বিশ্বাস ছিল বাংলাদেশেও ঐ জায়গাটা একদিন তৈরি হবে : বুলবুল টুম্পা

বিশ্বাস ছিল বাংলাদেশেও ঐ জায়গাটা একদিন তৈরি হবে : বুলবুল টুম্পা

1892
SHARE

তিনি ইচ্ছে করলে নাটক সিনেমায় অভিনয় করতে পারতেন। অফারও ছিল প্রচুর। কিন্তু তিনি আগেই লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছিলেন দেশে র‌্যাম্প মডেলিংকে একটা সম্মানজনক জায়গায় দাঁড় করাবেন। তাই নাটক সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ কখনোই নেননি। বরং এড়িয়ে গেছেন। শুরুর দিকে পরিচিতজনরা প্রায়ই বলতেনÐ টুম্পা এসব কি করছিস? এখনো সময় আছে, নিজেকে বদলে ফেল। কিন্তু টুম্পা ছিলেন তার লক্ষ্যের প্রতি অনঢ়, অবিচল। আর তাই দেশে মডেলিং-এর ডিগনিটি প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে তার অনন্য ভ‚মিকার কথা আজ সকলেই কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করে। দেশের জনপ্রিয় র‌্যাম্প মডেল তারকা বুলবুল টুম্পা সম্প্রতি আনন্দ আলোর সাথে এক আড্ডায় বসেছিলেন। বলেছেন তার জীবন সংগ্রামের অনেক কথা। তারই চুম্বক অংশ প্রকাশ করা হলো। লিখেছেন- প্রীতি ওয়ারেছা
03_2আনন্দ আলো: র‌্যাম্পে আসার গল্পটা কেমন?
বুলবুল টুম্পা: ১৯৯৭ সাল। আমি তখন স্কুলে পড়ি। আমার চাচার এক বন্ধু আমাকে দেখে র‌্যাম্পে কাজ করার ব্যাপারে চাচাকে প্রস্তাব দেয়। চাচার সেই বন্ধুটি মডেলিং করতেন। আমি তখন চেহারায় খুবই শুকনা টাইপের ছিলাম। উচ্চতাও গড়পড়তা। বাঙালি মেয়েদের চেয়ে তুলনামূলক একটু বেশি। চাচার সেই বন্ধুর ধারণা ছিল আমি র‌্যাম্পে ভাল করব। তখন আমার বাবা-মা বেঁচে নেই। ভাইয়েরা আমার অভিভাবক। তারা ব্যাপারটা শুনে রাজি হলেন না। রাজি না হবার কারণও ছিল। এর আগে আমাদের চৌদ্দগোষ্ঠির কেউ মিডিয়ায় কাজ করেনি। তাই পরিবারের কারও মিডিয়ার প্রতি স্বচ্ছ ধারনা ছিল না। যাই হোক, এক সময় ভাইয়েরা রাজি হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালের দিকে অনামিকা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে প্রথম র‌্যাম্পে কাজ করি।
আনন্দ আলো: র‌্যাম্পে তো কাজ শুরু হল। এখানে নিজেকে কিভাবে যোগ্য করে তুললেন?
বুলবুল টুম্পা: সেতো অনেক সংগ্রামের কাহিনী। শুরুর দিকে দুই তিনটা শো করার পর তানিয়া আপুর(তানিয়া আহমেদ) সাথে কাজ করার সুযোগ মেলে। তানিয়া আপুর সাথে অনেক বছর কাজ করেছি। তারপর বিবি আপু(বিবি রাসেল), স্বপন ভাইয়ের সাথে কাজ করেছি। আমি খুবই লাকি, সেসময় নামকরা ইন্ডিয়ান কোরিওগ্রাফারের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ২০০০-২০১০ পর্যন্ত আমাদের দেশে অনেক বড় বড় ফ্যাশন শো হয়েছে। সেই শো গুলোতে আমি যেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলাম।
আনন্দ আলো: আপনার পরিবার প্রসঙ্গে জানতে চাই…
বুলবুল টুম্পা: আমার মা খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ঘর সংসার নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকতেন। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তিনি নাটক পছন্দ করতেন। তিনি চাইতেন আমি যেন নাটকে অভিনয় করি। আমি খুব কম বয়সে বাবা-মাকে হারাই। মিরপুরে আমাদের নিজেদের বাড়ি। আমরা যৌথ পরিবারে বাস করি। আমার ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ার কারণে আমরা পরিবারের প্রত্যেকেই একে অপরের নির্ভরশীল হয়ে যাই। সবাই এক সাথেই আছি। আমি এখনো বিয়ে করিনি। তবে করব না এমনও নয়। আমি মনে করিÐ বিয়ে ব্যাপারটা পুরোটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। আল­াহ যেদিন বিয়ের ফুল ফোটাবে সেদিন আমার ক্ষমতাও নেই ফুল আটকিয়ে রাখার। আর যদি আল­াহ না চায় আমি হাজার চেষ্টা করলেও কিছু হবে না।
আনন্দ আলো: বোঝা গেল অপেক্ষায় আছেন…. তাই বলে কি প্রেমেও পড়েননি?
বুলবুল টুম্পা: (মৃদু হেসে) হ্যাঁ একবার প্রেমে পড়েছিলাম। অভিজ্ঞতা এতটাই তিক্ত ছিল যে প্রেমের প্রতি আস্থাই চলে গেছে। সেই প্রেমের কারণে জীবনের অনেক ইচ্ছের সমাপ্তি ঘটেছে। দীর্ঘদিন একা আছি তবুও নতুন করে প্রেমে পড়ার ইচ্ছে জাগেনি। যে কোন সম্পর্কের মধ্যেই সততা জরুরি। যাকে ভালোবাসতাম তিনি একজন চিকিৎসক। আমাকে ব্যবহার করে মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠাও পেয়েছেন। তার ব্যক্তি জীবনের অন্ধকারময় অনেক ঘটনা জানার পরও তাকে মাফ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন জানলাম তার স্ত্রী, সন্তান আছে তখন আর আপোষ করতে পারিনি। সে তার নিজস্ব জগতটাকে আমার কাছ থেকে পুরোটাই আড়াল করে রেখেছিল। ঘুনাক্ষরেও আমাকে সে কিছুই টের পেতে দেয়নি। অথচ সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর মিডিয়ার লোকজন আমাকেই দোষারোপ করেছে। বলেছে, টুম্পা নিশ্চয়ই নতুন কারো প্রেমে পরেছে যার ফলে ব্রেকআপ হয়েছে। আমাকে দোষারোপ করার আসলে কারণও ছিল। সেই মানুষটি এতই বিনয়ী আর মুখোশধারী ভদ্রলোক যে তাকে অবিশ্বাস করা যে কারো জন্যেই একেবারে কঠিন। আর তাই ঘটনার সত্যতা টের পেতে সবার প্রায় বছর খানেক লেগেছে।
02_3আনন্দ আলো: দীর্ঘদিন একা পথ চলছেন সেই প্রেক্ষিতেই বলছিÐ ‘মানুষ একবারই প্রেমে পড়ে’ তাহলে এটাই কি সত্যি?
বুলবুল টুম্পা: না না তা কেন হবে! আমি এখন যেমন আছি, চলছি সেভাবে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। জীবনটাকে এভাবেই গুছিয়ে নিয়েছি। আর ভবিষ্যতের কথা কি বলা যায়? এখন একা আছি। দুইজন হতে কতক্ষণই বা সময় লাগবে? ঐ যে বললাম সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে। তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে।
আনন্দ আলো: র‌্যাম্পের পাশাপাশি কোরিওগ্রাফি শুরু করলেন কবে থেকে?
বুলবুল টুম্পা: কোরিওগ্রাফি শুরু করেছি ২০০৭ থেকে। এখনও টানা করে যাচ্ছি। আমি কোরিওগ্রাফারদের সাথে সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। তানিয়া আপু, লুনা, সুমন সবাইকে অ্যাসিস্ট করতাম। তাদের হেল্পিং হ্যান্ড অনুপস্থিত থাকলে আমাকে বলতোÐ টুম্পা একটু দেখিয়ে দে কিংবা হেল্প কর। সেখান থেকেই বোধ হয় নিজের ভেতরে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। অ্যাসিস্ট করতে করতেই আমি শিখে গিয়েছিলাম কিভাবে স্টেজটাকে ইউজ করতে হয়। কিভাবে কোরিওগ্রাফিতে নতুনত্ব আনতে হয়, কোন সময় কি মিউজিক দেয়া উচিত, কোন কাপড়ের সাথে কি লাইটিংটা হওয়া উচিত। আমি বাস্তব শিক্ষা থেকে শিক্ষিত একজন কোরিওগ্রাফার। কোরিওগ্রাফিতে আমার পথ চলা শুরু হয়েছিল আজরার একটা ইভেন্টের মাধ্যমে। আজরা আমাকে কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করে। অনেক প্রশংসিত হয় সেই শো। শো শেষে আজরা আমাকে বলেছিল, তুই এত ভাল কোরিওগ্রাফি করিস! নিয়মিত করিস না কেন? সেই থেকে আস্তে আস্তে কোরিওগ্রাফিতে মনোযোগ দেই। তবে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই তানিয়া আপুকে। তার কারণেই আমার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। আর আমার বন্ধু সুমন কোন শো পেলেই আমাকে দিয়ে কোরিওগ্রাফি করাতো।
আনন্দ আলো: র‌্যাম্পকে নিয়ে সামনে কতদুর যেতে চান?
বুলবুল টুম্পা: আমি চাই উন্নত দেশের মত আমাদের দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও পরিচিত হয়ে উঠুক। একটা সময়ে পরিচিতজনদের কাছ থেকে শুনেছি টুম্পা এসব কি কর! মডেলদের কেউ চেনে নাকি! নাটক সিনেমা করলেও তো পার! কিন্তু আমি মডেলিংয়ের ডিগনিটিটা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। সারা বিশ্বে মিডিয়া জগতে মডেলরাই সবচেয়ে ডিমান্ডেবল পারসন। বাংলাদেশেও ঐ জায়গাটা একদিন তৈরি হবে। র‌্যাম্পের মানুষরা আসলেই অনেক সুন্দর আর পারসোনালিটি সম্পন্ন। আমাদের এখানে যারা কাজ করে তারা অনেক ভাল কাজ করে। আমি স্যালুট করি আমাদের দেশের মডেলদের কারণ আমাদের দেশে কোন এজেন্সি নেই। এজেন্সি ছাড়া একজন মডেল সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় ক্যারিয়ার গড়ে তুলছে সেটা বিশাল ব্যাপার। আমি এই অঙ্গনটিকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাই।
আনন্দ আলো: আপনারা যারা প্রতিষ্ঠিত মডেল তারা এজেন্সি করার ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ নেননি কেন?
বুলবুল টুম্পা: আমরা পারবো না কারণ এজেন্সি করতে হলে প্রচুর টাকা লাগে। মডেলদের পক্ষে সেটা সম্ভব না। এজেন্সি দিতে পারে বড় বড় কোম্পানি কিংবা মিডিয়া হাউজ। আমাদের দেশে এই সেক্টরে এজেন্সির প্রয়োজনীয়তা কেউ বোঝে না। এজেন্সি একটা মডেলকে পশ করে গড়ে তোলে। তবে একথা সত্য, আমরা মডেলরাও ভালো না। আমরা ভাবি এজেন্সির মাধ্যমে কেন যাব! ডাইরেক্ট গেলে তো আমি টাকা বেশি পাব। আবার স্পন্সররা কম টাকায় ডাইরেক্ট মডেল পেলে এজেন্সির মাধ্যমে মডেল নেবে কেন? তুপা আপা শুরু করেছিলেন কিন্তু টিকিয়ে রাখতে পারেননি এই জাতীয় বহুবিধ সমস্যার কারণে। আনন্দ আলো: র‌্যাম্প মডেলিংয়ে উন্নত দেশগুলোর সাথে আমাদের মূল পার্থক্য কোথায়?
বুলবুল টুম্পা: প্রত্যেকটা দেশে মডেলিং এর ক্ষেত্রে এজেন্সি আছে। এজেন্সি মডেলদের নিয়মিত বেতন ভাতা নিশ্চিত করে থাকে। মডেলের কাজ না থাকলেও তারা বেতন ভাতা পায় এজেন্সি থেকে। মডেলরা এজেন্সির মাধ্যমে কাজ পায়। মডেল কোথাও কাজ নিতে গেলে প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়Ð আপনি কোন এজেন্সির? যত কোয়ালিফাইড আর সুন্দর মডেলই হোক না কেন এজেন্সির মাধ্যমে না গেলে কেউ কোন কাজ পায় না। কোন মডেল কোন কাজ করবে সেটাও নির্ধারণ করে এজেন্সি। আমাদের দেশে কোন এজেন্সি নেই। এখানকার মডেলরা নিজ উদ্যোগে কাজ করে এবং কাজ পেয়ে থাকে।
আনন্দ আলো: আমাদের দেশে র‌্যাম্প মডেলরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এটা কেন হচ্ছে?
বুলবুল টুম্পা: এটা যার যার পারসোনাল ব্যাপার। কে কতটুকু র‌্যাম্পকে ভালোবাসে বিষয়টা আসলে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। আমি প্রচুর পরিমাণে মুভি, নাটক আর টিভিতে অভিনয়ের অফার পেয়েছি কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে সবাই সব কাজ করছে, তাতে করে নিজস্ব আইডেন্টিটি তৈরি হচ্ছে না। কিংবা অনেক পেশার প্রভাবে র‌্যাম্প তার আইডেন্টিটি হারাচ্ছে। র‌্যাম্প আমার ভালোবাসা। পরের জনমে যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করে, কি হতে চাও? আমি বলব, র‌্যাম্প একমাত্র র‌্যাম্প মডেলই হতে চাই। জীবনে প্রতিষ্টা পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমিও প্রচুর কষ্ট করেছি। প্রতিষ্ঠিত করেছি টুম্পা মানেই আমি। আমি মনে করি মানুষের যদি ইচ্ছে শক্তি থাকে, ভালোবাসা থাকে- হয়তো একটু সময় লাগে কিন্তু তার জন্য জায়গাটা তৈরি হয়ে যায়।
আনন্দ আলো: র‌্যাম্প মডেলিং করতে এসে মেয়েরা বিভিন্ন ধরণের ট্র্যাপে পড়ছে, অন্ধকার জগতের দিকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এটা কেন ঘটছে?
BULBUL-TUMPAবুলবুল টুম্পা: এই অভিযোগের কিছুটা হলেও সত্যতা আছে। আমি বলবো যারা এটা করে তাদের নিজের প্রতি ভালোবাসা একেবারেই নেই। আমি যখন নিজেকে ভালোবাসব তখন আমি যেখানেই যাই না কেন জেনে বুঝে যাব। যদি আমার খুব তাড়াতাড়ি সেলিব্রেটি হওয়ার চিন্তা থাকে তাহলে আমি হয়তো অন্ধকারকেই বেছে নেব। আর যদি আমার মনে হয় আমি যোগ্যতা দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হব সেক্ষেত্রে প্রথমে নিজেকে তৈরি করব। আমি লিফট দিয়ে ওঠার চেষ্টা করব না, সিঁড়ি দিয়ে উঠব। যারা সিঁড়িটাকে ব্যবহার করতে পারবে তারা কখনো অন্ধকারে যাওয়ার চিন্তা করবে না। এ কথাগুলো আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। দীর্ঘ ষোল বছর ধরে র‌্যাম্পে কাজ করছি, কাজের গুনেই আমি আজ বুলবুল টুম্পা। শুধু র‌্যাম্পেই না যারা মিডিয়ায় কাজ করতে আসছে আমি চাই তারা একটু জেনে বুঝে আসুক।
আনন্দ আলো: মিডিয়াকর্মীদের অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে- মিডিয়াতে যেন বন্ধুর অভাব। সবাই যেন একে অন্যের শত্র“। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?
বুলবুল টুম্পা: যে যত বড় সেলিব্রেটি সে তত অমায়িক। এটাকে উল্টো করলে কি বোঝায় সেটা তো বুঝতেই পারছেন। এখন অনেক মিডিয়া হাউজ। কাজ করার প্রচুর সুযোগ। মিডিয়া হাউজ ও সোশাল মিডিয়ার কল্যানে সবাই জেনে যাচ্ছে কারা ভালো কাজ করছে। কারো কাজ না থাকলে সে অন্যের পেছনে লাগবেই। কাজের জন্য সবাই গুণি মানুষকে ডাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমি যদি অযোগ্য হই কেউ আমাকে দিয়ে কাজ করাবে না। জেলাসি করে লাভ কি! যদি জেলাসি করতেই হয় তবে নিজেকে যোগ্য করে তবেই করা উচিত। অন্যের কাজকে হ্যাম্পার করে নয়, কাজের মানোন্নয়ন বিষয়ে জেলাসি করুক। তা কিন্তু করবে না। নিজেকে অদক্ষ মনে হলে দক্ষ করার ব্যবস্থা নিজেকেই নিতে হবে। তাহলে জেলাসি প্রবনতা আর থাকবে না।
আনন্দ আলো: আপনার নিজের প্রতিষ্ঠান ‘স্নাপ শট’ নিয়ে কিছু বলুন।
বুলবুল টুম্পা: প্রতিষ্ঠানটির জন্য আমরা অনেক কষ্ট করেছি। বিশেষ করে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অনেক কষ্টের পরেই আমি এখন একটা অবস্থান পেয়েছি। আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে কারণ সেসময় কোন গ্র“মিং প্রতিষ্ঠান ছিল না। বাসায় সারা রাত প্রাকটিস করেছি। বাইরের মডেলদের সাথে কাজ করতে গিয়ে তাদের ফলো করেছি। তখন খুব অনুভব করতাম যদি কেউ আমাকে গ্র“মিং করাতো তাহলে অনেক উপকৃত হতাম। সেই অভাববোধ থেকে নিজের সাধ্যের মধ্যে খুব ছোট্ট পরিসরে ২০০৬ সালে ‘স্নাপ শট’ নামের একটি গ্র“মিং প্রতিষ্ঠান চালু করি। আসলে র‌্যাম্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই করেছি। র‌্যাম্পে নতুনদের একটা শক্ত প্লাটফর্ম থাকুক আমি সেটা চাই। কোন মডেলের গ্র“মিং করা থাকলে তার পারসোনালিটি অনেক হাই থাকে, আত্মবিশ্বাস হাজারগুণ বেড়ে যায়। সেই আত্মবিশ্বাসের জোরেই তারা ভালো কাজ করে। সারিকা, অর্ষা, প্রিয়াংকা, হলি, আরিয়ানা সানজানা, জেনেট, লিন্ডা, মেঘলা, রাজ, এবিএম সুমন, বাপ্পিসহ আরো অনেকে আমার স্টুডেন্ট যারা এখন র‌্যাম্প জগত কাঁপাচ্ছে।
আনন্দ আলো: আপনার স্টুডেন্টরা আপনাকে মা ডাকে বলে শুনেছি।
বুলবুল টুম্পা: আমি সবাইকে ‘বাবা সোনা’ বলে সম্মোধন করি তাই ভালোবেসে তারাও আমাকে মা ডাকে।
আনন্দ আলো: কেউ যদি নিজেকে র‌্যাম্প মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সেক্ষেত্রে তার মধ্যে কি ধরণের গুনাবলী থাকা উচিত?
বুলবুল টুম্পা: প্রথমত প্রচুর খাটতে হবে। ভালো আচরণের অধিকারী হতে হবে, বাচনভঙ্গী সুন্দর হতে হবে, সুগঠিত শরীর হতে হবে। র‌্যাম্পের ক্ষেত্রে আরেকটা জরুরি বিষয় হল হাইট। যারা নতুন আসতে চায় তাদের ক্ষেত্রে বলব তারা যেন অবশ্যই পড়াশুনা করে জেনে বুঝে আসে। নিজের কর্মক্ষেত্রটাকে আগে থেকে জেনে বুঝে তবেই আসা উচিত তাহলে কাজের প্রতি ভালোবাসাটা থাকবে।
আনন্দ আলো: দেশের বাইরে শো করেছেন?
বুলবুল টুম্পা: আমি দেশের বাইরে কোন র‌্যাম্প শো করিনি। তবে প্রচুর ফটোশ্যুট করেছি। পিপল ট্রি নামে স্বনামধন্য একটি ম্যাগাজিনের সাথে আমি দুই বছর যুক্ত ছিলাম। তিনটা দেশে ইউকে, ইউএস আর জাপানে একসাথে পিপল ট্রি পাবলিশড হয়। তাদের সাথে প্রচুর কাজ করেছি। র‌্যাম্পে কাজ করার ক্ষেত্রে হাইট একটা বড় ব্যাপার। ইন্টারন্যাশনাল র‌্যাম্পে কমপক্ষে পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি হাইট লাগে। আমার হাইট পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। আমি নিজের হাইট সম্মন্ধে যেহেতু অবগত সুতরাং দেশের বাইরে র‌্যাম্পে কাজ করার চেষ্টা করিনি। অনেক অফার পেয়েছি কিন্তু আমি জানতাম আমার হাইটের কারণে ওরা শেষপর্যন্ত আমাকে নেবে না। তাই তাদেরকে আমার হাইটের বিষয়টা জানিয়ে সম্মানের সাথে সেই অফারগুলো ফিরিয়ে দিয়েছি।
আনন্দ আলো: আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে শুধু র‌্যাম্প মডেলিং করে কি জীবন নির্বাহ করা সম্ভব?
বুলবুল টুম্পা: পারছে তো অনেকেই। ষোল বছর ধরে আমিওতো টিকে আছি। এই সেক্টরে কেউ যদি সত্যিই কাজ করতে চায় তবে সে করতে পারবে। গ্ল্যামার চলে যাওয়ার পরে কেউ চাইলে গ্র“মিং করতে পারবে, কেউ চাইলে কোরিওগ্রাফিও করতে পারবে। মিডিয়ায় কাজের অনেক জায়গা আছে। আমি র‌্যাম্পে কাজ করার পাশাপাশি কোরিওগ্রাফি শুরু করেছি, টিচিংও শুরু করেছি।
আনন্দ আলো: র‌্যাম্প নিয়ে স্মৃতিময় ঘটনার কথা জানতে চাই…
বুলবুল টুম্পা: একবার পারসোনা বিউটি পার্লারের ব্রাঞ্চ ওপেনিংয়ে যোগ দিতে সিলেটে গিয়েছিলাম। ঠিক পরের দিন ‘কালারস্ অব চিটাগং’ নামে আমার বড় একটি শো ছিল চট্টগ্রামে। সিলেট আর চট্টগ্রামের মধ্যে দুরত্ব সম্মন্ধে আমার কোন ধারণাই ছিল না। সিলেট থেকে আমি কয়েকজন মডেলসহ রাত ৯টায় গাড়িতে উঠলাম। রাত পোনে একটার দিকে গাড়ির ভেতরে হৈচৈ শুরু হল। গাড়িতে আগুন লেগেছে। এমন একটা জায়গা গাড়িটা থামানো হল যেখানে ধু ধু মাঠ, ঘুটঘুটে অন্ধকার। পরিস্থিতি সামলে একঘন্টা পর আবার গাড়ি চলা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর একটা পেট্রোল পাম্পের সামনে গিয়ে আবার গাড়ি নষ্ট হল। এভাবে লক্কড় ঝক্কড় করতে করতে সকাল ৭টায় গাড়ি কুমিল­া এসে পৌঁছাল। ফোনে অর্গানাইজারকে জানালাম রাস্তার ঘটনা। তারা বলল, আমরা চট্টগ্রাম থেকে একটা মাইক্রোবাস পাঠাই? চট্টগ্রাম থেকে মাইক্রোবাস কখনইবা কুমিল­ায় পৌঁছাবে আর আমরাই বা কখন সেই বাসে চড়ে চট্টগ্রাম গিয়ে পৌঁছাব? অবশেষে বাসের ড্রাইভারকে বোঝালাম সমস্যার কথা। বললাম, ভাই আমাদেরকে আরেকটা গাড়িতে ওঠার ব্যবস্থা করে দেন। অবশেষে বাসের ড্রাইভার আমাদেরকে একটা বাসে উঠিয়ে দিল। সেদিন ভাগ্য এতই খারাপ ছিল যে সীতাকুন্ডে এসে পাঁচ ঘন্টা জ্যামে বসে থাকলাম। দেড়টার সময় চট্টগ্রাম পৌঁছালাম। হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সাড়ে পাঁচটার সময় আমি মডেলদের নিয়ে রিহার্সেল শুরু করলাম। মোট তেরটা কিউ নামাতে হবে। মডেলদের শুধু বললাম, কেউ আমার সাথে কথা বলবে না শুধু আমার কমান্ড ফলো করো। মাত্র দেড় ঘন্টা রিহার্সেল করে আমি একটি সফল শো নামিয়েছি সেদিন। খুব অবাক লাগে ভাবলে এখনো।
আনন্দ আলো: বুলবুল টুম্পার আনন্দ কিসে
বুলবুল টুম্পা: কারো জন্যে ভালো কিছু করতে পারলে খুব ভালো লাগে। আইএসডি নামে একটি এনজিওর সাথে আমি গত দুই বছর ধরে যুক্ত আছি। তাদেরকে আমি বিনা পারিশ্রমিকে শো করে দেই। শো থেকে পাওয়া টাকা এসিড দগ্ধদের চিকিৎসার্থে ব্যয় হয় এবং কিছু টাকা গরীব বাচ্চাদের স্কুলে যায়। আমি কাজটি করে খুব তৃপ্তি পাই। এছাড়া কারো কোন উপকারে লাগবে এমন কোন উদ্যোগের সাথে কেউ থাকতে বললে আমি কখনো না করি না। ছবি: রাকিবুল হক মেকআপ: অরা বিউটি লাউঞ্জ কৃতজ্ঞতা: মাহ্দীন তারিক