ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার এবার পেলেন আব্দুল লতিফ বাচ্চু ও নরেশ ভূঁইয়া

ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার এবার পেলেন আব্দুল লতিফ বাচ্চু ও নরেশ ভূঁইয়া

98
SHARE
FHSP

কিছু মানুষের যেন জন্মই হয় স্বপ্ন দেখার জন্য। দেশকালের বাস্তবতায় সময়ের চেয়ে তাঁরা থাকেন এগিয়ে। ফজলুল হক ছিলেন তেমনি একজন অগ্রগামী স্বপ্নিক মানুষ। আর স্বপ্ন কেবল তিনি নিজেই দেখতেন না, দেখাতেন অপরকেও। একদা তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সিনেমা নিয়ে। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো অবকাঠামোই যখন গড়ে ওঠে নি, সিনেমা করার কথা যখন প্রায় ভাবাও যায় নি সেই সময় তাঁর উদ্যোগে সিনেমা বিষয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সিনেমা’ নামে একটি পত্রিকা। কেবল তাই নয়, পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণ প্রক্রিয়াতেও তিনি ছিলেন সহযোগীর ভূমিকায়।

১৯৫০ সালের ঢাকা একটা ছোট্ট মফস্বল শহর, বগুড়া তো আরোই ছোট, প্রায় অজ পাড়াগাঁÑ সেই বগুড়া থেকে ফজলুল হক প্রকাশ করলেন চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা সিনেমা। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের দুই কেন্দ্র বোম্বেতে ও টালিগঞ্জে সিনেমার প্রতিনিধি ছিলেন। বিখ্যাত আলোকচিত্রী আফজাল চৌধুরী খবর সংগ্রহ করতেন বোম্বে থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক পীযুষ বসু লিখতেন টালিগঞ্জের খবরাখবর।

শুধু পত্রিকা প্রকাশ করেই কি ক্ষান্তি! তখনই তিনি স্বপ্ন দেখতেন এখানে একদিন মুভিÑক্যামেরা চলবে, নির্মিত হবে সিনেমা। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ঢাকায় এফডিসি গড়ে উঠবার পটভূমি যাঁরা তৈরি করেছিলেন ফজলুল হক তাঁদের অন্যতম। তাঁর আরেক স্বপ্ন হলিউডের মতো সিনেমার স্টুডিও হবে বাংলাদেশে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সড়কের পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠবে একটা চলচ্চিত্র নগরী। পরে তিনি নিজেই আবিভর্‚ত হন সিনেমার নির্মাতা হিসেবে। পাকিস্তানের প্রথম শিশু-চলচ্চিত্র তাঁরই হাতে তৈরি। পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি শুরু করেন সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা। প্রতিষ্ঠা করেন পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা ‘ইনল্যান্ড প্রেস’।

১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ের সূচনা ঘটান ফজলুল হক। কিছু পরে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে প্রসপেকটাস ছেপে আনুষ্ঠানিকভাবে নেমে পড়েছিলেন নতুন এই স্বপ্ন নিয়ে। আজকের দিনে অনেকেরই কাছে কী আকর্ষণীয়ই না এই রিয়েল এস্টেট ব্যবসা! কিন্তু সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা তাঁর এই স্বপ্ন তখন বাস্তবায়ন করা যায়নি। একজনের বাড়ির ছাদের ওপর আরেকজনের বাড়ি হবে এমনটা তখনো গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি সমাজে।

১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির ক্রান্তিলগ্নে ফজলুল হকের পক্ষে নিষ্ক্রিয় থাকা সম্ভব হয় না। পরিবারের সবাইকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছেড়ে চলে যেতে হয় মুক্তিযুদ্ধে। গভীর যুক্ততা ঘটে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে। সম্পৃক্ততা ঘটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গেও। আকাশবাণী বেতার কেন্দ্রেও অনুষ্ঠান করেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে।

ষাটের দশকের শেষের দিকে বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দিলেন খাবারের দোকান ‘সোনার চামচ’। স্বাধীনতার পর সেই ‘সোনার চামচ’ হয়ে উঠল সমৃদ্ধ দেশীয় গ্রামীণ ঐতিহ্যের পসরা ‘পিঠাঘর’। ঘড়ির ডায়ালে বাংলা সংখ্যা ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি ঈওঞওতঊঘ ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি ও দেয়াল ঘড়ির নাম দিলেন ‘নাগরিক’ ও ‘মুক্তি’। প্রতিটি হাতঘড়ির মূল্য ছিল এক শ’ টাকা। বেশ সাড়া জাগিয়েছিল ‘বাংলা ঘড়ি’। ‘অনির্বাণ’ নামে আইপিএস চালু করেছিলেন যা তখন ঢাকায় ছিল অভূতপূর্ব বস্তু। বেশ কৌত‚হল সৃষ্টিকারী সামগ্রী ছিল ‘অনির্বাণ’। দর্শনীয় বস্তু হিসেবেও অনেকে দেখতে আসতেন তা। উদ্যোগগুলোর কোনো কোনোটা উজ্জ্বল সম্ভাবনা জাগালেও অধিকাংশই সফল হয়ে উঠতে পারে নি তাঁর হাতে। কিন্তু সেসব স্বপ্নের অনেকগুলোই তো আজ বাস্তব!

FHSP-1বড় বিস্তৃতিপরায়ণ এই বাংলাদেশের লোকসমাজ। যেন ভুলে যাওয়াই তার দস্তুর! ফজলুল হকের সমসাময়িকদের কেউ কেউ খেদোক্তি করেছেন যে, তাঁকে স্মরণ করা হয় না যথাযথভাবে। কিন্তু না, এই অন্যায় অবিবেকী ক্রিয়ারও প্রতিক্রিয়া আছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে চালু হয়েছে ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার’। প্রতিবছর সেই পুরস্কার দেয়া হয় একজন চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও একজন চলচ্চিত্রকারকে। ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কারের আয়োজনে প্রতিবছরই সমবেত হন বিশিষ্টজনেরা। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও ২৬ অক্টোবর নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট জনেরা একত্রিত হয়েছিলেন। ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রদান কমিটি আয়োজিত এ অনিন্দ্য সুন্দর আয়োজনে দেশ বরেণ্য সিনেমাট্রোগ্রাফার আব্দুল লতিফ বাচ্চু ও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সাংবাদিক নরেশ ভুঁইয়াকে এবার ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। নাট্যজন মামুনুর রশীদ, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মোরশেদুল ইসলাম, শিশু সাহিত্যিক আলী ইমাম, চলচ্চিত্র পরিচালক আবু সাঈদ, নারী উদ্যোক্তা কনা রেজা, বিশিষ্ট রন্ধন বিশেষজ্ঞ কেকা ফেরদৌসী, বিশিষ্ট অভিনেতা আল মনসুর, নূরুল আলম (বাবু চাচা), সংগীত শিল্পী কোনাল প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। পুরস্কার প্রাপ্ত দুই গুণী ব্যক্তির হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, চ্যানেল আই-এর পরিচালক মুকিত মজুমদার বাবু। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন মৌসুমী বড়–য়া। অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদুল আলম পরিচালিত ফজলুল হকের জীবন ভিত্তিক ‘অগ্রগামী স্বাপ্নিক’ শীর্ষক একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

এ যাবৎ যাঁরা পেয়েছে পুরস্কার

ফজলুল হকের সহধর্মিণী দেশ বরেণ্য কথা সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০০৪ সাল থেকে ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। এ যাবৎ পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন: ফজল শাহাবুদ্দীন, আহমদ জামান চৌধুরী, চাষী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, সাইদুল আনাম টুটুল, রফিকুজ্জামান, সুভাষদত্ত, হীরেন দে, আব্দুর রহমান, গোলাম রব্বানী বিপ্লব, সৈয়দ শামসুল হক, আমজাদ হোসেন, চিম্ময় মুৎসুদ্দী, মোরশেদুল ইসলাম, ই. আর খান, অনুপম হায়াৎ, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, গোলাম সারওয়ার, নায়করাজ রাজ্জাক, রেজানুর রহমান, সৈয়দ সালাহ উদ্দিন জাকী, আরেফিন বাদল, মাসুদ পারভেজ, শহীদুল হক খান, আজিজুর রহমান, মোস্তফা জব্বার এবং আব্দুল লতিফ বাচ্চু ও নরেশ ভুঁইয়া।

 

 

বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এ এক অনন্য মাত্রা

আলী ইমাম

আজকে আমাদের চলচ্চিত্র চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে যে অবস্থানে এসেছে তার স্বপ্ন একদিন ফজলুল হকই দেখেছিলেন। তিনি দুর্দান্ত সাহসী বিপদগ্রস্ত একজন অনন্য সাধারণ মানুষ ছিলেন। বিপদগ্রস্ত বললাম এই জন্য যে, তিনি অনেক কিছুর উদ্যোগ নিতে গিয়ে বারবার অর্থনৈতিকভাবে হোঁচট খেয়েছেন। তারপরও তিনি স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। তাঁর সেই স্বপ্নের ধারা জেনেটিকভাবে ফরিদুর রেজা সাগর বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। পিতার অপূর্ণ স্বপ্নগুলো নিয়েই সাগর কাজ করে চলেছেন। এই পরিবারটি একটি সৃজনশীল মেধাবী পরিবার। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন নিষ্ঠার সঙ্গে পরিবারটিকে আজকের এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তাই তাঁর সন্তানেরা কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। ফজলুল হকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই পুরস্কার বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক অনন্য মাত্রার আশীর্বাদ।

আমাদের একটি ডিজিটাল ল্যাব দরকার

নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু

ফরিদুর রেজা সাগরকে ধন্যবাদ জানাই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রতিবছর এই পুরস্কারটি টিকিয়ে রাখার জন্য। এটা অবশ্যই আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য একটি অনন্য উদ্যোগ। আমার জন্ম যে বছর সেই বছর ফজলুল হকের মতো গুণী মানুষ বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে একটি ‘সিনেমা’ পত্রিকা বের করেন। এটা মনে হলেই আমি পুলকিত হই। আনন্দ পাই। তার মতো গুণী মানুষেরা এসেছিলেন বলেই আজকের চলচ্চিত্র নিয়ে আমরা এত স্বপ্ন দেখতে পারছি। দায়িত্ব এবং উত্তরাধিকারের যে কাজ সেটি ফরিদুর রেজা সাগর করে যাচ্ছেন। এজন্য তাকে অশেষ ধন্যবাদ।

বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম অনেক কিছু করেছে। এখন আমাদের একটি আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব দরকার। তাহলে ভারতে গিয়ে আমাদের আর কাজ করতে হবে না। এই উদ্যোগটি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের নেয়া উচিত।

সবার দোয়া চাই

কনা রেজা, নারী উদ্যোক্তা

আজকের অনুষ্ঠানে এত গুণীজনকে দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। এত গুণীজনের সামনে কথা বলতে পারাটাও ভাগ্যের ব্যাপার। আমি আমার শ্বশুর ফজলুল হককে চোখে দেখিনি। এজন্য নিজেকে দুর্ভাগা মনেকরি। কী কারণে যেন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। এজন্য সবসময় আমার একটা আফসোস কাজ করে। তাঁর কাজ, স্বপ্ন এবং পরিশ্রমকে আমি প্রাণভরে শ্রদ্ধা করি। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।

তিনি কখনও ভেঙে পড়তেন না

আজিজুর রহমান

একজন স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ ছিলেন ফজলুল হক। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি এইজন্য যে, এই মানুষটির সঙ্গে ‘সিনেমা’ পত্রিকায় কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সময় কাটানোর অনেক স্মৃতি আছে। এইসব স্মৃতির মধ্যে থেকে আমাকে সবসময় ভাবিয়ে তোলে তার চিন্তা চেতনা এবং পরিশ্রমের দিনগুলো। তিনি কখনোই ভেঙে পড়তেন না। যে কোনো কাজের মাঝে বাধা এলেও সেটার হাল ছাড়তেন না। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমি শিখেছিও বটে।

তার জীবন থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে

কোনাল

আমি ফজলুল হকের মতো এত বড় মাপের মানুষের সম্পর্কে কিছু জেনেছি বলে নিজেকে বেশ ভাগ্যবতী মনে করি। অনেক বাধা বিপত্তি থেকে কীভাবে এগিয়ে গেছেন এবং কীভাবে নিজের স্বপ্নের পেছনে ভালোলাগার পেছনে লেগে থাকতে হয় তা তার জীবনী থেকে আমি শেখার চেষ্টা করছি এবং নিজের জীবনে সেটা কাজে লাগানোর চেষ্টাও করছি।

তার উপদেশ পেয়েই নিজেকে গড়ে তুলি

নুরুল আলম, পারিবারিক বন্ধু

ফজলুল হক এই মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ১৯৬৯ সালে। পরিচয়ের প্রথম দিনেই আমি মুগ্ধ। সব ব্যাপারে তার যে বিচক্ষণতা তা আমাকে মুগ্ধ করতো। তখন থেকেই আমি তার ফ্যান হয়ে যাই। সব ব্যাপারে তিনি আদেশ-উপদেশ দিতেন। কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে চলতে হবে, পোশাক-আশাক কেমন পরতে হবে সেই বিষয়েও তিনি বলে দিতেন। একজন মানুষকে তৈরি করার পেছনেও তার ছিল অন্যরকম অবদান। আমি তখনকার সময়ে দেখতাম খান আতা, জহির রায়হানরা পর্যন্ত উনাকে বস বস বলতো। আমি অবাক হতাম। সেই থেকে এই পরিবারটির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা, এখনো আছে।

কঠিন বাধা পেয়েও উঠে দাঁড়িয়েছেন

মোরশেদুল ইসলাম

আমার সৌভাগ্য হয়নি গুণী এই মানুষটিকে দেখার। তাই তার কাজ সম্পর্কে, মানুষটি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ফরিদুর রেজা সাগরসহ তার পরিবারকে ধন্যবাদ জানাই। এমন উদ্যোগ সত্যিই আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য ইতিবাচক একটা দিক। সাগর ভাই বাবার সুযোগ্য সন্তান। বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে তার বাবা যেমনিভাবে কাজ করে গেছেন, স্বপ্ন দেখে গেছেন এবং বারবার বাধা পাওয়ার পরও উঠে দাঁড়িয়েছেন তেমনি বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন ফরিদুর রেজা সাগর। আজকে আমাদের চলচ্চিত্রের এই যে এত অর্জন এজন্য ইমপ্রেস টেলিফিল্মের অনেক অবদান আছে। তাই আবারো ধন্যবাদ এই প্রতিষ্ঠানকে।

তিনি অজ¯্র স্বপ্নের কথা বলতেন

আল মনসুর, অভিনেতা

আমার স্কুল কেটেছে মফস্বল শহরে। তখন ‘চিত্রালী’ পড়তাম নিয়মিত। সেই পত্রিকা পড়ে চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রের মানুষের প্রতি এক প্রকার আগ্রহ জন্মায়। বিশেষ করে চলচ্চিত্র পরিচালকদের প্রতি। পরবর্তী যে ঢাকায় আসার পর একজন পরিচালকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি ছিলেন ফজলুল হক। তাঁকে দেখে এবং পরিচয় হয়ে এক কথায় আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। বড় ভাই হিসেবে আমাকে কীভাবে যেন আপন করে নিলেন। অজ¯্র স্বপ্নের কথা বলতেন এবং একজন মানুষকে কীভাবে তার স্বপ্নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে সেই কথাও শোনাতেন। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই এখনও জীবন চলছি। অনেক বিপদেই তাঁর আদেশ-উপদেশগুলোর কথা মনে পড়ে সবসময়।

ফজলুল হক নিজে একটা প্রতিষ্ঠান

আবু সাঈদ

বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ফজলুল হক নিজে একটা ইনস্টিটিউট। তাঁর রেখে যাওয়া স্বপ্নের কথাগুলোই আমার পথ চলার পাথেয়। চলচ্চিত্রের যে ধ্যান-ধারণা তিনি পোষণ করতেন তা দেখে এবং শুনে আজকের একজন তরুণ উজ্জীবিত হয়। তাই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া কাজগুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। অবশ্য সেই কাজটি ফরিদুর রেজা সাগর নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন। তাকে অজ¯্র ধন্যবাদ।

আমার বাবার কথা খুব মনে পড়ছে

আব্দুল লতিফ বাচ্চু

আজ বারবার আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। আমরা যেই সময়টায় কাজ শুরু করি তখন চলচ্চিত্র নিয়ে নানান ধরনের নেতিবাচক কথা ছিল। গ্রামে গেলে নানান জনে নানান ধরনের কথা বলতেন। তবে আমার বাবা বলতেন, যে কাজটিই করো না কেন ঈমানদারের সঙ্গে কইরো। সত্যিই ঈমানদারের সঙ্গে করেছি বলেই আজ এই পুরস্কার পেলাম। আমি কৃতজ্ঞ এই পুরস্কার কমিটির প্রতি। বিশেষ করে ফরিদুর রেজা সাগরের প্রতি। বাবার সুযোগ্য সন্তান তিনি। চলচ্চিত্র নিয়ে তার বাবার যেমন স্বপ্ন ছিল, কিছু করার অদম্য ইচ্ছা ছিল, তার সন্তানেরও তা আছে। এমন মানুষ আছে বলেই, এমন পরিবার আছে বলেই চলচ্চিত্র শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে।

তেত্রিশ বছর কাটলো…

নরেশ ভুঁইয়া

৩৩ বছর চিত্রালীর মতো পত্রিকায় বিনোদন সাংবাদিকতা করেছি। অথচ সাংবাদিকতার জন্য পুরস্কার পাইনি। একটা সময় এ নিয়ে আপসোস হতো। অভিনয়, গ্রæপ থিয়েটার এবং নাটক পরিচালনা শুরু করি। আমি চলচ্চিত্র সাংবাদিক ছিলাম সেটা ভুলেই গেছিলাম। তবে এই পুরস্কার আমাকে তা মনে করিয়ে দিল। আমাকে মানুষ অভিনেতা হিসেবেই বেশি চিনে। তাই এই পুরস্কার পেয়ে নিজেকে আগের সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছি। ধন্যবাদ ফরিদুর রেজা সাগরসহ এই পুরস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ফজলুল হক যা করেছেন এবং তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন তা পূরণের লক্ষ্যে সাগর কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে অশেষ ধন্যবাদ।

চলচ্চিত্রের বিকাশে তার অবদান অনেক

মামুনুর রশীদ

ফজলুল হকের মুখে অনেক স্বপ্নের কথা শুনতাম। এগিয়ে যাওয়ার কথা শুনতাম। বেশ ভালো লাগতো। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য তার যে অবদান তা কখনোই ভোলার নয়। একটা মানুষের জীবনে সব সময় যে সাফল্য আসবে তা কিন্তু নয়। তার সন্তানরা যে স্বপ্নগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এটাইবা কম কিসে। ফাদার যেমন মেধাবী ছেলেও (ফরিদুর রেজা সাগর) তেমনই মেধাবী। একজন পিতা এরচেয়ে ভাগ্যবান আর কীভাবে হয় আমার জানা নেই। বাবার মতোই ছেলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রসহ শিল্প সংস্কৃতিতে অনেক অবদান রেখে চলেছেন। তারই একটি উদ্যোগ এই পুরস্কার। এটা অবশ্যই আমাদের চলচ্চিত্রসহ মিডিয়ার জন্য অনেক বড় উপহার।

ফজলুল হকের গোটা পরিবারের প্রতি শুভেচ্ছা

হাসান ইমাম

ফজলুল হক আমার আগে এসেছিলেন চলচ্চিত্রে। আমি এসেছি পরে। ১৯৬২ সালে এই গুণী মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয়। মনে পড়ে, এফডিসিতে তিনিই প্রথম আধুনিক একটি ক্যান্টিন করার উদ্যোগ নেন। এমন ছোট বড় অনেককিছু তিনিই চলচ্চিত্র অঙ্গনে শুরু করেন। আমি তার রূপবান চলচ্চিত্রে রহিম বাদশা চরিত্রে অভিনয় করি। একজন চলচ্চিত্রের মানুষ কতটা স্বপ্নবাজ এবং আধুনিক চিন্তা তখনকার সময়েই করতে পারেন সেটা ফজলুল হককে না দেখলে জানা হতো না। আমি এই পরিবাটিকে প্রাণভরে দোয়া করি যেন আরো ভালো কাজ করতে পারে।

এমন বাবার সন্তান হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার

কেকা ফেরদৌসী

এমন বাবার সন্তান হওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। আজকের অনুষ্ঠানে এসে এত গুণী মানুষের কাছে বাবার স্বপ্নের কথাগুলো শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছি। আসলে বাবার যোগ্য সন্তান আমি সাগর ভাইকেই বলবো। তিনি যেভাবে এই অঙ্গনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তা সত্যিই অনেক প্রশংসার দাবি রাখে। বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্ন নিয়ে তিনি কাজ করছেন নিরলসভাবে। তাই তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আমাদের সংস্কৃতি আমাদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানতে পারছে। বাবাতো ছিলেনই। আমাদের জীবনে মায়ের অবদানও কম নয়। আমাদের মা রাবেয়া খাতুন একটু অসুস্থ। তাঁর জন্য সকলে দোয়া করবেন।