নিজের প্রতি অবিচার করেছি-মেহের আফরোজ শাওন

নিজের প্রতি অবিচার করেছি-মেহের আফরোজ শাওন

346
SHARE
humayun-ahmed-his-wife-shawon

জনপ্রিয় অভিনেত্রী, নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত ‘সেন্স অব হিউমার’ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয়ের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো। গ্রন্থনায় রয়েছেন সৈয়দ ইকবাল

জয়: খুবই ভালো লাগছে আজকে আমার অনেক প্রিয় মানুষ হুমায়ূন স্যারের স্ত্রী আমাদের ভাবী এই অনুষ্ঠানে এসেছেন…

শাওন: আপনি অনুষ্ঠানে এমনিভাবে সবাইকেই বলেন। সবাই আপনার প্রিয়, সবাইকে আপনি ভালোবাসেন। এটা তেমন স্পেশাল কথা না।

জয়: কেন বলছি জানেনÑ আপনি সবার ভেতর নানান কারণে আলাদা। আপনি আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন স্যারের কাজ করেছেন এবং আপনি যে কাজ করেছেন তা অমর হয়ে থাকবে। তাই আমি কেন বাংলাদেশের সবাই আপনার ভক্ত এবং আপনাকে ভালোবাসে…

শাওন: এই বিষয়ে আমি অবশ্যই লাকি। যারা হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবাসে অন্ধের মতো তারা আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে।

জয়: আপনি তো জানেন হুমায়ূন স্যার আমাকে কি পরিমাণ ¯েœহ করতেন এবং আমি কতটা শ্রদ্ধা স্যারকে করতাম…

শাওন: অবশ্যই জানি। আপনি উনার কাছ থেকে অনেক ¯েœহ পেয়েছেন। আপনাকে অনেক পছন্দও করতো।

জয়: উনি যখন অসুস্থ হয়ে চলে গেলেন, ‘আংটি’ নামের একটা নাটক… একদম শেষের দিকের ঘটনা…।

শাওন: আপনার মনে আছে কি না জানি না হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ পরিচালনায় নাটক ‘নিশিকাব্য’তেও আপনি অভিনয় করেছিলেন। সেটাতে আমিও ছিলাম। বিষয়টা কী মজার হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় আমার অভিনীত শেষ নাটকে কো-এ্যাক্টর আপনি।

জয়: আরেকটি মজার ঘটনা বলিÑ স্যারের একটি নাটক ছিল ‘তিথির নীল তোয়ালে’। সেই নাটকের ৭/৮টি পর্ব শুটিং করার পর একটি ছেলের দাড়ি দেখে সেই নাটকটি পুরো ফেলে দিলেন এবং সেটা নতুন করে শ্যুট হলো। কিন্তু আমার ভাগ্যে আর সেই নীল তোয়ালেতে অভিনয় করা হলো না। আরেকটি ঘটনা বলি স্যার যখন ‘দুই দুয়ারী’ সিনেমা করেছিলেন তখন ছবির সকল আলাপ আলোচনায় আমি ছিলাম। অনেক কাজও করেছিলাম। এমনকি স্যার আমাকে সেই চরিত্রে কাস্টিংও করেছিলেন যেটি রিয়াজ ভাই করেছিল। পরবর্তীতে মাহফুজুর রহমান ক্যামেরাম্যান তিনি সুপারস্টার রিয়াজ ভাইকে নিয়ে আসেন এবং যথারীতি আমি ছবি থেকে বাদ পড়ে যাই।

শাওন: আপনার তো কপালটাই খারাপ।

জয়: আসলেই আমার কপাল খারাপ। আমি জানি না সেটা কেন। স্যারের সঙ্গে শুরুর দিকে ‘সমুদ্র বিলাস’সহ অনেক নাটকে অভিনয় করেছিলাম। এরপর কি জানি হয়ে গেল। সে যাই হোক আমি স্যারের ভক্ত, আমার মতো লাখ লাখ কোটি কোটি মানুষ স্যারের ভক্ত। আর আপনি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমাদের সবার প্রিয় লেখকের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

শাওন: না, আমি আপনাদের প্রিয় লেখকের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে একজন।

জয়: এই যে আপনি গুছিয়ে সুন্দর করে আমাকে কারেকশন করে দিলেন এই জন্যই তো আপনি মেহের আফরোজ শাওন। আপনার নামে প্রথম যে অভিযোগ এসেছে সেটি হলো আপনি নাকি স্যারকে নিয়ে বানানো ছবি ডুব’এর প্রচারণা চালাচ্ছেন।

শাওন: আমি এখানে বলি সেন্সরবোর্ডের গুণী যারা সদস্য আছেন সম্মাানিত দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষেরা আছেন তারা ছবিটি দেখে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি জায়গায় ‘কাট’ দিয়েছেন। তাই তারা আমার অভিযোগ এবং চিঠির ভিত্তিতে যে কাজটি করেছে সেটি নিয়ে আর কথা বলে কী হবে! সম্মানিত সদস্যদের প্রতি আমার এইটুকু আস্থা রয়েছে বলেই আমি উনাদের উপর আর কোনো কথা বলিনি। তাই এক্ষেত্রে এখন আর আমার কথা বলার মতো কিছু নাই।

জয়: আমরা অন্যের ছবি নিয়ে প্রচারণা করবো না। আমরা নিজেদের প্রচারণা করবো।

শাওন: আচ্ছা, আমার একটা অভিযোগ আছে আপনার বিরুদ্ধে। আপনি কী টাকা খেয়েছেন যে ঐ ছবি নিয়ে আপনি কথা বলছেন?

জয়: টাকা খেলেও কী আমি আপনাকে বলে দিবো যে খেয়েছি। আচ্ছা, আপনার প্রতি যেমন ভালোবাসা আছে তেমনি কিছু প্রশ্নও আছে। অনেকগুলো প্রশ্ন থেকে গেছে আপনার জায়গা থেকে দায়িত্ব হচ্ছে সেগুলো ক্লিয়ার করা। আপনি অনুমতি দিলে সেই প্রশ্নগুলো করবো আর না করলে তা করবো না।

শাওন: আমি আপনার অনুষ্ঠানের কয়েকটি পর্ব দেখেছি। আপনি বিশেষ বিশেষ অংশগুলো আলাদা করে ফেসবুকে পোস্ট করে থাকেন। সেই চুম্বক অংশগুলো দেখে আমি ধরেই নিয়েছি যে এখানে এলে একটা মেশিনগানের সামনে বসতে হবে। সেটা আমার কাছে কোনো বিষয় না। আমি মিডিয়ার এত এত সাংবাদিকদের নানান সময়ে মুখোমুখি হয়েছি যে সবই না এখন খুব সিম্পল লাগে। আমি আপনার কথায় রেশ ধরেই বলছি আপনি একটু আগে বললেন অনেক মানুষ আমাকে অনেক পছন্দ করে আবার অনেক মানুষের প্রশ্ন আছে। আসলে এটাও না আমিও জানি। অনেকে আমাকে অনেক পছন্দ করে আবার অনেকেই অপছন্দ করে। এটা প্রশ্ন না। এটা জাস্ট দুইটা ভাগ। এটা থাকতেই পারে।

জয়: আপনার বিরুদ্ধে প্রথমই যে অভিযোগ সেটা হচ্ছে আপনি আপনার বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করেছেন।

শাওন: আপনি তো না জেনেই আমাকে অনুষ্ঠানে ডেকেছেন। আমি বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করিনি। এটা নিয়ে অনেক কথায় হয়েছে। আমি হুমায়ূন আহমেদের নাটক করি ১৯৯১ সালে। তখন আমি হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের কাউকেই চিনতাম না। আমি তখন নরমালি বাংলাদেশ টেলিভিশনে অডিশন দিয়ে উনার ‘জননী’ ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করি। পরবর্তীতে আমি উনার অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করি। তখনো আমি উনার পরিবারের কাউকে চিনতাম না। আমি পড়েছি ভিকারুন্নেসায়। হুমায়ূন আহমেদের কন্যারা পড়েছেন হলিক্রসে। এমনকি তাদের সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধানটাও অনেক।

জয়: তাহলে এটা কী মানুষের একদমই ভুল ধারণা যে শিলা আহমেদ আপনার ফ্রেন্ড?

শাওন: আমরা একসঙ্গে একটি নাটক করেছি। হুমায়ূন আহমেদের নাটক করা তো অনেক বছর ধরে… সেই সুবাদে আমরা একটি নাটক করি। যে নাটকটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। নাটকটির নাম ‘আজ রবিবার’। এই নাটকটিতে আমাদের দুজনকে দুই বোনের চরিত্রে এত সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে দর্শক তা দারুণভাবে গ্রহণ করে। তিতলী এবং কংকা নামের দুটি চরিত্রে আমরা অভিনয় করি। ঐ চরিত্রটিতে কাজ করার সময় আমাদের দুজনের মধ্যে অসম্ভব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কাজেই আমি বলতে চাই বান্ধবীর বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়নি, বরং বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল।

জয়: (অট্টহাসি) সেই বন্ধুত্বে ফাটল ধরলো কবে থেকে যখন সে জানলো যে বন্ধু থেকে মা হয়ে গেছেন?

শাওন: বন্ধুত্বে ভাঙন কবে হলো এটা আমি বলতে পারবো না।

জয়: আপনি তো তখন অনেক ছোট ছিলেন যখন আপনি হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবেসেছেন…

শাওন: অবশ্যই।

জয়: একজন লেখককে সবাই ভালোবাসতেই পারে কিন্তু বিয়ের মতো এত কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন? এটা কী আপনার কাছে মনে হয়নি ভুল?

শাওন: হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে অনেক মেয়েই তার সেই বইয়ের নায়িকা ভাবে। কিন্তু সেই লেখকের সঙ্গে প্রেম ভালোবাসা কিংবা প্রণয়ের কথা কিন্তু কারো মাথায় আসে না। তখনি আসে যখন সেই লেখক দ্বারা কোনো না কোনোভাবে প্রেম ভালোবাসার বিষয়টি মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় কিংবা এই ধরনের একটি প্রণয়ের সম্পর্কের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন তখনি কিন্তু মাথায় আসে। আমার বয়স তখন ছিল ১৫/১৬, তাই আমার মাথায় তখন প্রেম প্রণয় এসব আসেনি। বিয়ে তো অনেক পরের কথা। আর আমি যদি এখন পুরোটা বলে দেই তাহলে আমার লেখা বই তো ফ্লপ যাবে। খুব শিগগিরই এ নিয়ে একটি বই লিখবো। যেখানে আমার সকল কথা থাকবে। আমাদের সম্পর্কের ডিটেইল থাকবে। আমার কাছে সবকিছু আছে। হুমায়ূন আহমেদ আমাকে প্রথম কোন চিঠি লিখে আমাকে ভুলালেন, কোন কথাগুলো লিখে আমাকে উদ্বুদ্ধ করলেনÑ সবকিছু আমাদের দর্শক, পাঠক হিসেবে পড়তে পারবেন। হুমায়ূন আহমেদের মতো এত দায়িত্বশীল একজন মানুষ যখন ভাবেন এরকম হতে পারে তখন আমার জায়গা থেকে ভাবনা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

জয়: কিন্তু আপনার মা তো জানতেন। আপনার মা বাবা এটা জানার পর কী করলেন?

শাওন: জয় ভাই… আমি কী আমার মা বাবাকে জানিয়ে এটা করেছি নাকি। কী ধরনের কথা বলেন? আমি তো মাকে জানিয়ে বিয়ে করতে যাইনি।

জয়: তার মানে একেবারেই গোপনে করেছেন?

শাওন: জয় ভাই আপনি কি এগুলো কম জানেন? আপনি গোপনে কী কী করেছেন তা কি আপনার বাবা মাকে জানিয়ে জানিয়ে করেছেন? আপনি এখনো যা করেন তা কি সব ভাবী জানে?

জয়: আচ্ছা বিয়ের পর আপনার কী কখনো মনে হয়েছে যে গুলতেকিন আহমেদের সঙ্গে আপনি অবিচার করেছেন?

শাওন: আমার মনে হয়েছে কেউ যদি সফল সংসার করেন এবং দুজন ভালো মানুষ একসঙ্গে থাকলেই যে তাদের সফল সংসার হবে এমন কোনো কথা নেই। তাই আমি বলবো সংসার যদি সফল হয় তাহলে সেই সংসার কখনোই ভাঙে না। যদি অবিচারের কথা আসে তাহলে আমি বলবো আমি আমার প্রতি অবিচার করেছি। আমি আমার মা বাবার প্রতি অবিচার করেছি। আর অন্যের পরিবারের যদি স্বপ্নভঙ্গের কথা আসে তাহলে সেই স্বপ্নভঙ্গের দায়ভার সেই পরিবারের মানুষদের।

জয়: আপনি একজন মহীয়সী মাও। ফেসবুকে দেখি আপনি বাচ্চাদের কি যতœ করে লালন পালন করে থাকেন। তাদেরকে দেশ-বিদেশে ঘুরাচ্ছেন। কিন্তু আপনার আরেক সন্তান নুহাশ যখন চলচ্চিত্র বানাচ্ছে তাকে কেন অভিনন্দন জানান না।

শাওন: কে বলেছে একথা? জানাই তো।

জয়: কোথায় জানান?

শাওন: আপনি তো কিছুই জানেন না। হুমায়ূন আহমেদের বড় সন্তান নুহাশের প্রথম নাটকের পরিচালনায় যে অভিজ্ঞতা সেটা ছিল ‘চৌধুরী খালেকুজ্জামানের বিশ্বরেকর্ড’ নাটকে নুহাশ অ্যাসিস্ট করা। সেই নাটকটি আমি পরিচালনা করি এবং নুহাশ আমার সহকারী হিসেবে কাজ করে। তাহলে ওর পরিচালনায় একদম শুরু থেকেই আমার সঙ্গে একটা অন্যরকম ভালো লাগা রয়েছে। পরবর্তীতে নুহাশ যখন একক নাটক পরিচালনা করে তখন প্রোডাকশনের টিমের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছি। শুধু তাই নয়, নাটকের যখন পোস্টার করে তখন সেখানে নুহাশের নামের বানান ভুল ছিল আমি নিজে ফোন করে ঐ নাটকের সংশ্লিষ্ট মানুষদের বলি যে নামের বানান ঠিক করতে। আমি ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছিলাম তাকে অভিনন্দন জানিয়ে। আমার তো মনে হয় নুহাশের আরো আগে কাজে আসা উচিত ছিল। তার বোনদের উচিত মিডিয়ায় কাজ করা। হুমায়ূন আহমেদের সন্তানেরাই তো উনার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

জয়: অনেকেই বলে থাকেন যে, স্যারের মৃত্যুর পর উনার কবর নিয়ে আপনি দাবি করার কারণেই নুহাশ পল্লীতে সেই কবরটি হয়।

শাওন: প্রথমত বলি, এটা আমার চাওয়া ছিল না। এটা হুমায়ূন আহমেদেরই চাওয়া ছিল। উনি সেটা চেয়েছিলেন বলেই সেটাই পূর্ণ হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ যে এই জিনিসটাই চেয়েছিলেন তিনি সেটা তার ‘বলপয়েন্ট’ বইতে লিখেছিলেন। উনি ঐ বইয়ের একটি জায়গায় লিখেছিলেন ‘কল্পনায় দেখছি নুহাশ পল্লীর সবুজ ঘাসে শ্বেত পাথরের ধবধবে সাদা কবর। চরণধ্বনিতে নিয়োগো আমায় নিও না নিওনা…। ঐ শব্দটাকেই আমি বাস্তবায়ন করবার চেষ্টা করেছি। আমি এটা করেছি সত্যি। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে সে সময়ে পরিবারের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায়। তাই যতই ভালো কাজ করা হয় না কেন ঐ যে অপছন্দ করার কারণে সব কাজই খারাপ হয়ে যায়। তাই ঐ সময় কিছু মানুষ ইন্ধন দিয়েছিল বিষয়টি নিয়ে। আর ঐ সময়ে আমাদের পরিবারের মানুষদেরও কি মাথা ঠিক ছিল। অবশ্যই না। চিকিৎসার জন্য শেষ এক বছর আমেরিকায় আমি যখন ছিলাম তখন দেশের মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যরাও কি ভালো ছিল? সবাই কিন্তু অস্থির ছিল। তাই যখন ঐ রকম ঘটনা ঘটেই গেল তখন তার কবর দেয়া নিয়ে কিছু মানুষ বেশ রাজনীতি করেছে।

জয়: সম্পত্তিজনিত কোনো বিষয় ছিল? আপনি কি মনে করেছিলেন সন্তানের ভাগ না পাওয়া যেতে পারে তাই তেমনটি করেছিলেন?

শাওন: আপনার কী তাই মনে হয়? আপনি তো আমার বাবা মা পুরো পরিবারকে চিনেন। সব জেনে কী মনে হয় আমি সম্পত্তির জন্য তেমন করেছি। নুহাশ পল্লী তো শাওন পল্লী না। নুহাশ পল্লী যেরকম ছিল সেরকমই আছে। সব সময় সেরকমই থাকবে। হুমায়ূন আহমেদের অধিকার আছে। এই অধিকারটা যে আছে এবং এই অধিকারটা যে ওরা পালন করে যাচ্ছে তা একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন।

জয়: জানার খুব আগ্রহ হুমায়ূন স্যারের আগের পরিবারের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না?

শাওন: আগের পরিবার পরের পরিবার বলে কোনো কথা নেই। পুরোটাই হুমায়ূন আহমেদের পরিবার। আমি সম্প্রতি নিউইয়র্ক থেকে ঘুরে আসলাম। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার গত পাঁচ বছর যাওয়ার সাহস হয়নি। অনেক সাহস করে বাচ্চাদের দেখানোর জন্য নিয়ে যাই। তাই ঐখানে যাওয়ার পরও অনেক কাছের মানুষদের সঙ্গেও দেখা হয়নি। তারা আমার পরিবারের অনেক কাছের আত্মীয়-স্বজন। ঠিক তেমনি অনেকের সঙ্গে সারাক্ষণ কথা হয় না কিংবা দেখাও হয় না। কেউ কাউকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করি না ভাত খেয়েছো কি না, তরকারি ভালো হয়েছে কি নাÑ এই টাইপের আলোচনা হয় না। তবে হ্যাঁ তাদের সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যোগাযোগ হয়, কথা হয়। তখন প্রত্যেকেই সমপরিমাণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেই।

জয়: আপনাকে নিয়ে নানারকম গুঞ্জন রয়েছেÑ

শাওন: এটা প্রথমত মিডিয়ার কিছু লেইম। আর আমাদের সমাজে একটা মেয়ে একা থাকছে সেটা কেউ বিশ্বাসই করতে পারে না। মেয়েটি বিয়ে করছে না, ডিভোর্সী কিংবা তার স্বামী মারা গেছে এই ধরনের মেয়েদের নিয়ে কথা হবেই। একটা মেয়ে একা স্ট্রংলি চলতে পারে, থাকতে পারে এটা আমাদের সমাজের মানুষদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আর মেয়েটি যদি প্রতিবাদী হয় তাহলে তো মেয়েটিকে নিয়ে কথা হবেই। তাই সমাজ-সমাজের মানুষই চায় প্রতিবাদী সেই একলা মানুষকে দোকলা বানানোর একটা চেষ্টা, গুঞ্জন চলতেই থাকে। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হবে না কখনোই।

জয়: স্যারের চিকিৎসার সময় ওনার সঙ্গে যে সময়টা কেটেছে, তা নিয়ে যদি বলতেনÑ

শাওন: এটা আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের প্রশ্ন জানেন। আমার বিয়ে হয়েছে ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। বিয়ের পর আমরা কোথাও বেড়াতে যেতে পারিনি। আমার একটি সন্তান মারা যায় লীলাবতী। এরপর নিশাত হয়। তারপর তো সিনেমা নাটকে ব্যস্ত হয়ে যাওয়া…। পরবর্তীতে তো আরেকটি সন্তান হওয়া এবং উনার অসুখ ধরা পড়া। সব মিলিয়ে আমাদের দুজনের যে সময়… বেড়ানো সেটা হয়ে ওঠেনি। আর কাজের মধ্যে যে আনন্দ সময় সেটা হয়েছে। কিন্তু কোথাও সেইভাবে যাওয়া হয়নি। এরকম একবার ঘোরা হয়েছে যেখানে ছিল নিশাত হুমায়ূন, নুহাশ হুমায়ূন, মেহের আফরোজ শাওন এবং হুমায়ূন আহমেদ এটা ছিল আমাদের চমৎকার একটা বেড়ানো। সেই সময়ে নিশাত আর নুহাশের চমৎকার কিছু ছবি আছে। যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে শুধুমাত্র আমার আর হুমায়ূনের কখনোই বেড়ানো হয়নি। ট্রিটমেন্টে যখন নিউইয়র্কে যাই তখনকার সময়টা আমাদের কতটা লড়াইয়ের সময় সেটা বলে বোঝানো যাবে না। যে পরিবারের একটি মানুষও এই কর্কট রোগে আক্রান্ত হননি তারা বুঝতে পারবেন না। সেই যুদ্ধের মধ্যে আমার আর ওনার কিছু ভালো লাগার সময় গেছে। একটার পর একটা কেমো থেরাপি নেয়ার মধ্যে দুই সপ্তাহের একটা সময় থাকে। এটা করা হয় যেন শরীরটা এডজাস্ট করতে পারে সেজন্য। সেই ফাঁকা দুই সপ্তাহে উনি আমাকে নেট দেখে দেখে বলতেন ঐ জায়গায় যেতে কত সময় লাগবে, ঐ জায়গায় যেতে কত দূর হবে দেখার জন্য বলতেন। তাই সেই সময়ের কাটানো সময়গুলো খুব আনন্দের ছিল। তাকে দেখেছি কত মনোবল ছিল তার মধ্যে। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ যা যা করে একজন মানুষ জীবনের শেষ মুহূর্তটুকু যেভাবে আহরণ করা দরকার উনি তাই করে গেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তটুকুও জীবনে আহরণ করেছেন।

