প্রকৃতিকে গিলছে কালো আঁধার -মুকিত মজুমদার বাবু

প্রকৃতিকে গিলছে কালো আঁধার -মুকিত মজুমদার বাবু

577
0
SHARE

প্রকৃতির গর্ভে মানুষ লালিত-পালিত হয় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যনত্ম। তাই প্রকৃতি আর মানুষের বন্ধন অবিচ্ছেদ্য, চিরনত্মন। প্রকৃতি তাকে অমৃতসুধা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। শিক্ষা দেয়, শানিত্ম দেয়, মনুষ্যত্ব দেয়, লজ্জার বসন দেয়, মাথা গোজার ঠাঁই দেয়, অসুখে সুখ দেয়, বিপদে আগলে রাখে মায়ের মতো। প্রকৃতি থেকেই মানুষ পায় বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় সব উপকরণ। আজ মানুষের যে সভ্যতা গড়ার অহমিকা তাও কিন্তু প্রকৃতিরই দান। অথচ প্রকৃতির কোলে লালিত-পালিত হওয়া মানুষই প্রকৃতিকে রক্তাক্ত করছে, ক্ষত-বিক্ষত করছে। ভুলে যাচ্ছে, মাতৃগর্ভের শিশু সনত্মানের নাড়ী কেটে সেই সনত্মানকে কখনো বাঁচিয়ে রাখা যায় না। প্রকৃতিকে বিপন্ন করে মানুষের অসিত্মত্ব কখনো টিকিয়ে রাখা যায় না। অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় না। অথচ মানুষ বোকার মতো সেই কাজটাই করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্তমান সুখের আশায় ভবিষ্যতের সুখকে জলাঞ্জলি দিতে পারছে না। ফলে ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের পৃথিবী।

রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক। পঞ্চাশ বা ষাট দশকের যে ঢাকা আমরা দেখেছি; আজকের ঢাকার সাথে তার কোনো মিল নেই। তখন সবুজ গাছ-গাছালির ভেতরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত হাতেগোণা অট্টালিকা। অধিকাংশই ছিল ধুলোমাটির পায়েচলা পথ। দূষণের কালো ধোঁয়ায় আজকের মতো ধূলিমেঘের সত্মর জমতনা নীল আকাশের গায়ে। কান ঝালাপালা করা গাড়ির ভেঁপু আর যানবাহনের শব্দের বদলে তখন ছিল পাখির কলকাকলিতে ভরা চারপাশ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু নদী ছিল স্বচ্ছ জলের আধার। মাঝি মনের সুখে যাত্রী পারাপার করত। জেলেরা মাছ ধরত। নদীর দু’পাড়ের ছেলেমেয়ের সাঁতার কাটত মনের আনন্দে। রঙ-বেরঙের পাল উড়িয়ে নদীর ঘাটে এসে ভিড়ত বাণিজ্যের নৌকা। কি ব্যসত্মতাইনা ছিল বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে। তখনকার সবুজে মোড়ানো ঢাকার অনেক কিছুই আজ নেই। ঢাকা শুধু কলেবরে বাড়ছে আর বাড়ছে। এক তলার পর দোতলা, তারপর তিনতলা… এভাবেই আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে মানুষের মধ্যে। চারপাশের খাল, বন, নদী সবই গ্রাস করছে ঢাকা। ঢাকার এ এক অন্য রূপ। সবুজের জন্য এতটুকু ছাড় শহরের কেউই দিচ্ছেনা। অথচ সবুজকে গ্রাস করে মানুষের অসিত্মত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টার পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ। মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে এ এক মরণ খেলায় মেতেছে।

প্রথমে প্রকৃতি সংরক্ষণ, তারপর সভ্যতার বিকাশ। প্রকৃতিকে টিকিয়ে রেখেই সভ্যতার বিকাশ করতে হবে। কেননা, প্রকৃতিকে বিপন্ন করে সভ্যতা গড়ে তুললে, একদিন ওই সভ্যতাই মানুষের কাল হয়ে দাঁড়াবে। যার নজির আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। আমরা সিডর দেখেছি, জলবায়ু উদ্বাসত্মু দেখেছি, সুনানি দেখেছি, প্রচণ্ড খরায় পুড়ে খাক হওয়া ফসলের মাঠ দেখেছি, লবণপানির আগ্রাসন দেখছি, অকাল বন্যার ক্ষয়ক্ষতি দেখছি, তাপমাত্রার বিভৎসতা দেখছি। পরিবেশ ও প্রকৃতিবিষয়ক সচেতনতা না বাড়লে আমাদের আরো নতুন নতুন দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে।

বাংলার ছয় ঋতু আমাদের গর্ব। বাঙালির ঐতিহ্য। আমাদের এ ঐতিহ্য আজ বৈরী জলবায়ুর কারণে বিপন্ন। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে এখন গ্রীষ্ম, শীত আর বর্ষাকেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তাও আবার শীতের সময় শীত অনুভূত হয় না, বর্ষা আসে অকালে।

সৃষ্টির শুরু থেকেই জলবায়ু পরিবর্তিত হলেও প্রকৃতিই তার নিজস্ব নিয়মে ভারসাম্য বজায় রাখছে। কিন্তু মানবসৃষ্ট কারণে জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে দ্রুত থেকে দ্রুততর। যার কারণে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় যে শুধু আমাদের তা কিন্তু নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়ে উন্নতদেশগুলো এর জন্য বেশি দায়ী। তারা বিশ্ব জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে গিয়ে দ্রুত উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে তাপমাত্রা। লাগামহীন এ ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে হবে, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দর একটা পৃথিবী দিতে হলে।

আমাদের হাতেই পৃথিবীর মঙ্গল নিহিত। আমাদের হাতেই পৃথিবী ধ্বংসের চাবি। আমরা সুন্দরের দিকে এগিয়ে যাব নাকি নিকষ কালো আঁধারকেই বরণ করে নেব সে প্রশ্নের উত্তর একমাত্র ভবিতব্যই দিতে পারে।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন