ববিতার সাথে একদিন

ববিতার সাথে একদিন

1578
0
SHARE

আবদুর রহমান : সুপ্রিয় দর্শক, এ মুহূর্তে আমি এভাবে বলতে চাই, এক রাজকন্যার পাশে বসে আছি আমি। অবশ্যই তিনি রাজকন্যা। আমি যদি এভাবেও বলি আলাদা আলাদা করে, ‘ব’তে বঙ্গ, ‘বি’তে বিজয়ী এবং ‘তা’এ তারকা- সব মিলিয়ে ববিতা। রাজকন্যা ববিতা প্রথমেই আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

ববিতা : আপনাকে ধন্যবাদ। চ্যানেল আইকেও আমার অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

আবদুর রহমান : আপনার ক্যারিয়ার যদি আমরা পর্যালোচনা করি, যদি বিশ্লেষণ করে দেখি তাহলে দেখবো, যে মানুষটির সঙ্গে আপনার অভিনয়ের সুচনা হয়েছে, অভিষেক ঘটেছে বড় পর্দায় তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। রাজ্জাক ভাইও আপনাকে অসম্ভব পছন্দ করেন এবং রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে রয়েছে আপনার বিখ্যাত অজস্র ছবি…

ববিতা : অজস্র… অজস্র … ছবি। রাজ্জাক ভাইয়ের সাথে যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে রাজ্জাক ভাই কিন্তু… মনে করেন আমি যখন চলচ্চিত্র জগতে এসেছি, আমাদের মধ্যে একটা মিল আছে সেটা জহির (জহির রায়হান) ভাই এর কল্যাণে। জহির ভাইয়ের হাত ধরে রাজ্জাক ভাই এসেছেন এবং জহির ভাইয়ের হাত ধরে আমিও এসেছি চলচ্চিত্র জগতে। ওই সময়টায় আমি একেবারেই বেণী দোলানো কিশোরী। আর রাজ্জাক ভাই সে তো একেবারে টগবগে একজন যুবক। জহির ভাইয়ের একটা ছবি ছিল ‘শেষ পর্যনৱ’… না, তার আগে আমাকে ‘সংসার’ ছবিতে বলা হয়েছিল অভিনয় করতে। তো ওই ছবিটাতে একটা মজার ব্যাপার, রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমার বাবা আর সুচন্দা আপা মা। ওই ছবিতে আমার তখন নাম ছিল সুবর্ণা। তো রাজ্জাক ভাইকে বাবা ডাকতে হয়েছে। আমি ওই ছবিটা করেছি। রিলিজ হওয়ার পর তেমন চলেনি। তারপর জহির ভাই চিনৱা করলেন যে, এবার ববিতাকে নায়িকা করে একটা ছবি বানাবো। আমি বললাম, আমি রাজী তারপর আর কোন ছবি-টবি করবো না। যাই হোক ওই ছবিটার প্রথম শূটিং হচ্ছে, খুবই রোমান্টিক দৃশ্য, খুব ইয়ে… তো আমি না খুব আনইজি ফিল করছি। আনইজি ফিল করছি এ জন্যে যে, ও মা! কয়দিন আগে আমি যাকে বাবা ডাকলাম… এখন আবার রোমান্টিক দৃশ্য তার সাথেই… এটা তো আমি পারছি না। জহির ভাইয়ের খুব বকা খেলাম। একটু ধমক দিয়ে বললেন, তুমি কি মনে করেছ এটা সত্যি নাকি? এটা তো অভিনয়! বকাটকা খেয়ে পরে ঠিক হয়ে গেল। খুবই সুন্দর ছবি ছিল। আর হ্যাঁ- জহির ভাইয়ের সে কি সুন্দর ছোট ছোট মিষ্টি ডায়লগ। এতে একটা গান ছিল, গানের মধ্যে আমি পাখায় বাতাস করছি। কল্পনা করছি। রাজ্জাক ভাইকে আহ্লাদ করে বলি, তোমাকে আরেকটু ভাত দিই? আরেকটু এটা দিই, ওটা দিই! নিজেই আবার হাসছি। এ করছি, ও করছি। এমন ব্যাপারগুলো ছিল, তো এগুলো এত মিষ্টি, এত মিষ্টি যে, এমন আর কোন ছবিতে আমি পাইনি। ওই গানটা জহির ভাইয়েরই লেখা ছিল। তো এ ছবির পর আমি আর বলতে পারলাম না যে, আমি আর সিনেমা-টিনেমা করবো না। রাজ্জাক ভাইকে কিন্তু আমরা ভাবতাম, মনে করতাম একই পরিবারের, আমাদের সবার এত সুন্দর সম্পর্ক মানে একটা অদ্ভূত ব্যাপার ছিল সেটা। হ্যাঁ, রাজ্জাক ভাইয়ের সাথে অসংখ্য ছবি করেছি, খুব ভালো ভালো ছবিগুলো রাজ্জাক ভাইয়ের সাথে করতে পেরেছি  আমি। গ্রেটফুল টু অল মাইটি আল্লাহ।

আবদুর রহমান : আমরা যেভাবেই বলি না কেন আপনি ববিতা আমাদের দেশের বড় অ্যাসেট। এখনো আপনি দুর্দানৱ স্মার্ট, অসাধারণ সুন্দরী। আর তাই অনেকেই জানতে চান যে, আপনার এই রূপ-লাবণ্য ধরে রাখার ব্যাপারটি। সবাই বলছে এভারগ্রীণ…

ববিতা : খুব সুন্দর করে মিষ্টি হাসি দিয়ে- নাআআআ, না এটা আপনারা ভালোবেসে বলছেন। সবাই হয়তো আমাকে ভালোবাসে আর তাই এই কমপ্লিমেন্ট…

আবদুর রহমান : আপনার ফ্রেন্ড, আপনার ভক্তরাই বলছে।

ববিতা : ও আচ্ছা। ফ্রেন্ডরা বলছে তাই না। আসলে আমারও খুব ভালো লাগে। আজকে আমি ববিতা হতে পেরেছি ভক্তদের ভালোবাসায় এবং তাদের অনুপ্রেরণায়। আপনাদের ভালোবাসায়। আজ যেখানে আমি পৌঁছেছি তার মধ্যে সবচেয়ে যাদের অবদান- মানে যাদের কাছে কাজ শিখেছি, যারা আমাকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছেন। আমাকে পথ চলা শিখিয়েছেন তাদের কথা আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। তাদের জন্যই তো আজ আমি ববিতা হয়েছি।

আবদুর রহমান : আপনার তো অনেক অনেকগুলো বিখ্যাত ছবি, এর মধ্যে রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি। তো আমি এভাবে উল্লেখ করতে চাই ‘আলোর মিছিল’ ছবিটির কো-আর্টিস্ট ছিলেন রাজ্জাক ভাই। ১৯৭৪ সালের ছবি এবং এ ছবিতে প্রথম আপনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। আলোর মিছিল ছবির গল্প শুনতে চাই।

ববিতা : যখন নারায়ণ ঘোষ মিতা, এত বড় পরিচালক আমার কাছে এলেন এবং আমাকে সিনেমার গল্পটি বললেন, গল্পটি শুনে দারুণ লাগলো। কিন্তু তখন একটা প্রবলেম হলো সেটা হচ্ছে, ওই যে অনেকের থাকে না! যেমন অনেক ওয়েল উইশার আমাকে বললো, তুমি এ ছবিটি করো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? ভেবে দেখ, রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে তুমি রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে এ্যাক্টিং করছো, আর এখানে রাজ্জাক ভাই মামা হবে আর তুমি ভাগ্নি… তো এটা কিন্তু তোমার ক্যারিয়ারে একটা বড় ঝামেলা হয়ে যাবে। আমি বললাম, আমাকে একটু ভাবতে দিন। আমি নিজে ভাবলাম, এত সুন্দর একটা ছবি, গল্পটা এত সুন্দর, ‘আলোর মিছিল’ এর আলো চরিত্রটি আমি করবোই। যে যা-ই বলুক, আমি দমে গেলাম না, করলাম এবং এ ছবি রিলিজ হওয়ার পরে সিনেমা হলে আমরা দর্শকদেরকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখেছি। যখন আলো মারা গেল রাজ্জাক ভাই রোজী ভাবীর ঘরে গিয়ে বলছে, আলোকে দাফন-কাফন করাতে হবে ভাবী আসো। তখন পরিচালক একটা শর্ট নিয়েছে এমন- একটা ফটোর ওপর ক্যামেরা চার্জ হচ্ছে আর ফটোর মানুষটা বলছে- ছোট মামা যাসনে, যাসনে। এই যে ওখানে যখন চার্জ হচ্ছে তখন দর্শকদের মনের মধ্যে একটা অনুভূতি কাজ করেছে যে এখন তো মামা যাচ্ছে তাকে গোসল করিয়ে দাফন করতে, তাই হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠেছে দর্শকরা।

আবদুর রহমান : টাকা আনা পাই…

ববিতা : উফ্‌, খুবই সুন্দর ছবি। ওই সময় টিনএজ ছেলেমেয়েরা যারা ছিল ওরা সবাই ভক্ত হয়ে গেল ববিতার। জহির ভাই এত সুন্দর করে গল্পটা তৈরি করেছিলেন- ওই যে সেই বড়লোকের ছোট্ট আদরের মেয়ে, যার মাথায় একটু হাল্কা পাতলা ছিট আছে। রাজ্জাক ভাই বাগানে বসে চা খাচ্ছে আর সে মেয়েটা এসে বলছে, তোমাকে পাখি এনে দিতে বলেছিলাম দাওনি। আবার আমার বাড়িতে বসে বসে চা খাচ্ছ, নাহ্‌ লজ্জাও করে না তোমার? এই যে মজার মজার ডায়লগ এগুলি দর্শক খুব মজা পেয়েছিল। রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে অসংখ্য ছবি করেছি আমি এবং খুব ভালো ভালো ছবিগুলো করতে পেরেছি সে জন্য আই অ্যাম সো গ্রেটফুল টু অল মাইটি আল্লাহ। রাজ্জাক ভাই তো আমাদের চলচ্চিত্র জগতের একটা ইন্সটিটিউশন। ওনার সঙ্গে কাজ করতে পেরে… এবং কাজ করতে কি যে ভালো লাগতো! উনি সবসময় খুব গাইড করতেন। বলতেন, তোমার অভিনয় ঠিক হচ্ছে না। এভাবে কর। ওখানে এভাবে কর। এখানে এরকম বলো। এই যে এ জিনিসগুলা এভাবেই তো শেখা আমাদের। রাজ্জাক ভাইয়ের কাছ থেকে এভাবে অনেক শিখেছি এবং আই ফিল প্রাউড যে, রাজ্জাক ভাইয়ের নিজের যে প্রডাকশন হাউজ ‘রাজলক্ষী’ এর ম্যাক্সিমাম ছবির নায়িকা কিন্তু আমিই ছিলাম। আরো বেশি ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে রাজ্জাক ভাইয়ের অননৱ প্রেম এবং ওনার ডাইরেকশনের ছবি। বিখ্যাত ছবি। সাড়া জাগানো ছবি। সে যে কি সুন্দর! আহারে ওই ছবির যে একটা গান ছিল, গানের কথাগুলো এমন, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই/ তুমি হলে মনের রানী…’ আমার মন চায় গানটি আবারও দেখতে কিন্তু আমি জানি না গানটি আছে কি না। শুনেছি কোথায় যেন এর প্রিন্ট আছে। কিন্তু…

এ ছবিতে কাজের সময় একটা ব্যাপার ছিল, ওই গল্পের মধ্যে এমন ছিল যে শেষ দৃশ্যে আমাদের চুম্বনের দৃশ্য থাকবে। তো রাজ্জাক ভাই আমাকে সুন্দর করে বোঝালেন যে, দেখ তুমি বিষ খেয়েছো আমি তোমাকে কিচ করে সেই বিষ তুলছি এবং এতে আমিও বিষে আক্রানৱ হয়ে আমরা দুজনেই মারা যাচ্ছি এমন ব্যাপার-স্যাপার। তো আমি রাজ্জাক ভাইয়ের কথা শুনে একেবারে ইমোশনাল হয়ে পড়ে শর্ট দিচ্ছি, কান্নাকাটি করছি। খুব সুন্দর নাকি আমাদের অভিনয় হয়েছে সবাই হাতে তালিও দিয়েছে। তো শুটিং শেষ করে রাজ্জাক ভাই এসে জড়িয়ে ধরেছে আমাকে- খুব ভালো অভিনয় করেছো। তো রাতেরবেলায় আমরা কাপ্তাইতে যে কটেজে ছিলাম সেখানে এসে আমি খুব কাঁদছি। এ কথা রাজ্জাক ভাইয়ের কানে গেলে তিনি বললেন, এই কি হয়েছে রে? ববিতা কাঁদছে বলে? কাঁদছে কেন ও? তো রাজ্জাক ভাই আমাকে বব বলে ডাকতেন। এসে বললেন, ববিতা তুমি কাঁদছো কেন? আমি বলছি, রাজ্জাক ভাই এ রকম দৃশ্যে অভিনয় করলাম আমার তো আর কোন দিন বিয়েটিয়ে হবে না! কেন? কেন? তুমি এটা ভাবছো কেন? রাজ্জাক ভাই বললেন। আমি বুললাম- রাজ্জাক ভাই এরকম চুম্বন দৃশ্যে আমরা অভিনয় করলাম মানুষ দেখবে! তখন রাজ্জাক ভাই বললেন, চিনৱা করো না। দৃশ্যটা আমরা দেখব। অড লাগলে দৃশ্য কাটবো অন্যভাবে দৃশ্য ম্যানেজ করা হবে এবং রাজ্জাক ভাই তাই করলেন। যা-ই হোক, ওই ছবির দুঃসাহস মানে রাজ্জাক ভাই ডিরেকশন দিচ্ছেন।  সেই যে কাপ্তাইয়ের একেবারে গহীন জঙ্গলে যেতে হবে ওখানে আর্মি আর পুলিশ-টুলিশ যারা ছিল তারা বলছে, দেখেন আপনারা ওখানে শুটিংয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আপনারা নিজেদের রিস্কে যাবেন। আমরা কিন্তু আপনাদের কোন দায়িত্ব নিতে পারবো না। তো যা হোক, আমি রাজ্জাক ভাইয়ের নায়িকা আমার যেতে যাতে কষ্ট না হয় সে কারণে আমার জন্য একটা পালকি বানিয়েছেন। ছোট্ট পালকির মধ্যে আমাকে বসিয়ে নিয়ে যেতে বললেন- আমার নায়িকা পাহাড় জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে যেতে ওর কষ্ট হবে ও টায়ার্ড হয়ে যাবে। এখানে আমি একটা কথা বলতে চাই যে, দেখুন একজন ডাইরেক্টর হিসেবে তাঁর কতখানি সেন্স দেখেন! সে বলছে, না ওকে ফ্রেশ থাকতে হবে, ওর কোন কষ্ট যেন না হয়। তো সে আমাকে ওই পালকিতে করে শুটিং স্পটে নিয়ে যাওয়া হত আবার আনা হত এভাবেই ছবির শুটিং শেষ করেছিলাম।

আবদুর রহমান : এক সময় তুমুল আলোচনা উঠেছিল এই যে, আপনার ব্লাউজের কাটিং বাংলাদেশে আপনিই সেই অভিনেত্রী যার ফ্যাশন দর্শকরা অনুকরণ করতো।

ববিতা : হ্যাঁ এটা একটা খুব মজার ব্যাপার সেটা হচ্ছে, তখন আমি যে ধরণের ব্লাউজ পরতাম পাশ থেকে পাইপেন লাগানো থাকতো। ভক্তরা টেইলারে গিয়ে বলতো ববিতা ব্লাউজ। ববিতা ব্লাউজ। শুধু যে ব্লাউজ তা নয়, আমি যে বিভিন্ন হেয়ার কাট করতাম, পারলারে মেয়েরা গিয়ে বলতো ববিতা কাট করে দাও।

আবদুর রহমান : এই কাজ বা চিনৱাগুলো আপনি কখন করতেন এই যে একটু ডিফারেন্ট ড্রেস। একটু আলাদা হেয়ার স্টাইল।

ববিতা : হ্যাঁ আমি তো প্রায় সব ধরনের চরিত্রেই কাজ করেছি, গ্রামীণ চরিত্র বা শহুরে মডার্ন যে ব্যাপারগুলো ছিল। আসলে আমি কি করতাম জানেন, খুব বিদেশে যাওয়া পড়তো তো ফ্যাস্টিভাল হোক, লন্ডন এখানে ওখানে। তো সেখানে গিয়ে গিয়ে বেশ সুন্দর সুন্দর ড্রেস দেখতাম কিনতাম। একটা মজার ব্যাপার হলো আজ পর্যনৱ আমি কোন ডিরেক্টরের দেওয়া পোশাক পরি নাই। সব সময় আমার নিজস্ব পোশাক, নিজস্ব ইয়ে… ব্যবহার করেছি। আমি ভাবতাম আমার ছবিটা কেমন হবে? আমার চরিত্র কি হবে সেই ধরনের ভেবে সিদ্ধানৱ নিতাম। এমন কি আরো অবাক হবেন যে, আমার সঙ্গে যে কো-আর্টিস্ট থাকবে যাতে সে… মাঝখানে জাফর ইকবালের সঙ্গে অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আমরা করেছি। খুবই রোমান্টিক ছবি। তো আমি এরকমও করেছি যে, যখন হয় তো বিদেশে কোথাও গিয়েছি, তখন ভেবেছি আচ্ছা আমি যদি কোন মডার্ন রোলে অভিনয় করি তাহলে কোন ধরনের পোশাক আমাকে পরতে হবে বা মানাবে। শুধু তা-ই নয়, আমার নায়ক কি পরবে? আমি একা পরবো আর আমার নায়ক ভালো কিছু পরবে না, বা ভালো কিছু দিল না প্রডিউসার তাহলে তো ভাল লাগবে না। নায়কেরটাও আমি কিনে নিয়ে আসতাম। (হাসি দিয়ে) এটা কোন দিন বলা হয়নি আপনাকে আজকে বললাম। আমার চিনৱা থাকতো আমার নায়ক যা পরবে তাতে ওকেও সুন্দর লাগবে আমাকেও সুন্দর লাগবে। এটা একটা মজার ব্যাপার না দুজনের মধ্যেই একটা মিল থাকবে। এই যে জিনিসগুলো, এগুলো আমি করতাম।

আবদুর রহমান : সে জন্যই আপনি একটু আলাদা সব থেকে। সব দিক থেকে। (ববিতার হাসি), আচ্ছা রাজ্জাক ভাইয়ের প্রসঙ্গে আবার একটু আসি। মাঝে মাঝেই আসবো আবার অন্য প্রসঙ্গে যাবো। সেটা হচ্ছে রাজ্জাক ভাই আপনার পরিচালক ছিলেন, আপনার সহঅভিনেতা ছিলেন এবং এক ধরণের ভালোবাসার মানে অভিভাবকসূলভ ভালোবাসার সম্পর্কও ছিলো। কিন্তু আমি শুনেছি যে আপনার যে দিন বিয়ে হয় সেদিন…

ববিতা : (হা হা হা হাসি দিয়ে) আপনি যখন তুললেনই তখন ঘটনাটা আপনাকে বলতেই হয়। আমার বাবা মৃত্যুসজ্জায় ছিলেন। তো বাবার একটা ইচ্ছা ছিলো যে, ‘মা আমি মরার আগে তোমার বিয়েটা দেখে যেতে চাই, তো ভালো কথা’ সবাই বললো ঠিক আছে, আব্বা বললেন, তোমার যদি কাউকে ভালো লাগে তাহলে আমাদেরকে বলো। না হলে আমরাই দেখি… এই সেই। তো সুচন্দা আপা আর দুলাভাই মিলে অনিকের আব্বাকে মানে আলম সাহেবকে নিয়ে বিয়ের প্রপোজাল করে এবং যেদিন নাকি আমার বিয়ে হবে মানে তখন জিনিসটা এমন হলো যে সকালে আমার বাড়িতে… যেহেতু বাবা মৃত্যুসজ্জায় প্রায় এ অবস্থায় ঠিক হলো সকালে ওদের আত্মীয়-স্বজন সবাই আমাদের বাড়িতে আসবে উকিল বাবা তারা বিয়ে-টিয়ে পড়াবে এবং বাকি সব ঠিকঠাক করা হবে। সেজন্য রাতে সবাইকে দাওয়াত দিলাম সব জার্নালিস্ট এসে হাজির সোনারগাঁ হোটেলে। সেদিন আপনিও ছিলেন সেখানে। যা হোক, সবাইকে দাওয়াত দিলাম, কিন্তু কি ব্যাপারটা সেটা বলা হবে না। সবাইকে ইনভাইট করেছি, সবাই ভাবছে ঠিক আছে দেখা যাক কি হয় গিয়েই দেখি। তো সেদিন কি হল জানেন? সেদিন ভাবলাম, আচ্ছা আমি যে বিয়ে করছি কিন্তু আমার বিবাহীত জীবন যদি সুখের না হয়, কোন ঝামেলা হয় তো কী হবে! এসব কি চিনৱা টিনৱা করে সকাবেলায় কি করলাম দেখেন, ওনারা আসবেন ১০-১১ টার দিকে। বাড়ির ভিতরে দুটো ব্যাক ডোর ছিল। ব্যাক ডোর দিয়ে বেরিয়ে গাড়ি করে সোজা রাজ্জাক ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির। রাজ্জাক ভাইয়ের বাড়িতে গেলাম। রাজ্জাক ভাই আমাকে দেখেই বললেন, ববিতা তুমি হঠাৎ আমার বাসায়? আমি গিয়ে লক্ষী ভাবীকে। সব বললাম, ভাবী আমার ভয় লাগছে, আমার পক্ষে এ বিয়ে করা সম্ভব না। আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পারবো না। তো তারা দুজন আমাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বললেন, দেখ এমন একটু ভয় লাগতেই পারে, কিন্তু সেটা কোন ব্যাপার না চলো। এই লক্ষী তুমি নিজে ববিতাকে বাসায় গিয়ে দিয়ে আসো।  (হেসে হেসে) তারপরে যা হবার তা হল সব ফর্মালিটিস পালন করা হল। আমাকে আংটি পরানো হল।

আবদুর রহমান : অনেকেই যেটা প্রশ্ন করে বা কৌতুহল দেখান যে রাজ্জাক ভাইয়ের ছবিতে তো আরো একজন থাকতে পারতো, আমি কবরী আপার কথাই বলছি। (ববিতা হাসি দিয়ে, ও আচ্ছা…)। পর্দায় তাদের দুজনার যে রোমান্টিক জুটি তার চেয়ে কিন্তু আপনি বেশি ছবি করেছেন।

ববিতা : হ্যাঁ- রাজ্জাক ভাইয়ের সাথে অনেক ছবি করেছি।

আবদুর রহমান : কবরীর চেয়ে বেশি সংখ্যক ছবি আছে রাজ্জাক- ববিতা জুটির। কিন্তু ওই যে একটা মুখরোচক গল্প চিরকাল রয়েই গেল। একটা প্রেম, একটা ভালো লাগা, ভালোবাসা। রাজ্জাক ভাইকে কি আপনি কখনো নায়ক হিসেবে ভাবেননি?

ববিতা : না, ঠিক তাও নয় ভেবেছি একজন অভিভাবক, একটা গাইডেন্স, একজন আপন লোক এই আর কি। তবে হ্যাঁ আবার যখন লাইলী মজনু করেছি তখন তো ব্যাপারটা ওমনই হয়েছে। ভীষন একটা ব্যাপার মানে…

আবদুর রহমান : কিন্তু আমরা যখন পীচ ঢালা পথ দেখি। কি অদ্ভূত সুন্দর একটা মিল। সুন্দর একটা বিখ্যাত গানও আছে।

ববিতা : হ্যা,ঁ পীচ ঢালা পথ, রাজ্জাক ভাইয়ের সাথে গাড়িতে ছিল গানটি তারপরে নৌকা… ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়।’ আর কিছু ছবি জাফর ইকবালের সাথে করেছি। তখন জাফরকে নিয়ে অনেক মুখরোচক কথাবার্তা হতো আর কি। ও সুন্দর গানও গাইতে পারতো। কি অদ্ভূত গলা ছিল! গীটার বাজাত এবং শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আমাকে ও গান শিখিয়েছে এবং মজার ব্যাপার কিছু ইংলিশ গান ও আমাকে শিখিয়েছে।

আবদুর রহমান : জাফর ইকবালের একটা বিখ্যাত গান আছে, সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী।

ববিতা : হ্যাঁ, তখন কি হয়েছে মোটামুটি পত্রপত্রিকায় লিখেটিখে মজাই পেত সবাই যে, ববিতা-জাফর ভীষণ প্রেম… এ সব হেনতেন আর কি। যখন নাকি ইকবালেরও বিয়ে হয়ে গেল, আমারও বিয়ে হয়ে গেল। তারপর জাফর ইকবাল বিটিভিতে এক অনুষ্ঠানে এ গানটি গাইলো এবং গাওয়ার পর লোকজন সাংঘাতিকভাবে পছন্দ করলো গানটি। তখন প্রত্যেকেরই একটা ধারণা হয়েছিল গানটা ববিতাকে উদ্দেশ্য করে গেয়েছিল জাফর। আমি তখন ইকবালকে জিজ্ঞেস করলাম, ইকবাল কি খবর সত্যি কি আমাকে চিনৱা করে গেয়েছেন আপনি? ইকবাল বলেছিল- গানটাতো আলাউদ্দিন আলী সাহেবের। তিনি বললেন- এটা তুমি গাও। তুমি গাইলে সবাই মনে করবে যে, তুমি ববিতা… এবং ওই গানটি সুপারডুপার হিট হল। এখনও কিন্তু সবাই তা-ই মনে করে।

আবদুর রহমান : বাদী থেকে বেগম। এই ছবিতে তিনটি রূপে আমরা ববিতাকে দেখেছি।

bobita-1ববিতা : এটা যদি বলেন, তবে আমি বলবো আমার তিনটি ছবির মধ্যে এটা একটি ছবি এবং এটাতে রাজ্জাক ভাই ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, ববিতাও ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। তো এই যে ওখানে আমার তিন ধরনের চরিত্র। ওই যে কখনো নর্তকী আমি, কখনো বাদী আবার কখনো বেগম। বিখ্যাত ‘বাদী থেকে বেগম’ ছবিটি লিখেছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় খোকা ভাই এবং আমার জীবনে যাদের অনেক অবদান আছে তাদের মধ্যে তিনি একটা শক্ত খুটি ছিলেন। খোকাভাই ওঁনার ঋণ আমি কোনদিন ভুলবো না। আজ উনি আমাদের মাঝে নেই। উনি ওই ছবির প্রডিউসারও ছিলেন। ওই ছবি করতে গিয়ে উনি আমাকে খুব বুঝিয়েছেন যে, ববিতা এটা তুমি এভাবে করবে এটা ওইভাবে করবে। যা-ই হোক, ছবিটি করলাম এবং ওই ছবিতে যখন আমি নর্তকী হলাম, তখন আমাকে পিওর ক্লাসিক্যাল ড্যান্স করতে হবে কিন্তু আমি ড্যান্স জানি না। শুটিংয়ের ফাঁকে যে এক ঘণ্টার লান্স ব্রেক থাকে, সে সময় তখন আমি ওই ছবির নৃত্য পরিচালক গওহর জামিল ও রওশন জামিলরা যেখানে থাকেন সেখানে গিয়ে প্রাকটিস করতাম, ধা ধিন ধিন না, না তিন তিন না’ এগুলো আমি করতাম, শিখতাম এবং আমাকে ওনারা ধরে ধরে শিখাতেন। এত সুন্দরভাবে শিখেছিলাম এবং শিখতে গিয়ে আমার পায়ে ফোঁসকা পড়ে গিয়েছিল এবং ছবিটি যখন রিলিজ হলো তখন কিন্তু যারা রিয়েল ড্যান্সার তারা বলেছেন, ববিতা বোধ হয় রিয়েল ক্লাসিক্যাল ড্যান্সার।

আবদুর রহমান : আমরাও তা-ই জানতাম।

ববিতা : নট, নো আই এ্যাম নট এ ড্যান্সার। কিন্তু এই যে আমাদের চেষ্টাটা সেটাই হল মূল। কেউ যাতে বুঝতে না পারে যে, ক্লাসিক্যাল ড্যান্স ববিতা জানে না। এটা যেন কেউ বলতে না পারে।

আবদুর রহমান : হে সমাজপতি যে গানটা, মানে সমসৱ কিছু যে নারীর গর্ভে জন্ম দেওয়া এই যে ব্যাখ্যা বর্ণনা অসাধারণ। এটি এবং আপনি একা রাজ্জাক ভাইকেই যে হ্যান্ডসাম বললেন তা তো নয়? দুর্দানৱ রাজকন্যা তো আপনি নিজেই। (ববিতার লাজুক হাসি)। এত অদ্ভূত সুন্দর কেন? এ প্রশ্নটা একা আমার না, প্রশ্নটা অনেক দর্শকের।

ববিতা : থ্যাঙ্কু সো মাচ…। থ্যাঙ্কস। দর্শকরা আমাকে ভালোবাসেন তো অনেক সে জন্যই বোধ হয় এটা বলে।

আবদুর রহমান : দর্শককেও বোধ হয় আপনি অনেক বেশি ভালোবাসেন?

ববিতা : অবশ্যই! আজকে দর্শকদের ভালোবাসায় যে পুরস্কার পেয়েছি। আজকে আমি বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে বিভিন্ন ফ্যাস্টিভালে সারা পৃথিবী ঘুরেছি…

আবদুর রহমান : আমাদের আরেকটা ভালো লাগার বিষয়। সেটা হচ্ছে যে, যাকে আমরা প্রবাদপুরুষ বলি চলচ্চিত্রের এই উপমহাদেশের অথবা বিশ্বব্যাপী সেই সত্যজিৎ রায় তাঁর চোখ আবিষ্কার করেছে এই ববিতাকে এটা ভাবতেও আমাদের ভালো লাগে। এ গল্পটুকু একটু শুনি?

ববিতা : আমরা তখন গেণ্ডারিয়ায় থাকি। আমার অভিনীত মাত্র ২/৩টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। হঠাৎ একদিন দেখলাম এফডিসিতে অপরিচিত এক ক্যামেরাম্যান আমার ছবি তুলছে। এর কিছুদিন পর আমার নামে একটি চিঠি এলো। তাতে লেখা সত্যজিত রায় তার নতুন ছবির জন্য তোমাকে নেয়ার কথা ভাবছেন। তুমি সত্বর যোগাযোগ করো। চিঠি পড়ে আমি তো হেসে গড়াগড়ি যাবার অবস্থা। আমি কোথাকার কোন ববিতা। আর সত্যজিৎ রায় পৃথিবীখ্যাত চিত্র পরিচালক। তিনি আমাকে ছবিতে নিবেন কেন? বোধহয় কেউ আমার সাথে ফান করার জন্য চিঠিখানা লিখেছে। হঠাৎ একদিন ভারতীয় দূতাবাস থেকে আমার কাছে একটা ফোন এলো- ম্যাডাম সত্যজিৎ রায় আপনাকে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। আপনি বাপারটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না কেন? সত্বর তার সাথে যোগাযোগ করন।

ফোনের ব্যাপারটা সুচন্দা আপাকে জানালাম। তিনি তো মহাখুশি। বললেন, আর দেরী নয় চলো কলকাতা। আমরা কলকাতায় গেলাম। এয়ার পোর্টে আমাদেরকে রিসিভ করা হলো এবং গ্র্যান্ড হোটেলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে এসেছিলেন ছবির প্রযোজক নন্দা ভট্টাচার্য। তিনি আমাদেরকে হোটেলের রুমে রেখে বললেন, আপনারা তৈরি থাকবেন। সন্ধ্যায় আমি এসে সত্যজিৎ রায়ের বাসায় নিয়ে যাব।

সত্যজিৎ রায়ের সাথ দেখা করতে যাব। আনন্দ যেন ধরে রাখতে পারছিলাম না। খুব করে সাজলাম। নন্দা ভট্টাচার্য সন্ধ্যায় এলেন এবং আমাদেরকে সত্যজিৎ রায়ের বাসায় নিয়ে গেলেন। দরজা দিয়ে মাত্র ঢুকেছি। আমার সামনে লম্বা এক লোক দাঁড়িয়ে। আমি সাহস করেও মাথা তুলে তাকাতে পারছি না।

তিনি বললেন- এই মেয়ে আমার দিকে তাকাও। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লোকটার দিকে তাকালাম। তিনি খুশি হলেন না। বললেন-তুমি এতো মেকআপ করেছো কেন? আমি তো তোমাকে এভাবে দেখতে চাইনি? তারপর সুচন্দা আপাকে জিজ্ঞেস করলেন- ও অভিনয় করতে পারবে তো? সুচন্দা আপা বললেন- দাদা ও ইতিমধ্যে কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করছে। বেশ প্রশংসা পাচ্ছে। সত্যজিৎ রায় আমাকে বললেন- কাল তুমি ইন্দ্রপুরি স্টুডিওতে আসবে। কিন্তু মেকআপ ছাড়া।

পরের দিন কোন প্রকার মেকআপ ছাড়াই ইন্দ্রপুরি স্টুডিওতে গেলাম। আমাকে দেখে সত্যজিৎ রায় মৃদু হেসে বললেন- এইতো তোমাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। মেকআপ ছাড়াই তুমি অনেক সুন্দর। তারপর একজন মেকআপম্যানকে ডেকে বললেন- ও আটপৌড়ে শাড়ি পরবে, সিঁথিতে সিদুর থাকবে। মাথায় ঘোমটা থাকবে। কিন্তু মুখ কোন মেকআপ থাকবে না। আটপৌড়ে শাড়ি পরে মাথায় ঘামটা দিয়ে আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম… সত্যজিৎ রায় নির্দেশনা দিচ্ছেন আমি অভিনয় করে যাচ্ছি। হঠাৎ তিনি ইউরেকা বলে চেচিয়ে উঠে বললেন- পেয়ে গেছি… অশনি সংকেতের অনঙ্গ বউকে পেয়ে গেছি… তারপর তো আরেক ইতিহাসের জন্ম হলো…

আবদুর রহমান : সে সময় সারাদেশ আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল?

ববিতা : হ্যা, সারাদেশের মানুষ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল।

আবদুর রহমান : ফ্রীজ নিয়ে একটা গল্প আছে ?

ববিতা : ওহ্‌! এইটা একটা মজার গল্প। রাজ্জাক ভাই আমাকে বলছে, এই পপ’ (পপ মানে পপি, আমাকে রাজ্জাক ভাই পপ বলে ডাকতেন) তুমি জানো? ছোটবেলায় তুমি ফ্রীজের মধ্যে বসে থাকতে তোমার কি মনে আছে? এ ঘটনাটি আমি রাজ্জাক ভাইয়ের মুখ থেকে শুনেছি। ব্যাপারটা হয়েছিলো কি, তখন আমাদের গেণ্ডারিয়ার বাড়িতে এসি ছিল না তাই গরমের সময় করতাম কি ফ্রীজের ভিতর থেকে সমসৱ র‌্যাক বের করে আমি ফ্রীজের মধ্যে ঢুকে বসে থাকতাম! চিনৱা করেন আমি কেমন পাগল ছিলাম।

আবদুর রহমান : আপনি তো মনিজা রহমান স্কুলে পড়েছেন?

ববিতা : আমি মনিজা রহমান স্কুলে পড়েছি এবং গেণ্ডারিয়া স্কুলেও পড়েছি…

আবদুর রহমান: রাজ্জাক ভাই আজকে যে জায়গাটাতে। আপনি আজকে যে জায়গাটাতে আপনাদের দুজনার বোঝাপড়া, পর্দার বোঝাপড়া ওইরকম না হলে কালজয়ী চলচ্চিত্র হয়তো আমরা দেখার সুযোগ পেতাম না?

ববিতা : সেটা হয়েছে কি, অনেক ছবি আমার কাছে এসেছে। কিন্তু আসলেই যে আমি হাতে নিয়েছি তা কিন্তু নয়। ছবি এসেছে হয় তো প্রডিউসাররা ক্যাশ টাকা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছেন। আমি বলেছি, না ভাই আপনি টাকাগুলো রাখুন আপনার স্ক্রিপ্টা দিন, অমি আগে পড়ে দেখি আমার চরিত্র কেমন, চ্যালেঞ্জিং কি না, আমার করণীয় কিছু আছে কি না, আমি এটাতে কি পাবো, কি হবে এবং একটা জিনিস আমি একটু করতাম, যেটার জন্য আমি রেজাল্ট পেয়েছি। সেটা হচ্ছে যে ভালো ছবিগুলো আসতো অনেক সময় অনেক বড় বড় পরিচালক ভালো ছবি করতে চাইতেন, কিন্তু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একটু ইয়ে ছিলো…

আবদুর রহমান : ওই ক্ষেত্রে আপনি তাদের সহযোগিতা করতেন?

ববিতা : আমার যত পুরস্কার। এখন আমার প্রায় এই ষাট-সত্তুরটা পুরস্কার জমা হয়েছে। তার জন্যে আমার যে কষ্টটা সেটাও কিন্তু আমি… যখন কোন ভালো ছবি এসেছে যেমন শেখ নেয়ামত আলী একটি ছবি বানাবেন ‘দহন’। আই নো ইট ভেরি ওয়েল যে হি ওউন বি এবেল টু পে মাই রেম্যুনারেসন্স। তো আমি কি করলাম, বললাম যে, না আপনাকে পয়সা দিতে হবে না। দত্ত দা ডুমুরের ফুল বানাবেন, বসুন্ধরা বানাবেন এ সব সুন্দর সুন্দর ছবি ‘তেইশ নাম্বার তৈলচিত্র’, ‘গলির ধারের ছেলেটি’, ‘ডুমুরের ফুল’ এধরণের অন্যরকম ছবিগুলো যখন বানাবেন তখন আমি নরমাল কমার্শিয়াল ছবিতে যে পারিশ্রমিক নিতাম, এ ছবিগুলোতে কিন্তু সে রকম পারিশ্রমিক নিতাম না। বলতাম, আমাকে অত পারিশ্রমিক দিতে হবে না, দরকার নাই ভাই। এরকম করে করে আমি কিন্তু বেশ কিছু ভালো ছবি করতে পেরেছি। তারাও খুশি হয়েছে এবং তারা ছবিগুলো করতে পেরেছে। ছবিগুলো ফ্যাস্টিভালে গেছে,তারা পুরস্কৃতও হয়েছে। আমি হাত তালি পেয়েছি। আমি এ্যাওয়ার্ড পেয়েছি।

