বাংলাদেশের রামসার অঞ্চল -মুকিত মজুমদার বাবু

বাংলাদেশের রামসার অঞ্চল -মুকিত মজুমদার বাবু

901
SHARE

রামসার সম্মেলন বিশ্বব্যাপী জলীয় পরিবেশ রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রয়াস। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ইরানের রামসার শহরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশসমূহ ‘কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস’ নামক একটি আনৱর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরবর্তিতে এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ১৫৮টি দেশ স্বাক্ষর করে। রামসার নিয়মানুযায়ী জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ জলাভূমিগুলো জলচর পাখিদের জন্য সংরক্ষণ, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও বিনোদনমূলক গুরুত্ব তুলে ধরে এ ধরনের স্থানগুলোকে রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর লক্ষ্য হলো- স্থানীয়, এলাকাভিত্তিক এবং জাতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম এবং আনৱর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলাভূমিসমূহ রক্ষা ও বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়।

পৃথিবীর ২.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিসৱৃত ২,২৩১টি স্থান আনৱর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি রামাসার অঞ্চল হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবন, মিষ্টি জলের ধু ধু সাগর টাঙ্গুয়া হাওর, নয়নাভিরাম এ দুটি জায়গা রামসার অঞ্চলের অনৱর্ভুক্ত।

সুন্দরবন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ ভাগ এবং সমগ্র বনাঞ্চলের ৪৪ ভাগ।  ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার এবং ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তৃনমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হয় সুন্দরবন দিবস। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিসৱৃত ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা এ সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত সুন্দরবনের কোলঘেঁষে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। সুন্দরবনের জল ও স্থলের প্রতিবেশ ব্যবস্থার রয়েছে এক চমৎকার সহাবস্থান। প্রাকৃতিক সম্পদ আর সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মিলনস্থল। প্রবাহমান ছোট-বড় অসংখ্য নদী-খাল, সেই সাথে জোয়ার-ভাটার কারণে সুন্দরবন হয়ে ওঠে জাগ্রত এক নিসর্গ। এ সৌন্দর্য যেমন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে মুগ্ধ করে তেমনি এর বহুমাত্রিক সম্পদও রয়েছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে প্রত্যেক অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয় সরকারের। শুধু তাই নয়, এ বনের কাঠ, মধু, মোম, গোলপাতা, মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, চিংড়ির পোনা, নানা প্রকার সম্পদের ওপর হাজার হাজার বাওয়ালী, মৌয়ালী ও জেলেদের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করে।

জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম। প্রাণিবিজ্ঞানী ডেভিড প্রেইন বনটিতে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদের অসিৱত্ব আবিষ্কার করেন। এ ছাড়াও এ বনভূমিতে রয়েছে প্রায় ৪৫০টি নদ-নদী ও খাল, ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী- যার মধ্যে আছে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির সৱন্যপায়ী প্রাণী। এর মধ্যে পৃথিবীখ্যাত সুন্দরবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার উল্লেখযোগ্য। এর সৌন্দর্য, ক্ষিপ্রতা ও রাজকীয় ভাব প্রকৃতপক্ষেই একে বনের রাজায় পরিণত করেছে। এছাড়া বাঘ খাদ্যশৃঙ্খলের সবার উপরে অবস্থান করায় পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকছে। এছাড়া সুন্দরবনে রয়েছে- চিত্রা হরিণ, বন্যশূকর, বানর, শুশুক, লোনাপানির কুমির, অজগর, কাছিম, ডলফিন, উদবিড়াল, মেছো বিড়াল, বন বিড়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। পৃথিবীর ৫০টি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে সুন্দরবনে আছে ৩৫ প্রজাতির উদ্ভিদ। উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে- সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, পশুর, বাইন, কাকড়া ইত্যাদি। প্রবাহিত প্রধান প্রধান নদীগুলো হলো- পশুর, শিবসা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গল ইত্যাদি। এছাড়া শত শত খাল এ বনের মধ্যে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। সুন্দরবন মৎস্য সম্পদেরও এক বিরাট আধার। ইলিশ, লইট্টা, ছুরি, পোয়া,  রূপচাঁদা, ভেটকি, পারসে, গলদা, বাগদা, চিতরা চিংড়ি ইত্যাদি মাছ পাওয়া যায়। জোয়ার-ভাটা আর লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও বিশেষভাবে অভিযোজিত। উদ্ভিদের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন শ্বাসমূল ও ঠেসমূল। সফল বংশবৃদ্ধির জন্য অনেক গাছ জরায়ুজ অংকুরোদগমের সাহায্য নিয়ে থাকে।

সুন্দরবনের গাছপালা উপকূলে বাস করা বিশাল এক জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করে বেঁচে আছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের প্রবল ঝাপটায় সুন্দরবন বুক পেতে দিয়ে উপকূলের অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করে। ২০০৯ সালের ২৫ মে’র প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাস আইলা থেকে ঢাল হয়ে উপকূলবাসীদের জীবন রক্ষা করে সুন্দরবন। জনশ্রুতি আছে- ‘সুন্দরবন যদি না থাকতো তাহলে সিডর ও আইলায় উপকূলে মানববসতির কোনো চিহ্নই থাকতো না।’ মূলকথা বন্ধুপ্রতিম সুন্দরবন পাহারাদার হয়ে পাহারা দিয়ে রাখছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের।

ইতিহাসের সাক্ষ্য থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়, ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে সুন্দরবন। সেই সাথে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাঘ, কুমির, মদনটাকসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। মানুষের অসংযত সম্পদ আহরণের সাথে সাথে বন উজাড় করে বসতি স্থাপনও সুন্দরবনের গায়ে ক্ষতর সৃষ্টি করছে। আমাদের এ ক্ষত সারাতে মলম দিতে হবে। সেই সাথে আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনো সিদ্ধানৱ যেন সুন্দরবনের সুন্দর পরিবেশ নষ্ট না করে।

কুয়াশার মতো অস্পষ্ট পাহাড় যেন আকাশ ছুঁই ছুঁই করছে। তারই কোলঘেঁষে যত দূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। আকাশ আর জলের মিলনের মাঝে মাঝে খুব কম চোখে পড়ে মানুষের ভাসমান গ্রাম। করচ ও হিজল গাছ মহিষের মতো গলা ডুবিয়ে মাথা উঁচু করে আছে। নতুন পর্যটকদের কাছে বিসৱীর্ণ জলরাশির স্বচ্ছ পানির আধারকে সুমদ্র বলে ভ্রম হতে পারে। এ সমুদ্রের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সাথে মাঝির কণ্ঠের সুরেলা গান, দল বেঁধে মাছের সাঁতার কাটা, লগিবৈঠার শব্দ যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করবে। এ চিত্রের ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে শুষ্ক মৌসুমে। হাওরের পাড়ে দেখা যায় হিজল-করচসহ বিভিন্ন ঘাস ও নলখাগড়ার ঝোপ। ঝাড়গুলো বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আশ্রয় ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাঠের পরে মাঠ সোনালি ধানের হাসির ঝিলিক। বাথানে গরু-মহিষ-ছাগল। ছোট ছোট বিলের গর্তে মাছ ধরার ব্যসৱতা নিয়ে দেশের অপূর্ব দর্শনীয় ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ স্থান হাওর।

বাংলাদেশের আরেক রামসার অঞ্চল সুনামগঞ্জ জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর। হাওরকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি এ হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার অঞ্চলের মর্যাদা পায়।

শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জলজ জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলো টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরে রয়েছে প্রায় ৫২টি বিল। আর বিলের মোট আয়তন প্রায় ৩৬৫১.৯১ হেক্টর। উল্লেখযোগ্য বিলগুলো হলো- বেরবেরিয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, হাতিরগাতা বিল, মহিষেরগাতা বিল, রুপাবই বিল, রউয়া বিল, চটাইন্ন্যা বিল ইত্যাদি।

