Home প্রতিবেদন বাংলার বর্ষবরণ

বাংলার বর্ষবরণ

SHARE
bangla

রাজু আলীম

বৈশাখী রঙের খেলা। বৈশাখ হলো বেনিআসহকলা-বেগুনী নীল আকাশি সবুজ হলুদ কমলা ও লাল রঙে বছরের প্রথম দিনের ছবি আঁকা। বৈশাখী রঙের খেলা। চর্যাপদের সময় হয়ে রবী ঠাকুর নজরুলে এসে জীবনানন্দের বাংলায় অনেক কমলা রঙের রোদে নতুন বছরে এগিয়ে চলা-বৈশাখ হলো বেনিআসহকলা।

হাজারো মানুষ সকালে প্রথম আলো গায়ে মেখে- কোরাসে গেয়ে ওঠা মেয়ে- আলতা রাঙা পায়ে-আগুন রাঙা শাড়িতে বৈশাখী বন্দনায় মাতোয়ারা- বৈশাখী রঙের খেলা। বিশ্ব বাঙালির আবহমান ঘরে ঘরে- রাজপথ থেকে অলি গলি পাড়া মহল্লা- গ্রামে গঞ্জে হাট বাজার মানুষে মানুষে গাড়িতে বাড়িতে- খবরের কাগজ টেলিভিশনে যে যেখানে আছে-একই সুরে সুর মিলিয়ে সবাই মিলে গান গাওয়া- ‘এসো  হে  বৈশাখ, এসো এসো- তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক, এসো এসো।’

বৈশাখে তন্বী তরুণীর খোঁপায় ফুল। বৈশাখ নতুন আর নিপুণ। বৈশাখী বিকেলে তুমুল ঝড় আর সেই ঝড়ের মাতনে কাজী নজরুল আর তাঁর জয় ধ্বনিতে নতুনের মিছিল- ‘ওই নতুনের কেতন উড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর।  তোরা সব জয় ধ্বনি কর।’

নগরে ভোরের আলো ফুঁটে ওঠে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ গান। মাটির শানকিতে পান্তা ইলিশের সাথে কাঁচা মরিচ স্বাদে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। বৈশাখী টানে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গানে। সুরের ধারা ও চ্যানেল আই-এর হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে লাইভ সম্প্রচার পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখে বিশ্ববাঙালি জুড়ায় তাদের প্রাণ।

শহরে ও গ্রামের  ধুলো মাখা পথে মিছিলে মিছিলে চলা রঙ বেরঙের মুখোশ, কাগজের ফুল, পশু পাখির মুখ, কাগজের কারুতে নকশা আর আলপনায় পাড়া মহল্লা হুলস্থ‚ল। গ্রামে বট অশ্বথ গাছের ছায়া শীতলে বৈশাখী রথের মেলা- খই, দই, মুড়ি, চিড়া, নাড়ু, নিমকি, সন্দেশ,  দানাদার, রসকদম্ব, গুড়ের জিলাপি আর পাটালি কতই না বাহারি।

নাগরদোলা, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ দেখা। বাউল লালন, হাসন রাজা, ঘেঁটু ও লেটো গান, জারি সারি ভাটিয়ালি, পালা আর গম্ভীরার সাথে আরো কত শত গানের আসর। অভিনয় শিল্পীদের যাত্রাপালা। লাইলী মজনু, ইউসূফ জোলেখা আর রাধা কৃষ্ণের পালা দেখে কেঁদে বুক ভাসায় গ্রামের সহজ সরল মানুষ। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে পালার আসর।

পুরনো দিনে শহুরে বৈশাখী গানের কনসার্টে আযম খান, ফকির আলমগীর, ফেরদৗস ওয়াহিদ এর গানে টালমাটাল ছোট-বড় সবাই। আর এখনকার দিনে রোদে পুড়ে  বৈশাখী কনসার্টে  জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, মমতাজ, হাসান অথবা ফিড ব্যাকের মাকসুদ-এর  মেলায় যাইরে- ‘বাসন্তি রঙ শাড়ি পরে ললনারা হেঁটে যায়,  মেলায় যাইরে, বখাটে ছেলের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই, মেলায় যাইরে, মেলায় যাইরে।’

বৈশাখে নতুন সিনেমা মুক্তির হিড়িক। দল বেঁধে হলে বাদাম খেতে খেতে কবরী, রাজ্জাক, ফারুক, ববিতা, শাবানা, আলমগীর আর বুলবুল আহমেদের সিনেমা। হালে শহুরে জীবনের ফ্যাশনে এয়ার কন্ডিশন্ড সিনেপ্লেক্সে পপকর্ণ চিবোতে চিবোতে ফেরদৌস মৌসুমী, পূর্ণিমা, শাকিব খান, রিয়াজ, জয়া আহসান, নুসরাত ফারিয়া, আরেফিন শুভ, বাপ্পী, মাহি, বুবলী আর পরীমণি’র বৈশাখী সিনেমা উপভোগ। পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া শপিং মল-এর ফুডকোর্ট এ পান্তা ইলিশ সাথে ফুল ভলিউমে গান- ‘আইলো আইলো রে রঙে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে, পাগলা মনে রঙিন চোখে, নাগরদোলায় বছর ঘুরে একতারাটার সুরটা বুকে, হাজার তালের বাউল সুরে,  দেশটা জুড়ে খুশির ঝড়ে একটা কথাই সবার মনে- আইলো আইলো  রে- রঙে ভরা বৈশাখ আবার আইলো রে।’

bangla-1পরিবার নিয়ে শহরে বৈশাখ উদযাপনের মতো গ্রামের বাড়িতে উঠোনে বসে খানা পিনা আর গানের আসর। বাহারি নানা রকমের রসের পিঠা স্বাদে বাড়ির  ছেলে-মেয়েরা  নেচে ওঠে উৎসবের গানে- ‘বাজে  রে বাজে  ঢোল আর ঢাক, এলো  রে এলো পহেলা বৈশাখ। আজি কৃষ্ণচূড়ার ডালে লেগেছে লালে লালে, সেই রঙ হৃদয়ে ছড়াক। বাজে  রে বাজে ঢোল আর ঢাক, এলো  রে এলো পহেলা বৈশাখ।’

বৈশাখী  উৎসবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগে রঙের  ছোঁয়া- গান, আবৃত্তি, নাটক, ছবি আঁকা, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, হাঁড়ি ভাঙা, কুস্তি, দৌড় প্রতিযোগিতা, মোরগ লড়াই, সাঁতার, ঘুড়ি প্রতিযোগিতা, ঘোড়াদৌড় ও নৌকাবাইচসহ আরো কত কত বাঙালি আয়োজন। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি  বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে সরকারি ছুটি। সব বয়েসি মানুষ চুটিয়ে করে মজা ।

এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ। গ্রাম বাংলা আর শহরের বাঙালিরা এই দিনে ঘর-বাড়ি ঘষে মেজে তকতকে ঝকঝকে করে। পহেলা বৈশাখ মানে নতুন জীবনের শুরু। এই সময় তাই ব্যবসায়েরও শুভ সূচনা। নানা ধরনের ছাড় এবং পণ্য ক্রয়ের অফার নিয়ে হাজির হয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। শহুরে জীবনে পহেলা বৈশাখে বাণিজ্যের পসরা বেশিই চোখে পড়ে। বিউটি পার্লারে  বৈশাখী সাজগোজ থেকে শুরু করে শপিং মল এবং বুটিক হাউজগুলো পোশাক কেনায় ধামাকা অফার নিয়ে হাজির হয়। ঘর সাজানোর সৌখিন পণ্য এবং ফ্রিজ টিভি এসি  কেনায় থাকে নগদ ছাড়। আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্লট এবং ফ্ল্যাট বিক্রয়ে বৈশাখী মেলায় দেয় বিশেষ ছাড় ।

গণমাধ্যম জুড়ে পহেলা বৈশাখ। বাহারি বৈশাখী ফ্যাশন সংখ্যা বের করে পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলো। বৈশাখী খাবারের রেসিপি নিয়ে বিশেষ আয়োজন।  ভোজন বিলাসি বাঙালি নারীদের কাছে বৈশাখের রেসিপি সংখ্যা খুবই জনপ্রিয়। পহেলা বৈশাখের আগাম বার্তা দিয়ে প্রচার প্রচারণায় সরব সম্প্রচার মাধ্যম। নিয়মিত খবর ও বুলেটিনের সাথে বৈশাখী গান, নাটক, সিনেমা, আড্ডা, আলোচনা ও  ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মাধ্যমে পরিবারের  ছোট-বড় সবার দৃষ্টি আটকে রাখে টিভিতে।

গ্রামে এবং শহরে নতুন বছরের হিসাব পাকাপাকি টুকে রাখার জন্যে ব্যবসায়িরা বছরের প্রথম দিনে নতুন একটি খাতা খোলো। যার নাম হাল খাতা। এই হালখাতা পহেলা বৈশাখে চিরায়ত বাঙালির প্রাণের উৎসব। পুরনো বছরের সব হিসাব নতুন খাতায় আবার নতুন করে শুরু হয়। হালখাতার দিন দোকানীরা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টি মন্ডা খেতে দিয়ে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করে থাকেন। হালখাতার এই মিষ্টির স্বাদ মুখে নিয়ে আরেকটি নতুন বছর শুরু করে বিশ্ব বাঙালি।      ছবি: সংগৃহিত