Home সাক্ষাৎকার বন্যাদি, সুরের ধারা ও হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ

বন্যাদি, সুরের ধারা ও হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ

SHARE
Borsha-Boron

আমীরুল ইসলাম
সেই ছোটবেলা থেকেই বন্যাদির ভক্ত। বন্যাদির সকল কাজের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধাবোধ। আমি খুব কাছ থেকে বন্যাদির কাজ গভীরভাবে উপলব্ধি করি। অবলোকন করি। আর ক্রমাগত বিস্মিত হই।
শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীয় শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তুলেছেন বন্যাদি। বিখ্যাত কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষিত। কণিকার প্রিয়তম ছাত্রী বন্যা। রবীন্দ্রনাথের সংগীতে উৎসর্গিত প্রাণ তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগের অধ্যাপক তিনি। নৃত্যকলা বিভাগের প্রধান। রবীন্দ্র-সংগীতের প্রায় সকল গানই তিনি স্বকণ্ঠে গেয়েছেন। চার ভাগের তিন ভাগ ইতোমধ্যে রেকর্ড হয়েছে। সিডি আকারে প্রকাশিতও হয়েছে। পরিবারের বিদগ্ধ রুচি ও ¯িœগ্ধতার এক অনন্য প্রতীক বন্যাদি। দেশ ও দশের প্রতি দায়বোধ তীব্র। সুফিয়া কামাল কিংবা ড. আনিসুজ্জামানের ¯েœহছায়ায় বেড়ে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা ব্যক্তিগতভাবে বন্যাদিকে ¯েœহ করেন। দেশে-বিদেশে রবীন্দ্রভক্তদের কাছে বন্যাদি আদরণীয় এক ব্যক্তিত্ব।
এতকিছুর বাইরে বন্যাদির জীবন জুড়ে আছে সুরের ধারা। তার প্রাণের সংগঠন। ২৫ বছর ধরে তিনি এই সংগঠনটিকে কর্মক্ষম রেখেছেন। হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী এই সংগঠনে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বন্যাদির ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া কিছু নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারও তার কাছে আলাদা অর্থ বহন করে না। সুরের ধারার জন্য তিনি সর্বস্ব পণ করতে রাজী আছেন। অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনা ও রুচির আলো তিনি ছড়িয়ে দিতে চান সুরের ধারার মাধ্যমে।
দেখতে দেখতে সুরের ধারা এখন ২৫ বছরের দুরন্ত যৌবনা খর¯্রােতা নদীর মতো। সুরের ধারা নৃত্য-গীতি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। সুরের ধারা মিউজিক কলেজ। সুরের ধারার আছে শিশু বিভাগ।
আমরা খুব সংগঠনবিমুখ জাতি। বাণিজ্য ও কর্পোরেট সংস্কৃতিতে আমরা ডুবে গেছি। ভালোবাসা ও মূল্যবোধ এখন পালিয়ে গেছে। এরকম বৈরী সময়ে বন্যাদি সুরের ধারার মাধ্যমে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করে যাচ্ছেন। মৌলবাদ ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম। এই কঠোর সাধনায় তিনি নিঃসঙ্গ, একক। একলব্যের সাধনায় তিনি মগ্ন।
তাই বারবার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে আমাদের।
বাঙালি জাতীয়বাদের বিকাশে ছায়ানটের মতো এই সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় সুরের ধারাও সহযাত্রী। মাত্র পঁচিশ বছরেই সুরের ধারা প্রমাণ করেছেÑ শিশুগাছ থেকে কীভাবে একটি সংগঠন শ্রম, সততা, মেধা ব্যয় করে মহীরুহে পরিণত হয়।
বন্যাদির সব গরল আত্মস্থ করার অলৌকিক ক্ষমতা আছে। তপস্যা সাধিকার মতো তিনি যেন সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছেন। কোনো প্রতিক‚লতা তাকে স্পর্শ করে না। তিনি আগুনে হেঁটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে জানেন।
যে কারণে তার হৃদয়ের সংগঠন ‘সুরের ধারা’ আজ বিশ্বব্যাপী বাঙালির কাছে বরণীয় সংগঠন।
মনে পড়ে, সুরের ধারার চৈত্র সংক্রান্তি পালনের দিনগুলো। লালমাটিয়া গার্লস কলেজের মাঠে বিশাল বটবৃক্ষের তলায় দুই বা তিনদিনব্যাপী উৎসব। গান, নৃত্য, নাটক, বক্তব্য, সেমিনার সে এক মহোৎসব।
বন্যাদির হৃদয়ের প্রাঙ্গণ অনেক প্রশস্ত। লালমাটিয়ার সেই কলেজ মাঠে মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ আমলা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিদেশি কূটনীতিক এবং শিল্পী সমাজের প্রায় সকলেই সেখানে উপস্থিত থাকতেন। অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি আপ্যায়ন। মধুর পরিবেশ। পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন। সেই উত্তাপ টের পেতাম।
একবার কালবৈশাখী ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল চৈত্র সংক্রান্তির আসর। অনুষ্ঠান করা গেল না। বন্যাদি নির্বিকার। সবকিছু মেনে নেয়ার দুরন্ত ক্ষমতা তার।
সুরের ধারার বৃহৎ কার্যক্রমের সঙ্গে চ্যানেল আই বরাবর সংযুক্ত থেকেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর ব্যক্তিগতভাবে সুরের ধারার পরম হিতাকাক্সক্ষী। বন্যাদির সঙ্গে তার অচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব। আমরা চ্যানেল আইয়ের কর্মী হিসাবে সুরের ধারার নানা আয়োজনে সংযুক্ত হয়ে পড়ি। সরাসরি সম্প্র্রচার, রেকর্ডিং করা এসব নৈমিত্তিক কাজ ছাড়াও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিয়ে সুরের ধারার পাশে থাকার চেষ্টা করি।
রবীন্দ্র সার্ধশত বর্ষে সুরের ধারার হাজার কণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করে শ্রæতি গীতবিতানের উদ্বোধন করে। সে এক মহাযজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রæতি গীত বিতান উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে। সংগীত নিয়ে এত বড় অনুষ্ঠান আর কোথাও হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই।
এরই ধারাবাহিকতায় সাগর ভাই তার দুর্দান্ত পরিকল্পনার কথা জানালেন। সাগর ভাই সবসময়ই অতি সৃজনশীল ব্যক্তি। হাসতে হাসতে বড় বড় কাজ করে ফেলেন। স্বপ্ন দেখেন। বাস্তবায়িত করেন। তিনি বললেন, আমরা হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ উদযাপন করবো বন্যাদির নেতৃত্বে। আমরাও উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে ২০১২ সাল।
ভেন্যু নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা হলো। শ্রদ্ধেয় শাইখ সিরাজ ও বন্যাদি বৃক্ষশোভিত প্রাঙ্গণের প্রস্তাব দিলেন। তা নাহলে বাংলা বর্ষবরণের কোনো অর্থ হয় না। তেমন প্রত্যাশা মতো প্রাঙ্গণ পাওয়া গেল না। তখন নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কথা ভেবে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রকেই নির্বাচিত করা হলো।
সারাদেশ থেকে হাজার কণ্ঠ এসে উপস্থিত। মহাযজ্ঞ! কলেজ মাঠে চললো রিহার্সেল। একহাজার কণ্ঠ একই সঙ্গে মিলে গমগম করে গান গাওয়া খুবই দুঃসাধ্য কাজ। বন্যাদি সেই অসাধ্যকেই সাধন করলেন।
ভোরবেলা সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সম্মেলক গান। একই রকম পোশাক পরা হাজার হাজার শিল্পী। ছায়ানট বটমূলে ঐতিহ্য তৈরি করেছে। আর সুরের ধারা ২০১২ সালে পহেলা বৈশাখে উদযাপনের ইতিহাস সৃষ্টি করল। ব্যস্ত ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে গত ছয় বছর ধরে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে। লক্ষ মানুষের ঢল নামে সেদিন। সুরের ধারা কাজ করে চলে ক্লান্তিহীন। আগের দিন চৈত্র সংক্রান্তি। প্রায় আট ঘণ্টার অনুষ্ঠান থাকে। বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান। সুরের ধারার পরিবেশনা। তারপর রাত জেগে চলতে থাকে পরদিন সকালের হাজারও কণ্ঠের আয়োজন। উদ্দেশ্য সৎ থাকলে ঝঞ্ঝাটহীনভাবে সবকিছু সফল হয়। গত ছয় বারের আয়োজন সামান্য এলোমেলো হয়নি। কোনো উচ্চকিত ঘটনা ঘটেনি।
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে সুষ্ঠুভাবে। এর সকল কৃতিত্ব বন্যাদির প্রাপ্য। অনুষ্ঠানের আগে একটি মাস বন্যাদি বিদেশ যান না। যত বড় অনুষ্ঠানই থাকুক না কেনÑ সবকিছু থেকে ছুটি নেন তিনি।
অনুষ্ঠান আয়োজনের মগ্নতার আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন তিনি। নিজেই রিহার্সেল করান। শিল্পী নির্বাচন করেন। কোন গান গাওয়া হবে সেটাও ঠিক করেন।
কাজের পাহাড়ের ওপর বসেও নির্বিকার ধ্যানমগ্ন বন্যাদি। অকর্মা মানুষের সমালোচনাকে প্রশ্রয় দেন না তিনি। কারও ভালো প্রস্তাব মন দিয়ে শোনেন। বন্যাদির সহ্য ও ধারণ ক্ষমতা অনেক। স্বপ্ন যেটা দেখেন সেটার কাছাকাছি পৌঁছাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। হাল ছেড়ে দেন না। এবং কখনোই মুষড়ে পড়েন না। ব্যর্থতা বলে তার অভিধানে কিছু নেই। নব উদ্যোগে, নব উদ্যমে আবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে বন্যাদির যাত্রা শুরু হয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব গর্ব হয় যে, আমিও সুরের ধারার একজন সামান্য কর্মী। সুরের ধারার নানা আয়োজনে আমিও সংযুক্ত থাকি। এ বড় আনন্দ আমার জন্যে।
সুরের ধারার যে কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে চ্যানেল আই গভীরভাবে সংযুক্ত থাকে। চ্যানেল আই বা সাগর ভাই শুধু যে সুরের ধারার সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন তাই নয়। সুরের ধারার পরিবারের একজন ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজ। তারা সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসাবে সুরের ধারার সঙ্গে কাজ করেন।
চ্যানেল আই শুধু যে টেলিভিশনÑ ব্যাপারটা তাই নয়। চ্যানেল আই সামাজিক প্রতিষ্ঠানও। তাদের নানা কার্যক্রম কিংবা সহ-প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশন আছে। সে সবের মাধ্যমে চ্যানেল আই সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত। কিন্তু যখন চ্যানেল আই সুরের ধারার সঙ্গে কাজ করে তখন সেটা সামাজিক আন্দোলন হিসাবে কাজ করে। তাই সুরের ধারার সঙ্গে সহজেই আমরা সংযুক্ত হই। সুরের ধারাও আমাদের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। আমরাও সুরের ধারার অংশী। পৌষমেলা কিংবা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান ছাড়াও বছরব্যাপী সুরের ধারার সঙ্গে থাকতে পেরে আমরা গৌরববোধ করি। শফি আহমেদ স্যার, কবি মারুফুল ইসলাম, আজিজুর রহমান তুহিন, স্বাতী সরকার, আঁখি, ধ্রæব আচার্য, কৃষ্ণকান্ত আচার্য, লহ্মণ, দীপক পাল, টুসি আপা, সারোয়ার হোসেন বাবু, তনুশ্রী, রাজীব, দোলা, প্রমুখের সঙ্গে সুরের ধারা পরিবারের সদস্য হয়ে গেছি আমরা। এক সঙ্গে কাজ করি। এই আনন্দ আমাদের কোনোদিন ফুরাবে না।
সুরের ধারার সফলতা কোথায়? এটা কি শুধুই গানের স্কুল? বছর শেষে এই স্কুল বা কলেজে সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়?
না। এরকম ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সুরের ধারার কার্যক্রম প্রত্যেকে ব্রত হিসাবে নিয়েছে। জীবন যাপনের সঙ্গে জীবন সাধনার যোগ আছে। উন্নত রুচি বা সাংস্কৃতিক রোধের উন্নয়নে কাজ করে যাওয়াই তো প্রধান লক্ষ্য। এতেই সুরের ধারার সাফল্য।
বন্যাদি অনেক আগে একদিন এক আড্ডায় কথাচ্ছলে বলছিলেন, কয়েকদিন আগে সুরের ধারার ভাইবোনদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়েছিলাম। সে এক উচ্ছলিত আনন্দ ধারায় সবাই মেতে উঠেছে। সারাদিন কেটে যায় হইচই আনন্দ গানে। ওরা যখন ফিরছিল বাসে তখন সবাই মিলে গাইছিল: যাব না, যাব না, যাব না ঘরে। বাহির করেছে পাগল মোরে।
অতুল প্রসাদের গান। তখন বন্যাদি আবেগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
সুরের ধারার সবাই তো আর শিল্পী হবে না। আমরা সেটা চাইও না। এই যে ওরা অতুল প্রসাদের গান গাইছে, শুদ্ধ সংগীতের চর্চা করছে, ভালো গান শুনছে, গাইছে এটাই তো আমরা চাই।
সুরের ধারার সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করবে, বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে ভালোবাসবে। মিলনের ছন্দে মিলিবে আনন্দ।
এখানেই সুরের ধারার সফলতা। বন্যাদির সফলতা। বন্যাদির চোখে যে স্বপ্নের খেলা দেখতে পাইÑ একদিন সেই স্বপ্ন আলোর ফুল হয়ে ফুটবে।
সুরের ধারায় ¯œাত হব আমরা।