Pokrity-O-Jibonটাঙ্গুয়ার হাওর জলজ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং জলচর পাখির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে অসংখ্য পরিযায়ী পাখির বিচরণে মুখরিত হয় হাওরের প্রতিবেশব্যবস্থা। রঙ-বেরঙের ফুলে ভরে ওঠে হাওরের চারপাশ। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ হাওরের জলে ডিম পারে এবং মাছগুলো দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। হাওর পাড়ের সারি সারি হিজল করচ ও নলখাগড়া বন রয়েছে, যা যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করে।

টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। হিজল, করচ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রায় ১৪১ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ২৬ প্রজাতির মাছ বিপন্ন এবং ১৬ প্রজাতির মাছ মহাবিপন্ন। বিলুপ্তির দ্বারপ্রানেৱ রয়েছে- চিতল, মহাশোল, সরপুঁটি, বাঘাইর ও রিটা। টাঙ্গুয়া হাওরে ১১ প্রজাতির উভচর দেখা যায়। এদের মধ্যে রয়েছে কুনোব্যাঙ, কোলাব্যাঙ, ঝিঁ ঝিঁ ব্যাঙ, কটকটি ব্যাঙ ইত্যাদি। সরীসৃপ রয়েছে প্রায় ৩৪ প্রজাতির। এদের মধ্যে ৬ প্রজাতি কচ্ছপ, ৭ প্রজাতি টিকটিকি এবং ২১ প্রজাতি সাপ। সুন্ধি কাছিম, ঢোরা সাপ, টিকটিকি, অঞ্জনি হাওরের উল্লেখযোগ্য সরীসৃপ।

টাঙ্গুয়া হাওরকে রঙবাহারি পাখির রাজ্য বললে অতুক্তি হবে না। প্রায় ২১৯ প্রজাতির পাখি দেখা যায় এ হাওরে। এদের মধ্যে প্রায় ৯৮ প্রজাতির পাখি শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নেয় এ হাওরে। লালঝুঁটি ভুতিহাঁস, লেঞ্জাহাঁস, চখাচখি, কালালেজ জৌরালী প্রভৃতি পরিযায়ী পাখি এদের মধ্যে অন্যতম। অবশিষ্ট প্রায় ১২১ প্রজাতি আমাদের দেশি পাখি। সবুজ সুইচোরা, শঙ্খচিল, দেশি মেটেহাঁস, পাতি সরালী, ছোট পানকৌড়ি, এশীয় শামুকখোল প্রভৃতি আমাদের দেশি পাখির মধ্যে অন্যতম। পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য টাঙ্গুয়ার হাওরের ২টি বিলকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। এছাড়া দেশি মাছ সংরক্ষণের জন্য হাওরের ৪টি বিলকে মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়।

উপরে গাঢ় নীল আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেসে যাওয়া, স্বচ্ছ মিষ্টি জলের বিসৱীর্ণ জলরাশি, ঝাঁকে ঝাঁকে মাছের বিচরণ, চুড়ির রিনিঝিনির মতো ঢেউয়ের শব্দ, মাঝির কণ্ঠের গান, জলরাশির ভেতর থেকে উঁকি দেয়া করচ বা হিজল গাছ, জলের ওপর ভেসে থাকা ছোট ছোট দ্বীপের মতো বাড়ি, নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। সব মিলিয়ে হাওর যেমন ভালোলাগার এক বিস্ময় তেমনি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ এক আধার। সময়ের পরিক্রমায় সুন্দর হাওরের সৌন্দর্যে আজ ক্ষয় ধরেছে। বৈরী জলবায়ুর পাশাপাশি সে সৌন্দর্য বিকৃতিতে মানুষও কম দায়ী নয়। হাওর আমাদের অমূল্য সম্পদ। তার জীববৈচিত্র্য ও মোহনীয়তা আমাদেরই ধরে রাখতে হবে। সংরক্ষণের তাগিদ পৌঁছে দিতে হবে তৃর্ণমূল পর্যায়ে।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন