Home মুখোমুখি বাবা ও ছেলের মধুময় গল্প

বাবা ও ছেলের মধুময় গল্প

SHARE

এনামুল করিম নির্ঝর আর রৌদ্র সাকিব করিম। বাবা স্থপতি, চলচ্চিত্রকার, আলোকচিত্রী, গীতিকার, সুরকার ও লেখক। আর ছেলেও বাবার মতো আলোকচিত্রী, লেখালেখি করেন, গিটার ভালো বাজাতে পারেন। পড়াশোনা করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে। বাবা-ছেলেকে নিয়ে আনন্দ আলো একদিন মুখোমুখি বসেছিল ব্যস জমে গেল বাবা-ছেলের আড্ডা। লিখেছেন-মোহাম্মদ তারেক।

আনন্দ আলো: বাবা এনামুল করিম নির্ঝর এবং রৌদ্র সাকিব করিম পরস্পরের কাছে কে কেমন?

এনামুলক করিম নির্ঝর: আমরা পিতা-পুত্র বন্ধুর মতো। রক্তের সম্পর্ক তো বটেই। শাসন, অনুশাসন, রাগ, অনুরাগ, ভালোবাসা প্রতিটি ব্যাপারেই ছেলের সাথে আমার সম্পৃক্ততা। আমি যেমন আমার পরিবারের একমাত্র সনত্মান ছিলাম। রৌদ্রও আমার একমাত্র সনত্মান। সেজন্য অনেক কিছুরই কেন্দ্রবিন্দু ও। প্রত্যাশার জায়গাটাও বেশি।

রৌদ্র সাকিব করিম: বাবা আর আমি দু’জনই খুব কাছের বন্ধু। সব কিছু শেয়ার করা যায় এরকম একটা সর্ম্পক আছে আমাদের মধ্যে। বাবা হিসেবে বলব অসম্ভব রকমের দায়িত্বশীল একজন মানুষ। খুবই সৎ। সনত্মানের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা অনেক বেশি। সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ।

আনন্দ আলো: বাবার শাসন আর ছেলের আবদার সম্পর্কে কার কী অভিমত?

এনামুল করিম নির্ঝর: ছেলের আবদার বাবার কাছে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা অতিরিক্ত চাপের আকারে নয়। শাসনের কথা যদি বলি তাহলে বলব একেবারেই যে ওকে বকা দেইনি সেটা বললে ভুল হবে। বকাগুলো মূলত হয় মানবতাবাদি বিষয় নিয়ে। আমার মনে হয় না, লেখাপড়া নিয়ে ওকে বকাঝকা করেছি। যেটা করেছি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। অবশ্যই কর্তব্য যে সব বিষয় আছে সেগুলো নিয়ে বকাঝকা দিয়েছি। আমি ছোটবেলা থেকে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিলাম, এখনো আছি, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকব। আমি চাইব যে রৌদ্র সেই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবে।

রৌদ্র সাকিব করিম: ছোটবেলায় বাবা-মায়ের শাসনসটা একরকম ছিল। এখন অন্যরকম। শাসনটা উপদেশ মূলক। বাবা-মায়ের শাসন তো অবশ্যই চাই। শাসন না করলে তো সামনের দিকে এগোতে পারব না। আমার কোনো কিছুতে ভুল হলে আব্বু বকাঝকা দেয়। বুঝি সেটা আমার ভালোর জন্যই দেয়।

আনন্দ আলো: ছেলের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে কিছু বলুন?

এনামুল করিম নির্ঝর: বাবা-মায়ের কাছে সব সনত্মানই বাচ্চা থাকে। সব সময় ওদেরকে আমরা জ্ঞান, উপদেশ দিয়ে থাকি। রৌদ্রের ভালো দিক হচ্ছে খুবই ধৈর্যশীল একটি ছেলে। ভালো মন্দ যাচাই করার ক্ষমতা ওর মধ্যে আছে। ও খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারে। ওর অনেক মানবিক গুণাবলী রয়েছে। যে কোনো কাজ প্রপারলি করতে পছন্দ করে। সাকসেসের জন্য পাগল হয়ে দৌড়ায় না। আবার অলস হয়ে বসে থাকে না। রৌদ্র ফটোগ্রাফিতে বেশ পারদর্শী। ভালো গিটার বাজাতে পারে। আবার গানও গাইতে পারে। রৌদ্রের মন্দ দিক হচ্ছে, ও একটু চাপা স্বভাবের। নিজেকে প্রকাশ করতে চায় না। ভবিষ্যতের যে সময়টা আসছে সে সময়টাতে ওর আরো বেশি প্রকাশ ভঙ্গি দরকার।

আনন্দ আলো: রৌদ্রের কাছে জানতে চাই বাবার কোন দিক সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?

রৌদ্র সাকিব করিম: বাবা অনেক সত্যবাদী। অসাধারণ একজন মানুষ। কোনো কিছু না লুকিয়ে সরাসরি বলতে পছন্দ করেন। সনত্মানের প্রতি তার অফুরনত্ম ভালোবাসা ও দুর্বলতা আছে। বাবা হেল্পফুল একজন মানুষ। সবাইকে অনেক হেল্প করে। বাবার সৃজনশীল ক্ষমতাও অসাধারণ। এটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।

আনন্দ আলো: বাবা-ছেলের একসাথে স্মৃতিময় কোনো ঘটনা

এনামুল করিম নির্ঝর: খুব ছোটবেলায় ওর সাথে আমার একটা মজার স্মৃতি আছে। আমার কোনো বন্ধু-বান্ধব ছিল না। ওকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। ওকে সিট বেল্টে বেঁধে রাখতাম। কথা বলতে জানতো না। মাঝে মধ্যে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আর মাথা উচু করে তাকিয়ে বাইরে দৃশ্য দেখবার চেষ্টা করত। ওর বয়স তখন ৭/৮ বছর হবে। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো ওর হাতে একটা ক্যামেরা দিয়ে বলব ছবি তোল। প্রদশর্নী করব। ছবি বিক্রি করে যে টাকাটা পাব সেই টাকাটা তুমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ স্কুলে দিবে। ওই সময়টা ওর মানার কথা নয়। ও সেটা মেনেছে। ছেলের সঙ্গে আমার এই স্মৃতিটা এখনো মনে পড়ে।

রৌদ্র সাকিব করিম: বাবার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে। একটা স্মৃতির কথা না বললেই নয়। ঈদের দিন ছিল। আমি মায়ের সাথে থাকি। ঈদের নামাজ আমি আর বাবা একসাথে পড়ি। ওইদিন সকালে বাবা আমাকে নিতে আসে। ধানমন্ডিতে ঈদের নামাজ পড়তে পারিনি। শেষ পর্যনত্ম পুরনো ঢাকায় গিয়ে নামাজ পড়লাম। বাবার এক কলিগের সাথে দেখা করে চিপা গলি দিয়ে বের হওয়ার পথে বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল একটা বাড়ির দিকে। বাড়িটার নাম মল্লিক বাড়ি। অদ্ভুদ একটা বাড়ি। বাবা ওই বছর এই বাড়িতে ‘আহ্‌া’ ছবির কাজ করেন। ২০০৭ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। এটা আমার জীবনে একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।

আনন্দ আলো: অবসর সময় কীভাবে কাটান?

এনামুল করিম নির্ঝর: আমি অবসর সময় খুব একটা পাইনা। আমার সময়টা খুব মাপা। অফিসে থাকলে আর্কিটেকচার নিয়ে ব্যসত্ম থাকি। যখনই অবসর পাই তখন আমার নতুন সিনেমার কাজ নিয়ে বসে পড়ি। এরপরে যেটুকু সময় পাই গান তৈরি করি, বই পড়ি, সিনেমা দেখি। আমার সবটাই অবসরের কাজ, আবার কোনোটাই অবসর না।

রৌদ্র সাকিব করিম: অবসর সময়ে আমি গিটার বাজাই, গান গাই, গান শুনি, মুভি দেখি, এডিটিং করি, আর গেমস খেলতে পছন্দ করি।

আনন্দ আলো: বর্তমানে আপনারা কি কি কাজ নিয়ে ব্যসত্ম আছেন?

এনামুল করিম নির্ঝর: আমি মূলত স্থাপত্য বিষয় নিয়ে ব্যসত্ম আছি। এরই মধ্যে আমার গানশালার পরের ১০১টি গানের প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়েছে। মুম্বাইতে আর্কিটেকচারের প্র্যাকটিস শুরু করেছি। এসবের পাশাপাশি আমার নতুন সিনেমার কাজ নিয়ে ব্যসত্ম আছি। সিনেমার পান্ডুলিপি নিয়ে রৌদ্র এবং তার বন্ধুদের সাথে প্রতিনিয়ত বসছি। জুন অথবা জুলাই নাগাদ ছবির কাজ শুরু করব।

রৌদ্র সাকিব করিম: আমি পড়াশোনা করছি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি, আর এডেটিং করছি। বাবা নতুন সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছেন। আমি সেটা ঠিক ঠাক করে দিচ্ছি। আমার মাথায় কোনো আইডিয়া এলে সেটা বাবাকে বলে দেই। আমি এখন বাবার সিনেমার কাজ নিয়ে ব্যসত্ম আছি।

আনন্দ আলো: দুজনের প্রিয় কাজ কোনটি?

এনামুল করিম নির্ঝর: ২০০৪ সালে রৌদ্রের যখন নয় বছর বয়স তখন শিল্পাঙ্গনে ওর তোলা আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছিল। শিরোনাম ছিল। ‘আমার ক্যামেরা বন্ধু’। ছবি বিক্রির টাকা দেওয়া হয়েছিল বন্যার্ত শিশুদের বই কেনার জন্য।

রৌদ্র সাকিব করিম: বাবা আগে খুব ছবি আঁকতেন। বাবার আঁকা ছবি গুলো আমার খুব প্রিয়।

আনন্দ আলো: একে অপরের কাছে যে কথাটি এখনো বলা হয়নি?

এনামুল করিম নির্ঝর: আমার জীবনের এমন কোনো কথা নেই যা রৌদ্রকে বলা হয়নি। সব সময় ওর সাথে কথা শেয়ার করতে পছন্দ করি।

রৌদ্র সাকিব করিম: আমি যা বলতে চাই, মুখে না বললেও বাবা তা সহজেই বুঝতে পারেন।

আনন্দ আলো: বাবা ও ছেলের প্রিয় মুহূর্ত?

এনামুল করিম নির্ঝর: শুক্রবার রৌদ্র যখন আমার কাছে আসে, ওই মুহূর্ত গুলো অন্যরকম মনে হয়। ওই সময়টা দারুণ উপভোগ করি।

রৌদ্র সাকিব করিম: স্কুলে আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। একদম শেষ দিকে কয়েকজনের সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব হয়। স্কুল থেকে আমাদের একবার সিলেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শ্রীমঙ্গলে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়ানোর সেই মুহূর্ত গুলো কখনোই ভুলব না।

আনন্দ আলো: বাবা ও ছেলের তোলা প্রিয় আলোকচিত্র

এনামুল করিম নির্ঝর: আমি তখন মাত্র ছবি তোলার চর্চা করছি। একদিন রাসত্মার ধারে আলোকচিত্রী হাসান সাইফুদ্দিন ভাইয়ের একটা ছবি তুললাম। পরে ছবিটার জন্য পুরস্কারও পেয়েছিলাম।

রৌদ্র সাকিব করিম: অনেক বছর আগে বাবার সঙ্গে একবার ধানমন্ডি লেকের ধারে হাঁটছি। লেকের ধারে ঘাসের ওপর দেখি একটা সবুজ শাড়ি আর একটা লাল শাড়ি পাশাপাশি ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আমি তা ক্যামেরায় বন্দী করি। পরে ছবিটি ‘আমার ক্যামেরা বন্ধু’ প্রদর্শনীতে রেখেছিলাম। বিক্রিও হয়েছিল।

আনন্দ আলো: কোন কারনে খুব রাগ হলে কী করেন?

এনামুল করিম নির্ঝর: যার ওপর রাগ হয়, তাকে খুব বকা দেই। কিন্তু একটু পরেই তাকে আবার কাছে টেনে নেই। আমি রাগ বেশিক্ষণ পুষে রাখি না।

রৌদ্র সাকিব করিম: যখন খুব রাগ হয় তখন চুপ করে বসে থাকি। পরে রাগ কমাতে জোরে জোরে নিশ্বাস নেই।

আনন্দ আলো: বাবা ও ছেলের জন্য কোনো গান?

anamol-Kobir-Nirjhor-1এনামুল করিম নির্ঝর: আট বছর আগে রৌদ্রের জন্য একটা গান করেছিলাম। গানের শিরোনাম ‘বড় কিংবা দিওনা মাঝারি বাড়ি, চেনা বাড়িটা লাগছে অচেনা বাড়ি’।

রৌদ্র সাকিব করিম: আহা! ছবির জন্য বাবা একটা গান তৈরি করেছিলেন ‘দূর ইশারায়’। আমার গান লেখার চর্চা নেই। বাবার জন্য এই গানটার কথা বলতে চাই।

আনন্দ আলো: আপনারা যে কাজটা করতে চান না।

এনামুল করিম নির্ঝর: রাগ করাটা কমাতে চাই। ক্ষতিকর কোনো কাজ করতে চাই না। প্রতিনিয়ত আমার বোকামিগুলো কমানোর চেষ্টা করছি। মানুষকে বিশ্বাস করতে চাই কিন্তু বোকামি করতে চাই না।

রৌদ্র সাকিব করিম: মিথ্যা কথা বলতে চাই না। মানুষের ক্ষতি করতে চাই, না। আমি যেখান থেকে এসেছি সেটা যেন ভুলে না যাই।

আনন্দ আলো: আপনার ‘এক নির্ঝরের গান’ অ্যালবামটি এবার কলকাতা থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। অনুভূতি কেমন?

এনামুল করিম নির্ঝর: আমরা দুই বাংলার শিল্পীদের এক সূত্রে গেঁথেছি। আমার স্বপ্ন এখন বাসত্মবকে ছুঁয়েছে। কাটাতারের বেড়া কোনো দিনই বাংলা গান আর সুরকে আটকাতে পারেনি, সেই কথা আবারও প্রমাণিত হলো। ‘এক নির্ঝরের গান’ প্রথম অ্যালবাম ঢাকায় বেরিয়েছে গত বছরের ১২ জুন। ১০১টি গান দিয়ে সাজানো হয়েছে অ্যালবামটি। আমার লেখা ও সুর করা গানের সঙ্গীতায়োন করেছে ১৩ জন তরুণ সঙ্গীতায়োজক। কণ্ঠ দিয়েছেন ৪১ জন শিল্পী। এই ১০১টি গানের মধ্য থেকে ৩২টি নির্বাচিত গানের সংকলন কলকাতায় প্রকাশ করেছে সারেগামা।

আনন্দ আলো: স্থপতি নির্ঝরকে প্রশ্ন করি, একটা বাড়ির ডিজাইন করার সময় আপনি আসলে কী ভাবেন?

এনামুল করিম নির্ঝর: বিল্ডিং ডিজাইন করার সময় আমার একটা ভাবনা থাকে। আমি কী ভাবে তাকে একটি অর্থপূর্ণ পরিসর করে দেব। প্রায় বাড়িতে দেখা যায় যে কি সব লাগিয়ে রাখে। ভয়াবহ একটা ব্যাপার। কিন্তু তার মধ্যে অর্থপূর্ণ পরিসর বানাতে গেলে তাদের জীবনে যেটা চাওয়া, পাওয়া তাদের যে অভ্যাস, তাদের সর্ম্পকের যে আর্কিটেকচার আছে সেটাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা যাদের বাড়িঘর বানাই সেখানে আমরা একটা প্রসেসের মধ্য দিয়ে যাই। বাড়ির মানুষের সম্পর্কের গল্প, চাওয়া পাওয়ার গল্প, তাদের ভবিষ্যতের গল্প শোনার চেষ্টা করি। এগুলোর মধ্যে আমরা ঢুকে যাই প্রচণ্ড ভাবে। শুধুমাত্র কয়েকটা দেয়াল, ছাদ, জানালা থাকলেই বাড়ি হয় না। বাড়িটা যেন বাড়ি হয়। যারা থাকে তাদের মতো করেই যেন বাড়ি হয়। এটা হচ্ছে খুব জরুরি বিষয়।