প্রাণী-বাগানের পূর্বাপর -মুকিত মজুমদার বাবু

প্রাণী-বাগানের পূর্বাপর -মুকিত মজুমদার বাবু

760
SHARE

‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে…’ উক্তিটি করেছিলেন ভ্রমণ কাহিনী ও রম্যরচনা লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তারপরও মানুষ খাঁচায় পাখি পোষে। বাঘ, হরিণ শিকার করে ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে তার চামড়া ও শিং টাঙিয়ে রাখে। মানুষ বিনোদিত হবে বলে সিংহকে লোহার খাঁচায় বন্দি করা হয়। বাঘকে করে তোলে মানুষের বিনোদনের প্রাণী। বানর লোহার জালে লাফঝাঁপ করে। কুমিরকে দেখা যায় চারপাশে ইটের দেয়াল ঘেরা পুকুরে। বাঘ, সিংহ, সাপ, বানর, ময়ূর খাঁচায় নয়, জঙ্গলই তাদের উপযুক্ত স্থান। প্রাকৃতিক নিয়মেই বন-জঙ্গলে তাদের জন্ম হয়, সেখানেই তারা বিচরণ করে, খাদ্যের চাহিদা মেটায়, বংশবিসৱার করে, এমনকি মৃত্যু পর্যনৱ হয় বন-জঙ্গলেই। এক কথায় বলতে গেলে পশুপাখির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যনৱ কাটে বন-জঙ্গলে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম, যা ঘটে আসছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। আদিমকাল থেকেই কিছু কিছু মানুষ কখনো নিজের স্বার্থে, কখনো শখের বশবর্তী হয়ে, কখনো বিনোদন কিংবা  মতার বর্হিঃপ্রকাশ ঘটাতে বনের পশুপাখি বন্দী করে আসছে। আসেৱ আসেৱ তারা পৃহপালিত পশু হয়ে উঠেছে। বনের পশুকে বন্দী করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার আজও চলমান। বন-জঙ্গলের ভয়ঙ্কর পশুও মানুষের হাত থেকে মুক্তি পায়নি। প্রাচীনকালে মেসোপটেমিয়া, মিশর এবং চীনের মানুষ পশুপাখি ধরে খাঁচায় বন্দী করে রাখত। এর সাথে জড়িয়ে ছিল একটা জাতির সম্মান, আনন্দ এবং বৈজ্ঞানিক কৌতূহল। তখনকার দিনে প্রভাবশালী শাসকরা দূর-দূরানৱ থেকে বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করতেন। যে শাসকের সংগ্রহে যত বেশি প্রাণী থাকত অন্যান্য শাসকদের কাছে তার সম্মানটাও তত বেশি ছিল। শুধু তাই নয়, নিজের প্রজাদের কাছেও শাসক অধিক সম্মান পেতেন। রোমান সম্রাট অগাস্টাস ব্রিটেন আক্রমণ করার সময় সাথে করে হাতি নিয়েছিলেন। আগের দিনে রাজারা তাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য পশুপাখির খাঁচায় বন্দী করে রাখতেন। ১৬০০ সালের দিকে রাজা প্রথম জেমস এবং সভাসদবৃন্দ মিলে সিংহ আর ভালুকের লড়াই উপভোগ করতেন। আমাদের উপমহাদেশে রাজারা বাঘ পুষতেন। অন্যায়কারীকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হতো হিংস্র বাঘের খাঁচায়। আর হাতি-ঘোড়ার ব্যবহার করা হতো রক্ত য়ী বিভিন্ন যুদ্ধে। চীনা সম্রাজ্ঞী টান-কি হরিণের ঘর নামে পাথরের তৈরি একটি সংগ্রহশালা নির্মাণ করিয়েছিলেন। ঝো রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ওয়েন ওয়াঙ বিশাল একটি পশুসংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চীনারা এই বন্যপ্রাণী সংগ্রহশালাকে বলত ‘লিঙইউ’। মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্য, অঙ্গরাজ্য এবং লোকালয়ে পশুপাখি সংগ্রহশালাও গড়ে ওঠে। আধুনিক বিশ্বের শুরুর দিকে, অ্যাজটেক সম্রাট দ্বিতীয় মন্টেঝুমা টেনোখটিলানে (বর্তমান নিউ মেক্সিকো) একটি বন্যপ্রাণী সংগ্রহশালা স্থাপন করেন। এখানে ভিন্ন ভিন্ন ভবন, খাঁচা, বাগান, হ্রদ, ঝরনা এবং পুকুর বানানো হয়েছিল এসব বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে।

প্রাচীনকালের বন্যপ্রাণীর সংগ্রহশালাই আজকের চিড়িয়াখানায় রূপ পেয়েছে। চিড়িয়াখানাকে সহজ কথায় বলা যায় প্রাণীদের বাগান বা জুওলজিক্যাল গার্ডেন। জুওলজিক্যাল গার্ডেন থেকেই সংক্ষেপে ‘জু’ শব্দটি এসেছে। ‘জুওলজিকাল সোসাইটি অব লন্ডন’ চিড়িয়াখানার জন্য সর্বপ্রথম ‘জ্যু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

২০০৯ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো চিড়িয়াখানা আবিষ্কৃত হয় মিশরে । মেনাজেরি নামে পরিচিত এই চিড়িয়াখানা খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালে স্থাপিত বলে ধারণা করা হয়। তবে কেউ কেউ মনে করেন ১১৫০ সালে সর্বপ্রথম চীনা সম্রাট ওয়েন তার শখের জন্য একটি চিড়িয়াখানা স্থাপন করেন। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পশুপাখিদের জন্য আরামপ্রদ, মানসম্পন্ন আর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে এসব পশুপাখি সম্পর্কে দর্শনার্থীদের ভালো ধারণা দেয়া। আবার অনেকে মনে করেন মিশরীয় রাণী হাশেপসাট খ্রিস্টপূর্ব ১৪৯০ সালে চিড়িয়াখানার গোড়াপত্তন করেন। হাশেপসাটের চিড়িয়াখানার পশুপাখিদের সংগ্রহ করা হয়েছিল সোমালিয়া থেকে। দর্শনার্থীদের কাছ থেকে চিড়িয়াখানার পশুপাখিদের সুরক্ষা দিতে পরিখা নির্মাণ করা হয় অনেক চিড়িয়াখানায়। এই চিনৱা প্রথম মাথায় এসেছিল জার্মান নাগরিক কার্ল হাগেনবেকের। ইংল্যান্ডে প্রথমবারের মতো চিড়িয়াখানা স্থাপন করা হয় ১২০৪ সালে। আর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চিড়িয়াখানা স্থাপিত হয় ১৭৫২ সালে। এটাকেই সবচেয়ে প্রাচীনতম আধুনিক চিড়িয়াখানা বলে গণ্য করা হয়। ১৮০০ সালের দিকে জনসাধারণ ১ শিলিং-এর বিনিময়ে খাঁচার প্রাণীদের দেখে আসতে পারত। এভাবেই শুরু হয় ব্রিটেনের চিড়িয়াখানার যাত্রা। চিড়িয়াখানার প্রাণীদের সামলানো খুব সহজ কাজ ছিল না। যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই সবাইকে সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হতো। ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক চিড়িয়াখানার গোড়াপত্তন হয় লন্ডন শহরে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানাটি আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়। এছাড়া সিঙ্গাপুর জু, জুওলজিক্যাল পার্ক, ভারতের আলীপুরের চিড়িয়াখানা পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে বিশ্বে সহস্রাধিক চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কের মধ্যে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই দুই শতাধিক চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় চিড়িয়াখানা ঢাকায় অবস্থিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঢাকার নবাবদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে পশুপাখি পুষতেন। শুধু নবাবরাই নন, ঢাকার অনেক অবস্থাসম্পন্ন মানুষই পশুপাখি পুষতেন। এসব বন্যপ্রাণীদের কেমন করে পুষতে হয়, সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা বা জ্ঞান সবার ছিল না। কাজেই অনেকে তখন সরকারিভাবে এদের রাখার ব্যবস্থার জন্য আবেদন জানান। ১৯৫০ সালে হাইকোর্ট সংলগ্ন রমনা পার্কে কয়েকটা ঘর তুলে এদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। ওই সময় ওই চিড়িয়াখানায় ছিল ৩ থেকে ৪টা চিতাবাঘ, কয়েকটা ময়ূর, দেশি-বিদেশি পাখি, বাঘডাস, মেছোবাঘ, কুমির, বনবিড়াল ও শেয়াল। ঢাকার প্রথম চিড়িয়াখানাই ছিল এটা। ষাটের দশকে ঢাকার মিরপুরে মানসম্পন্ন চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। প্রথমে ২১৩.৪১ একর জমি নিয়ে চিড়িয়াখানা হলেও পরে এর আয়তন দাঁড়ায় ১৮৬.৬৩ একর। ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন মিরপুর চিড়িয়াখানা জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। মিরপুর চিড়িয়াখানায় এখন প্রায় ১৯০ প্রজাতির প্রায় ২ হাজার ২ শ’ মেরুদন্ডী প্রাণী আছে। এই চিড়িয়াখানার ভেতরে জীবিত পশুপাখি ছাড়াও রয়েছে মৃত প্রাণীদের নিয়ে একটি জাদুঘর। ঢাকা চিড়িয়াখানা ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোটবড় আরো কয়েকটি চিড়িয়াখানা আছে। আশির দশকের শেষ দিকে ঢাকা শহরের বাইরে রাজশাহীতেও মানুষের বিনোদনের জন্য স্থাপিত হয় প্রথম চিড়িয়াখানা। এছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়েও বাংলাদেশে কয়েকটি চিড়িয়াখানা রয়েছে।

Pokrity-o-Jibon-1সম্প্রতি চিড়িয়াখানার ধারণা নিয়ে জন্ম নিয়েছে সাফারি পার্ক। চিড়িয়াখানায় যেমন বন্যপ্রাণী বন্দী অবস্থায় থাকে সাফারি পার্কে ঠিক তার বিপরীত। এখানে বন্যপ্রাণী মুক্ত পরিবেশে থাকে। যে প্রাণী যে পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে তাকে সেই পরিবেশে রাখা হয়। দর্শনার্থীরা বরং বিভিন্ন খাঁচা আকৃতির গাড়িতে চড়ে, কখনো হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী দেখার সুযোগ পান। চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিক্ষা ও গবেষণার কাজে সাফারি পার্ক বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষায়িত চিড়িয়াখানার আদলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠেছে বায়োপার্ক। এ পার্কে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী আবদ্ধ বা মুক্ত অবস্থায় থাকে। তবে মুক্ত অবস্থায় থাকলেও বায়োপার্কের চারদিকে খাল বা কূপের মত করে কাটা থাকে যাতে এরা কোনো মানুষকে হঠাৎ আক্রমণ করতে কিংবা পালিয়ে যেতে না পারে। বিনোদনের পাশাপাশি গবেষণা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমও বায়োপার্কের অন্যতম উদ্দেশ্য।

চিড়িয়াখানা এবং চিত্তবিনোদন পার্কের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে এনিম্যাল থিমপার্ক। এ পার্ক সাধারণত বিনোদন এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। এখানে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন প্রজাতির স্থলজ ও জলজ প্রাণী দেখার সুযোগ পায়। এনিম্যাল থিমপার্কে বিভিন্ন ধরনের রাইডের সুযোগও রয়েছে।

শিশুদের জন্য তৈরি পেটিং জু নামের এক ধরনের বিশেষ চিড়িয়াখানা রয়েছে যেখানে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের পোষাপ্রাণী প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। বিভিন্ন গৃহপালিত পশুপাখির পাশাপাশি কিছু বিশেষ বন্যপ্রাণীও দেখার ব্যবস্থা আছে পেটিং জুতে। পেটিং জুকে অন্যনামে শিশুদের চিড়িয়াখানা বলা হয়। এ চিড়িয়াখানায় শিশুরা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। এখানে সংরক্ষিত প্রাণীদের আচরণ হিংস্র না হওয়ায় শিশুরা এসব প্রাণীর কাছাকাছি যেতে এবং ছুঁয়ে দেখতে পারে। ফলে শিশু বয়স থেকেই বিভিন্ন প্রাণীর সাথে শিশুদের গড়ে ওঠে এক নিবিড় সম্পর্ক।

স্পেশালাইজড জু নামে আরেক ধরনের বিশেষ চিড়িয়াখানা আছে যেখানে বিশেষ কিছু বন্যপ্রাণীর জন্য আলাদা বসবাসের স্থান গড়ে তোলা হয়। যে সব প্রাণী সাধারণত উষ্ণ অঞ্চলে বসবাস করে, তাদের শীতপ্রধান অঞ্চলে রাখতে হলে সে অনুযায়ী পরিবেশ তৈরি করা হয়। ভিন্ন পরিবেশে রাখা বন্যপ্রাণীর প্রকৃত বাসস্থান ও পরিবেশের মতো অন্যান্য সুযোগসুবিধাও নিশ্চিত করা হয় স্পেশালাইজড জুতে। স্পেশালাইজড জু ছাড়াও অন্যান্য সাধারণ চিড়িয়াখানাতেও ভিনদেশি প্রাণী রাখতে সে অনুযায়ী বিশেষ কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করা হয়।

রোডসাইড জু সাধারণত উত্তর আমেরিকায় দেখা যায়, বিশেষত অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায়। রোডসাইড জু ছোট পরিসরে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি করা হয়। দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য এখানে সংরক্ষিত প্রাণীকে বিভিন্ন ধরনের খেলা দেখানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

মূলত চিড়িয়াখানা বলতে এমন একটি জায়গাকে বুঝায় যেখানে দর্শকদের মনোরঞ্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী সম্পর্কিত শিক্ষা ও গবেষণার জায়গা। খাঁচার গায়ে কোনটা কোন প্রাণী, কোন পরিবারের, কোন দেশের, বৈজ্ঞানিক নাম কি… ইত্যাদি লেখা থাকে, যা দেখে দর্শনার্থীরা প্রাণীটি সম্পর্কে বিসৱারিত জানতে পারে। বেশিরভাগ মানুষ পশুপাখির ছবি দেখে টিভির পর্দায়। আর সরাসরি দেখা মেলে চিড়িয়াখানায়। বর্তমানে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণার কাজ চিড়িয়াখানা থেকেই হচ্ছে। প্রকৃতিতে যেসব প্রাণী অসহায় বা প্রজননের উপযুক্ত স্থান হারিয়েছে তাদেরকে চিড়িয়াখানার কৃত্রিম পরিবেশে রেখে প্রজননের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রকৃতি থেকে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীরও দেখা মিলবে চিড়িয়াখানায়।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন