বাংলার প্রকৃতিতে স্নিগ্ধ শরৎ: মুকিত মজুমদার বাবু

বাংলার প্রকৃতিতে স্নিগ্ধ শরৎ: মুকিত মজুমদার বাবু

2615
0
SHARE

শরতের মন ভোলানো রূপ এখন বাংলার প্রকৃতিতে। অনুপম রূপ সৌন্দর্যমন্ডিত শরৎ ঋতু ‘শারদল²ী’ নামে পরিচিত। প্রকৃতির শুভ্রতা, স্নিগ্ধতা, সৌন্দর্য আর অপার ভালোলাগা নিয়ে বাংলার প্রকৃতি সেজেছে শরতের সাজে। পেরিয়ে এসেছে গ্রীষ্মের রুক্ষতা আর বিবর্ণতার বিস্তীর্ণ বন্ধুর পথ। শরতের হতবিহŸল চোখ দেখেছে দাবদাহের অগ্নিশিখা প্রকৃতির শরীর থেকে শুষে নেয়া শেষ জলকণা। তারপরই চলতি পথে পেয়েছে বরষার রিমঝিম অবারিত বারিধারা। গ্রীষ্মের অতৃপ্ত তৃষ্ণা মিটিয়েছে বৃষ্টির জলে। বুকফাটা কান্নার পরিসমাপ্তি ঘটেছে জলনূপুরের গানে। সব কালিমা, সব মলিনতা মিলিয়ে গিয়ে শরৎ আজ নিজেকেই মেলে ধরেছে প্রকৃতিতে বৃষ্টির সৌন্দর্য পিপাসু ময়ূরের মতো। প্রকৃতিতে কেবলই তাই নির্মল আনন্দ আর অনাবিল বাঁধভাঙা উচ্ছ¡াসের জোয়ার। শরতে তাই প্রকৃতিও থাকে প্রশান্তিতে। বারো মাসের ভাদ্র-আশ্বিন। ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু। কোনো হিংস্রতা নেই এ ঋতুর চোখে-মুখে। শরৎ শান্ত, নিরীহ, বড় বেশি চুপচাপ। তবে শরতের আছে পবিত্রতা, আছে কোমলতা, আছে শুভ্রতা, আছে নির্মলতা, আছে স্বচ্ছতা আর আছে মায়াবী স্নিগ্ধতা। সকাল বেলার দুর্বাঘাসের ওপর শিশির বিন্দু দিনের বোলফোটা আলোর রোশনাই জানান দেয় শরতের রূপবৈচিত্র্য। আকাশে ময়ূরকণ্ঠী নীলের বিস্তারই প্রকৃতিপ্রেমীদের মিটিয়ে দেয় স্বচ্ছ আকাশ দেখার দুর্দমনীয় আকাঙ্খা। দুধসাদা ছেঁড়া মেঘের কিশোরী দুরন্তপনা যেকোনো মানুষকে নিয়ে যায় সীমাহীন এক স্বপ্নরাজ্যে। রোদ-বৃষ্টির গোল­াছুট খেলা শরতের রূপবৈচিত্র্যে যোগ করে নতুন মাত্রা। তবে কলকল নদীর তীরঘেঁষে বাতাসে গানের তালের মতো মাথা দোলানো কাশফুলের হাসিমাখা মুখ শরতের রূপ-মাধুর্যকে দান করে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। কাশফুলের ছন্দ তোলা গানই যেন শরতের অপার মহিমা। শরতের কোলে মাঠের পর মাঠ নয়নাভিরাম সবুজ ধানের শীষের সাথে দোল খায় কৃষকের আগামী দিনের স্বপ্ন-সাধ। তবে শরতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÐ এখানে ঝুম বৃষ্টি নামলেও পাঁচ হাত দূরে নেই কোনো বৃষ্টির ছিটেফোঁটা। এ সময় আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কেড়ে নেয় বিন্দু বিন্দু শিশির জমা শিউলি, ছাতিম, গন্ধ ভাদালি, পান্থপাদপ, লিয়্যুইয়া, ইপিল ইপিল, অ্যাকাশিয়া, কুশ ও কাশসহ নানা