প্রকৃতিতে বৈশাখ-মুকিত মজুমদার বাবু

প্রকৃতিতে বৈশাখ-মুকিত মজুমদার বাবু

280
SHARE
POJ

গাছে গাছে যখন ফুল ফোটে, কোকিল কুহু… কুহু… গান গায়, কানে কানে তখন প্রকৃতি বলে যায় বসন্ত এসেছে। চারদিকে কুয়াশার চাদর, সেই সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা আর পিঠে-পায়েসের আয়োজনই বলে দেয় এটা শীতকাল। ঝুম ঝুম বৃষ্টি আর মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি খেলা দেখে যে কেউ বলে দিতে পারে বর্ষাকালের কথা। নদীর তীরে কাশফুল আর অসীম আকাশের নীলে ধবধবে সাদা চাঁদের ইঙ্গিতই শরৎকাল। নবান্নের উৎসবে মেতে ওঠে কৃষক হেমন্তে। মাঠ-ঘাট চৌচির, চারদিকে ঝড়ের তান্ডব নিয়ে দুয়ারে হাজির হয় চৈত্র ও বৈশাখ অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে এটাই প্রথম ঋতু। বুঝতে বাকি থাকে না কালবৈশাখীর প্রলয় নৃত্যের কথা। এভাবেই চারদিকে জানান দিয়ে আসে বৈশাখ। আসে বাংলা নববর্ষ।

বর্ষ শুরুর প্রথম দিন রাজধানীর রমনার বটমূলসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দিনটিকে বরণ করতে শুরু হয় উৎসব। ইলিশ আর পান্তা খাওয়া যেন এ উৎসবের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা যোগ করেছে তার সঙ্গে নতুন মাত্রা। পুরুষরা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়িতে প্রাণের সঞ্চার করে মেলাপ্রাঙ্গণ। নতুন সাজে, নতুন বেশে পহেলা বৈশাখ যেন মিশে গেছে বাঙালির সত্তার সঙ্গে। এ দিনে গ্রামে গ্রামে, শহরে-বন্দরে চলে আনন্দ উৎসব। প্রাচীন বট কিংবা অশ্বত্থ গাছের ছায়ায়, নদীর পাড় কিংবা বিলের ধারে বসে জমজমাট বৈশাখী মেলা। জমে ওঠে পুতুল নাচ, লাঠি খেলা, সার্কাস, ঘোড়দৌড়, মোরগ ও ষাঁড়ের লড়াই। রাতে বসে গানের আসর। কবিগান, জারিগান, সারিগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালাই মনে করিয়ে দেয় বাঙালির শিকড়ের কথা। পহেলা বৈশাখ যেন বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উৎসব-আনন্দে অবগাহন করার দিন। শুধু মানুষের সঙ্গে নয়, প্রকৃতির সঙ্গেও বৈশাখের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। কালবৈশাখীর প্রচন্ড দাবদাহ আর ঝড়ের রুদ্রমূর্তি বুঝিয়ে দেয় বৈশাখের প্রকৃতি।

বিপদ থেকে বাঁচতে মানুষ আশ্রয় খোঁজে। আর সে আশ্রয় দেয় প্রকৃতি। যার কারণে প্রকৃতি পূজার ধারাবাহিকতা এখনও ভারতবর্ষে বিদ্যমান। প্রকৃতির সঙ্গে আদিকাল থেকেই মানুষের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। পহেলা বৈশাখ যে বাংলা বছরের প্রথম দিন হিসেবে পালিত হয় সেটাও কিন্তু প্রকৃতির কারণেই ঘটেছে। মোগল স্ম্রাট আকবরের শাসনামলে ইসলামিক হিজরি অনুসারে কৃষি ও ভূমির খাজনা আদায় করা হতো। সৌরনির্ভর হওয়ায় হিজরি পঞ্জিকা কৃষি বছর ও অর্থবছর একই সময়ে হতো না। অসময়ে খাজনা পরিশোধ করতে হতো বলে কৃষকদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হতো। সহজে খাজনা আদায়ের জন্য স¤্রাট আকবর আমির ফাতেউল্লাহ সিরাজিকে বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি করার আদেশ দেন। তিনি সৌর-হিন্দু ও চান্দ্র-হিজরি বর্ষপঞ্জির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি। সেই থেকে পালিত হয় বাংলা সন আর পহেলা বৈশাখে নববর্ষ।

প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকা যে অসম্ভব তা প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বুঝতে পেরেছে। শক্তির আধার হিসেবে তাই পূজিত হয়েছে পৃথিবী, সূর্য, সাপ, অগ্নি, পাহাড়, গাছ, নদী অর্থাৎ প্রকৃতি। সনাতন ধর্ম তার উদাহরণ বহন করছে আজও। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাচীনকালে আমেরিকার মেয়েরা জমি চাষ করার আগে ‘পৃথিবী’ মায়ের কাছে প্রার্থনা করতেন যা জে. এরিক টমসনের ইংরেজি অনুবাদে দেখা যায়, ‘আপনার বিরাট শরীর চাষ করে আঘাত দেব। আমার প্রার্থনা, আপনার বুকে চাষ করার অনুমতি দিন। আমি আপনাকে মলিন ও আপনার সৌন্দর্য নষ্ট করতে উদ্যত হয়েছি। খাদ্যলাভের জন্য আমি এই কাজ করতে উৎসাহিত হয়েছি। আপনার কাছে প্রার্থনা করি, যেন কোনো জন্তু আমাকে আক্রমণ বা কোনো সাপ আমাকে দংশন না করে কিংবা বৃশ্চিক বা ভ্রমর যেন আমাকে আঘাত না করে। গাছকে আদেশ করুন, তারা যেন আমার ওপর পড়ে না যায়।’ উত্তর আমেরিকার ইন্ডিয়ানদের ওরেন্ডার প্রকৃতি সম্পর্কে ড. কারপেনটার ‘ঈড়সঢ়ধৎধঃরাব জবষরমরড়হ’ নামক ইংরেজি গ্রন্থে মন্তব্য করেন, ‘ওরেন্ডা প্রাকৃতিক মূর্তশক্তি এবং সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, জল, উদ্ভিদ এবং প্রাণীসমূহ ও প্রকৃতির অন্যান্য বস্তুর মধ্যে নিজ নিজ রূপে প্রকাশিত হয়। বজ্রের যে শব্দ শোনা যায়, তাও ওরেন্ডার শক্তি।’ স্যার জন মার্শ্যাল ‘গধযবহলড়-উধৎড় ধহফ ঃযব ওহফঁং ঈরারষরংধঃরড়হ’ নামক ইংরেজি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ভারতে শক্তিপূজা খুবই পুরনো। ভারত ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশে বিশ্বমাতার আরাধনা এত দৃঢ়মূল ও সুব্যাপক হয়নি। বিশাল ভারতের প্রতিটা গ্রামের প্রতিটা ঘরে বিশ্বমাতার আরাধনার কথা জানতে পারা যায়। তিনি বিশ্বমাতা বা মহাদেবী বা মহাপ্রকৃতি নামে অভিহিতা।’

সভ্যতার দাম্ভিকতায় প্রকৃতি আজ বিপন্ন। প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় নিজের মতো করে। মানুষের তখন কিছুই করার থাকে না। প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা নয়, দরকার বন্ধুত্ব। আগামীর পৃথিবী বাসযোগ্য করে তুলতে প্রকৃতিকে বাঁচাতে, মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত করতে দূষিত জঞ্জাল সরিয়ে শুচি করতে হবে আমাদের ধরাকে।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন