ফিরিয়ে দাও মাটি!

ফিরিয়ে দাও মাটি!

679
SHARE
Rohinga

ফারজানা ব্রাউনিয়া: প্রতিদিন বাংলাদেশে বাড়ছে রোহিঙ্গাদের ঢল। অসহায়, নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘ মিছিলের দিকে তাকানো যায় না। বুক ফেটে কান্না আসে। স্বর্ণ কিশোরী নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফারজানা ব্রাউনিয়ার এই লেখায় তারই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে…

হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে তার। বুক ধড়ফড় করছে। ঘরের ভিতরেই লুকাবে? নাকি বাইরে বেরিয়ে দৌঁড় দেবে? ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ১৪ বছরের কিশোরী মাÑ মরিয়ম। স্বামীকে মেরে ফেলেছে মিয়ানমার আর্মি। পাখির মতো ছোট্ট শরীরে যে নির্যাতন তাকে সহ্য করতে হয়েছে তার মধ্য দিয়ে সে আর যেতে চায় না। কোলের শিশুটিকে কাঁখে বসিয়ে ছুটে বের হয় রাস্তায়। মধ্যরাতেও গনগনে আলো। পাশের বেশ কটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে আর্মিরা। প্রাণ ভয়ে নিঃশব্দে পালাচ্ছে মানুষ। সেও ছুটলো তাদের সঙ্গে। এরপর আর কিছুই মনে নেই মরিয়মের। মরিয়ম এখন মুক্ত। পৃথিবীর সকল অত্যাচার, অবিচার থেকে। সীমানার নামে রাজনৈতিক সিদ্ধি উদ্ধারে মানুষের উপরে যে বর্বরতা, তা আর মরিয়মকে স্পর্শ করতে পারবে না। অনড় দেহটি সীমান্তেই পড়ে আছে তার। শিশুটি কোথায় কেউ জানে না। হয়তো অন্য কোনো মা তার সাতটি শিশু সহকারে মরিয়মের সন্তানকে বুকে নিয়ে পার করেছে সীমান্ত। বাংলাদেশের সীমান্ত পৃথিবীর অন্যান্য সীমান্তের মতো কাঁটাবিদ্ধ নয়। মানবতার তরে সীমান্ত প্রহরীরা সেদিন শক্ত হাতে বাধা দেয়নি মৃত্যু ভয়ে ছুটে আসা অসহায় এই মানুষগুলোকে। সীমান্ত খুলে দিয়ে ১৯৭১-এ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেদিন মানবতার, মাতৃত্বের যে পরিচয় দিয়েছিলেন তেমনি আরো একবার পৃথিবীতে মানবতার উদাহরণ সৃষ্টি করলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একজন দুজন নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ।  গণনা মতে দশ লক্ষ ছুঁই ছুঁই।

সংখ্যায় বিশাল এ মানুষগুলো শুরুতে উখিয়া এবং আশেপাশের সাত আট মাইল রাস্তা জুড়ে অবস্থান করছিলো। বাংলাদেশের সুদক্ষ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘর তৈরি হলো, পাহাড় কেটে নির্মিত হলো রাস্তা। মানুষগুলোর মুখে সুশৃঙ্খলভাবে অন্ন তুলে দিতে তৈরি করলো এক সামাজিক কাঠামো। এ যেনো আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ।

Rohinga-1নয়টি ক্যাম্প ও পঁচিশটি সাব ক্যাম্প নির্মিত হলো। মানুষগুলোকে পরিবারের সাথে রেখেই বসবাস করবার জন্য স্থানান্তরিত করা হলো এই ক্যাম্পগুলোতে। শুরুতে যে শিশুটির কথা বলেছিলাম, সে শিশুটি এখন কোন ঘরে আছে জানা নেই। তবে মরিয়মের সন্তানের মতো পিতা মাতাহীন এমনি শিশুর সংখ্যাও অগণিত। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং দেশের মিডিয়া ও অন্যান্য সংগঠনগুলো তাদের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করে চলেছে এই ক্যাম্পগুলোতে। এই মানুষগুলোর ক্ষুধা মেটাতে প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবারের প্রয়োজন সে তুলনায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসা খাবারের পরিমাণ অনেক কম। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্যÑ যে অনুভ‚তিটুকু ধারণ করে হৃদয়ের মাঝে সেখান থেকেই আসছে খাবারগুলো ত্রাণ হিসেবে। যার কারণে সরকারি গুদাম উন্মুক্ত থাকলেও এখন পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো খাবার নেয়া প্রয়োজন হয়নি। একটি মানুষের পরাজয় হয়তো অন্য একটি মানুষের বিজয়ের গল্প গাথতে পারে। কিন্তু শুধু একবার মানবতার পরাজয় পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের পরাজয়ের ছবি এঁকে দেয়। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মানবতার তরে হাতে হাত রেখে কীভাবে বেষ্টনি তৈরি করে মানবতাকে রক্ষা করতে পারে তা ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেলো। এ মানুষগুলো বাংলাদেশের মাটিতে ঠিক কতদিন থাকবে জানা নেই। হয়তো তারা নিজের মাটি ফিরে পাবে একদিন। হয়তো পাবে না কোনোদিনই; হয়তো মিশে যেতে হবে বাঙালির জীবন ¯্রােতে। শুধু মিয়ানমার, বাংলাদেশ নয়Ñ সিরিয়া, জার্মানি, ইরাক, তুরস্ক, লেবালন, মিশর, স্পেনসহ অনেক দেশেরও দৃশ্য একই। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এক দেশ যখন সীমান্ত বাধে অন্য দেশকে তখন সীমান্ত খুলে দিতে হয়। কিন্তু সীমান্তের কাঁটাতারে যে নামটিকে মৃত্যুবরণ করতে হয় তার নাম মানুষ অথবা মানবতা। গায়ের রঙ ভিন্ন হলেও রক্তের রঙ লাল এবং তারা আমার আপনার মতো মানুষ। আর তাই বিতর্ক যাই থাকুক না কেন মানবতার এ ক্রন্দনের সময় বাংলাদেশের প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি সংগঠন, প্রতিটি সংগ্রামের মতো স্বর্ণ কিশোরীরাও উপস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

কুতুপালং-২ থেকে যাত্রা শুরু করলো তারা। উদ্দেশ্য প্রতিটি ক্যাম্পেই একটি ক্লাব হবে। সে ক্লাবের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে দুজন রোহিঙ্গা স্বর্ণ কিশোরী। তারা তাদের কিশোরী স্বাস্থ্য, গর্ভকালীন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে তথ্য আদান প্রদান ও সেখানকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যোগাযোগ করবে উক্ত উপজেলার স্বর্ণ কিশোরী স্মৃতি বড় ুয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রের সঙ্গে।

যেকোনো দুর্যোগে সবচাইতে বেশি ঝুকি থাকে কিশোরীর। আর এ কারণেই স্বর্ণ কিশোরীরা তাদের ভাষায় তাদের সমবয়সী হয়ে তাদের বেদনার কথা শুনতে সময় দিচ্ছে ঘরে ঘরে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্বর্ণ কিশোরী অহনা যখন ১৬ হাজার টাকা তুলে দিলো নেটওয়ার্ক মঞ্চকে ঠিক তখনই নিজেদের অর্জিত ১২ হাজার টাকা তুলে দিলো আরো ৪ স্বর্ণ কিশোরী। আরও কিছু টাকা যোগাড় করে যখন ভাবনা শুরু হলো চাল, ডাল, তেল এর পাশে আর কী প্রয়োজন? তখনই লিস্টের প্রথমে উঠে এলো কাপড়ের স্যানিটারি ন্যাপকিন ও সাবান এর কথা। মোমবাতি, দিয়াশলাই, ১টি গামছা, একজোড়া স্যান্ডেল, শুকনো খাবার আর খাবার স্যালাইনও দরকার। বরাবরের মতো ক্রান্তিকালে স্বর্ণ কিশোরীদের পাশে এসে আরো একবার দাঁড়ালেন সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, প্রেসিডেন্ট, আইবিএফ এবং ডিইডি, আইসিডিডিআরবি। সঙ্গে আরো থাকলেন ওয়েল ফুডের টোস্ট নিয়ে ওয়েল গ্রæপের কর্ণধার সৈয়দ নূরুল ইসলাম।

সব সরঞ্জামাদি গুছিয়ে নিয়ে যাত্রা হলো শুরু। ঢাকা থেকে মাইক্রোবাস যাচ্ছে কক্সবাজারের দিকে। ২০১৬ সালের বর্ষসেরা স্বর্ণ কিশোরী দীপ্তি চৌধুরীর নেতৃত্বে কক্সবাজারের স্বর্ণ কিশোরী অর্পিতা পাল, উখিয়া উপজেলার স্বর্ণ কিশোরী স্মৃতি বড় ুয়া এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার স্বর্ণ কিশোরী সাদিয়া রহমান ঐশী। চ্যানেল আইয়ের পুরো টিম প্রস্তুত বিশ্ববাসীর কাছে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাওয়া পাওয়া তুলে ধরতে।

Rohinga-2সেদিন আমি সেখানে উপস্থিত হবার আগেই সূর্যোদয় থেকেই কাজ করছিলো স্বর্ণ কিশোরীরা। আমি উপস্থিত হয়েই লক্ষ্য করলাম ষাট থেকে সত্তুরজন কিশোরী একত্রিত হয়ে কথা বলছে তাদের সঙ্গে। স্বর্ণ কিশোরী নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশনের পরিচালক রফিকুল ইসলাম তাদের মাঝে একটি ক্লাব গঠন করে দিলেন। ক্লাবের নিয়ম কানুন জানালেন এবং স্বর্ণ কিশোরী নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. নিজামউদ্দিন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরলেন তাদের সামনে। দীর্ঘ সময় ত্রাণ সামগ্রীর জন্য অপেক্ষমান একটি লাইন ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে। কোথাও কোনো চিৎকার নেই, চেচামেচি নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানকার প্রথম স্বর্ণ কিশোরী সুরক্ষা ক্লাব উদ্বোধন করলেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সিভিল সার্জন এবং স্বাস্থ্য মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদকে নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন এমপি। সকলের মাঝে প্রতিদিনের মতো চাল, ডাল, তেল বিতরণ শুরু হলো আইবিএফ এবং স্বর্ণ কিশোরীর সৌজন্যে। সঙ্গে একটি লাল সবুজের স্বাস্থ্য ব্যাগ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ত্রাণ সংগ্রহকারীদের মধ্য থেকে একজন কিশোরী বলে উঠলোÑ এই প্রথম একটা সাবান পেলাম। স্বর্ণ কিশোরী দীপ্তি এবার তার আবেগকে আর ধরে রাখতে পারলো না। দুচোখ ভিজে এলো তার। মুহূর্তেই চোখের পানি সরিয়ে আবারও শক্ত হয়ে দাঁড়ালো সে। নানা প্রশ্ন দীপ্তির মাথায়। আমার মতোই একজন কিশোরী কী করে হাজার মানুষের জন্য তৈরি একটি টয়লেট ব্যবহার করবে? মাসিকের সময়ই বা তার কী ব্যবস্থাপনা রয়েছে? প্রথম একটি সাবান হাতে পেলো মানে টয়লেটের পর এবং খাবার আগে তাহলে কী দিয়ে হাত ধুয়েছে এতোদিন? হায় সৃষ্টিকর্তা তোমার সৃষ্টি সূর্যের আলো, বৃষ্টির পানি আর বাতাসের অক্সিজেন যদি প্রতিটি মানুষকে একই রকমভাবে স্পর্শ করতে পারে তাহলে কেন মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদ? দেশের মানুষকে অত্যাচার করে তাকে তার নিজ মাটি ছাড়া করলো কোন দানব? ছোট্ট একটি শিশু হামাগুড়ি দিয়ে দীপ্তির পায়ের কাছে এসে বসলো। চোখের পানিটুকু সরিয়ে মুখে হাসি মেখে শিশুটির দিকে তাকাতেই সে লক্ষ করলো বাবা, মা কিংবা ভাইবোন, কেউই নেই তার আশেপাশে। পরম মমতায় সে বুকে টেনে নিলো শিশুটিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, আমিও তোমার মতোই একজন মানুষ। আমার ক্ষমতা খুবই সীমিত। তবে আমি যদি প্রকৃতি হতাম, বিশ্বাস করো প্রতিশোধ নিতাম। ধ্বংস করে দিতাম মানুষে মানুষে ভেদাভেদকারী সৃষ্টিকারী মানুষরূপী সেই দানবগুলোকে। আর তুমি আমি মিলে গড়ে তুলতাম এক শান্তির পৃথিবী। যেখানে তোমার বাবা থাকতো, মা থাকতো। আর তুমি থাকতে তোমার মাটিতে। জয় হোক মানবতার।