প্রজাতির ফুল। বরষায় ভরা জলাশয়ে স্থান পায় শাপলা-পদ্মসহ নানা জলজ ফুলের প্রজাতি। ফলে ফলে সাজে কাঠ বাদাম, নারকেল, বাতাবিলেবু, খেজুর, তালসহ বিভিন্ন জাতের গাছ। শরতের শান্ত-স্নিগ্ধ রূপবৈচিত্র্য দিনের আলোয় ধরা দেয় একভাবে আর রাতে ধরা দেয় অন্যভাবে। দিনে যেমন বৃষ্টিধোয়া গাছের পাতা ও নির্মল ঘাসে সূর্য আলো পড়ে চারদিক মাঠ-ঘাটকে স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল করে তোলে তেমনি রাতে নির্মল নীল স্বচ্ছ আকাশে চাঁদের মায়াবী মাধবী জ্যোৎস্নার আলো আর কোনো ঋতুতেই দেখা যায় না। নির্মেঘ আকাশের জ্যোৎনার অমৃতসুধা পান করে মানুষ পায় পরমতৃপ্তি। কখনো রাতের আকাশ ছিঁড়ে ঝমঝম নামে ক্ষণিকের বৃষ্টি, পরক্ষণেই তকতকে পরিচ্ছন্ন আকাশের কোলে দোল খায় যুবতি চাঁদ। গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির জল টুপটাপ করে ভাঙে রাতের নির্জনতা। সুতা বেয়ে নেমে আসা চাঁদের আলোয় মানুষের উদাস বাউল মন ভেসে চলে নিরুদ্দেশের পথে। মহাকবি কালিদাসের সাহিত্যে শরৎ ধরা দিয়েছে নববধূর সাঝেÐ “…নববধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত। শুভ্র-সমুজ্জল কাশ ফুল এর পরিধেয়রূপে অবস্থান করছে, পদ্ম এর মুখ শোভা, মদমত্ত হংস এর রমণীয় ঝঙ্কার। আজ যেন সবাই মনলোভা রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে। আজ অনবরত মেঘের জল ঝ’রে ঝ’রে আকাশ কেমন সুনির্মল সাজেই না সেজেছে। আজকের দিনে কাঞ্চন ফুলের গাছগুলো কার মন না কাড়ছে…।” রবীন্দ্রনাথের ভাষায়Ð “…প্রভাতের প্রকৃতি কী অনুপম প্রসন্ন মূর্তি ধারণ করে। রৌদ্র দেখিলে মনে হয় যেন প্রকৃতি কী এক নূতন উত্তাপের দ্বারা সোনাকে গলাইয়া বাষ্প করিয়া এত সূ² করিয়া দিয়াছেন যে, সোনা আর নাই কেবল তাহার লাবণ্যের দ্বারা চারিদিক আচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে।” প্রকৃতির কণ্ঠে কণ্ঠে মিলিয়ে কবি গেয়েছেনÐ “আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা…।” বৈরী জলবায়ুর বিষাক্ত ছোবল ষড়ঋতুর শরীরে আঁচড় কাটলেও প্রতিবারই শরৎ আসে আপন নিয়মে। তারপরও শরতের প্রকৃতির বৈচিত্র্যতা রচনা করে এ দেশের মানুষের হাসি-কান্না, মান-অভিমান, মিলন-বিরহের মহাকাব্য। প্রকৃতি সাজে ছেদ পড়লেও প্রকৃতি সাজে অপরূপ সাজে। স্নিতা, স্বচ্ছতা, কোমলতা, নির্মলতায় আজও শরৎ প্রশান্তির পরশ বোলায় মানুষের মনে-প্রাণে। অন্তর দিয়ে অনুভব করে শরতের রূপবৈচিত্র্য।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন