বাহারি রংয়ের পাখির মেলায়

বাহারি রংয়ের পাখির মেলায়

335
0
SHARE
POJ

মুকিত মজুমদার বাবু

ভোর। তখনো সূর্য ওঠেনি। চারদিকে পাখির কিচির-মিচির শব্দ। থৈ থৈ পানি। মিহি সুতার মতো নেমে আসছে কুয়াশা। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। শীত শীত ভাব। আমরা আছি হাতিয়ায় দমার চরে। বৈচিত্র্যে ভরপুর এক দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ। কোথাও কেউ নেই। যেদিকে তাকানো যায় শুধু পাখি আর পাখি। স্থানীয় পাখির সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিযায়ী পাখি। জিরিয়া, বাটান, গুলিন্দা, বক, কমনশেলডাক, চখাচখি, রাঙা মানিকজোড়, গাঙচিল, পাকড়া, উল্টোঠুঁটি, পানচিল, কালালেজী জৌরালি, হট টি টি, কাস্তেচরাসহ প্রায় ৪০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। বিচিত্র এদের রং। বিচিত্র এদের অঙ্গভঙ্গি। কোনোটা কালো, কোনোটা সাদা, ছাইরংয়া, কোনোটা আবার হলুদ। নানা ভঙ্গিমায় স্বাধীনভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে চরের মাটিতে। এক এক ধরনের আওয়াজ করে ডাকছে এক এক প্রজাতির পাখি। যেন কোনো পাখির মেলা বসেছে। এখানে পাখি, ওখানে পাখি, সেখানে পাখি। কোথায় নেই পাখির দল? চরে কোনো শিকারির ভয় নেই। নেই কোনো বিষটোপের ভয়। এরা এখানে নির্ভয়, নিরাপদ। এই চরে রয়েছে বিপন্নপ্রায় দেশি গাঙচষা। পৃথিবীতে এই পাখির সংখ্যা মাত্র ১০ হাজার। এর মধ্যে দমার চরেই দেখা মেলে প্রায় চার হাজার পাখির। বাংলার আর কোনো চর বা দ্বীপে রংবাহারি এমন পাখির মেলা দেখা যায় বলে আমার জানা নেই।

দমার চর এক কথায় দুর্গম অঞ্চল। থকথকে কাদা। চারদিকে নোনা পানি। টেউয়ের পরে টেউ আসছে। ট্রলারে থেকে মনে হচ্ছে নাগরদোলায় চড়েছি। আমরা দু’টো ট্রলার নিয়েছি। সঙ্গে নিয়েছি নয় দিনের খাবারসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিস। আমরা ঘুরব। ঘুরে ঘুরে পাখি দেখব। বিশেষ করে বঙ্গোসাগরের কুলঘেঁষা ভোলা, মনপুরা, হাতিয়া, চর বারি, নিঝুম দ্বীপ, চর শাহজালাল, চর মন্তাজ, চর পিয়াল, চর কালকিনি, চর হাজিপুর, সোনার চর, চর কচ্ছপিয়া, চর যাদব, চর তুলাতুলি ও ঢাল চরসহ আরো কিছু অঞ্চলে যাব।

ভোর হয়েছে নৌকাতেই। সাগরের এক অপূর্ব দোলানীতে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি মনে নেই। এক ঘুমে রাত পার। সকালবেলা জেগে উঠে প্রকৃতির এই রূপ-রস-গন্ধে আমি বিমোহিত। প্রকৃতির কাছে আসা, প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া… এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি। অন্যরকম তৃপ্তি। অন্যরকম আনন্দ।

সবাই জেগে উঠছে। সূর্যের আলোতে ভরে গেছে চারদিক। যে যার মতো তৈরি হয়ে নিচ্ছে চরে নেমে পাখি দেখবে বলে। ভাটা চলছে। চরে নামার এখনই উপযুক্ত সময়। ঝুপ ঝুপ করে নেমে পড়ি আমরা। নিচে পা রাখতেই হাঁটু অব্দি ডুবে যায় কাদার ভেতর। আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে করতে এগিয়ে যাই সামনের দিকে। বিশ-ত্রিশ হাত যেতেই কাদা কমে গেল। সবুজ ঘাসের সমতল ভূমির দেখা পেলাম। কিন্তু ঘাসের ওপর পা রাখতেই সূচের মতো বিধতে লাগল পায়ে। ঘাসগুলো মাড়িয়ে এগোতেই শক্ত মাটি, আবার থকথকে কাদা পড়ল পথে। তবে এবার কাদাটা আগের চেয়ে কম।

যতদূর চোখ যায় হালকা উঁচু নিচু মাটি আর ধু ধু চরে নানা প্রজাতির পাখি ছাড়া যেন আর কিছুই নেই। তবে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে মহিষ। গরুও আছে; তার সংখ্যা খুবই কম। এখানে মহিষ ও গরুর চলাফেরায় বিঘিœত হচ্ছে পাখির স্বাধীনতা। মহিষ-গরুর পায়ের তলে নষ্ট হচ্ছে পাখির ডিম। দীর্ঘদিন ধরে পাখিপ্রেমীরা এই দ্বীপটিকে সংরক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়ে আসছে। পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে দমার চরের পরিবেশ অক্ষুণœ থাক এটা আমিও চাই।

অবাক হয়ে সবাই পাখি দেখছে। যেন ওরা আগে কোনোদিন এত পাখি এক সঙ্গে দেখেনি। নানা রকম ‘বিস্ময়সূচক’ শব্দ করছে মুখে। চোখে লাগানো বাইনোকুলার। একজন বললেন, এমন পাখির স্বর্গরাজ্য বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই।

পাখির রাজ্যে প্রায় চার ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। কীভাবে সময়টা পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। এরই মধ্যে জোয়ার আসতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে পানি দখল করে নিচ্ছে চরের সব জায়গা। আমরা তড়িঘড়ি ট্রলারে উঠে পড়লাম। পেছন ফিরে অবাক হয়ে দেখলামÑ থৈ থৈ পানির সাগর। পাখিগুলো সেই পানিতে ভাসছে, গোসল করছে, উল্লাস করছে। মহিষগুলো পানির ভেতরে শরীর ডুবিয়ে ঝিম মেরে বসে আছে। কিছু সময় আগের দেখা দমার চর এখন শুধু ধু ধু সাগর।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন