বছরের আলোচিত চরিত্র মাশরাফি

বছরের আলোচিত চরিত্র মাশরাফি

SHARE
Mash-1

আমাদের একজন মাশরাফি আছে একথা যখন ভাবি তখন বুকে সাহস পাই। মাশরাফি সঙ্গে থাকলেই সতীর্থদের বুকেও বল আসে। ভালো কিছু করার অদম্য সাহস, শক্তি ও অনুপ্রেরণা জন্মে সবার মাঝে। মাশরাফি এক সময় আমাদের ক্রিকেটের তিন ফরমেটেরই অধিনায়ক ছিলেন। এখন শুধুমাত্র ওয়ানডে ফরমেটের অধিনায়ক। তবুও মাশরাফিই আমাদের ক্রিকেটের অনুপ্রেরণা। অসম্ভব মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন এই ক্রিকেট তারকা তার সামাজিক কর্মকাÐের গুণেও দেশের মানুষের কাছে আদরনীয় হয়ে উঠেছেন। সেই মাশরাফিই নতুন বছরে আনন্দ আলোর প্রেরণা হয়ে উঠলেন। তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই প্রকাশ করা হলো ইংরেজি বছরের শুরুতে আনন্দ আলোর বিশেষ শীর্ষ কাহিনী। লিখেছেন আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান

কীভাবে এলেন মাশরাফি

২০০১ সালের কথা। অনূর্ধ্ব-১৭ খুলনা বিভাগের সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিসের ম্যাচ। ভেন্যু ঢাকার আবাহনী মাঠ। খুলনার অফিশিয়ালরা দাওয়াত দিয়েছিল দেখতে যাওয়ার। যথারীতি ম্যাচের দিন গিয়ে দেখি খেলা বন্ধ। ঘটনা কি, খুলনা জানাল তাদের দু’জন প্লেয়ারকে নাকি বাদ দেয়া হয়েছে। তাকিয়ে দেখি এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক (মাশরাফি বিন মুর্তজা) ও রাসেল (সৈয়দ রাসেল)। দু’জনই প্রায় কেঁদে ফেলবে এমন অবস্থা। রাসেল তো মনে হয় কেঁদেই ফেলেছিল!’

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সফলতম ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে প্রথমবার দেখার ঘটনা এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন জাহিদুর রেজা বাবু। চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের এই প্রধান কিউরেটরকে বলা হয় মাশরাফির ‘আবিষ্কারক’। বাবুর হাত ধরেই দেশের পেশাদার ক্রিকেটে এসেছেন মাশরাফি।

বাবুর হাত ধরে সেদিন মাশরাফি ও রাসেল; দু’জনই খেলতে পেরেছিলেন। তাদের খেলায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বাবু, মুগ্ধ হয়েছিলেন বাকি সবাই। কিন্তু তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না, এক সপ্তাহের মধ্যে তাকেই মাশরাফির দায়িত্বটা নিতে হবে, ‘শেষ পর্যন্ত দু’জনই ওই ম্যাচে খেলেছিল। ডেড পিচে কি জোরে বল করছিল! সেই শুরু। কিছুদিন পর বায়তুল মোকাররম গেটের সামনে দাঁড়ানো মাশরাফির বাবা-মা বাবুকে বলেছিলেন, ছেলেকে এই ঢাকা শহরে আপনার কাছে রেখে যাচ্ছি। আপনি ওর লোকাল গার্ডিয়ান।’

পথটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন যশোরের এই জাহিদুর রেজা বাবু। পাশের জেলা নড়াইল থেকে আসা কৌশিককে একবারে পাঠিয়ে দিলেন ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেটে। বাঁ-হাতি পেসার রাসেলকে পাঠালেন সেকেন্ড ডিভিশনে। ফার্স্ট ডিভিশন খেলার ওই বছরই বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে সুযোগ পান মাশরাফি। সেটা ২০০১ সালেই। কলকাতা সফরে ২৫ ওভার বল করেছিলেন তরুণ সেই ফাস্ট বোলার। ক্যারিয়ারের ইনজুরির বীজটা ওই সফরেই বপন হয়েছিল হয়তো।

এ নিয়ে বাবু বলেন, ‘কলকাতায় গিয়ে ২৫ ওভার বল করে কৌশিক। সেটা করা উচিত হয়নি একেবারেই। আমরা এগুলো পরে টের পেয়েছি। সে সময় নিজে বলতে পারছিলাম না দেখে আলম চৌধুরীকে দিয়ে অনুরোধ করিয়েছিলাম সেক্রেটারি আশরাফুল হককে। যেন ছেলেটাকে কিছুদিন বিশ্রাম দেয়া হয়। কিন্তু আশরাফুল হক কোনোভাবেই মানতে চাননি। ততদিনে পিঠে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে মাশরাফির।’

লোকাল গার্ডিয়ানের কাজ করতে গিয়ে মাশরাফির জন্য প্রায় সবকিছুই করেছেন বাবু। সেটা দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের শক্ত বলয়ের কারণেই।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ততদিনে ‘পরিণত’ হওয়ার পথে মাশরাফি। আর্থিক যোগও হচ্ছিল সমানে। তাই বাবু সবকিছু বুঝিয়ে দিতে লাগলেন মাশরাফিকে, ‘এমনও হয়েছে, ছোট মানুষ মাশরাফি। পাশে বসে ইন্টারভিউয়ের সময় বলে দিয়েছি। ওর সব চেক বই প্রথম দু’বছর আমার কাছে ছিল। যখন প্রিমিয়ার লিগে ঢুকল, তখন আমি নিজে থেকে ওকে দিয়ে দুটি একাউন্ট খুলিয়েছি। চেকবইগুলো আমার কাছেই ছিল। যখন ২০০৩ সালের দিকে দেখলাম টাকা-পয়সা আসা শুরু করছে তখন আমি নিজে থেকেই ওকে বুঝিয়ে দিলাম। চেকবইগুলো তখন ওর কাছেই রাখতে দিলাম।’

তবে যে বাবুকে মাশরাফির ‘আবিষ্কারক’ বলা হচ্ছে, সেই কৃতিত্বটা একা নিতে চাইলেন না তিনি নিজেই। কৃতিত্ব দিলেন আরও কয়েকজনকে। বললেন, ‘এই মাশরাফির উত্থানের পেছনে আরও অনেকে আছে। যাদের নাম সেভাবে আসে না। বিশেষ করে তার নানা মফিজ। এছাড়া মন্টু কোচও তাকে দেখেছেন।‘

খেলাধুলার বাইরেই বরং দু’জনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বেশি। ব্যক্তিগতভাবে সেই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বাবু ভাই মানে মাশরাফির দিকদর্শন। যে কোনো সিদ্ধান্তে বাবু ভাইয়ের পরামর্শ মাশরাফির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বাবু নিজেও বুঝতে পারেন মাশরাফির মনের কথা। যার প্রমাণ সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসরের কথা মনে করলেই টের পাওয়া যায়।

ওই ঘটনার স্মৃতিচারণ করলেন বাবু, ‘অবসর নেওয়ার দিন আমাকে শুরুতে মেসেঞ্জারে ফোন দিয়েছিল, আমি খেয়াল করিনি। পরে মেসেজ দেয়, ‘‘জরুরি ভিত্তিতে আমার ফোনটা ধরেন।” আমাকে বলে, সাড়ে সাতটার সময় টিভির সামনে থাকবেন, আমি অবসরে যাচ্ছি।’

বাবু আরও বলেন, ‘আমি জানতাম তার মনের অবস্থা। তাই বললাম, ভালো!’’ আরও অনেককিছু নিয়ে কথা হলো ওইসময়। শুধু এটুকুই বলেছিলাম, ১৬ কোটি মানুষের দোয়া আছে ভাই, তুই তোর মতন খেল।’

mashrafiত্যাগ দিয়েই শুরু করি। সবাই ত্যাগ স্বীকার করতে জানেন না। করেনও না। যা পাও হাতে তাই নাও সাথেÑ এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাওয়া-পাওয়া। এক্ষেত্রে আমাদের মাশরাফি বিন মর্তুজা ব্যতিক্রম। অন্যের চেয়ে একেবারেই আলাদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বরেণ্য শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের ব্যাখ্যাটা এরকমÑ আমাদের মাশরাফি এমন একজন মানুষ যাকে ভালো না বেসে পারা যায় না। এর কারণ কি? মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেট টীমের দলপতি এজন্যই কি তার প্রতি দেশের মানুষের এত ভালোবাসা? কিন্তু ক্রিকেট দলে আরও অনেকেই তো নেতৃত্ব দিয়েছেন। সবাই কি মাশরাফির মতো এত অন্তর ছুঁয়েছেন? অবশ্য একজন মানুষ তো অন্যজনের থেকে আলাদা হবেনই। সে জন্য কারও নাম শামীম কারও নাম হামিম। শামীম আর হামিম এক মায়ের পেটে জন্ম নিলেও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে বিস্তর ফারাক। শামীমকে হয়তো অনেকে এড়িয়ে চলে আবার হয়তো হামিমের সান্নিধ্যে যাবার জন্য সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। এখানেই শামীম আর হামিমের মধ্যে পার্থক্য। তেমনি অন্যদের থেকে বিস্তর ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের মাশরাফি। একজন মানুষের মানবিক যত গুণাবলী থাকা দরকার তার প্রায় সবকিছুই আছে মাশরাফির মধ্যে। চরম সংকটে মাশরাফি কখনও আস্থা হারান না। এই শক্তিটা তিনি দলের সদস্যদেরও বুঝিয়ে দেন। আজ পারিনি তো কি হয়েছে, কাল নিশ্চয়ই পারব। চিয়ার আপ… চলো এগিয়ে যাই…

প্রফেসর আনোয়ার হোসেন মাশরাফি সম্পর্কে ব্যাখ্যাটা শেষ করলেন এভাবেÑ ‘আমাদের মাশরাফি শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয় মানুষ হিসেবেও অনুকরণীয়। ওর মধ্যে অনেক মানবিক গুণাবলী থাকায় সবার কাছে আদরের হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা একজন তরুণ যদি মাশরাফিকে অনুসরণ করে জীবনে সাফল্য তো পাবেই নিজেকে অন্যের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে পারবে।

কী এমন মানবিক গুণাবলী আছে মাশরাফির যে কারণে তিনি অন্যের থেকে আলাদা। এর একটা সহজ উত্তর আছে। লেখার শুরুতে ত্যাগ স্বীকারের কথা বলা হয়েছে। ত্যাগ স্বীকারের গল্পের নায়ক হয়ে উঠেছেন আমাদের মাশরাফি। ছোট বড় যে ধরনেরই হউক উপহার পেতে অনেক ভালো লাগে সবার। এখন শীত মওসুম। প্রাতিষ্ঠানিক বনভোজনের হিড়িক পড়েছে। বনভোজনে আগ্রহী করে তোলার জন্য প্রায় প্রতিটি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান র‌্যাফেল ড্র’র ব্যবস্থা রাখে। বিদেশ ভ্রমণের এয়ার টিকেট, টিভি, ফ্রিজ, মোবাইল সেট অথবা এই জাতীয় অনেক পুরস্কার থাকে র‌্যাফেল ড্রতে। এমনও হয় প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পুরস্কার না পেয়েও অনেকে র‌্যাফেল ড্র’র অনুষ্ঠানে শেষ পুরস্কারটির জন্যও অনেক আশায় বসে থাকেন। শেষ পুরস্কারটি হয়তো একসেট থালা বাসন অথবা শীতের চাদর। এর জন্য সে কি অপেক্ষা।

mashrafiআর আমাদের মাশরাফি কোটি টাকার গাড়ি উপহার পেয়েও তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। সদ্য সমাপ্ত বিপিএল এ বসুন্ধরা গ্রæপের ক্রিকেট টিম মাশরাফির রংপুর রাইডার্স চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দলকে চ্যাম্পিয়ন করে তোলার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বসুন্ধরা গ্রæপ থাকে একটি দামি গাড়ি উপহার দিতে চেয়েছিল। মাশরাফি বিন মর্তুজা বিনীত ভাবে এই গাড়ির অফার ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজের জন্য কোটি টাকার গাড়ি নেননি মাশরাফি। কিন্তু তার নিজের এলাকায় গড়ে তোলা নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে নিয়েছেন বসুন্ধরার কাছ থেকে। নড়াইলে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। তাই রোগীদের দ্রæত হাসপাতালে নেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতো। মাশরাফি এটা বুঝতে পেরেই কোটি টাকার গাড়ি না নিয়ে এলাকার মানুষের জন্য অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে নিয়েছেন মাশরাফি। এটাই ত্যাগী মাশরাফির সাম্প্রতিক সময়ের বহুল আলোচিত উদার দৃষ্টান্ত। মাশরাফিকে দেশের সাধারণ মানুষ ভাবেন নিজের সন্তান হিসেবে। শারীরিক অনেক সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করে মাঠের লড়াইয়ে যখন নামেন মাশরাফি তখন সারাদেশে অসংখ্য বাবা-মা তার জন্য জায়নামাজে বসেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে মুনাজাত করেন মাশরাফির জন্য। ঢাকার মুগদায় এক মায়ের কথা উল্লেখ করি। তার ছেলেও ক্রিকেট খেলে। ছেলের আইডল মাশরাফি। মায়েরও আইডল মাশরাফি। দেশ-বিদেশে যেখানেই বাংলাদেশের খেলা থাকুক, বাংলাদেশ দলের জন্য তো বটেই মাশরাফির মঙ্গল কামনায় জায়নামাজে বসে যান তিনি। এই মা জানেন পায়ে অসংখ্য ইনজুরি নিয়ে মাঠের ক্রিকেট লড়াইয়ে নামে মাশরাফি। সে মাঠে যতবারই তার পায়ের ট্রাউজার টেনে টেনে পা ঠিক রাখার চেষ্টা করে ততবারই মাশরাফির জন্য এই মায়ের বুক ধুকপুক করে। মাশরাফির মঙ্গলের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতেই থাকেন এই মা।

আমাদের মাশরাফির ঢাকার ঠিকানা মিরপুরে। মা-বাবা ভাইবোন নিয়ে বেশ বড় পরিবার তার। এক সঙ্গে থাকেন সবাই। মাশরাফির স্ত্রীর মহানুভবতায় অবশ্য এই একান্নবর্তী পরিবারটি প্রতিদিন আনন্দে মেতে থাকে। মাশরাফির বাসায় এলাকার মানুষের অবাধ যাতায়াত আছে। খেলা না থাকলে মাশরাফি যখন বাসায় থাকেন তখন ভক্তদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকে আসেন শুধুই তাকে দেখতে। মায়েরাও আসেন। মাশরাফির মাথায় হাত বুলিয়ে যান। অনেক তরুণ  আসে মাশরাফিকে সামনা সামনি এক নজর দেখার জন্য। মাঝে মাঝে এমন ভক্তও আসেন যার আচার আচরণ দেখে মাশরাফি নিজেও অবাক হন। হয়তো মনে মনে ভাবেনÑ আমি কী মানুষের এতই শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য?

হ্যাঁ মাশরাফি বিন মর্তুজা এর চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য। আমরা অনেকেই জানি না খেলার বাইরে মাশরাফি সামাজিক কার্যক্রমে কতটা জড়িত। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের কথা হয়তো সবাই জানেন। কিন্তু এর বাইরেও মাশরাফি অসংখ্য সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। ব্যাংকে টাকা রাখলেও সেটার ওপর থেকে তিনি কখনও সুদ নেন না। গোপনে কত জনকে যে সাহায্য করেন তার হিসেবে নেই। নড়াইলে এতিমদের জন্য তিনি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। মাশরাফির আর্থিক সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছেন। গরিব বন্ধুদের জন্য নড়াইলে তিনি দোকান করে দিয়েছেন। এজন্য অনেকে তাকে আদর করে ডাকে পাগলা বলে।

একবার দুইবার নয় সাতবার পায়ে অস্ত্রোপচার করেছেন মাশরাফি। ২০১১ সালে সর্বশেষ অস্ত্রোপচারের সময় অস্ট্রেলিয়ার শল্যবিদ ডেভিড ইয়াং একটা সতর্কবাণী দিয়েছিলেন। জোড়াতালির হাঁটু নিয়ে এভাবে খেলা চালিয়ে গেল ৪০-৪৫ বছর বয়সে হুইল চেয়ারে বসে পড়তে হবে মাশরাফিকে। ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারেই তাকে বলেছেন, তোমার নিজেরও তো একটা জীবন আছে। সেটা নিয়ে ভাবো। আমি তোমার পা’টা ঠিক করে দিচ্ছি। এবার খেলো না। ডাক্তারের একথা শুনে মাশরাফির প্রতিক্রিয়া ছিল এমনÑ ডাক্তার তুমি সারাজীবন আমাকে এত সাহস দিয়ে গেছো, আর এখন এসব কী বলছ? তুমি তোমার অপারেশন করো। বাকিটা আমি বুঝব।

ডাক্তার ইয়াংয়ের অবশ্য এমন প্রতিক্রিয়ায় অবাক না হওয়ারই কথা। মাশরাফিকে তো আর নতুন দেখেননি। মেলবোর্ন থেকে একেকবার হাঁটু কেটে ফেরত পাঠিয়েছেন, কয়দিন পরই শুনেছেন তার রোগী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এবারও সে রকম হতে যাচ্ছে দেখে ডাক্তার আর তাকে ঘাটাননি। ডাক্তার ইয়াং এর মতে ৪০/৪৫ বছরের পর মাশরাফির হাঁটু দুটো আর কার্যক্রম থাকবে না। কৃত্রিম হাঁটু লাগিয়ে মাশরাফিকে চলাফেরা করতে হতে পারে।

এতেও মোটেও শংকিত নন আমাদের মাশরাফি। মাঠের ক্রিকেট লড়াইয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। হাঁটুতে এতবার ছুরি চালানোর পরও ক্রিকেটের কোনো পেসার এত বছর ধরে খেলা চালিয়ে গেছেন এরকম উদাহরণ ডাক্তার ইয়াং এর জানা নেই। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘জীবনে অনেক রোগী দেখেছি। ৩০ বছরের শল্যবিদ জীবনে বহু ক্রিকেটার নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু মাশরাফির মতো দেশের জন্য এত নিবেদিত প্রাণ ক্রিকেটার আর দেখেনি। দুই হাঁটুর লিগমেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে দাপটের সঙ্গে খেলা চালিয়ে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার মতোই।

খেলোয়াড়দের জীবনে বড় শত্রæ ইনজুরি। কিন্তু এই ইনজুরিকে বন্ধু বানিয়েছেন আমাদের মাশরাফি বিন মর্তুজা। দুই হাঁটুতে সাত সাতবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে দুইবার। বেশি পরিশ্রমে হাঁটু ফুলে যায়। তখন অসহ্য ব্যথা শুরু হয়। খেলা শেষে সিরিঞ্জ দিয়ে বের করে নিতে হয় হাঁটুতে জমে থাকা বিষাক্ত রস। অনেক সময় সকালে ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নামতে পারেন না। হাঁটু দুটো কয়েকবার ভাঁজ করে তারপর আস্তে আস্তে সোজা করতে হয়। মাঝে মাঝে রাতগুলো হয়ে ওঠে আতঙ্কের। মাশরাফি হয়তো ঘুমের মধ্যেই অনুভব করেন, কোনো একটা পা বাঁকানো যাচ্ছে না। মাশরাফির ভাষায় “রাতে মাঝে মাঝে আমার অবস্থা দেখে আমার স্ত্রী সুমী ভয় পেয়ে যায়। ব্যথায় পা’টা যেন হাটু থেকে আলগা হয়ে যাচ্ছে। আমি অদ্ভুত শব্দ করে উঠি।”

মাশরাফির এই যে এত শারীরিক কষ্ট খেলার মাঠে কখনই বুঝতে দেন না। তবে দর্শক ঠিকই বুঝতে পারে। সে কারণে মাশরাফির প্রতি সবার আলাদা অনুভব তৈরি হয়। মাশরাফির মঙ্গল কামনায় দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। এটাকেই জীবনের পরম পাওয়া মনে করেন মাশরাফি। তার ভাষায় আমরা এন্টারটেইনার, বিনোদন দেয়া আমাদের কাজ। আমরা কিন্তু নায়ক নই। যদি বলেন সত্যিকারের নায়ক কে? তাহলে আমি বলব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীরা। আমরা জাতির জন্য কোনো ত্যাগ করিনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তারাই সত্যিকারের নায়ক…

মাশরাফির মতো মানবিক গুণ সম্পন্ন দেশ প্রেমিক মানুষের পক্ষেই এমন কথা বলা সম্ভব। আর তাই আমরা আনন্দ আলোর পরিবার গত বছরের আলোচিত চরিত্র হিসেবে মাশরাফিকে বেছে নিয়েছি। আশাকরি মাশরাফির আদর্শ নতুন বছরের ক্রিকেট অগ্রযাত্রায় তো বটেই সৃজনশীল সামাজিক নানা উদ্যোগেও প্রভাব ফেলবে। নতুন বছরে সবার জন্য শুভ কামনা।

ঐতো আমাদের পাগলা!

Mashঅনেকে মাশরাফিকে পাগলা বলে ডাকেন। আসলে তার জীবনের পুরোটাতেই পাগলামিতে ঠাসা। তাইতো দল হেরে গেলে সতীর্থদের সান্ত¦না দিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে নীরবে কাঁদেন। চিত্রা নদীর সব জল যেন ওঠে আসে তার চোখে। আবার রাস্তায় কোনো রিকশাওয়ালাও হাত বাড়িয়ে দিলে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি এমনই এক সেলেব্রেটি যে একেবারে হাতের নাগালেই থাকেন। মিরপুরে বাসার সামনে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেন আবার সাংবাদিকদের সঙ্গে সময় কাটাতে চলে আসেন লাউঞ্জে। সম্পর্কের মধ্যে কোনো ‘অদৃশ্য দেয়াল’ তুলে দিতে শেখেননি মাশরাফি।

আবার সতীর্থদের সঙ্গেও তার সম্পর্কটা ঠিক এমনই। তাসকিন-সৌম্য থেকে শুরু করে মুস্তাফিজ-সাব্বির সবাইকে আগলে রাখেন বড় ভাইয়ের মতো। জাতীয় দলে একটাই গ্রæপ-সেটা মাশরাফির। এখানে সিনিয়র-জুনিয়রে কোনো দলাদলি নেই। পুরো দলটাই ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ একই সুতোয় গেঁথে রেখেছেন।

ওপার বাংলায় থেকেও মাশরাফির এমন বিনয় আর ক্রিকেট প্রজ্ঞা ছুঁয়ে গেছে সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যকে। ‘দেখুন, মাশরাফি একজন সিংহ-হৃদয় ক্রিকেটার। সবসময় উজ্জীবিত। কলকাতায় বোরোলিনের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো একসময়, যেখানে লেখা থাকতো: ‘জীবনের ওঠা পড়া কিছুই লাগে না গায়’। মাশরাফি সেই ধরনের। সেই জন্য আমার মনে হয় সৌরভের পর দুই বাংলা মিলিয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণামূলক চরিত্র হলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

ক্রিকেট মাঠের মতো ব্যক্তিগত জীবনটাও একেবারেই সাদামাটা মাশরাফির। দামি পোশাক, ব্র্যান্ড কখনোই প্রলুব্ধ করে না তাকে। ট্রাউজার, টি-শার্ট আর পায়ে ¯িøপার- এই হলেন মাঠের বাইরের মাশরাফি। সঙ্গে সানগøাসটা অবশ্য থাকবেই। পাশাপাশি একটা মোটর সাইকেল হলে তাকে আর আটকায় কে?

আর ঘরে প্রতিটি বাঙালির মতো প্রথম পছন্দ লুঙ্গি। খাবার দাবারেও আট-দশজনের ছায়া। ডাইনিং টেবিলে মাছ, ডাল, ডিমভর্তা ও আলুভর্তা হলে আর কিছুরই প্রয়োজন হয় না।

মাঝে মধ্যে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠেন মাশরাফি। পছন্দের তালিকায় জেমস, আইয়ুব বাচ্চু আর হাসান। সময় পেলে রবীন্দ্র সংগীতেও ডুবে থাকেন। তবে সিনেমায় এখনো সেই উত্তম-সুচিত্রাতেই মজে আছেন টাইগার ক্যাপ্টেন।

প্রচÐ মাতৃভক্ত মাশরাফি সুযোগ পেলেই ছুটে যান মায়ের কাছে, নড়াইলে। তার সেই বাড়িটি অবশ্য এখন ভক্তদের আড্ডাস্থল হয়ে গেছে। যেখানে কারোরই প্রবেশাধিকারে বাধা নেই। এমনকি পুরো বাড়ির কোথাও নেই কোনো তালা! যে কেউ যাক, সাদরে আপ্যায়ন করেন মাশরাফির মা।

স্ত্রী, এক মেয়ে আর এক ছেলে। বিজ্ঞাপনের ভাষায় যাকে বলে সুখী পরিবার। বাড়ির পাশের মেয়ে সুমনা হক সুমি তার প্রথম প্রেম। ২০০৬ সালে সংসার পাতেন দুজন। এখন মেয়ে হুমায়রা, ছেলে সাহিলকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার।

প্রিয় শহর নড়াইলের ছোট থেকে বড় সবারই জানা তাদের কৌশিক- খুবই ধর্মপরায়ণ, নিখাদ দেশপ্রেমিক, সৎ একজন মানুষ। এটা অবশ্য এখন সবারই জানা। তাইতো মাশরাফি যখন পা পিছলে উইকেটে পড়ে যান, তখন শঙ্কায় কেঁপে ওঠে গোটা বাংলাদেশ। প্রার্থনায় বসে যান অনেকে। এমন নেতার জন্য আকুল হয়ে উঠেন সবাই।