Home প্রতিবেদন গল্প বিকেলে গায়ে হলুদ সন্ধ্যায় মঞ্চে অভিনয়

বিকেলে গায়ে হলুদ সন্ধ্যায় মঞ্চে অভিনয়

SHARE
fazlur-rahman-babu

ফজলুর রহমান বাবু

ছোটবেলার একটা স্মৃতির কথা বেশ মনে পড়ছে। তখন আমি খুবই ছোট। ৫/৬ বছরের কথা। বাবা খুলনায় সরকারি চাকরি করতেন। আমি পড়তাম খুলনা ভিক্টোরিয়া ইনফেন্ট স্কুলে। বাবার হাত ধরে স্কুলে যেতাম। শিক্ষকদের দেখে খুউব ভয় পেতাম। যদিও শিক্ষকদের সবাই আমাকে আদর করতেন। তবুও কেন যেন সবাইকে ভয় পেতাম। অভিনয় জীবনে বহুবার শিক্ষদের ভ‚মিকায় অভিনয় করেছি। শিক্ষক হিসেবে যতবারই অভিনয় করেছি ততবারই আমার শিশুকালের কথা মনে পড়েছে। প্রাইমারী শিক্ষকের বেলায় বারবারই মনে প্রশ্ন জেগেছে শিক্ষক হিসেবে আমাকেও কি কোনো শিশু ভয় পাচ্ছে! কই সে? এসো বাবা তোমাকে একটু আদর করি…
হ ১৯৬৯ সাল। দেশটা সংগ্রাম মুখর হয়ে উঠেছে। কেন, কিসের জন্য এত সংগ্রাম তখন বুঝতাম না। ছোট বয়সে বোঝার কথাও নয়। এখনও মনে পড়ে কিছু না বুঝলেও মিছিল আমাকে খুব টানতো। নাইন টেনের বড় ভাইয়েরা প্রায় প্রতিদিনই মিছিল বের করতেন। আমরা ছোটরাও সেই মিছিলে যোগ দিতাম। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা… বলে ¯েøাগান দিতাম। তখন এই ¯েøাগানের গুরুত্ব বুঝিনি। এখন বুঝি। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলেই গর্বে বুক ফুলে যায়। আমিও মিছিলে ছিলাম। স্বাধীনতার মিছিলে…
হ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। স্বাধীনতার জন্য দেশ আন্দোলন মুখর হয়ে উঠেছে। গোটা দেশে থমথমে অবস্থা। নদীর পাড়ে আমরা সবাই একটা রেডিও সঙ্গে নিয়ে গোল হয়ে বসে আছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ভাষণ দিবেন। রেডিওতে তাঁর ভাষণ শোনা যাবে। আমরা সবাই গোল হয়ে অধীর আগ্রহে বসে আছি। রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। হঠাৎ রেডিওতে ভেসে উঠল বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠÑ ভাইয়েরা আমার… সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই আরও কাছাকাছি হলাম। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনছি। আর মুগ্ধ হচ্ছি। কখনও তীব্র আবেগ, কখনও উচ্ছ¡াস আবার কখনও প্রতিবাদী হয়ে উঠছি সকলে। নেতা যখন ঘোষণা দিলেনÑ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম… তখন আনন্দে আমরা গগন বিদারী চিৎকার দিয়েছিলাম…
আজও এই স্মৃতি আমাকে সকল কাজে প্রেরনা যোগায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক সরাসরি ভাষণ শুনতে পারার সৌভাগ্য হয়েছিল। এ এক পরম সৌভাগ্য আমার।
হ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা শহর থেকে গ্রামে চলে আসি। স্কুল বন্ধ। কোনো কাজ নাই। বন্ধুরা মিলে গানের দল বানালাম। রেডিওতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর যে সব গান বাজত সে গানই দোতরা বাজিয়ে গাইতাম। বন্ধুদের মধ্যে ফরহাদ, মধুর কথা মনে পড়ছে। ঐ বয়সে দরাজ গলায় গান ধরতো। ঐ যে গানের প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম… আজও গানের সঙ্গে আছি…
হ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভয়ভীতি কাটিয়ে সবাই আনন্দ করছে। ততদিনে আমরা আবার শহরে ফিরে এসেছি। বিকেলে শহরে অবস্থা দেখার জন্য হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। সবাই আনন্দ মিছিল করছে। আমিও মিছিলে যোগ দিলাম। সন্ধ্যার পর মনে হলো আমি তো বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। রাতে একা বাড়ি ফিরবো কি করে? পাশেই এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বন্ধুর বাবা সব শুনে বললেনÑ ঠিক আছে রাতে আমাদের বাসায় থাকো। ওদিকে আমাদের বাড়িতে আমাকে ঘিরে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। সবাই কান্নাকাটি করছে। সবার ধারণা আমি হারিয়ে গেছি। পরের দিন সকালে আমি যখন বাড়িতে গেলাম তখন সারাবাড়ি আনন্দে থই থই করে উঠলো। সত্যি এই স্মৃতি ভোলার মতো নয়।
হ এবার আমার নাট্যজীবনের একটি স্মৃতির কথা বলি। ১৯৭৮ সাল। ঢাকায় জাতীয় নাট্য উৎসব চলছে। ফরিদপুর টাউন থিয়েটারের উদ্যোগে আমরা উৎসবে যোগ দিতে ঢাকায় এলাম। শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্য উৎসব চলছে। অনেক দর্শক। আমাদের নাটক মঞ্চস্থ হলো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো নাটকের জনপ্রিয় মানুষগুলোকে দেখছিলাম। আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেরামত মাওলা, রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ এদেরকে প্রথম সরাসরি দেখলাম। দারুণ এক্সসাইটেড আমি। পরের দিন দেশের জনপ্রিয় একটি দৈনিক পত্রিকায় আমাদের নাটকের ছবিসহ উৎসবের সংবাদ প্রকাশ হলো। ছবিতে অন্যান্যের সঙ্গে আমাকেও দেখা যাচ্ছে। রিপোর্টেও আমার নাম আছে। জীবনে প্রথম পত্রিকায় নিজের ছবি ছাপা হতে দেখে আমি তো আনন্দে আত্মহারা। অনেকের সঙ্গে আমার মুখটা ভালো করে বোঝা যাচ্ছিল না। তবুও সেই ছবি প্রকাশের আনন্দ আজও ভুলতে পারি না।
হ টিভি নাটকে অভিনয় নিয়ে একটা মজার স্মৃতি বলি। তখনকার দিনে বিটিভিতে বিভিন্ন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ছোট ছোট নাটকের অংশ থাকতো। সে রকমই একটি নাটকে আমার অভিনয়ের সুযোগ ঘটে। মামুন ভাই সুযোগটা করে দিয়েছেন। নির্ধারিত দিনে বন্ধু-বান্ধবসহ আরও অনেকে টিভি সেটের সামনে বসলাম। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি শুরু হলো। সবাই বেশ নড়ে চড়ে বসল। কেউ একজন আমাকে প্রশ্ন করলÑ কিরে বাবু তোকে দেখা যাবে তো… টিভিতে…
সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজন ধমক দিলÑ আরে ভাই এত কথা বলেন কেন? আগে দেখেন না…
ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে নাটকের অংশ দেখানো হলো। কিন্তু আমার অভিনয় অংশ নাই। বাদ দেয়া হয়েছে। বন্ধুরা টিপ্পনী কাটতে শুরু করল। আমি তো লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছিলাম না। ভাগ্য ভালো নাটকের টেলপে অভিনেতা হিসেবে আমার নাম প্রচার হয়েছে। তাই দেখে সবার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে যে আমি মিথ্যা বলি নাই।
হ মঞ্চ কর্মী হিসেবে আরণ্যকের সঙ্গে কলকাতায় নাটক করতে যাওয়ার একটা ঘটনা আমাকে মাঝে মাঝেই বেশ আলোড়িত করে। সম্ভবত ১৯৮৮ সালে আমরা আরণ্যক নাট্যদল ‘ইবলিশ’ নাটকটি নিয়ে কলকাতায় একটি নাট্য উৎসবে যোগ দিতে যাই। সেখানে মনোজ মিত্র, বিভাস চক্রবর্তী, উৎপল দত্তসহ অনেক নাট্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে। নাট্যকর্মী হিসেবে নতুন এক উপলব্দি হয় আমার।
হ আমার বিয়ে নিয়ে একটা মজার স্মৃতি আছে। সুযোগ যখন পেলাম তখন ঘটনাটা বলেই ফেলি। বিয়ে করতে যাব ফরিদপুরে। ততদিনে আমি আরণ্যক নাট্যদলে যুক্ত হয়েছি। মঞ্চে নিয়মিত কাজ করি। আমার বিয়েতে দলের সবাইকে দাওয়াত করা হলো। দল সিদ্ধান্ত নিল বিয়ের দাওয়াত কবুল করা হলো কিন্তু শর্ত একটাই ফরিদপুরে নাটকের শো হবে। সবাই একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। ফরিদপুর জসীম উদ্দীন হলে নাটক মঞ্চস্থ হবে। নাটকের নাম ‘খেলাখেলা’।
সন্ধ্যায় নাটক মঞ্চস্থ হবে। আমি সেই নাটকের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করবো। অথচ বিকেলে আমার গায়ে বিয়ের হলুদ দেয়া হচ্ছে। বাড়ির সবাই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত। সন্ধ্যার কিছু আগে পরিবারের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নাটক করার জন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হলাম। ‘খেলাখেলা’ মঞ্চস্থ হলো। দর্শক ভর্তি মিলনায়তনে নাটক নিয়ে প্রশংসার ঢেউ খেলে যাচ্ছে। অনেক দর্শক নাটকটি দেখতে পাননি। তারা দাবি তুললেন পরের দিন সকালে নাটকটির আরেকটি শো করার। দলের সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিল। দল প্রধান মামুনুর রশীদ আমাদের অভিভাবক মামুন ভাই পরিস্থিতি বুঝে আমার দিকেই বলটা ছুড়ে দিয়ে বললেনÑ বাবু যদি রাজি হয় তাহলে আমরাও রাজি।
বাবুতো রাজি। কিন্তু পরিবার তো রাজি নয়। রাতে শো করে বাড়িতে যাবার পর অনেক বকাঝকা খেলাম। এই যখন অবস্থা তখন পরের দিন আবার নাটকের শো। এটা কি আদৌ সম্ভব? হ্যাঁ আমরা পরের দিনও খেলাখেলার অরেকটি শো করেছি। একদল নাটক পাগল কর্মীর পক্ষেই এটা সম্ভব হয়েছে। ঐ পাগলামীর শক্তিতেই এখনও নাটক করেই চলেছি…
হ আমরা যারা শোবিজে কাজ করি তারা অনেক সময় ইচ্ছা করলেও পরিবারকে সময় দিতে পারি না। ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও পরিবারকে সময় দিতে অনেক সময় ব্যর্থ হই। আমার স্ত্রী তখন সন্তান সম্ভবা। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। স্বামী হিসেবে তার পাশে থাকা আমার জরুরি কর্তব্য। অথচ আমি বিটিভির একটি নাটকের শ্যুটিং করছিলাম সেই রাতে। কোনো উপায় ছিল না। আমি শ্যুটিং এ না থাকলে পুরো ইউনিট সমস্যায় পড়বে। সে কারণে স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে আমি নাটকে অভিনয় করলাম। রাত ১১ টার দিকে শ্যুটিং শেষ করে হাসপাতালে স্ত্রীর কাছে গেলাম। ভোরবেলা আমার কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। এ এক অপার আনন্দ।
হ মেঘে মেঘে অনেক বেলা হলো। অনেকগুলো সিনেমায় অভিনয় করলাম। আমার প্রথম সিনেমা আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিহঙ্গ। সত্যি কথা বলতে কি বিহঙ্গতে অভিনয় করে আমি সিনেমা আর টিভি নাটকের খুব একটা পার্থক্য নিরূপণ করতে পারিনি। কারণ বিহঙ্গতে যারা অভিনয় করছিলাম, নির্মাণ কাজে জড়িত ছিলাম তারা সবাই টিভি নাটকেও কাজ করি এক সঙ্গে। কাজেই পরিবেশ গত পার্থক্য খুব একটা দেখছিলাম না। তবে হ্যাঁ আবু সাইয়িদ এর ‘শঙ্খনাদ’ সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়ে একটু যেন পার্থক্য বুঝতে পারলাম। মাহফুজুর রহমান ছিলেন এই সিনেমার ক্যামেরাম্যান। আমার দেখা একজন ভালো মানুষ। শঙ্খনাদÑ এ অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই। এটা আমার বেশ আনন্দের স্মৃতি। সম্প্রতি তৌকির আহমেদের নতুন ছবি অজ্ঞাতনামায় অভিনয় করে আমি বেশ আনন্দ পেয়েছি।
হ বিদেশ যাওয়া নিয়ে একটি স্মৃতির কথা বলি। বিদেশ যাত্রা মানেই উড়োজাহাজে ভ্রমণ। আমি প্রথম উড়োজাহাজে উড়ি ইউরোপে যাবার সময়। ফ্রান্স আর ইটালিতে নাটক করতে যাচ্ছি। দলে ৪ সদস্য-মামুনুর রশীদ, ডলি জহুর, পাভেল আজাদ ও আমি। এই প্রথম উড়োজাহাজে উঠলাম। মাটি থেকে আকাশে ভাসছি। ভেসে ভেসে চলে এলাম অন্য দেশে। সে এক বিস্ময়কর ও প্রেরণাদায়ক ঘটনা ছিল আমার জন্য।