আবদুর রহমান : গাছের প্রতি আপনার এক ধরণের মমত্ববোধ, পাখির প্রতি আপনার গভীর মায়া, আপনার বাড়ির ছাদে রকমারি ফুল, রকমারী গাছগাছালী, খাঁচার ভিতরে হরেক রকমের ছোট ছোট সুন্দর সুন্দর পাখি এই ভালোবাসার টান তো অনেক দিনের আপনার?

bobita-2ববিতা : আমার একজন প্রিয় শিল্পী রওশন জামিল। একদিন ওনার বাড়িতে যখন আমি গেছি, ওনার বাগানে দেখি কি গাছের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তো আমি চারিদিকে তাকিয়ে বলছি যে, ভাবী কার সাথে কথা বলে? আমি তো কাউকে খুঁজে পাই না। ভাবী কথা বলছে কার সাথে? তো আমি কাছে গেলাম, গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাবী তুমি কার সাথে কথা বলছিলে? রওশন ভাবী বললেন, পপ আয় আয়, আমি গাছের সাথে বলছি! আমি বললাম গাছের সাথে?! ভাবী বললেন যে, শোন, তোকে আমি আজকে একটা কথা বলি, তুই আমার কথা শুনবি। যত পারিস মানুষের থেকে দূরে থাকবি। আর যখন মন চাইবে গাছের সাথে কথা বলবি। গাছের তো জীবন আছে তুই ওর সাথে কথা বলবি ও তোকে রিপ্লাই দিবে। আমি বললাম- সত্যি ভাবী? ভাবী বললেন, হ্যাঁ, গাছকে ভালোবাসবে, ওকে আদর করবে দেখবে ও তোমাকে সুন্দর সুন্দর ফুল দিবে।

আবদুর রহমান : আর পাখি?

ববিতা : আমি তো একা নিঃসঙ্গ এ জন্যেই জিনিসগুলা আমার ভিতরে এসেছে। আমার অনেক ধরণের পাখি আছে। লাভ বার্ড, ময়না পাখি। ময়না কথা বলে, সকালবেলা প্রথমেই বলবে, অনিক কই? অনিক? আবার নিজেই বলবে, অনিক তো নাই! এরকম দুঃখের সুরে বলবে মাঝে মাঝে সে আমাকে নকল করে হা হা হা করে হাসবে। আবার বলবে পপি খোদা হাফেজ। একা একা সে রাজ্যের কথা বলে। কোন এক সময় হয়তো কেউ কেউ বলে যেমন চম্পা হয়তো বলে, এই তোমার পাখিটা না বাচাল অনেক কথা বলে। এ ধরণের পাখি, তারপরে অ্যাকুরিয়ামে সুন্দর সুন্দর মাছ। তারপর আমার খুব সুন্দর একটা পাপীচ আছে, ও এতো ভালো আমি যদি শুটিংয়ে বা বাইরে কোথাও যাই, ও গেটের সামনে বসে থাকবে এবং সে কিন্তু কাঁদবে আমার জন্য তার চোখ দিয়ে পানি পরবে। গাড়ির হর্ণ পেলে আমি যখন আসবো তাকে কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ আদর করতে হবে তারপর সে চুপ। (হাসি দিয়ে) তা আমার বেশ ভালোই লাগে এগুলো।

আবদুর রহমান : আরেকটি বিষয় দেখলাম আপনার বেডরুমের বিছানায় অনেকগুলো বই। নোট বুক…

ববিতা : এটাও খেয়াল করে ফেলেছেন সাংঘাতিক চোখ তো আপনার রহমান ভাই! (হাসি দিয়ে) হ্যাঁ, এটাও আমার অভ্যেস আছে। বই খাতা কলম আমার পাশে থাকে, মানুষের তো শেখার শেষ নেই। অনেক সময় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ভালো ভালো কোন অনুষ্ঠান শিক্ষণীয় কোন বিষয়, সুন্দর বক্তব্য, সুন্দর কথা যদি হয়তো খুব ভালো লেগেছে ওটা আমি করি কি লিখে রাখি।

আবদুর রহমান : গান শোনেন?

ববিতা : হ্যাঁ, গান শুনি। মা খুব রবীন্দ্র সঙ্গীত পছন্দ করতেন। তো আমারও তাই রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা হয়। মাঝে মধ্যে একটু আধটু গানও গাইতাম। আবার বলে ফেলেন না যে গান গাইতে। (এরপর ববিতার সেই মনকাড়া হাসি’ হা হা হা…)।

আবদুর রহমান : আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

ববিতা : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ রহমান ভাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে অনেক ভালো লাগলো। আর মনে হচ্ছে আরো অনেক কথা বলি যা বলতে হবে এবং তা সামনে নিশ্চয়ই বলবো।