্রহণ করলেন। মঞ্চে তার পাশে বড় বড় কাসার কলস রাখা ছিল। তাতে লাইন ধরে মানুষ অর্থের চেক এবং টাকা ফেলে দিচ্ছে। বেলা ১টার দিকে সাধুবাবা আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, মা আপনি কি খুব ক্লানত্ম। আমি বিনীত কণ্ঠে বললাম, না বাবা আমি ক্লানত্ম নই। বাবা তখন বললেন, চলেন ভিতরে যাই। আপনাকে একটু প্রসাদ খাওয়াব।

মঞ্চের একটু দূরে একটা ঘরে গিয়ে বসলাম। সেখানেই শুনলাম সাধুবাবা অনেক বছর ধরে গাজরের রস ছাড়া আর কিছুই খান না। তার গায়ের রং টকটকে ফর্সা। মাথায় চুল নাই। গেরুয়া বসন। তাকে দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে বললেন, মা আপনি হয়তো ভাবছেন আমি একজন বৈষ্ণব হয়ে কেন আপনাকে ডেকে আনলাম? আসলে কী জানেন, এই এলাকার মানুষ খুবই গোঁড়া। আমি চাই এদের গোঁড়ামিটা ভাঙ্গুক। আপনি রবীন্দ্রনাথের গান গাইবেন। আমি আপনার গানের খুব ভক্ত। আপনি রবীন্দ্রনাথের পুজাপর্বের গান গাইবেন। তারপর মূল অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ তুলে বললেন, আপনি কিন্তু আমার সাথেই যাবেন।

মূল অনুষ্ঠানে যাবার আয়োজন দেখে আমি আরো বিস্মিত হলাম। সাধুবাবার জন্য মার্সিডিজ গাড়ি প্রস্তুত। গাড়ির সামনে পেছনে ব্ল্যাকক্যাট-এর প্রহরা। সামনে ব্লাকক্যাট, তার পেছনে সামনে সাধুবাবার গাড়ি, তার পেছনে আমাদের গাড়ি, আমাদের পেছনে ব্ল্যাকক্যাট…।

আমরা একপর্যায়ে সেই মন্দির স্থলে গেলাম। বিশাল এলাকা জুড়ে মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। কৃষ্ণচন্দ্রের আমলের এই মন্দিরের রত্নচুরি হয়ে যায়। স্থাপনায় ফাটল ধরে। সাধুবাবার উদ্যোগে মন্দিরটি আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

সাধুবাবা মন্দিরের সামনে বানানো একটি মঞ্চে গটগট করে উঠে গেলেন। মঞ্চের পাশেই একটি সংরক্ষিত জায়গায় আমাদেরকে বসানো হলো। আমি চারদিকে যতই তাকাচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি। লাখ লাখ মানুষ এসেছে। গ্রামের সাধারণ মহিলা, বৈষ্ণব বৈষ্ণবী… ন্যাড়া মাথা, বিধবা, গলায় তুলশীর মালা… যে দিকে তাকাই শুধুই মানুষ আর মানুষ। সবাই সাধুবাবাকে ভক্তি জানাচ্ছে। সাধুবাবার পাশেই কয়েক হাত দূরে ভক্তরা বসেছে। তাদের সামনেই সাধুবাবা আমাকে ডেকে বসালেন। বললেন, আপনি গান শুরু করেন। আমি মঞ্চে ওঠার আগে দেখলাম এক কিশোরী কীর্তন গাইছে। নেচে গেয়ে অভিনয় করে গাইছে সে। তার সাথে যন্ত্রীরা যখন সুর তুলছে… সে কী পরিবেশ… বিশেষ করে হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ বলার সময় এলাকা যেন কেঁপে উঠছে। এই দৃশ্য দেখে আমার তো অস্থির অবস্থা। এই পরিবেশে আমি কি করে গান গাইব? কিশোরীর কীর্তন গাওয়া শেষ। সাধুবাবা এবার আমাকে বললেন, মা এবার আপনি গান শুরু করুন। আমি রীতিমত ঘামতে শুরু করেছি। বাকরুদ্ধ অবস্থা। নার্ভাস। কোন গান দিয়ে শুরু করবো ভেবে পাচ্ছি না। ভাবছিলাম ভানুসিংহের পদাবলী অথবা এই ধরনের গান দিয়ে শুরু করবো। সাধুবাবাই পথ বাতলে দিলেন। বললেন, মা আপনি ‘বহে নিরনত্মর অননত্ম আনন্দ’ এই গানটি দিয়ে শুরু করুন। আমি কিভাবে গান শুরু করেছিলাম আজ আর বলতে পারব না। তবে এটুকু মনে আছে রবীন্দ্রনাথের গান সেদিন আমার ওপর সত্যি সত্যি ভর করেছিল। গান যখন গাইছিলাম তখন অনুভব করি, হাজার হাজার মানুষ নীরব হয়ে গেছে। কোন সাড়াশব্দ নাই। গান শেষ হবার পর হাজার হাজার মানুষের সে কী হাততালি আর আনন্দধ্বনি…

আমাকে বলা হয়েছিল আপনি আধঘণ্টা গান করবেন। বোধকরি ৫/৭টি গান গেয়েছিলাম। গান শেষে সাধুবাবাকে প্রণাম করে মঞ্চ থেকে নেমে আসছিলাম তখন আমার সামনে ব্ল্যাকক্যাট, পেছনে ব্ল্যাকক্যাট। আমাকে কাছ থেকে দেখার জন্য অনেকে ভীড় ঠেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্ল্যাকক্যাটসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত লোকজন কাউকে সামনে আসতে দিচ্ছে না। এমন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও মাথায় চুল নাই অতিশয় বৃদ্ধ এক মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মা বড় ভালো গান গেয়েছিস… তার কথা শুনে আমি অভিভূত। জীবনে অনেক জায়গায় গান গেয়েছি। কিন্তু এতো আনন্দ আর কোথাও পাইনি। এখনও মাঝে মাঝে সেই মহিলার কণ্ঠটা ভেসে ওঠে- মা বড় ভালো গান গেয়েছিস।