Home ভ্রমণ নাটকের বাড়ি নাটকের গাড়ি!

নাটকের বাড়ি নাটকের গাড়ি!

SHARE

কলকাতা থেকে ফিরে রেজানুর রহমান

কলকাতার সল্টলেকের বিধাননগর এলাকায় শুধু নাট্যকর্মীদের থাকার জন্য একটি ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। নাট্যজন বিভাষ চক্রবর্তী ও তাঁর বন্ধুদের সহায়তায় অন্য থিয়েটারের উদ্যোগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটিকে ঘিরে অভিনয় ও অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত মানুষজনেরই পদচারণা। কলকাতায় গিয়ে আমরা এখানেই উঠলাম। আমরা মানে এথিক থিয়েটারের কর্মীরা। কলকাতার বারাকপুরে ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন সাগ্নিক-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক নাট্য উৎসবে বাংলাদেশ থেকে এথিক আমন্ত্রণ পেয়েছে। সেজন্যই আমরা কলকাতায় এসেছি। কলকাতায় পা ফেলে শুধু নাট্যকর্মীদের জন্য নির্ধারিত একটি ঐতিহাসিক ভবনে থাকার জায়গা পাওয়ায় এথিক-এর তরুণ কর্মীরা যারপর নাই অভিভূত। সবার চোখে-মুখে বিস্ময়। কারণ নাট্য কর্মীদের জন্য এতবড় সুযোগ তো নিজের দেশে নাই। অন্য থিয়েটার-এর এই ভবনটিতে বিভিন্ন নাট্যসংগঠনের কর্মীরা শিফট হিসেবে নির্ধারিত ভাড়ায় নাটকের মহড়া করেন। দেশ-বিদেশ থেকে নাট্য উৎসব অথবা নাট্য প্রশিক্ষণের জন্য এটি ভাড়া নেয়া যায়। দিনধরা হয় আগের দিন সকাল আটটা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা। ভাড়া খুবই কম।

ভবনটিতে ঢোকার মুখেই অফিস কাম অভ্যর্থনা কক্ষ। জুতা অথবা সেন্ডেল পায়ে উপরে উঠা নিষেধ। প্রতিটি রুমে ব্যবহার বিধি লিখে রাখা হয়েছে। যেমন: ঘরের দেয়ালে পেরেক জাতীয় কিছু লাগাবেন না। ঘরের ভেতরে ধূমপান ও মদ্যপান নিষিদ্ধ। ছাদে বা বাইরে ধূমপান নিষিদ্ধ নয়। এই বাড়িতে বহু মানুষ আসবেন এবং কাজ করবেন। তাছাড়া পাশেই একটি হাসপাতাল আছে। কাজেই সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখা সকলের দায়িত্ব। বহিরাগত ব্যক্তি অতিথির সঙ্গে অবশ্যই দেখা করতে আসবেন। কিন্তু তারা সংখ্যায় বেশি না হলে ভালো। বেশি সময়ের জন্য না থাকাই ভালো।

রাতে ১১ টার পর গেট বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ ক্ষেত্রে আগাম জানাতে হবে। অতিথি যে কয়দিন থাকবেন সেই কয়দিন ঘর ঠিকঠাক রাখা, আলো, পাখা বন্ধ রাখা, তালা ছাবির দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। ঘরের কোনো ক্ষতি হলে অতিথিকে সেই বাবদ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এরকম আরও কিছু নির্দেশনা দেয়া আছে ভবনটিতে। বাংলাদেশের অনেকেই অন্যথিয়েটারের এই ভবনে থেকেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মন্তব্য খাতায় মন্তব্যও লিখে এসেছেন। নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু লিখেছেন, অন্য থিয়েটারের ভবন অন্যরকম এক অনুভূতি। বিভাষদার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ভবনের নির্মাণকালে এসেছিলাম। সেটা ছিল স্বপ্নের নির্মাণ। এবার স্বপ্নের নির্মাণের সঙ্গে বসবাস। থিয়েটারের নিজের ঘর। ভালো লাগল। নাট্যজন শিমুল ইউসুফ, রোকেয়া রফিক বেবী, লুনা আফরোজ, ঠাণ্ডু রায়হানও মন্তব্য বইয়ের খাতায় এমন কথা লিখেছেন।

ভবনটি দেখে, বিশিষ্ট জনদের মন্তব্য পড়ে আমাদের এক তরুণ নাট্যকর্মী বললেন- আহারে আমাদের যদি এমন একটা ভবন থাকতো। আমাদের মানে আমাদের বাংলাদেশে এমন একটা ভবন থাকলে কি আনন্দই না হতো!

