বিদায় সেলুলয়েডের কবি

বিদায় সেলুলয়েডের কবি

376
0
SHARE

৪ জুলাই প্রয়াত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত চিত্রপরিচালক আব্বাস কিয়ারোসৱামি। তাঁর ছবি দেখে জঁ-লুক গদার মনৱব্য করেছিলেন, ‘ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথের হাত ধরে সিনেমার শুরু, আর শেষ আব্বাস কিয়ারোসৱামির হাত ধরে।’ প্রয়াত হওয়ার পর শোকবিহ্বল মার্টিন স্করসেজি বলেছেন, ‘বিশেষ প্রতিভার অধিকারী বিরল একজন ব্যক্তিত্বকে হারাল পৃথিবী।’ শুরু থেকে শেষ পর্যনৱ নিজের জাদুতে পরিচালক, বোদ্ধা, সমালোচক থেকে সাধারণ দর্শককে মুগ্ধ করেছেন আব্বাস। প্রয়াত এই পরিচালককে নিয়ে বিশেষ আয়োজন

জন্ম ইরানের রাজধানী তেহরানের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন দেয়াল-শিল্পী। আব্বাস কিয়ারোসৱামিও ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকিতে মনোযোগী হন। পরে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পেইন্টিং অ্যান্ড গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে পড়েন। ক্যারিয়ারও গড়েছিলেন সে পথেই। প্রথম জীবনে পেশা ছিল নানা ধরনের ফরমায়েশি ছবি আঁকা, পোস্টার ডিজাইন আর বাচ্চাদের বইয়ের অলংকরণ করা। পরে টিভি-বিজ্ঞাপন বানানোর কাজেও হাত লাগান। একসময় অর্থাভাবে রাসৱায় ট্রাফিক পুলিশের চাকরিও করেছেন।

বদল শুরু হয় ‘কানুন’-এ চাকরি দিয়ে। তেহরানভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত শিশু ও তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। সেখানে যোগ দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে বোঝালেন, তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিলের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হতে পারে সিনেমা। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির চলচিত্র অধ্যয়ন বিভাগ চালু হলো। সেখান থেকে তিনি বাচ্চাদের জন্য বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিও বানালেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ‘কানুন’ থেকে এক ঘণ্টার একটা সিনেমা বানান ‘দ্য এক্সপেরিয়েন্স’। পরের বছরই মুক্তি পায় তাঁর নিজের প্রথম সিনেমা ‘দ্য ট্রাভেলার’। অবশ্য সিনেমাটি আনৱর্জাতিক পরিসরে মুক্তি পায় নব্বইয়ের দশকে এসে। নিজে সিনেমা বানানো শুরু করার পরও দীর্ঘদিন ‘কানুন’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি সিনেমা-সাহিত্যের ওপর ইরান সরকারের ভীষণ কড়াকড়ির মধ্যেও নিজের কাজ করে গেছেন। ইসলামী বিপ্লবের পর সমসাময়িক অধিকাংশ পরিচালক দেশ ছাড়লেও সে পথ মাড়াননি কিয়ারোসৱামি, ‘আমি মাটিতে শিকড় ছড়ানো একটা গাছের মতো। আপনি গাছটাকে উপড়ে নিয়ে অন্য কোথাও লাগালে, গাছটাতে হয়তো আর ফলই ধরবে না। দেশ ছেড়ে গেলে আমার অবস্থাও ওই গাছের মতোই হবে।’

দেশে থেকেই, সেন্সরশিপের কড়াকড়ির বেড়াজালের ফাঁক গলে তিনি এমন সব সিনেমা উপহার দিয়েছেন, যেগুলো তাঁকে সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পরিচালকে পরিণত করেছে।

পরিচালক হিসেবে কিয়ারোসৱামির খ্যাতির শুরু কোকার-ট্রিলজি দিয়ে। ট্রিলজির প্রথম সিনেমা ‘হয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হোম?’ মুক্তি পায় ১৯৮৭ সালে। এই সিনেমা দিয়েই কিয়ারোসৱামি প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আনৱর্জাতিক পুরস্কার জেতেন। সিনেমা তিনটির পরের দুটি ‘লাইফ, অ্যান্ড নাথিং মোর’ এবং ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’ মুক্তি পায় যথাক্রমে ১৯৯২ এবং ১৯৯৪ সালে। দ্বিতীয় সিনেমাটি দেখে জঁ-লুক গদার মনৱব্য করেন, ‘সিনেমাটির শুরু হয়েছে ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথের হাত ধরে, আর শেষ হয়েছে আব্বাস কিয়ারোসৱামির  হাত ধরে।’

তবে কিয়ারোসৱামির জীবনের সেরা কাজ বলা হয় যেটিকে সেই ‘টেস্ট অব চেরি’, মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। সিনেমাটির কাহিনী অজানা কারণে নিভৃতে আত্মহত্যা করতে চাওয়া এক লোককে ঘিরে, যে তেহরানজুড়ে তাকে কবর দেওয়ার জন্য একজনকে খুঁজে বেড়ায়। সিনেমাটি সে বছরের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সর্বোচ্চ পুরস্কার পাম দ’অর জিতে নেয়।

এবার আসা যাক কিয়ারোসৱামির স্টাইল নিয়ে। তিনি কেন ব্যতিক্রম? কারণ তিনি সিনেমার মৌলিক নিয়মটাই ভেঙে দিয়েছেন। অন্যদের মতো তিনি সিনেমায় সব কিছু ব্যাখ্যা করেন না। নিজেদের মতো বুঝে নেওয়ার সুযোগ দেন দর্শকদের। যেমন ‘টেস্ট অব চেরি’তে জনাব বাদি কেন আত্মহত্যা করতে চায় তা জানানো হয় না।

কিয়ারোসৱামির আরেক বৈশিষ্ট্য তিনি চলচ্চিত্র আর তথ্যচিত্রের সীমানা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আবারও ‘টেস্ট অব চেরি’র কথাই ধরা যাক। শেষ দৃশ্যে জনাব বাদি যখন কবরে শুয়ে আছে তখন ক্যামেরা বাসৱবে ফিরে আসে। দেখা যায় কিয়ারোসৱামি তাঁর ক্রুদের নিয়ে শুটিং করছেন। ফিল্ম ক্যামেরা থেকে সাধারণ ভিডিও ক্যামেরায় এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন দর্শকদের ধাক্কা দেয়।

অনেক ছবিতেই অন্ধকার নিয়ে খেলেছেন কিয়ারোসৱামি [দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস, এবিসি আফ্রিকা]। এতে দর্শকরা নিজেদের মতো করে দৃশ্য তৈরি করে নেন। কোনো একটা দৃশ্যের মাধ্যমে চরিত্রের অবস্থা তুলে ধরতেও পটু কিয়ারোসৱামি। এ ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র আঁকাবাঁকা পথ। যেমন ‘হয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম’-এ আঁকাবাঁকা পথ দেখিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বন্ধুকে পেতে কত কষ্ট করতে হবে। দৃশ্য ব্যবহারের এমন উদাহরণ পরিচালকের সব ছবিতেই আছে।

তাঁর ছবিতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা থাকলেও ‘সিনেমা কেমন হবে’ এ প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন খুব সহজেই, ‘আমি বিশ্বাস করি সিনেমা শুধু দুই রকমই হয়; ভালো সিনেমা ও মন্দ সিনেমা। ভালো সিনেমা সেটাই, যা আমরা বিশ্বাস করি, যেটা করি না সেটাই মন্দ ছবি।’ বলা হয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক সিনেমাই সাধারণ দর্শকের কাছে দুর্বোধ্য। এ নিয়ে মজার উত্তর দিয়েছেন তিনি, ‘আমার ছবি দেখতে দেখতে কেউ যদি ঘুমিয়ে পড়ে কিছু মনে করব না। কারণ, আমি জানি খুব ভালো ছবিগুলো আপনাকে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করতে পারে। এটাকে খারাপভাবে নেওয়ার কিছু নেই।’ দেশ না ছাড়ার সিদ্ধানৱ থেকে শেষ জীবনে কিয়ারোসৱামিকে সরে আসতে হয়। মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় আসার পর, সিনেমায় কড়াকড়ি বেড়ে যায়। ফলে তাঁর শেষ কয়েকটা ছবি তিনি বিদেশের প্রেক্ষাপটেই নির্মাণ করেন। শুটিংও হয় বিদেশে। এই সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম

‘সার্টিফায়েড কপি’ (২০১০) এবং ‘লাইক সামওয়ান ইন লাভ’ (২০১২)।

ভালো ছবি সম্পর্কে তাঁর যত ভাবনা

আব্বাস কিয়ারোসৱামি ছিলেন শানৱ স্বভাবের মানুষ। কথা বলতেন গুছিয়ে, কবিতার মতো করে। নানা সময়ে প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ-

এরপেছনে বড় ভূমিকা বন্ধু আব্বাস কোহেন্দারির জুতোর! উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চিত্রকলায় পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরীক্ষায় পাস করতে পারলাম না। একদিন কোহেন্দারি তাজরিশ ব্রিজের দিকে নিয়ে যেতে চাইল। আমার পায়ে স্যান্ডেল, রাজি হলাম না। ও একটা নতুন জুতা দিল। গেলাম ব্রিজে। ওখান থেকে ফরহাদের বাসায়। ওখানেই মোহাকেকের সঙ্গে দেখা। সে চিত্রকলার ওপর কর্মশালা করত। ক্লাস করলাম, চিত্রকলায় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম। সেই শুরু। এরপর বিজ্ঞাপন, বইয়ের প্রচ্ছদ, পোস্টার অতঃপর চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্রের বাইরে অনেক কিছু করেছেন। ছবি তোলা, লেখা ইত্যাদি। কোন পরিচয়ে বেশি সন্তুষ্ট?

আমি ভবঘুরে। এ জন্য সব জায়গায় যেতে পারি, সব কাজ করতে পারি। যেমন ছুতারের কাজ করেও অনেক সময় কাটাই, তখন এটাতে যত তৃপ্তি পাই অন্য কিছুতে তত পাই না। আর ছবি তোলা? আমার কাছে স্থিরচিত্র, ভিডিও, চলচ্চিত্র সব একই।

আপনার বেশির ভাগ ছবিরই মূল চরিত্র পুরুষ। ইরানে কড়া ধর্মীয় অনুশাসন কি এর কারণ?

নারীকে ব্যতিক্রম দেখতে পছন্দ করি না। বিশেষত নায়কোচিত চরিত্রে নারীকে বাজে লাগে কারণ এটা বাসৱবতা বিবর্জিত। এর বাইরে সিনেমায় স্রেফ সাজানোর বস্তু হিসেবে নারীকে দেখানো হয়েছে, যেটাও আমার পছন্দ নয়। অবশ্য আমার ‘টেন’ ছবিতে মূল চরিত্রে নারী আছে।

এই ছবি কি আপনার বিবাহিত জীবন থেকে অনুপ্রাণিত?

অবশ্যই। আমার যে বিষয়ের অভিজ্ঞতা নেই তা কখনো দেখাই না। আমার ডিভোর্স হয়েছিল। এরপরের নানা ভোগানিৱই ছবিতে উঠে এসেছে।

আপনার ছবির অনেকেই পেশাদার অভিনেতা নন। কখনো এঁরা বাসৱব জীবনের নিজেদের চরিত্রেই অভিনয় করেন।

অপেশাদাররা আমার চিত্রনাট্য ঠিক করে দিতে পারে। এটা মসৱ সুবিধা। কিছু লেখার পর যদি দেখি তাঁরা সেটা স্বাভাবিকভাবে বলতে পারছে না তখনই বুঝি সমস্যা আছে। সিনেমা তৈরির সময় বারবার এরা আমাকে ‘হসৱক্ষেপ’ করে, বস্তুত এরাই আমাকে ভালো ছবি বানাতে সাহায্য করে।

আপনার অনেক সিনেমাই অসমাপ্ত [যেমন ‘টেস্ট অব চেরি’]। কারণ কী?

অধিকাংশ সময়ই দর্শকরা একটা গল্প দেখার আশা নিয়ে সিনেমা দেখতে বসে। আমি ভাবি দর্শক আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। এ কারণেই দুই ঘণ্টা তাদের বন্দি করে আমার ভাবনামতো তাদের গল্প বলার পক্ষপাতী নই। ভালো ছবি সেটাই, যা দর্শককে বন্দি না করে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে পারে।

আপনার ছবিতে গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

গাড়িই আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। সেই সব। আমার অফিস, বাড়ি, আমার লোকেশন। যখন গাড়িতে বসি আর পাশে কেউ থাকে, খুব অনৱরঙ্গ অনুভূতি হয়। সবসময় পরস্পরের দিকে তাকাতেও হচ্ছে না, চারপাশও দেখতে পাচ্ছি। নীরবতা এখানে খুব কষ্টের নয়।