পাখির জন্য ভালোবাসা-মুকিত মজুমদার বাবু

পাখির জন্য ভালোবাসা-মুকিত মজুমদার বাবু

820
SHARE

তখনো সূর্য ওঠেনি। পূবাকাশের লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বিশাল এক আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। একটু দূরে আরো পাঁচ সাতটা গাছ। বড় বড় কাঁচা আম ঝুলছে। তার পাশেই একটা লিচু গাছ। থোকা থোকা লিচু এসেছে। ওই গাছগুলো থেকে পাখিদের কলকাকলি ভেসে আসছে। একটা উড়ে যাচ্ছে তো দুটো এসে বসছে। কেউ বেসুরা কণ্ঠে মনের আনন্দে গান গাইছে। কারোর কণ্ঠ আবার দারুণ সুরেলা। কেউ পিউ পিউ করে নেচে চলেছে। কেউ আবার ফিসফিসানি কথায় মত্ত। ভোর হওয়ার সাথে সাথে ওদেরও ব্যসত্মতা বেড়ে গেছে। খাবারের সন্ধানে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। ছানাদের খাবার জোগাড় করার তাড়া রয়েছে।

বৈশাখ প্রায় শেষ। ‘প্রকৃতি ও জীবন’ প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের প্রকৃতিবিষয়ক চিত্রধারণ করতে আমরা শহর ছেড়ে অজ পাড়াগাঁয়ে। শহরের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি তাপমাত্রা এখানে কম। পাশে খোলা প্রানত্মর থাকায় শনশন বাতাস আছে। গাছের সুশীতল ছায়া আছে। চারপাশে চোখ জুড়ানো সবুজ আছে। মাঝে মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ার দেখা মিললেও গরমের দাপট কিন্তু মোটেই কম নয়। মানুষ হাঁসফাঁস করছে। সেই সাথে বাড়ছে দুর্ভোগ। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিও এই গরমে অস্থির। খাল-বিল পানি শূন্য। নদীতে হাঁটু পানি। কোনো কোনো নদীর বুকের ওপর দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে যানবাহন। গ্রীষ্মে পানির অভাব দেখা দেয় দেশের প্রায় সব জায়গায়। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন পানির দরকার, তেমনি পশুপাখির বেঁচে থাকার জন্যও পানির প্রয়োজন। তাইতো পানির অভাব আর প্রচন্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে প্রাণিকুল। মাঠ ফাটা রোদে মানুষ যেমন ঠান্ডা জায়গা খোঁজে, তেমনি পশুপাখিও শরীর ভেজাতে চায় শীতল পানিতে। পানি পান করে তৃষ্ণা মেটাতে চায়। কিন্তু সেই তৃষ্ণার পানি কোথায়?

গ্রামের চেয়ে শহরগুলোতে পানির সঙ্কট তীব্র। বিশেষ করে পশুপাখির জন্যে। গ্রামের কোনো কোনো বিলে-ঝিলে কিংবা পুকুরের তলানিতে জমে থাকা পানিতে পশুপাখি তাদের তৃষ্ণা মেটায়। শরীর ভিজিয়ে গরম থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পায়। কিন্তু শহরে বরাবরই পানির অভাব। কোথাও কোনো কল খোলা থাকলে কিংবা একটু পানি পেলে সেখানে পাখিদের ভিড় জমে যায়। উৎসবে মেতে ওঠে ওরা। খাবারের চেয়ে এই গ্রীষ্মের দাবদাহে ওদের বেশি প্রয়োজন পানির। একটু ছায়ার।

শহর ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে। শহরের পরিধি বাড়াতে গিয়ে আমরা গাছপালা, ঝোপঝাড় ধ্বংস করছি। যে গাছে পাখি বাসা বাঁধত, রোদের তাপ থেকে শীতল ছায়া পেতে আশ্রয় নিত, সে গাছ আমরা কেটে ফেলছি আমাদের সুখের প্রাসাদ তৈরি করতে। আমরা গাছ কেটে ফেলে কখনো নিরাশ্রয় পাখিদের কথা ভাবছি না। ওরা কোথায় বাসা বাঁধবে, কোথায় প্রজনন করবে, ছানাদের নিয়ে কোথায় স্বাচ্ছন্দে দিন কাটাবে তা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। আমরা ব্যসত্ম আছি আমাদের সুখ-শানিত্ম নিয়ে, ভোগ-বিলাস নিয়ে। আমাদেরই কারণে ওরা আজ হারিয়ে যাচ্ছে- এ কথাটা কখনো কারো মনে হয় না?

পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে অনেক পাখি তাল মেলাতে পারছে না। তারা হারিয়ে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রজাতি ইট-পাথরের শহরের দালানের ফাঁক-ফোঁকরে ঠিকই বাসা বেঁধে বংশবিসত্মার করছে। যারা এই পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে টিকে আছে তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? আমরা কি পারি না বারান্দার এক কোণে দুটি মাটির কলস (পাখিদের জন্য এক ধরনের বাসা) ঝুলিয়ে পাখির বাসা তৈরি করে দিতে? এই গরমে তৃষ্ণার্থ পাখিদের জন্য বারান্দার এক কোণে একটি পাত্রে পানি রাখতে, একটু খাবার রাখতে?

একটা ছয় তালা বিল্ডিং-এ এক ফ্লোরে চারটা করে ফ্ল্যাট থাকলে ওই বিল্ডিং-এ মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা দাঁড়ায় চব্বিশ। চব্বিশটা বারান্দায় যদি দুটি করে পাখির বাসা থাকে তাহলে আটচল্লিশটা বাসায় এক থেকে দুমাসের ভেতর কমপক্ষে বিশ জোড়া পাখি আশ্রয় নেবে। পরিবারের বেঁচে যাওয়া সামান্য খাবার আর পানি বারান্দার একপাশে রেখে দিলেই ওদের জন্য যথেষ্ট। এমনি করে শহরগুলোর অগণিত বিল্ডিং-এ যদি পাখিদের আশ্রয় দেয়া যায় তাহলে আমার বিশ্বাস, শহরটা শব্দদূষণে নয়, পাখির কিচিরমিচিরে ভরে উঠবে। জানি, পাখিদের বর্জ্যে বারান্দা নোংরা হবে। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে ওদের জায়গা দখল করেই গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি।

মানুষের সৌন্দর্য বিকশিত হয় অলংকারে। প্রকৃতির অলংকার পাখি। ইট-পাথরের এই শহরে প্রকৃতির অলংকার রক্ষা করতে আমাদের পাশেই আজ তাদের আশ্রয় দিতে হবে। আমাদের মতো পাখিদেরও বাঁচার অধিকার আছে।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন