Home প্রতিবেদন প্রকৃতি কথা প্রকৃতির গায়ে হিমেল হাওয়া : মুকিত মজুমদার বাবু

প্রকৃতির গায়ে হিমেল হাওয়া : মুকিত মজুমদার বাবু

SHARE

শীতকাল মানে চারপাশে মিহি কুয়াশার বৃষ্টি, আধো শুকনো জলাশয়ে হাজার হাজার পরিযায়ী রঙবাহারি পাখির ছন্দ তোলা নাচ, হিমেল হাওয়ায় মিষ্টি রোদ্দুরের প্রিয়তম পরশ, গাঢ় সবুজের পাতা চুঁইয়ে টুপ টুপ শিশিরেরা খসে পড়ে দূর্বাঘাসের উপর। বিসত্মীর্ণ দিগনেত্ম শস্যক্ষেতের হলুদ গালিচা কিংবা শস্যফুলে ভ্রমরের আনন্দনৃত্য প্রকৃতিকে সাজায় নতুন নতুন সাজে। সূর্যের আলো পড়ে সেই শিশির বিন্দু যখন এক মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা করে তখন শীতের প্রকৃতি হয়ে ওঠে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের আধার। শীত এমনই এক ঋতু যে নিজে জীর্ণ-শীর্ণ-দীনতায় থাকলেও মানুষকে কাছে ডেকে নেয় তার অপরূপ রূপে মোহাবিষ্ট করে। আর এটাই হলো শীতের বৈশিষ্ট্য।

শানত্ম শীতে প্রকৃতিপ্রেমীরা প্রকৃতির অমৃতসুধা আকণ্ঠ পান করতে বেরিয়ে পড়েন ঘর ছেড়ে। বছরজুড়ে অপেক্ষায় থাকেন প্রকৃতির সাথে সময় কাটাতে, প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে। সারা বছরের পথ চলতে, ক্লানিত্ম দূর করতে শীতকালেই চলার শক্তি সঞ্চিত হয় প্রকৃতি থেকে। শীতকালের দিনের সময় কম হলেও মিষ্টি মধুর শীতের আমেজে প্রকৃতি কোনো রুদ্রমূর্তির চোখ রাঙানি থাকে না। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দূরে সরে যায়। তবুও দুয়ারে দাঁড়ানো বৈরী জলবায়ু আর মানবসৃষ্ট অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে কখনো কখনো অনাকাক্ষিত দুর্যোগ নেমে আসে, নেমে আসে বিপর্যয়, যার সংখ্যা খুবই নগণ্য।

নতুন ধানের পিঠা-পায়েস নিয়ে সকালের মিঠে রোদ্দুরে পিঠ ঠেকিয়ে রসনা তৃপ্তি শীতের সে এক অন্যরকম অনুভূতি। খেজুরের মিষ্টি রসের হাঁড়িতে পাটকাঠি ডুবিয়ে গ্রামের ছেলেমেয়েদের চুক চুক করে রস খাওয়ার সেই দৃশ্য আজো বদলায়নি। বদলায়নি বাঙালির সেই অতিথিপরায়ণ মন-মানসিকতা। তবে দিন দিন কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। ইটভাটার কারণে অনেকেই খেজুর গাছকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে বিক্রি করে দিচ্ছে। গ্রামের ধুলো ওড়া মেঠোপথে খেজুর গাছের দেখা মিললেও আগের মতো সারিবাধা গাছ আর চোখে পড়ে না।

 

শীতকাল যে শুধু পিঠে-পায়েসের উৎসব চলে তা কিন্তু নয়। অন্যান্য ঋতুর চেয়ে এই ঋতুতেই সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় শাকসবজি। ধরণী থাকে প্রসবিনী। মাঠে মাঠে ফুলকপি, পালংশাক, মূলা, লাউ, পাতাকপি, ধনেপাতা, শালগম, গাজর, মুগ, বিভিন্ন জাতের শিম, মটর, টমেটো, মাষকলাই, বেগুন, ওলকপি, ব্রোকলি পাওয়া যায়, যা অন্য কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। তবে শীতের ফল কুল কমলা ছাড়া তেমন একটা দেখা যায় না।

শীতকাল প্রকৃতির গায়ে হিমেল হাওয়ার শক্ত কামড় বসালেও প্রকৃতি কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে নেয় না। সে হেসে ওঠে আঁধার সরিয়ে সকালের আলোর মতো। প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে বিভিন্ন প্রজাতির গাঁদা ফুল যেমন- বড় ইনকা গাঁদা, ছোট ছোট চায়না গাঁদা, রক্ত গাঁদা, দেশি গাঁদা, জাম্বো গাঁদা, অ্যাস্টার, ডায়ান্থাস, ভারবেনা, কারনেশান, সূর্যমুখী, হলিহক, বাগান বিলাস, জিনিয়া, ক্যামেলিয়া, কসমস, ডালিয়া, স্বর্ণ অশোক, জার্বেরা, সিলভিয়া ইত্যাদি ফুলে। শীতকালে ভেষজগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ তুলসী গাছে ফুল ফোটে। আকাশনীমও শীতের ফুল। এছাড়া নানা প্রজাতির রঙবাহারি দেশি-বিদেশি গোলাপ তো রয়েছেই।

খাল-বিল-নদ-নদীর পানি কমে যায় শীতকালে। শত্রুতা ভুলে জড়াজড়ি করে বেঁচে থাকে জলজপ্রাণী। কিন্তু মানুষের অসচেতনতার কারণে মাছ শিকারের নামে জলাশয় সেচ দিয়ে হাজার হাজার জলজপ্রাণী ধ্বংস করা হয়। আর এর ফলস্বরূপ বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ছোট-বড় দেশি প্রজাতির অসংখ্য মাছ।

প্রকৃতিকে হিমেল হাওয়া গ্রাস করলেও উল্লুক, ভাল্লুক, বাদুড়, হনুমান ও মুখপোড়া হনুমানরা বাচ্চা প্রসব করে। সাপ নিজেকে গর্তে লুকিয়ে রাখে শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচাতে।

শীতকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় প্রকৃতির অলংকার হিসেবে পরিচিত পরিযায়ী পাখি। নানান রঙের। নানান ঢঙের। তবে দুঃখের বিষয়, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্যকারী এসব পাখি শিকারির শিকারে পরিণত হয়। রসনা বিলাসে পরিযায়ী পাখি শিকার করা আর প্রকৃতির ধ্বংস ডেকে আনা একই কথা। তাই পরিযায়ী পাখি শিকার করে পেটের ক্ষুধা মেটানো নয়, তার রঙবাহারি রূপ এবং কলকাকলি উপভোগ করে মনের ক্ষুধা মেটানোই হোক সকলের প্রত্যাশা।

প্রকৃতি বিপন্নতা নয়; প্রকৃতির সৌন্দর্যই মেটাক মানুষের মনের ক্ষুধা। শীত ঋতু হয়ে উঠুক সেই সৌন্দর্যের আধার।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন