Home আরোও বিভাগ নুসরাত ফারিয়ার খোলামেলা গল্প

নুসরাত ফারিয়ার খোলামেলা গল্প

SHARE
Nusrat-faria

ঘটনাটি প্রায়শই মনে নাড়া দেয় নুসরাত ফারিয়াকে। তখন তিনি শুধুই উপস্থাপনা করতেন। একবার চ্যানেল আই-এর এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশের বাইরে যান। সুযোগটি করে দিয়েছিলেন চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। ওই অনুষ্ঠানে তখনকার সময়ের একজন ব্যস্ত নায়িকাও অতিথি হিসেবে সামিল হয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই ওই চিত্রনায়িকার প্রতি সবার ছিল আলাদা নজর। নুসরাত ফারিয়া ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন একজন কর্মীর দায়িত্ব পালন করতে। অনুষ্ঠানে নুসরাত ফারিয়ার কর্মদক্ষতায় সকলে মুগ্ধ হন। দেশে ফিরে জাজ মাল্টিমিডিয়া কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন ফরিদুর রেজা সাগর। বলা বাহুল, জাজের নতুন ছবিতে নায়িকা হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন নুসরাত ফারিয়া। চলচ্চিত্রে আসার এই সুন্দর স্মৃতি প্রায়শই মনের গহীনে নাড়া দেয় ফারিয়ার। ভেবে ভেবে নতুন কাজে অনুপ্রেরণা খোঁজেন।
একটা সময় নুসরাত ফারিয়ার পরিচয় ছিল একজন উপস্থাপক ও মডেল হিসেবে। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় আধুনিক দৃষ্টি ভঙ্গি ও ভিন্নধর্মী স্টাইলের কারণে ব্যাপক আলোচিত হন। সেই সঙ্গে বিজ্ঞাপনচিত্রে তার গø্যামারাস উপস্থিতিও নজর কাড়ে সবার। চলচ্চিত্রে পা রেখেই নিজেকে যোগ্য অভিনেত্রী হিসেবে প্রমাণ করেন। ছিলেন উপস্থাপক। তারপর হলেন বিজ্ঞাপনের মডেল। যোগ্যতার গুণে চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আবির্ভূত হন। সাম্প্রতিক সময়ের খবর, নায়িকা থেকে গায়িকা হয়েছেন নুসরাত ফারিয়া। ‘পটাকা’ নাকে একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। ওই গানের মিউজিক ভিডিও এখন আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার বিষয়। গানের কথা লিখেছেন রাকিব হাসান রাহুল এবং সুর করেছেন প্রীতম হাসান। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে গানের চর্চা না করলেও ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল ফারিয়ার। তারই রেশ ধরে ‘পটাকা’ নামের মিউজিক ভিডিওতে গান গেয়েছেন এবং অভিনয়ও করেছেন। গানটির মিউজিক ভিডিও পরিচালনার পাশাপাশি কোরিওগ্রাফি করেছেন ভারতের বাবা যাদব।
২০১০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ার যাত্রা শুরু করেন ফারিয়া। ওই বছর বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়েছিলেন। এক সময় ডিজে হিসেবে কাজ করেছেন মিডিয়ায়। আর টিভির ‘ঠিক বলেছেন তো’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম টিভি পর্দায় উপস্থাপক হিসেবে আবিভর্‚ত হন। পরবর্তীতে এনটিভির ‘থার্টিফাস্ট ধামাকা কক্সবাজার’ অনুষ্ঠানটি ফারিয়ার জন্য ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। আরটিভির ‘লেট নাইট কফি উইথ নুসরাত ফারিয়া’ এস এ টিভির ‘ক্লিয়ার এস এ লাইভ স্টুডিও’ এটিএন বাংলার ‘ট্রেন্ড’ জিটিভির ‘লাক্স ওয়ার্ল্ড অব গø্যামার’ এনটিভির ‘স্টাইল অ্যাÐ ট্রেন্ড’ রেডিও ফুর্তিতে ‘নাইট শিফট উইথ ফারিয়া’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নুসরাত ফারিয়া তার সৃজনশীল প্রতিভাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি উপস্থাপক হিসেবে যেমন জনপ্রিয় তেমনি বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়। তবে চলচ্চিত্রের পর্দায় নিজেকে একজন শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। চলচ্চিত্রে তার সাবলীল অভিনয় এপার বাংলা, ওপার বাংলা দুই জায়গায়ই সমানভাবে প্রশংসিত। ফারিয়া অবশ্যই সুন্দরী। চলচ্চিত্রের পর্দায় অনেক সুন্দরীই তার সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হন। কিন্তু ফারিয়া এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্রের পর্দায় তার সাবলীল উপস্থিতি বিশেষ ভাবে প্রশংসনীয়। সে কারণে ফারিয়ার ভক্তের সংখ্যা দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণরা ফারিয়ার অভিনয়ের বেশ ভক্ত। সে কারণে ফারিয়ার নতুন ছবি মুক্তি পেলে তরুণরাই দেখার জন্য বেশি ভিড় করে। গায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর নুসরাত ফারিয়ার ভক্তের সংখ্যা বেড়েছে।
তবে দীর্ঘ প্রায় এক বছর হলো ফারিয়ার নতুন ছবি মুক্তি পায়নি। এর কারণ কি প্রশ্ন তুলতেই ফারিয়া বললেন, কারণ কিছুই না। ‘পটাকা’ গানের অ্যালবাম রিলিজের জন্য এতদিন ব্যস্ত ছিলাম। অচিরেই অভিনয়ে ফিরব।
পটাকা, ভিডিও অ্যালবামটি রিলিজের আগে ফারিয়ার অনুভ‚তি জানতে চাওয়া হয়েছিল। ফারিয়ার সহজ সরল স্বীকারোক্তি ছিল অনেকটা এরকমÑ প্রথম সিনেমা রিলিজের মতো লাগছে। একটু একটু ভয়ও হচ্ছে আমার গান সবাই পছন্দ করবে তো! তবে আমি আশাবাদী আমার গান সবার পছন্দ হবে। প্রশ্ন করা হয়েছিল গায়িকা হিসেবে নিজেকে কত নম্বর দিবেন? বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরই দিয়েছিলেন ফারিয়াÑ নিজের কাজের প্রশংসা নিজে করা ঠিক নয়। তবে আত্মবিশ্বাস জন্মেছে আমার গান সবার পছন্দ হবে।
পটাকা নামের এই মিউজিক ভিডিও থেকে অর্জিত অর্থ একটি স্কুলের জন্য ব্যয় করবেন বলে জানিয়েছেন ফারিয়া। ময়মনসিংহের রাইমনি নামের একটি গ্রামে কোনো স্কুলে ছিল না। ৪ বছর আগে ফরিয়ার পারিবারিক উদ্যোগে ওই গ্রামে একটি স্কুল গড়ে তোলা হয়। পটাকা থেকে অর্জিত আয়ের ১০ ভাগ ওই স্কুলের জন্য ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছেন ফারিয়া।
প্রশ্ন ছিল অভিনয়ের মতো গানেও কি নিয়মিত হবেন? নুসরাত ফারিয়া জানিয়েছেন, পুরোটাই নির্ভর করছে দর্শকের আগ্রহের ওপর। দর্শক শ্রোতারা যদি চায় তাহলে গান গাইতে কোনো আপত্তি নাই। তবে অনেক বেশি গান করবো না। বছরে একটা বা দুটো গান গাইবার ইচ্ছে আছে। নুসরাত ফারিয়ার মতো, পটাকা সাধারণ কোনো গান নয়। এই গানে একটি মেয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আছে। আমি আমার দায়িত্ববোধ থেকে গানটি করেছি।
পটাকায় আছে একটি মেয়ের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। অনেকটা কি ফারিয়ার নিজেরই মতো? কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকায় ফারিয়ার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে অতি সম্প্রতি। পত্রিকাটি লিখেছে “অভিনেত্রী ফারিয়া জন্মসূত্রে বাংলাদেশের মানুষ হলেও এপার বাংলার মানুষের মনে মজবুত বাসা তৈরি করে নিয়েছেন তার অভিনয় দক্ষতার গুণে। সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে তার মিউজিক ভিডিও পটাকা। প্রেমের ভাঙ্গন থেকে মেয়েরা কীভাবে বেড়িয়ে আসবে তাই নিয়েই বানানো হয়েছে মিউজিক ভিডিওটি। এই গান থেকে যা আয় হবে তা ব্যয় করা হবে একটি স্কুলের বাচ্চাদের পড়াশোনায়। নুসরাত পড়াশোনার ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে পড়াশোনার ব্যাপারে বেশ চাপ ছিল। নুসরাতের কথায় ‘ছোটবেলা কেটেছে আর্মি ক্যান্টনমেন্টে। শুধু পড়াশোনাই করেছি। স্কুলে যেতাম, স্কুল শেষে বাসায় ফিরে আসতাম। সে রকম বন্ধু ছিল না। বাবা সারাক্ষণ পড়াশোনার জন্য চাপ দিতেন। তাই খুব পড়েছি। রেজাল্টও ভালো ছিল’।
এত পড়াশোনার চাপ। অভিনয় জগতে আসার পথ কি মসৃণ ছিল? নুসরাতের মতে, না মসৃণ ছিল না। বাড়িতে সকলেই খুব রাগ করেছিলেন। এক-দেড় বছর আমার সঙ্গে পরিবারের অনেকে ভালো করে কথা বলেননি। পরে আস্তে আস্তে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।
তবে পড়াশোনাটা তিনি চালিয়ে যেতে চান। তার পাশাপাশি অভিনয় ও গানও। গানের প্রতি কেন এত আগ্রহ? প্রশ্ন তুলতেই নুসরাত বলেন, “গান না শিখলেও স্কুলের অনুষ্ঠানে গান, নাচ, বিতর্ক সবকিছুতেই অংশগ্রহণ করতাম। ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক আমার খুব পছন্দ। নজরুল সংগীত ভালো লাগে। গানের মাধ্যমে আমি সৃষ্টিশীল কাজের অনুপ্রেরণা পাই। তাই ঠিক করেছিলাম গান নিয়ে বড় কিছু করব। এতদিনে সেই সুযোগ পেলাম।”
টলিউডে এত কাজ করলেও বাংলাদেশই তার আসল ঠিকানা। ফারিয়ার মন্তব্য “কাজের ক্ষেত্রে কোনো সীমারেখা থাকা উচিত নয়। আমি দুই বাংলাতেই কাজ করতে চাই। কিন্তু থাকব বাংলাদেশে। এখানে উড়ে উড়ে এসে কাজ করে পালিয়ে যাব” মিষ্টি হেসে স্পষ্ট জবাব নুসরাতের।
দেশের প্রতি যার এত ভালোবাসা তার প্রতি আমাদের অনেক শ্রদ্ধা। নুসরাত ফারিয়া চলচ্চিত্রে যেমন তার অভিনয় প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছেন তেমনি দ্যুতি ছড়ালেন কণ্ঠেও।
আধুনিক, স্মার্ট এই গুণী অভিনয় শিল্পীর প্রতি রইল আমাদের অনেক, অনেক শুভ কামনা।