প্রেম নেই তবে ভালোবাসা আছে

প্রেম নেই তবে ভালোবাসা আছে

1886
SHARE

চা বাগানের মাঝখান দিয়ে দৌঁড়ে যাচ্ছে মেয়েটি। সাদা জুতা সাদা পোশাক পড়া মেয়েটি মুখোশ পড়া অবস্থায় দৌঁড়াচ্ছে। তাকে দেখতে আকাশ থেকে নেমে আসা পরীর মতো লাগছে। মেয়েটির নামও পরী। সামনের দিকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হঠাৎ পরী একটি মাইক্রোবাসের সামনে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। অল্পের জন্য পরী মারত্মক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। পরীর পেছনে পেছনে আসে তার ছোট ভাই জোভান। বড় বোনের এমন খামখেয়ালীপনার জন্য মাইক্রোবাস চালকের কাছে স্যরি বলে সে। এরপরও পরী দৌঁড়াতে থাকে। একসময় অচেনা এক বাসার ভেতর ঢুকে যায় পরী। হঠাৎ বাসার ভেতর একজন কিশোরী প্রবেশ করায় সবাই কেমন হকচকিয়ে যায়। বোনের অনাকাংখিত অনুপ্রেবেশের জন্য পরীর ভাই জোভান এ বাসার সবার কাছে স্যরি বলেন। বের হয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে কে যেন জোভানকে ডাক দেয়। পেছন ফিরে দেখে তার বান্ধবী সৌমি। বান্ধবী সৌমিকে সব খুলে বলে জোভান। তার একমাত্র বোন পরী একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। একেবারে শিশুর মতো আচরণ করে সব সময়। পড়াশোনা জানে না। স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। সৌমি পরামর্শ দেয় তার জানামতে ভালো একটি স্পেশাল চাইল্ডদের স্কুল আছে সেখানে পরীকে ভর্তি করলে ও ভালো থাকবে।

বোনকে নিয়ে বাসায় আসার পর মা সুচরিতাকে সব খুলে বলে জোভান। মা সব শুনে মেয়েকে কোনো ভাবেই স্কুলে পাঠাতে রাজি হন না। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে গানের আসর বসে পরীদের বাসায়। সবাই মিলে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাওয়ার সময় পরীকে পাওয়া যায় না। অনেক খোঁজাখুজির পর দেখা যায় পরী ছাদে শহীদ মিনার বানিয়ে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি আপন মনে গাইছে। পরীর শহীদ মিনার বানিয়ে গান গাওয়ার দৃশ্য দেখে সবাই হতবাক। এরপর পরীর বাবা সুব্রত উৎসাহী হন মেয়েকে অটিস্টিক স্কুলে ভর্তি করাতে। তবে মা সুচরিতা আদরের পরীকে স্কুলে ভর্তি করাতে রাজি হন না। অবশ্য শেষ পর্যনত্ম সবাই রাজি হন পরীকে স্কুলে ভর্তি করাতে। স্কুল কম্পাউন্ডে পরীদের গাড়ি পৌছানোর পর সবাই স্কুলের অফিসে এসে উপস্থিত হয়। কিন্তু পরী বসে থাকে গাড়িতে। স্কুলের শিক্ষক ইমতু (আরেফিন শুভ) গাড়ি থেকে পরীকে নামিয়ে আনতে যান। কিন্তু পারেন না। এ সময় স্কুলের এক শিক্ষার্থী কাগজের চরকি নিয়ে পরীর কাছে যায়। চরকি দেখে আনন্দে গাড়ি থেকে নেমে মাঠে এসে সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে খেলা করতে থাকে পরী। পরীকে স্পেশাল স্কুলে ভর্তি করে হোস্টেলে রেখে বাবা মা কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে যান। পরীও রাতে খাবারের আগে কাঁদতে থাকে বাবা মার জন্য। পরে সব কিছু মানিয়ে নিয়ে লেখাপড়া ও খেলাধুলা শিখতে থাকে পরী। বুদ্ধিমতি পরী স্কুলের শিক্ষক ইমতুর প্রিয় ছাত্রী হয়ে ওঠে। শিক্ষক স্বপ্ন দেখে পরী স্পেশাল অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করে আনবে। শুরু হয় প্রশিক্ষণ। এ সময় স্কুলের কর্মকান্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভিলেন ডন। তাকে পিটিয়ে আসত্মানা তছনছ করে দেয় ইমতু। সুযোগ বুঝে পরীকে অপহরণ করে ডন। পরে ইমতু তাকে উদ্ধার করে। ঢাকায় স্পেশাল অলিম্পিকের বাছাই পর্বে যাওয়ার আগে ইমতুর ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। তবুও ঢাকায় যায় সে। বাছাই পর্বে পরী যখন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে তখন ইমতু চিৎকার দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার জানায় তার ব্রেইনস্টোক করেছে। সারাজীবন তাকে হুইল চেয়ারে কাটাতে হবে।

এদিকে চ্যাম্পিয়ন হয় পরী। কিছুদিন পর স্পেশাল অলিম্পিকের চূড়ানত্ম পর্বে খেলতে বিদেশ যাবে সে। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় পরী শাড়ি পড়ে ইমতুর সামনে এসে আঁচল উচিয়ে বলে এই যে শাড়ি, শাড়ি। হুইল চেয়ারে নিথর হয়ে বসে পরীর শাড়ির দিকে তাকিয়ে হাসতে চেষ্টা করে। এই হলো অনন্য মামুন পরিচালিত অসিত্মত্ব ছবির কাহিনী সংক্ষেপ। ছবিতে অভিনয় করেছেন সুজাতা, সুচরিতা, সুব্রত, আরেফিন শুভ, তিশা, জোভান, সৌসি, জ্যাকী প্রমুখ।

অসিত্মত্ব ছবির ৫টি গান একেবারেই ভিন্ন ধারার। দুটি গান এরই মধ্যে তরুণ শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেছে। তার একটি গান ‘আয় না বল না’ এবং ‘আমরা করবো জয় আমরা করবো জয়’ গানটি আমাদের সকলের ভালো কাজের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার সঙ্গীত। ছবিতে বার বার উচ্চারিত হয়েছে অটিষ্টিক বা বিশেষ শিশুদের মুখে এই গানটি। হলে বসে সিনেমা দর্শকরাও গানটির সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়েছেন। ছবির গল্পে, গাঁথুনীতে, নির্মাণে, অভিনয়ে বিশেষ কোনো চমক নেই তবুও ছবির শেষ দৃশ্য পর্যনত্ম দর্শকদের প্রবল আগ্রহ দেখা গেছে। দর্শকরা চাইছিল এই বুঝি ছবির নায়িকা পরী অটিষ্টিক খোলস ছেড়ে নায়কের সঙ্গে প্রেমে মজবেন কিন্তু পরী আর স্বাভাবিক হয় না প্রেমও আর হয় না। সিনেমা হলে ঢোকার আগে পোষ্টার দেখেও কিন্তু দর্শকের মনে হবে অসিত্মত্ব একটি রোমান্টিক ছবি। ছবির মূল গল্প যে অটিষ্টিকাদের নিয়ে আবর্তিত সেটা ছবি না দেখলে বোঝার উপায় নেই। হতেপারে এটা ছবির পরিচালকের একটি কৌশল। কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই এটি একটি মানবিক ও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাগ্রত করার প্রেরণার ছবি। এদেশে এখন অসংখ্য অটিস্টিক শিশু কিশোর রয়েছে তাদের প্রতি বিত্তবান থেকে শুরু করে সাধারণ সচেতন মানুষের দায়িত্ব অনেক। তারই অংশ হিসেবে নির্মাতা অনন্য মামুন একটি সুন্দর সাবলিল গল্পের মাধ্যমে অটিষ্টিকদের প্রতি সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়েছেন অসিত্মত্ব ছবিতে। এজন্য তাকে অভিনন্দন। অভিনন্দন তিশাকে একজন অটিষ্টিক কিশোরীর ভূমিকায় অসাধারণ ও অনবদ্য অভিনয়ের জন্য। এই প্রথম তিশা ও আরেফিন শুভ একসঙ্গে অভিনয় করেছেন পর্দায় তাদের ভালোবাসার রসায়ন জমেছিল।