জয়: অনেক সিরিয়াস হয়ে গেছি। একটু হাল্কা হই…। আচ্ছা আপনি কী আর কখনোই বিয়ে করবেন না? এটা কী কষ্টের হবে না আপনার জন্য?

শাওন: আপনি কী করে ভাবলেন যে এটা কষ্টের হবে।

জয়: সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে তো এটাই বলে?

শাওন: আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এই কারণেই সাধারণ। আমার দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ হলে হুমায়ূন আহমেদের প্রেমে হয়তো পড়তাম কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ আমার প্রেমে পড়তেন না। আমার দৃষ্টিভঙ্গি যদি সাধারণই হতো তাহলে হুমায়ূন আহমেদ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমার সঙ্গে সুখের দিন কাটাতে পারতেন না। আমার চিন্তা ভাবনা অবশ্যই সাধারণ না।

জয়: যদি কখনো বিয়ে করার বিবেচনা করেন তাহলে আমার বিষয়টা ভাবতে পারেন। আমার দুটি সন্তান আর আপনারও দুটি সন্তান এই চার সন্তান মিলে আমরা সুখের সংসার করবো…।

শাওন: (শাসনের ভঙ্গিতে) ঐ ধরনের বিবেচনা করার মতো ইচ্ছা আমার নেই। আপনি একথা বলার পর মনে হয়েছে আপনাকে একটা ‘থাপ্পড়’ দেই। কারণ আপনি শুরুতেই বলেছিলেন উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করবেন না। কিন্তু আপনি সেই উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করলেন।

জয়: আপনি মনে হয় রেগে গেলেন…

শাওন: অবশ্যই। আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। প্রোগ্রামের পর আমি ‘থাপ্পড়’ দিতেও পারি।

জয়: আচ্ছা আপনি তো গানে বেশ পারদর্শী। অনেক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন…

শাওন: আমি ছোটবেলায় নাচতে চাইতাম। কিন্তু আমার মা চাইতেন আমি গান করি। তাই মাকে খুশি করার জন্য গান গাই। গান শিখি। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে প্রথম কাজ ‘জননী’ করার সময় ১৯৯১ তিনি আমাকে বলেছিলেন এই মেয়ে তুমি তো গানে পারদর্শী। নতুন কুঁড়ি থেকে বিজয়ীও হয়েছো। তাই গান গাও তো। এখন আমি গান গাই। তিনি তখন কিছুই বললেন না। এরপর থেকে তিনি প্রায়ই আমাকে গান গাওয়ার কথা বলতেন। ‘নক্ষত্রবাড়ি’ নাটক করার সময় ১৯৯৫ সালে তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম’ গানটা শোনো এবং তুমি আগামীকাল গাইতে হবে। সেখানে সেলিম খানও ছিল। আমি বললাম, গানটা তো এখুনি গাইতে পারবো। ওনাকে শোনানোর পর তিনি মুগ্ধ হলেন। উনি আসলে এমনিভাবে আমাকে গানের শিল্পীও বানালেন। তিনি আমার কাছ থেকে প্রায়ই গান শুনতে চাইতেন এবং শোনার পর চিরকুট দিতেন। আমি আস্তে আস্তে বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে এত বড় মাপের মানুষ আমার গানের এত প্রশংসা কেন করেন। তিনি তো আরো অনেকের গান শুনেছেন। তখন আমার মনে হতে লাগলো যে আমার মধ্যে গানের কিছু না কিছু আছে। এরপর থেকে আমি গানটাকে যতœ নেয়া শুরু করলাম। যেটা আগে করিনি। নরমালি গাইতাম। আমাদের মধ্যে যখন খুব ভালো সম্পর্ক প্রণয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে তখন আমার কাছে তিনি একটা গান শুনতে চেয়েছেন। কতোবারও ভেবেছিলো আপনা ভুলিয়া…। এটি রবীন্দ্রসংগীত।