natokকলকাতার ভিতরেই বারাকপুর। সেখানেই সুকান্ত সদনমঞ্চে শুরু হয়েছে তিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব। দর্শকের উপস্থিতি দেখে মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেল। অধিকাংশ দর্শক এসেছেন পারিবারিক ভাবে স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে। বয়োজ্যেষ্ঠদের সংখ্যাও কম নয়। উৎসব শুরুর দিনে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন নান্দিকার মঞ্চস্থ করলো তাদের বহুল আলোচিত নাটক অজ্ঞাতবাস। বিরাট মিলনায়তনে ঠাসা দর্শক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো নাটক দেখলেন। নান্দিকারের প্রধান পুরুষ বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্র প্রসাদ সেন গুপ্ত নাটক শুরুর আগে এক বক্তৃতায় প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশের কথা তুললেন। বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের জন্য শুভেচ্ছা জানালেন।

নান্দিকারের অভিনয় শেষ। খুশি মনে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন দর্শক। নান্দিকারের প্রধান পুরুষ রুদ্র প্রসাদ সেনগুপ্ত তার দলের সদস্যদের নিয়ে যে গাড়িটিতে করে চলে যাচ্ছিলেন তার প্রতি হঠাৎ দৃষ্টি আটকে গেল। জ্বীপ সদৃশ্য গাড়িটির আগে ও পিছে লেখা নান্দিকার। দেখে বেশ ভালো লাগল। ওরা নাট্যকর্মীদের জন্য বাড়ি বানিয়েছে। গাড়ির ব্যবস্থাও করেছে। আমরা সেই তুলনায় কি অনেক পিছিয়ে আছি?

উৎসবের দ্বিতীয় দিন বাংলাদেশের নাটক মঞ্চস্থ হলো। বাংলাদেশের ‘এথিক’ নাটক মঞ্চস্থ করলো। নাটকের নাম ‘হাড়ি ফাটিবে’। উৎপল দত্তের এই নাটকটি দেখে দর্শক যারপর নাই আনন্দিত। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক নিয়ে কলকাতার দর্শকের আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখে একবারও মনে হলো না ঢাকা কলকাতার চেয়ে পিছিয়ে আছে। বরং মনে হলো ঢাকাই এগিয়ে আছে। তাহলে কেন আমাদের নিজস্ব একটি ভবন নাই। আমাদের গাড়ি নাই, বাড়ি নাই…

dev-shonkor-halderদেব শংকর হালদার মঞ্চ অভিনেতার চেয়ে একজন টিভি উপস্থাপক হিসেবে বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিত। উৎসবের তৃতীয় অর্থাৎ শেষদিন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন হযবরল-এর পক্ষে মঞ্চে অভিনয় করলেন। নাটকের নাম ইপসা। তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ আমরা। নাটক শেষে বাংলাদেশের তরুণ মঞ্চকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন তিনি। প্রথম প্রশ্ন ছিল- কেমন আছেন?

দেব শংকর হালদার: এই তো ভালো আছি। আপনাদের দেখে খুব ভালো লাগছে।

প্রশ্ন: আপনি কি জানেন বাংলাদেশে আপনার ভক্তের সংখ্যা অনেক?

দেব শংকর হালদার: হ্যাঁ জানি। সবাইকে জানাই অনেক শুভেচ্ছা।

প্রশ্ন: আপনি কি হযবরল’এর সঙ্গেই মঞ্চে নাটক করেন?

দেব শংকর হালদার: না, আমি বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে মঞ্চে অভিনয় করি। এটাই আমার একমাত্র কাজ। এখনই অন্য একটি গ্রুপের নাটকে রিহার্সেল করতে যাব।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক সম্পর্কে কিছু বলুন।

দেব শংকর হালদার: বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক অনেক উন্নত। এর আগে একাধিক নাট্য উৎসবে নাটক করার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলাম। অচিরেই একটি নাট্য উৎসব উপলক্ষে ঢাকায় যাব। উৎসবে আমাদের হযবরল-এর ইপসা মঞ্চস্থ হবে।

প্রশ্ন: ঢাকা ও কলকাতার দর্শকদের জন্য কিছু বলুন।

দেব শংকর হালদার: দর্শকদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলার আছে। তাহলো টিভি অর্থাৎ এই বোকাবাক্সটির প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী না হয়ে মঞ্চে নাটক দেখুন। মঞ্চকে ভালোবাসুন, দেখবেন নিজস্ব সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে। নিজেও বেশ আনন্দ পাবেন।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনে তুমুল বৃষ্টি ছিল। আশঙ্কা ছিল দর্শককে নিয়ে। অথচ বৃষ্টি উপেক্ষা করে দর্শক নাটক দেখতে এসেছেন। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। ভেতরে দর্শকে ঠাসা মিলনায়তন। মঞ্চে চলছে নাটক। দেখে শুধুই মনে হচ্ছিল আমাদের এখানে আমাদের মঞ্চে এমন সুন্দর পরিবেশ কবে পাব? এজন্য দায় কার? দর্শকের, নাকি নাট্যকর্মীদের?